ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০৪ জুন ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

বাংলাদেশের সামনে যে সব ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ

অজয় দাশগুপ্ত : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৪-১০ ২:১৮:০৬ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৪-১১ ২:৫০:০১ এএম

করোনা দুনিয়াকে সম্পূর্ণ নতুন ও ভয়ঙ্কর বার্তা দিয়েছে। উন্নত বিশ্ব নামে পরিচিত শক্তিধর আমেরিকা আর ইউরোপ পারে নি এই মহামারি ঠেকাতে। চার্চিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লড়েছিলেন জার্মাানির বিরুদ্ধে। সাথে ছিলো ইউরোপ। আজকে জার্মাানিও লড়ছে সবার স‌ঙ্গে এক হয়ে। ঘাতক একটাই। চীন থেকে শুরু এই ভাইরাসের বিস্তার দেখে আপনি কি করে বলবেন এটি কারো উদ্দেশ্য প্রণোদিত কাজ? সাউথ আমেরিকা তথা ল্যাতিন আমেরিকানরা চীন ভারতের নাম জানলেও তাদের বিষয়ে উদাসীন। এদের জীবনে চীনা প্রভাব নাই। নাই ভারতীয় খাবারের দোকান। পুরো দুনিয়ায় রমরমা ব্যবসা হলেও এসব এলাকায় হিন্দী সিনেমা চলে না। সে সব দেশেও করোনা থাবা মেরেছে। কীভাবে বিশ্বাস করবো এক কি দুইজন পর্যটক বা বিদেশীর কারণে এই হাল? কোথাও ঘনীভূত রহস্য জমা আছে। যা হয়তো একদিন বেরিয়ে আসবে।

বলছিলাম আমাদের এই সিডনির কথা। আমরা একদিকে যেমন ভাগ্যের সহায়তা পাই, আরেকদিকে আছে কঠোর বাস্তবতা। সহায়তা বলতে যে‌হেতু এটি সাগরবেষ্টিত দেশ এবং কোনো স্থল সীমান্ত নাই তাই কোনো কিছু একবার ঠেকালে তা আর আসতে পারে না।  তাই অস্ট্রেলিয়া শুরুতেই বিমান চলাচলসহ বিদেশের যাত্রী বহণ বন্ধ করে দিয়েছিল। তবে জানতে হবে এ এক বিশাল দেশ। ভারতের চাইতেও বড়। ফলে তাকে অন্যান্য রাজ্যের স‌ঙ্গেও কঠোর হতে হয় বৈকি। সেটাও হয়েছে। সবগুলো অঙ্গরাজ্য কঠিনভাবে বন্ধ করে দিয়েছে আনাগোনা। একটি অভিন্ন রাষ্ট্র কাঠামোয় যা অস্বাভাবিক বা নিয়ম বর্হিভূত কিন্তু তাই হয়েছে। সে কারণেই বলা হচ্ছে করোনা পরবর্তী দুনিয়া আগের দুনিয়া থাকবে না। আর আমাদের ভাগ্যহীনতার কারণ এদেশে একবার কিছু ঢুকলে আর মহামারি হলে পালানোর রাস্তাও বন্ধ। তাই গোড়ার দিকে খানিকটা গড়িমসি করলেও এখন সরকার কঠোর। কারণ তারা পরিকল্পনা করে ফেলেছে। যারা কাজ হারিয়েছে বা কাজে যেতে পারছে না তাদের পরিবার বাঁচানোর অনুদান ঘোষণা এবং বিল পাস হয়ে গেছে। মে মাস থেকে দেওয়া হবে এই অনুদান এবং তা শুরু করা হবে মার্চ থেকে। ২ কোটির কিছু বেশি জনসংখ্যার দেশে এটা সম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশে?

সে প্রসঙ্গে আসার আগে আর একটা কথা বলি সামাজিক দূরত্ব এখানেও না মানার বাতিক আছে। বিশেষত আমাদের উপমহাদেশ থেকে আগত মানুষরা নিয়ম মানতে নারাজ। তাদের স্বভাব উল্টো কাজটা করা। দেখবেন আমাদের যেখানে মূত্র ত্যাগ নিষেধ বলে পোস্টার বা সাইন থাকে সেখানে গেলেই কড়া গন্ধে আপনার দম বন্ধ হয়ে আসবে। বাঙালির এমন স্বভাব  ঐ সাইন দেখার পরই তার বেগ চাপে। স‌ঙ্গে স‌ঙ্গে সে দাঁড়িয়ে বা বসে যায় কাজটি সারার জন্য। প্রাণঘাতী এমন একটা ভাইরাসের পরও মানুষ কিন্তু মানছে না। এখানে যেভাবে বাধ্য করা হচ্ছে তা হলো মোটা অঙ্কের জরিমানা আর জেল খাটার ভয়। এ লেখা যখন লিখছি তার আগে  আমি বাসা থেকে বেরিয়ে একটা কাজ কর‌তে যাবার পথে দেখলাম একজনকে পুলিশ তাদের গাড়ি‌তে তুলে নিয়ে গেলো। কোনো খারাপ ব্যবহার বা গালাগাল নাই । কিন্তু ঐ যে জরিমানা আর সাজা তাতেই সাইজ করা হবে। দেশে এটাও অসম্ভব।

প্রথম কারণ হচ্ছে আমাদের জনসংখ্যা। এই চাপ নেওয়া কোনো অলৌকিক শক্তির জন্যও কষ্টকর। এর ওপর আমাদের মানবিক বিবেচনা কি বলে? মানুষ যদি খেতে না পায় আর তার ঘরে মা ভাই বোন বাচ্চা কিংবা পত্নী না খেয়ে থাকে সে কিভাবে ঘরে থাকবে? আমাকে অনেকে বলেছেন যখন তাড়াহুড়ো করে সবাই দরকারী জিনিসপত্র কিনছিল তখন অনেকের বাজার করা দেখে মনে হতে পারে তারা বিয়ের বাজার করতে নেমেছে। এরা অবিবেচক। তাদের কোনো ধারণা নাই এই জিনিসগুলো তারা হয়তো ব্যবহার করারও সময় পাবে না। আর এমন দিনও আসতে পারে যখন তাদের তা খেতে মন চাইবে না।

এই ধরনের মজুদ ভয়ঙ্কর। আমাদের দেশের সমাজ শ্রেণি বিভক্ত। ধনীরা আর উচ্চবিত্তরা বেঁচে থাকবেন। সংকটে থাকবে মধ্যবিত্ত। কিন্তু সবচেয়ে গভীর খাদের কিনারে আছে নিম্ন মধ্যবিত্ত। তারা হাত পাততে পারে না। এই যে ধরেন পেপার পত্রিকা বন্ধ হবার পথে তাদের সার্কুলেশন নেমে এসেছে নিম্নতম পর্যায়ে এরা যদি বেতন না পায় চলবে কি করে? তারা কি সাহায্যের জন্য লাইনে দাঁড়াতে পারবেন? না তাদের কেউ দান খয়রাত করতে আসবে? নিম্ম আয়ের মানুষ মাস শেষে যা পান তাতেই চলেন। কীভাবে তারা বাসা ভাড়া দেবেন, কীভাবে খাবেন? সরকার যত প্রণোদনা আর প্যাকেজ দিক তাতো আর হাওয়ায় উড়ে ঘরে আসবে না। যারা দেবে বা দেবার মালিক তাদের চেহারা জাতি চেনে। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পরপর চোরদের উদ্দেশ্যে যে কটুকথা বলেছিলেন সে বাস্তবতা এখনো চলমান। লোকজন বলাবলি করছে যত করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন তার চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে চাল চোর। সবে তো চাল। এরপর আর কী কী আসে সেটাই দেখার বিষয়।

বিবিসি এবং বিশ্ব মিডিয়া বলছে পোশাক শিল্প নিয়ে মহা সংকটে পড়বে চীন, ই ইউ, বাংলাদেশ আর ভিয়েতনাম। ভাবুন একবার। এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল লাখো পরিবারের কী হবে? কী হবে সেই হকারের যে আপনাকে রোজ খবরের কাগজ দিয়ে ভাত জোটাতো। সব ধরনের খুচরো কাজ বন্ধ। মানুষ যারা দিন আনে দিন খায় তাদের কথা তো ভাবলেই ভয় পাই। সরকারের কি সাধ্য আছে ষোলো কোটি মানুষকে বসিয়ে খাওয়ানোর। তাই বাংলাদেশে মূলত দুই ধর‌নের সমস্যা। করোনা যেমন তাকে সতর্ক করছে, ভয় পাইয়ে দিচ্ছে, সাথে আছে খাদ্য ও আর্থিক সংকটের ভয়াবহ ভীতি।  উন্নয়ন বা অগ্রযাত্রার গল্পে এখন আর কাজ হবে না। এটা মাথায় রাখতে হবে মানুষ ভাত না পেলে রাস্তায় নেমে আসবেই। ভয় আছে মধ্যবিত্তকে নিয়ে ও। যখনই তাদের আয় রোজগার বন্ধ হয়ে যাবে তখন তার আত্মহননের প্রবণতা বাড়বে। হয়ে উঠবে মারাত্মক বিধ্বংসী। ফলে এটা মাথায় রাখা দরকার এই সমস্যার সমাধান যেমন এখন নাই তেমনি সতর্কতারও বিকল্প নাই। আমি জানি না কতটা রেশনিং চলছে দেশে। মানুষের কেনাকাটা সীমিত করতেই হবে। যেমন সিডনিতে এখন চাইলেই আপনি মজুদ করার জন্য কিছু কিনতে পারবেন না। জরুরি ও অপ্রতুল সবকিছু সীমিত করে দেওয়া হয়েছে।  যতটা প্রয়োজন ততোটাই নিতে পারার মতো। বাংলাদেশে এই নিয়ম চালু করাও কঠিন।

এটা বলার দরকার পড়ে না এই করোনা গেলেও থাকবে ভয়াবহ কঠিন দিন। সেই দুঃসময় মোকাবিলার মতো বিজ্ঞানসম্মত কোনো পথ বা পরিকল্পনা সরকারের আছে বলে মনে হয় না। যে সব স্তম্ভের ওপর অর্থনীতি দাঁড়িয়ে ছিল সবগুলো আক্রান্ত। পোশাক শিল্প রপ্তানী শিল্প রেমিট্যান্স সব এখন তোপের মুখে। অচিরে আশার পথ বা আলো ও দেখা যাচ্ছে না।

মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্ত আর দরিদ্র মানুষ না বাঁচলে কী হতে পারে সেটা অনুমানের বিষয় না, আতঙ্কের বিষয়। সময় থাকতে দুটি কাজ জরুরি, সাবধানে থেকে সংক্রমণ কমিয়ে দেশ ও অর্থনীতিকে সচল রাখা। আর পরিকল্পনা করে সংযম ও বিবেকের মাধ্যমে সংকট মোকাবিল করা। অন্ধত্ব বা কোনো অন্ধ বিশ্বাস এখন কাজে আসতে পারে না। এটাই নিয়তি।

লেখক: প্রাব‌ন্ধিক, অস্ট্রে‌লিয়া থেকে


ঢাকা/তারা