ঢাকা, বুধবার, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ২৭ মে ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

করোনার ক্রান্তিলগ্নে আমাদের করণীয়

তাসলিমা পারভীন বুলাকী : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৪-০৫ ১১:৩২:২৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৪-০৮ ২:৪১:২৩ এএম

নিজাম সাহেব। একটি বহুজাতিক কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। রোজ সকালে চা আর খবরের কাগজ হাতে নিয়ে দিন শুরু হয়। করোনা পরিস্থিতিতে এখন কাগজ বন্ধ। নিরুপায় নিজাম সাহেব সকালে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে টিভিতে চোখ বুলান। ফেসবুকে নিউজ ফিডে ঢুঁ মারেন।

সকালের নাশতা পর্ব শেষ হতে হতেই চলে আসে দুপুর তারপর রাত। প্রতিবারেই খাবারের মেন্যুতে থাকে জিভে জল আনা রকমারি আইটেম। আর সেসব গোগ্রাসে খান তিনি। রফিক আনসারীর গিন্নী কর্পোরেট নারী। করোনা পরিস্থিতিতে লকডাউনে অফিস বন্ধ। সেই সুযোগ পুরোটা কাজে লাগাচ্ছেন মিসেস সামিয়া আনসারী। স্বামী আর সন্তানদের জন্য সবসময় কিছু করতে না পারার ব্যাথাটা তিনি এখন পুষিয়ে নিচ্ছেন। লকডাউনের সময়টাতে পরিবারের লোকজনের খুব কেয়ার নিচ্ছেন তিনি। আগে যেখানে একবেলা রান্না করতেন সবার জন্য এখন সেই সামিয়া যখন-তখন রান্না ঘরে যাচ্ছেন। তার কাছে আবদার করে বাদ যাচ্ছেন না পরিবারের কেউই। সবার মুখে প্রশান্তির হাসি যেন তিনি বেশ উপভোগ করছেন। শুধু তাই নয়, তিনি রোজ যেসব রান্না করছেন সেগুলো তার ফেসবুকের ওয়ালে পোস্ট করছেন এবং তার অন্য আত্নীয়দেরও রান্নায় উদ্বুদ্ধ করছেন।

অন্যদিকে, শাকিল আদনান করোনায় সাধারণ ছুটি পেয়ে স্ত্রী আর আটমাসের পুত্র নিয়ে গ্রামে গেছেন। অঘোষিত লকডাউনে তিনি আর শ্বশুরবাড়ির আমন্ত্রণ রক্ষা করতে পারেননি। অগত্যা, শাশুড়ি পুকুড়ের সবচেয়ে বড় মাছটা, বাড়ির কয়টা দেশি মুরগি, কবুতর রান্না করে মেয়ে বাড়ি হাজির হয়েছেন। কদিন গ্রামীণ পরিবেশে লকডাউনে বেশ আমোদে মেতে উঠল পরিবারটি।

এই হলো করোনা পরিস্থিতে আমাদের দেশের সামর্থবান কিছু পরিবারের হোম কোয়ারেন্টাইনের খণ্ড চিত্র। সামর্থ আছে এমন দশ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে নয় পরিবারে একই চিত্র পেয়েছি। সেই হিসেবে শতকরা ৯০টি পরিবারে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটিতে সংযম না মেনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তা উদযাপনের একটা খামখেয়ালিপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।  সেটা এটা শুধু শহরেই সীমাবদ্ধ নয়, গ্রামীণ জনপদেও উৎসবের আমেজ বিরাজমান। কিন্তু, মহামারি করোনা পরিস্থিতে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে নাগরিক সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার পাশাপাশি দেশের জন্য কী করণীয় তা আমরা অনেকেই জানি না বা বুঝি না। শুধু একপক্ষ অন্যপক্ষ বা সরকারকে দোষারোপ করেই ক্ষান্ত হই কিন্তু নিজেদের কর্তব্য কী তা এড়িয়ে যাই।

কিন্তু সময়টা দায়িত্ব আর কর্তব্য এড়িয়ে যাবার নয়। কঠিন আর বাস্তবতার প্রস্তুতি নেবার উপযুক্ত সময়। সবাইকে ধৈয্য আর সংযমের মধ্যে দিয়ে সহবস্থানের মাধ্যমে দেশের পাশে থাকার সময়।

কারণ করোনাভাইরাসের বিস্তার বিশ্বে একটা ভয়ানক মন্দা আর খাদ্য ঘাটতি সৃষ্টি করবে। এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতির ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষত পর্যটন, ভ্রমণ, বাণিজ্য ও উৎপাদন ব্যবস্থায় ধাক্কা, অভ্যন্তরীণ চাহিদা হ্রাস, পণ্য সরবরাহ ব্যাহত ও স্বাস্থ্যখাত দারুণ ক্ষতির মুখে পড়বে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান দুই চালিকা শক্তি হলো রপ্তানি ও রেমিট্যান্স। বিশ্বজুড়ে এই পরিস্থিতিতে দেশের গার্মেন্টস-এর রপ্তানিতে ধস নামার আশঙ্কা করছেন বিজিএমই সভাপতি রুবানা হক। (সূত্র: প্রথম আলো) শুধু গার্মেন্টস রপ্তানিই নয়, রপ্তানির সকল খাতে একে একে কার্যাদেশ বাতিলের চিঠি আসছে বাইরের দেশগুলো থেকে।

রপ্তানি আয় কমে গেলে দেশের শিল্প কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের আয় কমে যাবে। সেই সঙ্গে দেশের মানুষের কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। দেশে বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।

অন্যদিকে, প্রবাসীরা সিংহভাগ এখন দেশে। যারা বিদেশে আছেন তাদের অবস্থাও নাজুক। এমতাবস্থায় দেশে টাকা পাঠানো কমিয়ে দিলে তাদের পরিবার আগের মত খরচ করতে পারবে না। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে ব্যবসা-বাণিজ্যে। কমে যাবে বেচাকেনা। চাহিদা কমে গেলে ভোক্তাপণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতির মুখে পড়বে।

ফলে, বাংলাদেশে ও অর্থনীতির গতি ধীর হয়ে যাবে। ইতোমধ্যে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের আঘাত এসেছে। সুনির্দিষ্ট ৬টি খাতে এর প্রভাব পড়ছে। ভোগ্যপণ্য, মূলধনী যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল আমদানি, রপ্তানি খাতে সংকট দৃশ্যমান হচ্ছে।

এমতাবস্থায়, করোনাপরিস্থিতিতে আমাদের দেশে চলা এই অচলাবস্থা ঠিক কবে নাগাদ ঠিক হবে তা সঠিক করে কেউ বলতে পারেন না। আর ঠিক হলেও দেশের অর্থনীতি সচল হতে হলে ঠিক কতো সময় লাগবে তা আমাদের অজানা।

তাই,  বিশ্বে যখন খাদ্য সংকট আর অভাব, যেখানে অসহায় মানুষগুলো কষ্ট করছে, সেখানে বাসার কোয়ারেন্টাইনকে মজার ছুটি ধরে ঘরোয়া পার্টি করে আনন্দ উৎসবে সময় পার করা কোনো সচেতন মানুষের কাজ হতে পারে না। উদ্ধুত পরিস্থিতিতে দেশের প্রতিটি নাগরিকের সংযত জীবনচর্চা করা উচিত। এবং প্রতিদিনের ব্যয়ের খাতটা খুব হিসেব করে করা দরকার।

কোনো কাজে বিলাসিতা করার সময় এখন নয়। বিশেষ করে খাদ্য বা দৈনন্দিন ব্যবহারের কোনো বস্তুর ওপর। প্রতিদিন খাদ্য তালিকায় যে খাবারটুকু না হলেই নয় সেটিই রাখতে হবে। এই দুর্যোগের সময়ে কোনোক্রমেই খাবার নষ্ট করা চলবে না। ঘরের লাইট ফ্যান অযথা না জ্বালিয়ে ঠিক যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই ব্যবহার করতে হবে। সেইসঙ্গে গ্যাস এবং পানিও পরিমিতভাবে ব্যবহার করতে হবে। অযথা এসব নষ্ট করা থেকে বিরত থাকলে আপনি দেশের পাশে থাকলেন। হয়তো এমন সময়ও আসতে পারে যে, আপনার কাছে অর্থ আছে কিন্তু তা দিয়ে পণ্যদ্রব্য ক্রয় করার মতো পরিস্থিতি আপনার নাই।

তাই, করোনা পরিস্থিতিতেপরিবারকে বেশি বেশি সময় দিন। সন্তানদের নৈতিকতা, সহমর্মিতা শেখান। আত্নীয় স্বজনদের খোঁজখবর নিন। সেইসঙ্গে আপনার বাসার পাশের অভুক্ত মানুষের পাশে দাঁড়ান। এই দুর্দিনের কোয়ারেন্টাইন হোক আপানার সংযত জীবনচর্চা। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে দেশ আপনার কাছে এগুলো প্রত্যাশা করে। এখন সময়টা দশের পাশে থাকার। দেশের পাশে থাকার।

আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে?

লেখক: সাংবাদিক

ঢাকা/তারা