ঢাকা, শুক্রবার, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ২৯ মে ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

করোনাকালে সংবাদকর্মীর দায়

মোহাম্মদ নূরুল হক : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৪-২৪ ১:৩৩:০২ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৪-২৫ ৪:১৭:৫০ এএম

করোনা নিয়ে গুজব থামছেই না। বন্ধ হচ্ছে না গুজবনির্ভর সংবাদ প্রচারের হিড়িক। আজকাল হিট-কাটতির লোভে পড়ে অনেক গণমাধ্যম তথ্যমাত্রকেই সংবাদ হিসেবে গণ্য করছে। প্রকাশ করছে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে। কোনো কোনো গণমাধ্যম সেসব ‘তথ্যের’ (আদতেই এসব তথ্যের সংবাদমূল্য কিংবা গ্রহণযোগ্যতা নেই।) লিংক আবার বুস্ট করছে। ভাবছে না— এই গুজবনির্ভর ‘তথ্য’ একদিন তাদের জন্যও কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে!

এ জন্য জাতির যেকোনো ক্রান্তিলগ্নে দুই ধরনের লড়াকু মানুষের বড় প্রয়োজন। প্রথমত সশস্ত্র যোদ্ধা, দ্বিতীয়ত শব্দসৈনিক। প্রথম শ্রেণী যুদ্ধে-বিগ্রহে-সংগ্রামে-সংকটে-মহামারিতে জাতির পাশে দাঁড়ায়। কখনো অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে সশস্ত্র প্রতিপক্ষের ওপর। কখনো আর্তের সেবায় নিজেকে সঁপে দেয় অকাতরে। আর দ্বিতীয় শ্রেণীর কাজ আপাতত দৃশ্যমান হয় না। যদিও তারাও যোদ্ধা। কিন্তু তারা প্রথম শ্রেণীকে প্রয়োজনে যেমন সামনে এগিয়ে যাওয়ার মনোবল জোগান, তেমনি সময়ে-সময়ে পিছু হটারও পরামর্শ দেন। কখনো মিছিলের অগ্রভাগের সৈনিকের মুখে বসিয়ে দেন তীব্র স্লোগানের ভাষা, কখনো হাতে তুলে দেন শত্রুবধের মারণাস্ত্র। আবার এমনও সময় আসে, তখন তারা সশস্ত্র যোদ্ধাদের হাতে তুলে দেন গোলাপ। মানুষ এই নিরস্ত্র-শব্দসৈনিকদের নাম দিয়েছে বুদ্ধিজীবী-সংবাদকর্মী।

বিশ্বব্যাপী চলছে করোনার দাপট। পুরো মানবজাতিকে করে তুলেছে বিমর্ষ-শঙ্কিত। এই সময়ে জাতিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সরকারঘোষিত সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া উচিত বুদ্ধিজীবী-সংবাদকর্মীর। কিন্তু তারা কি জাতিকে করোনা সংক্রমণের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করে তুলছেন?

প্রায় সংবাদপত্রের পাতা খুললে, অনলাইন ব্রাউজ করলে দেখা যায়, ফেসবুকে ভাইরালসর্বস্ব তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি সংবাদ। যেসব তথ্যের আপাতত কোনো ভিত্তি নেই কিন্তু প্রচুর কাটতি আছে। আর এই কাটতির বিষয় মাথায় রেখেই কোনো কোনো গণমাধ্যম চটকদার শিরোনাম দিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে সাধারণ বাজার-ভার্চুয়াল মার্কেটে। তাতে যেমনি প্রিন্ট পত্রিকার কাটতি বাড়ছে হুহু করে, তেমনি বিদ্যুৎগতিতে হিট বাড়ছে অনলাইনে। টিআরপিও বাড়ছে টিভি চ্যানেলের।

এই তো সেদিনও ঘটেছে তেমনি এক ভয়াবহ ঘটনা। কেউ একজন ফেসবুকে পোস্ট দিলেন, রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় ছয়জন নিহত হয়েছে। ওই পোস্ট দেখামাত্রই কোনো রকম যাচাই-বাছাই ছাড়াই প্রতিবেদন প্রকাশ করে ফেললো কয়েকটি নিউজপোর্টাল ও দৈনিকে অনলাইন ভার্সন। কিছুক্ষণ পর আবার ওই সব নিউজপোর্টাল এবং দৈনিকের অনলাইন ভার্সন থেকে প্রতিবেদনটি সরিয়েও নেওয়া হলো। আর ওই ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে পাঠানো সংবাদবিজ্ঞপ্তিতে জানানো হলো, সড়ক দুর্ঘটনায় একজনের মৃত্যু হয়েছে।  এখন প্রশ্ন হলো— কেন এমন হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর ‍খুঁজতে গেলে কয়েকটি বিষয় সামনে আসবে। সেগুলো হলো:

     ১। ফেসবুক পোস্ট আসক্তি
     ২। ভিডিও ক্লিপের প্রতি  মোহ
     ৩। ফেসুবকের ইনবক্সে স্ক্রিনশট চালাচালি
     ৫। ভুয়া পোর্টালের নিউজ দেখে বিভ্রান্ত হওয়া
     ৬। টিভি স্ক্রলনির্ভরতা
     ৭। ব্রেকিং আসক্তি
     ৮। হিট বাড়ানোর প্রতিযোগিতা

পুনরুক্তি এড়ানোর জন্য এবং আলোচনার সুবিধার্থে উল্লিখিত আটটি বিষয় একসঙ্গ আলোচনা করা যাক।

বর্তমান যুগের ধর্মই এই— সবার আগে তথ্য পাওয়ার প্রতিযোগিতা। কেবল নিজে পেয়েই তৃপ্ত থাকে না  সংশ্লিষ্টরা, ওই তথ্য সবার আগে রাষ্ট্র করার এক ধরনের প্রতিযোগিতার মনোভাব তৈরি হয়ে যায় তাদের। তাই সবার আগে তথ্য পাওয়ার জন্য উদ্বেল হয়ে ওঠে অনেকেই। আর সত্য হোক কিংবা মিথ্যা— দ্রুত তথ্য পাওয়ার এখন প্রধান মাধ্যম ফেসবুক। সংবাদকর্মীদের অনেকেই এই ফেসবুক আসক্তির শিকার। তারা ফেসবুকে কোনো পোস্ট কিংবা ভিডিও ক্লিপ দেখামাত্র তা দিয়ে প্রতিবেদন তৈরির জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তাদের এই করিৎকর্মা স্বভাব দেখে একশ্রেণীর অসাধু-বিকৃত তথ্যপাচারকারী সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা নামে-বেনামে ফেসবুক আইডি খুলে বিভিন্ন ধরনের ব্যতিক্রমী টেক্সট-ছবি ও ভিডিও ক্লিপ পোস্ট দিতে থাকে। আর ছদ্মনামে প্রকাশ করা ওইসব পোস্ট স্বনামের আইডি থেকে ফেসবুকাসক্ত সংবাদকর্মীকে ইনবক্স করে।

এই প্রতারকচক্র কেবল নিজেদের তৈরি বিভিন্ন ভিডিও ক্লিপ-ছবি-টেক্সট ফেসবুকে পোস্ট করেই থেমে থাকে না; একাধিক নিউজপোর্টাল ও ইউটিউবভিত্তিক ভিডিও-চ্যানেলও পরিচালনা করে। সেখানে তারা বিদেশি বিভিন্ন মুভির ক্লিপ নিয়ে তৈরি করে ভিন্ন ধরনের ভিডিও। যেখানে নিজেদের তৈরি সংলাপ বাংলায় বসিয়ে দেওয়া হয়। এরপর বিভিন্ন অঞ্চলের নির্যাতিত বা নির্যাতনকারীর ভিডিও বলে ইউটিউবে ছেড়ে দেয়। একইসঙ্গে ওইসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোপনসূত্র কিংবা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাত দিয়ে তৈরি করে ফেলে আস্ত প্রতিবেদন। আবার সেসব প্রতিবেদন দেখে কোনো টিভিও স্ক্রল দেওয়া শুরু করে। এর ফলে ঘটে ভয়ঙ্কর সব ঘটনা! একই ঘটনায় ফেসবুকে ছবি-ভিডিও ক্লিপ ভাইরাল, নিউজপোর্টালে  প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পাশাশি টিভি স্ক্রল দেখে অতি উৎসাহী সংবাদকর্মীর ভেতর শুরু হয় অস্থিরতা। তখন ওই সংবাদকর্মী একটি সম্ভাব্য ‘ব্রেকিং নিউজ’ পরিবেশনের উত্তেজনায় তথ্য যাচাইয়ের কথা ভুলে যান। ওই স্ক্রিনশট-ভিডিও ক্লিপ ধরে তৈরি করে ফেলেন প্রতিবেদন। প্রকাশ করেন নিউজপোর্টালে। আর তখনই ঘটে যত অঘটন। ততক্ষণে সুলুকসন্ধানী দায়িত্বশীল, পেশাদার সংবাদকর্মীরা চষে বেড়ান খবরের এই প্রান্তর থেকে ওই প্রান্তর। তাতে বেরিয়ে আসে প্রকৃত ঘটনা। শুরু হয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরেও আলোচনা। কখনো কখনো এসব ঘটনার ফল এতটাই ভয়াবহ হয় যে, পুরো গণমাধ্যমটিই বন্ধ হয়ে যায়। একজন-দুইজন অতি উৎসাহী, অপরিণামদর্শী সংবাদকর্মীর ব্রেকিং আসক্তি-হিট প্রতিযোগিতার বলির পাঁঠা হতে হয় পুরো গণমাধ্যমটিকে। এর একাধিক প্রমাণ নিকট অতীত থেকে দেখানো যাবে।  সেসব ঘটনা জাতি এত দ্রুত বিস্মৃত হয়নি বলে, এখানে আর উল্লেখ করা হলো  না।

এখন বিশ্বব্যাপী চলছে মহামারি করোনার দাপট। অপরাধীরা স্বাভাবিক সময়ে যেমন অপরাধ করে বেড়ায়, তেমনি মহমারি-যুদ্ধ-বিগ্রহেও। তাদের অপরাধের কৌশল বদলায় মাত্র, নিজেদের বদলায় না কখনোই। তাই কোনো রাষ্ট্রে জরুরি অবস্থা কিংবা মহামারি শুরু হলে তারা অপরাধের নতুন নতুন কৌশল খুঁজতে থাকে। কখনো স্বেচ্ছাসেবী সেজে ঢুকে পড়ে মানুষের বাসা-বাড়িতে, কখনো সাহায্যপ্রার্থী হিসেবে মিশে যায় শরণার্থী-ত্রাণপ্রার্থীদের ভিড়ে। আর সেখানেই মানুষকে অজ্ঞান করে হোক, বিভ্রান্ত করেই হোক, লুট-ছিনতাই-চুরি করে পালিয়ে যায়। কখনো কখনো খুন করতেও দ্বিধা করে না। এই শ্রেণী হলো ট্র্যাডিশনাল ক্রিমিনাল। কিন্তু বর্তমানে আরেক ধরনের ক্রিমিনাল আছে, যাদের নাম দেওয়া যেতে পারে ডিজিটাল ক্রিমিনাল।

ট্র্যাডিশনাল ক্রিমিনালদের সাধারণত সবাই চেনে কিন্তু ডিজিটাল ক্রিমিনালদের সহজে চেনা যায় না। এরা সাধারণত শুভাকাঙ্ক্ষী সেজে মিশে যায়। এই শ্রেণীর প্রধান টার্গেট থাকে তথ্যপ্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করা। করতে না পারলে সংবাদকর্মীদের বিভ্রান্ত করার সব রকমের চেষ্টা করে যায়। এখন করোনাকালে তথ্যবিভ্রান্তি হচ্ছে সবচেয়ে বড় মহামারি। করোনা কেবল তাকে মৃত্যু পর্যন্ত নিয়ে যায়, যাকে সে আক্রান্ত করতে পারে। কিন্তু করোনাবিষয়ক বিভ্রান্তিমূলক তথ্য সমাজ-রাষ্ট্র থেকে শুরু করে পুরো মানবজাতিকেই ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। তবে এই বিভ্রান্তিমূলক তথ্য কিন্তু ডিজিটাল ক্রিমিনালরা নিজেরা প্রকাশ করে না, প্রচারও না। তারা গণমাধ্যমকর্মীদের হাত দিয়েই তা প্রচার করে। আর পরিশেষে গণমাধ্যমকর্মীদের করুণ পরিণতি দেখে পরিহাসের হাসি তারাই হাসে।

তাই, এই সময়ের সংবাদকর্মীকে হতে হবে সতর্ক, সন্দেহপ্রবণ, খুঁতখুঁতে, নির্মোহ, নিস্পৃহ এবং ‍দৃঢ়চেতা। গায়েপড়ে তথ্যদাতার প্রতি প্রকাশ্যে কৃতজ্ঞতার ভাব দেখালেও ভেতরে ভেতরে তাকে দেখতে হবে সন্দেহের চোখে। তার দেওয়া তথ্য সংশ্লিষ্ট এলাকার পুলিশ কর্মকর্তা, চিকিৎসক, প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগীদের মাধ্যমে একাধিকবার যাচাই করতে হবে। সংশ্লিষ্টবিষয়ের এক্সপার্ট দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে নিতে হবে ভিডিও ক্লিপ। মনে রাখতে হবে— ভিডিও ক্লিপের অরিজিনাল কপির সন্ধান পাওয়া কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। এক্সপার্টদের সহযোগিতা নিয়ে তাও উদ্ধার সম্ভব। প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞেরও শরণাপন্ন হওয়া উচিত। তাদের সাহায্য নিলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে, ভিডিওটি আসলে কোনো নাটকের স্ক্রিপ্ট কি না? নাকি পুরনো অ্যাকশন বা হরর মুভির ক্লিপ? আর তাতে সুকৌশলে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে ডিজিটাল ক্রিমিনালের তৈরি স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী সংলাপ?

এই দীর্ঘ প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করতে গিয়ে হয়তো কালপেক্ষণ হবে। হয়তো একটি সম্ভাব্য ব্রেকিং নিউজ হাতছাড়া হয়ে যাবে। তাতে কমে যাবে কয়েক লাখ হিট কিংবা কয়েকহাজার কপির কাটতি। এই কমে যাওয়া আখেরে কিন্তু ক্ষতি নয়। লাভ। কীভাবে? বলছি।

প্রচলিত কথায়, ন্যায়বিচারের মূলবাণী হলো— ‘আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে দশজন দোষী বের হয়ে যদি যায়, তবে যাক; কিন্তু একজন নিরপরাধও যেন শাস্তি না পায়।’ আইনের এই কথাটি গণমাধ্যম কর্মীদেরও মনে রাখা উচিত। তথ্য যাচাই করতে গিয়ে দশটি ব্রেকিং নিউজ যদি হাতছাড়া হয়, তবে হোক; কিন্তু অতি উৎসাহে অসাবধানতায় কিংবা অনবধানতাবশত যেন একটি ‘মিথ্যা তথ্য’ সংবাদ হিসেবে প্রকাশের সুযোগ না পায়। বিশেষত এই করোনাকালে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে সংবাদকর্মীদের। একথা ভুলে গেলে চলবে না, গণমাধ্যমের কাজ কেবল তথ্য সরবরাহ করা নয়, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনই তার নৈতিক দায়িত্ব।

লেখক: কবি-প্রাবন্ধিক ও সংবাদকর্মী


ঢাকা/তারা