ঢাকা, সোমবার, ২২ আষাঢ় ১৪২৭, ০৬ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

লিবিয়ায় বাংলাদেশি হত্যা এবং আমাদের দায়িত্ব

মাছুম বিল্লাহ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৫-৩১ ১:৫০:১৫ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৫-৩১ ১:৫০:১৫ এএম

মানব পাচার সংক্রান্ত অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাপ্রবাহ পত্রিকা, টিভির পর্দায় বছরজুড়েই দেখতে পাই। কিন্তু কোথাও কোনো সমাধান দেখতে পাই না দু’চারটি বিবৃতি ছাড়া। হু হু করে বেড়ে যাওয়া বেকারত্বের এই দেশে জন্ম নেওয়া হাজার হাজার তরুণ ভাগ্যের খোঁজে বিদেশে পাড়ি জমায়। এটি বিচিত্র কিছু নয়। ইংরেজ বণিকেরা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে অজানা সমুদ্র পাড়ি দিয়ে সারা পৃথিবী চষে বেড়িয়েছে। বিশে^র সব প্রান্তে গিয়ে বাণিজ্য করে কায়েম করেছে তাদের রাজত্ব।

অজানা  উদ্দেশ্যে যাত্রা, অজানাকে জানা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। আমাদের দেশের তরুণরাও চায় অজানাকে জানতে। কিন্তু এটিই তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য নয়। তারা মূলত ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে চায়। দেশের এই সীমিত পরিসরে যখন সেটি সম্ভব হয় না তখন তারা পাড়ি জমাতে চায় বিশে^র বিভিন্ন প্রান্তে। সেটি বৈধ, অবৈধ, ঝুঁকিপূর্ণ সব মেনে নিয়েই। কাজটি করতে গিয়ে যখন তাদের  সলিল সমাধি কিংবা বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটে তখন হায় হায় রব ওঠে। সরকারও নড়েচড়ে বসে। কমিটি গঠন হয়। কিন্তু বিষয়টি যে, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বের দাবিদার সে দিকে খুব একটা গড়ায় না।

আমাদের মনে রাখতে হবে, সিঙ্গাপুর নামক ছোট্ট ও উন্নত দেশটি ছিল একটি জেলে পল্লী। সেখানকার জনগণও কিন্তু অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে বিশে^র বিভিন্ন দেশে কাজ করত। সেই বিষয়টি তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছে। তার সাথে যুক্ত হয়েছে সরকার। বিশে^র বড় বড় কোম্পানিগুলোকে সেদেশে কাজ করার সহজ সুযোগ করে দিয়েছে তারা। ফলে সিঙ্গাপুরে তৈরি হয়েছে তরুণদের জন্য বিশাল কাজের ক্ষেত্র। পরে তাদের বিদেশে গিয়ে অর শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে হয়নি। সিঙ্গাপুর সরকার জনগণের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ট্যাক্স নিয়ে জনগণকে নিজস্ব ফ্লাটের মালিক বানিয়ে দিচ্ছে। যতটা জেনেছি প্রায় আশি শতাংশ মানুষেরই সেখানে রয়েছে নিজস্ব ফ্লাট। সরকারের পরিকল্পনা হচ্ছে, প্রতিটি মানুষ তার নিজের ফ্লাটে বসবাস করবেন। এসব দেশের মানুষ সরকারকে ট্যাক্স দেওয়ার জন্য হাতে টাকা নিয়ে বসে থাকে। আর আমাদের দেশে ট্যাক্স দিয়ে মনে হয় আমাদের টাকা দিয়ে হর্তকর্তারা কোন দেশে টাকা জমাচ্ছেন উপরওয়ালাই ভালো জানেন। যাদের ট্যাক্স দেওয়ার কথা তারা ট্যাক্স দেননা, বরং তারা ভোগ করেন ‘ট্যাক্স হলিডে’। ট্যাক্স দিচ্ছি আমাদের মতো সাধারণ মানুষ, দেশের রেমিট্যান্সের পাল্লা ভারি করছেন বৈধ ও অবৈধ উপায়ে জীবন বাজি রেখে বিদেশে কাজ করা মানুষগুলো। কিন্তু আমরা তাদের কি দিচ্ছি?

বিদেশী কোনো কোম্পানি এলে তাদের লাইসেন্স পেতে, লালফিতার দৌরাত্ম্যে নাভিশ^াস উঠে যায়। তারপর কমিশন বাণিজ্য, মাস্তান, চাঁদাবাজি এসব বিষয় তো রয়েছেই। কোন তরুণ, নতুন কোনো উদ্যোক্তা কিছু একটা শুরু করবেন, পার্টির মাস্তান, এলাকার মাস্তান, উটকো মাস্তান সবাই এসে আপনার কাছে চাঁদা দাবি করবে। কোথায় যাবে আমাদের তরুণরা? তখন তারা নিজের ভিটেমাটি বিক্রি করে অজানার উদ্দেশে পাড়ি জমায়। যারা লক্ষ্যে পৌাঁছাতে পারেন তারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষাভাবে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখেন, বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার সমৃদ্ধ করেন আর আমরা তার ক্রেডিট নিতে থাকি। কিন্তু তারা কীভাবে, জীবনক বাজি রেখে বিদেশে গেলেন সে খবর কেউ রাখিনা। আমরা শুধু বলি, আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এযাবত কালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলি কিন্তু নিজেকে জিজ্ঞেস করি না এর পেছনে কতটুকু অবদান রয়েছে আমাদের?

আমাদের বিদেশী মিশনগুলো যদি বিশে^র বিভিন্ন প্রান্তে উপযুক্ত শ্রমবাজার সৃষ্টি করতে পারতে তাহলে তো এসব তরুণদের ঐ দালালদের মাধ্যমে বিদেশে যেত হতো না। মরুভূমি পারি দিয়ে ডিঙ্গি নৌকায় চড়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে হতো না। আমরা কি আসলে বিষয়টির ওপর প্রয়োজনীয় গুরুত্ব আরোপ করতে পেরেছি? যারা বিদেশে আছেন তারা সবাই জানেন আমাদের মিশনগুলোর সেবাদানের চিত্র। কি সেবা তারা দিচ্ছেন অভিবাসীদের? কতটুকু সহায়তা তারা করছেন? বহুবার ফোন করেও কোন ফোনের উত্তর পাওয়া যায় না, তারা ফোন ধরেন না। এর প্রতিকার কি আছে? কে দেখবে এগুলো? এগুলো গল্প নয়, বাস্তব। 

ঈদ যেতে না যেতেই লিবিয়ার মানব পাচারকারী এক ব্যক্তির পরিবারের সদস্যরা ৩০ অভিবাসীকে গুলি করে হত্যা করেছে, তাদের মধ্যে ২৬ জনই বাংলাদেশি। কত বড় মর্মান্তিক ঘটনা! লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলী থেকে ১৮০ কিলোমিটার দূরত্বে মিজদা শহরে ঘটনাটি ঘটেছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মান্ত্রণালয় মিজদা শহরের নিরাপত্তা বিভাগকে দোষীদের গ্রেপ্তারে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে। আমরা জানি গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত লিবিয়া। যার অর্থনীতি তেলনির্ভর। কাজের সন্ধানে এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশ থেকেই তরুণরা অবৈধ পথে দেশটিতে পাড়ি জমায় যাতে ভবিষ্যতে তারা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপের কোন দেশে যেতে পারেন। আর কাজগুলো হয়ে থাকে অবৈধ পথে, এ সুযোগ নেয় দেশী-বিদেশী দালালরা। কোনোভাবে প্রাণে বেঁচে বর্তমানে একজন লিবিয়ানের আশ্রয়ে আত্মগোপন করে আছেন এক বাংলাদেশি। তিনি জানিয়েছেন ১৫ দিন আগে বেনগাজী থেকে মরুভূমি পাড়ি দিয়ে কাজের সন্ধানে মানব পাচারকারীরা তাদের লিবিয়ার ত্রিপলি শহরে নিয়ে আসার পথে তিনিসহ ৩৮জন বাংলাদেশি মিজদা শহরে দুষ্কৃৃতিকারীদের হাতে জিম্মি হন। জিম্মি অবস্থায় তাদের অত্যাচার, নির্যাতন করার এক পর্যায়ে অপহৃত ব্যক্তিরা মূল অপহরণকারী লিবিয়ান এক ব্যক্তিকে হত্যা করে। এর জের হিসেবে অন্যান্য দুষ্কৃৃতিকারীরা আকস্মিকভাবে তাদের ওপর এলোপাথাড়ি গুলি করে। ফলে ২৬ বাংলাদেশি নিহত হন। ১১ জন বাংলাদেশি হাতে-পায়ে, বুকে-পিঠে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। নিহত ২৬ জনের লাশ তার পরিবারের সদস্যরা ফিরে পাবেন কিনা তারও কোন নিশ্চয়তা নেই। যারা হাসপাতালে আছেন তারা আর স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবেন কিনা তারও কোন নিশ্চয়তা নেই। লিবিয়ায় বাংলাদেশি মিশন থেকে এখনও সেভাবে কিছু জানা যায়নি। এটিই একটি বড় প্রমাণ যে, আমাদের মিশনগুলো প্রবাসী শ্রমিকদের কতটা গুরুত্ব সহকারে দেখে। 

বিদেশে কর্মসংস্থানের বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্ব প্রদান করতে হবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে, সরকারকে। গুরুত্ব শুধু কথায় নয়, কাগজে নয়, গুরুত্ব দিতে হবে কাজে। যে কোনো বিষয় সামনে এলেই আমরা একটি সাধারণ কথা শুনি- ‘এ বিষয়ে ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে।’ এ ধরনের কথা বলে লাভ নেই। কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, কিসের আলোকে নেওয়া হয়েছে- সেগুলোর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। এটি যতটা জাতীয় বিষয় ততটাই বৈশ্বিক। তাই, বৈশ্বিক মন্ডলে যথাযথ কূটনৈতিক প্রক্রিয়া, চাপ প্রয়োগ করার বিষয়টি ভাবতে হবে। মানব পাচার অবশ্যই একটি আন্তঃদেশীয় সমস্যা, কাজেই একটি দেশের একার পক্ষে এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়, তাই বিষয়টিকে বৈশ্বিক মন্ডলে সমাধানের উদ্যোগ নিত হবে। এ কাজটি করতে হবে সরকারকেই। এ বিষয়ে  আমাদের দেশের অনেক বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বিশ্বের অনেক দেশে কর্মরত আছেন, তাদের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

আমাদের মনে আছে থাইল্যান্ডের গহীন অরণ্যে অবৈধ অভিবাসী প্রত্যাশীদের গণকবর আবিষ্কার হলে বিশ^জুড়ে হৈ চৈ পড়ে ছিল। তারপর পরই বিষয়টি আবার চাপা পড়ে যায়। আমাদের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান বিশাল। জনশক্তি রপ্তানি খাতে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দূর হলে অবৈধ উপায়ে, অবৈধ পথে বিদেশ গমণের প্রবণতা ও সংখ্যা কমে যাবে। আর বাড়বে রেমিট্যান্স প্রবাহ। আমরা এই কল্যাণকর বিষয়টি আসলেই চাই কিনা চিন্তা করতে হবে। আর তা করতে হলে বিদেশে অবস্থানরত মিশনগুলোকে সত্যিকার অর্থে গতিশীল করতে হবে। তাদের রুটিনমাফিক কাজ আর ট্রাডিশনাল দয়িত্ব পালন করলেই হবে না। বিদেশে শ্রম বাজারকে প্রসারিত করার জন্য যা যা দরকার তাই করতে হবে।

লেখক: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক

 

ঢাকা/তারা