ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০৪ জুন ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

নেতা আছে, সিনেমা নেই: অসহায় চলচ্চিত্রের স্বল্প আয়ের মানুষ

রাহাত সাইফুল : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৪-০৩ ৯:৪৪:১০ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৪-০৪ ২:১৮:১৩ এএম

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস দীর্ঘ ও গৌরবের। দেশ বিভাগের পর পশ্চিম পাকিস্তানের চলচ্চিত্র প্রযোজক এফ দোসানির পূর্ব পাকিস্তানে চলচ্চিত্র প্রযোজনার ব্যাপারে নেতিবাচক মন্তব্যে ক্ষুদ্ধ হয়ে আবদুল জব্বার খান ‘মুখ ও মুখোশ’ চলচ্চিত্র নির্মাণে উদ্যোগী হন। ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট বাংলাদেশের প্রথম সবাক বাংলা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ মুক্তি পায়। এটি প্রযোজনা করে ইকবাল ফিল্ম। মুক্তির পর এটি দারুণ সাড়া ফেলে। বিষয়টি উপলব্ধি করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি নিজে চলচ্চিত্রকে ভালোবাসতেন বলেই ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল উত্থাপিত বিলের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা (ইপিএফডিসি) প্রতিষ্ঠিত হয়। সে সময় তিনি শিল্পমন্ত্রী ছিলেন।

১৯৫৯ সাল থেকে ইপিএফডিসির সহযোগিতায় প্রতি বছর চলচ্চিত্র নির্মাণ হয় ও মুক্তি পেতে থাকে। একের পর এক জনপ্রিয় সিনেমা মোহিত করেছে দর্শকদের। ঢাকাই সিনেমার সাফল্য দেশের গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বাইরেও সুনাম অর্জন করে। বিএফডিসির শুটিং চলচ্চিত্রের ফ্লোরগুলোতে নিয়মিত শুটিং হতো। এমনকি ফ্লোর নিয়ে কাড়াকাড়ি লেগে যেত। এজন্য আগে থেকেই ফ্লোর বুকিং দিতে হতো। বিএফডিসিতে থাকতো উৎসবমুখর পরিবেশ।

নব্বই দশকের শেষের দিকে অশ্লীলতার ভূত এসে ভর করে এ দেশের চলচ্চিত্রে। এরপর থেকে ঢাকাই চলচ্চিত্রের শক্ত অবস্থান নড়বড়ে হয়ে যায়। ধীরে ধীরে হলবিমুখ হয় দর্শক।

পরবর্তী সময়ে ২০১২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারিভাবে ৩ এপ্রিল জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। এরপর থেকে দিনটি বর্ণিল আয়োজনে জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস হিসেবে উদযাপন করে বিএফডিসি। তারপর আট বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে দিবসটি পালিত হয়। করোনা মহামারির কারণে এবার ছন্দপতন ঘটেছে। রাখা হয়নি কোনো আয়োজন। 

চলচ্চিত্র শিল্পের এ বেহাল দশায় বিশ্বমানের চলচ্চিত্রের সঙ্গে পাল্লা দিতে বর্তমান সরকার বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। অ্যানালগ যুগ ছেড়ে ইতিমধ্যেই চলচ্চিত্র ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করেছে। তবে এফডিসির লাইট, জিমিজিব, ক্যামেরাসহ ডাবিং, এডিটিং ও কালার মিক্সের যন্ত্রপাতির ভাড়া তুলনামূলক বেশি হওয়া প্রযোজক বাহির থেকে ভাড়া নিয়ে কাজ করতে হয়।

ধীরে হলেও উন্নতির দিকে যাচ্ছে ঢাকাই সিনেমা—এ কথা স্পষ্ট। চলচ্চিত্র শিল্পের এই সম্ভাবনাকে পায়ে ঠেলে ‘উত্তপ্ত’ পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করছেন এই শিল্পের মানুষেরাই। গত কয়েক বছর ধরেই বিষয়টি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চলচ্চিত্র পাড়ায় কান পাতলেই শোনা যায়, একজন অন্যজনের বিরুদ্ধে কথা বলছেন।  দিনে দিনে সিনেমা নির্মাণ সংখ্যা তলানিতে ঠেকেছে। সিনেমা সংকটে প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হতে হতে ১৪০০ থেকে এর সংখ্যা এখন ষাটের ঘরে। 

এখন আর বিএফডিসির ঝর্ণা স্পটে গানের দৃশ্য, সুইমিং পুলে সাঁতার আর কড়ই তলায় মারামারি দৃশ্য দেখা মিলে না। এসব স্থান এখন যেন ময়লার ভাগাড়। শোনা যায় না দরাজ কণ্ঠের সংলাপ। সাড়া-শব্দহীন বিএফডিসি। বিএফডিসির মানুষগুলোও যেন প্রাণহীন। তাদের মুখেও নেই হাসি। চলচ্চিত্র ও বিএফডিসির সঙ্গে জড়িত আছে কয়েক হাজার মানুষ। চলচ্চিত্রে কাজ করেই চলে তাদের সংসার। পরিচালক, ক্যামেরাম্যান, লাইটম্যান, মেকআপম্যান, শুটিং বয়, টি বয়, এক্সট্রা শিল্পী, স্টান্টম্যানসহ কেউ ভালো নেই। 

এদিকে চলচ্চিত্রের ১৮টি সংগঠন রয়েছে। এ সংগঠনগুলোর নির্বাচনে বেশ উৎসবমুখর পরিবেশে অনেক আশা নিয়ে নেতা নির্ধারণ করেন সদস্যরা। এই নির্বাচন ঘিরেই আবার তৈরি হয় বিভাজন।

চলচ্চিত্র নির্মাণের কথা আসলেই সবার আগে প্রযোজক প্রয়োজন। দীর্ঘ দিন পর চলচ্চিত্রের ‘মাদার সংগঠন’ প্রযোজক সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠনটির নির্বাচন হওয়ায় অনেকে আশায় বুক বাঁধেন, চলচ্চিত্রের স্বার্থে সংগঠনটি কাজ করবে। এরই মধ্যে ছয় মাস পার হলেও মিটিং ছাড়া দৃশ্যমান কিছু লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এমনকি প্রযোজক সমিতির নেতাদের অনেকেই দীর্ঘদিন সিনেমা প্রযোজনা করছেন না। স্বাভাবিক কারণে পরিচাক ও শিল্পীরাও বেকার হয়ে পড়ছেন। সিনেমা নির্মাণ কম হলেও দিবস বা উৎসবে সংগঠনগুলোর নেতাদের তৎপরতা বেশ লক্ষ্যণীয়।

চলচ্চিত্র শিল্পের এই পড়ন্ত বিকেলে বিশেষ করে প্রযোজক সমিতির নেতাদের উদ্যোগী হয়ে সিনেমা প্রযোজনা বাড়ানো উচিত। নিজেদের মধ্যে বিভাজন চলচ্চিত্র শিল্পকে আরো সংকটের মধ্যে ফেলবে। এই সংকট শুধু ব্যক্তিগত ইস্যু নিয়েই তৈরি হচ্ছে। চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টরা পরস্পরের প্রতি কাদা ছোড়াছুড়ি করছেন, কাজ কম করছেন। ক্ষমতা প্রদর্শনের প্রতিযোগিতায় অসহায় হয়ে পড়ছে চলচ্চিত্রের স্বল্প আয়ের মানুষগুলো। এই সংকটময় মুহূর্তে চলচ্চিত্রের মানুষদের ব্যক্তি-বিদ্বেষ ভুলে চলচ্চিত্রের স্বার্থে এক হয়ে কাজ করলে এই বিপর্যয় থেকে উত্তরণ ঘটানো সম্ভব।

আমাদের প্রত্যাশা হলিউড, বলিউড, টালিউড সিনেমাকে পরোয়া না করে আবারো নতুন কোনো ‘মুখ ও মুখোশ’ নির্মাণে উদ্যোগী হবেন কেউ। ঢাকাই চলচ্চিত্র ফিরে পাবে প্রাণ। দর্শকমহলে সৃষ্টি হবে নতুন আগ্রহ। ফিরে আসবে চলচ্চিত্রের সোনালি অধ্যায়।

 

ঢাকা/শান্ত