ঢাকা     মঙ্গলবার   ০৪ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ১৯ ১৪২৭ ||  ১৪ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

risingbd-august-banner-970x90

স্মরণ

আলম তালুকদার: প্রাণবন্ত মানুষের প্রস্থান

|| রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৭:২৭, ৯ জুলাই ২০২০  

‘চীন হতে করোনার ভাইরাস আসে

পৃথিবীর দেশে দেশে যমদূত হাসে

ভ্যাকসিন আসে নাই মানুষেরা ত্রাসে

মানুষের দুর্ভোগ বাড়ে প্রতি মাসে।’

শিশুসাহিত্যিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আলম তালুকদারের ছড়া থেকে চারটি লাইন। করোনাকালে তিনি লিখেছিলেন এই ছড়াটি। ছড়াটি তাঁর জীবনেই সত্য হয়ে দেখা দিলো। করোনা নামক যমদূত তাঁকে আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে গেল ৮ জুলাই ২০২০, বিকেল সাড়ে তিনটায়। বুধবার রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তিনি স্ত্রী ও তিন সন্তানসহ বহু গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। আলম তালুকদার ১৯৫৬ সালের ১ জানুয়ারি টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার গালা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের মাধ্যমে চাকরিতে যোগ দেন।

যে মানুষটি প্রতিনিয়ত মানুষকে ছন্দে-আনন্দে ভরিয়ে তুলত সে মানুষটি সবাইকে বেদনার সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে চলে গেল অচেনা দেশে। এটি ভাবতে বুক ভারি হয়ে ওঠে। চোখ ভিজে আসে। কী বোর্ডে আঙুল স্থির হয়ে যায়। কী লিখব কিছুই ভেবে পাই না।

সদা হাস্যোজ্জল, প্রাণবন্ত, আড্ডাবাজ মানুষ আলম তালুকদার আর কখনো আড্ডার মধ্যমণি হবেন না। আর কখনো মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথার ফুলঝুরিতে, ছন্দের তুড়িতে উপস্থিত কবি-সাহিত্যিক তথা দর্শক-শ্রোতাদের চিত্ত চৈতন্যে ভরপুর করে দেবেন না। এখন এটিই চির সত্য। চির বাস্তব।

শিল্পসাহিত্যের মানুষজনের কাছে তিনি আলম তালুকদার নামে পরিচিত থাকলেও তাঁর একাডেমিক নাম ছিল নুর হোসেন তালুকদার। ছিলেন সরকারের একজন অতিরিক্ত সচিব। কর্মজীবনে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদ ও দায়িত্ব পালন করেন। একাধিক জেলার প্রশাসক, বেগম সুফিয়া কামাল গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও পরিবার পরিকল্পনা মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। চাকরির মেয়াদ শেষে সরকারের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে ২০১৬ সালে অবসর নেন।

অবসর জীবনেও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রাইম ইউনিভার্সিটিতে ছিলেন। অথচ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার পরও তাঁর বিচরণ ছিল অতি সাধারণ এবং সর্বজনসাহচর্য কেন্দ্রিক।
একজন নির্লোভ, সহজ-সরল প্রাণ, বইপ্রেমি মানুষ ছিলেন আলম তালুকদার। আমলা হিসেবে কখনোই পরিচয় দিতেন না। নিজেকে একজন শিল্পসাহিত্যের মানুষ হিসেবেই পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। শিল্পসাহিত্যের আহ্বান কখনো পরিত্যাগ করেছেন, এমন উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাবে না। বই নিয়ে তাঁর স্লোগান ছিল, পড়িলে বই আলোকিত হই, না পড়িলে বই অন্ধকারে রই। এতেই বুঝা যায়, বইয়ের প্রতি ভালোবাসা কতটা তাঁকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল।

প্রসঙ্গত, ২০১০ সালে আমার গ্রাম সিকিরচরে একটি পাঠাগার স্থাপন করি। তখন আলম ভাই পাবলিক লাইব্রেরির মহাপরিচালক। তাঁকে বললাম, আমার গ্রামে একটা পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেছি। ৩০ অক্টোবর উদ্বোধন। ঢাকা থেকে অনেকেই যাবেন, আপনাকেও যেতে হবে। তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বললেন, আরে কন কী! আপনার গ্রামে পাঠাগার দিছেন, আর আমি যাবো না, এটা কী করে ভাবলেন! এরপর বললেন, আর কে কে যাচ্ছে? আমি বললাম, কবি নির্মলেন্দু গুণ, নিসর্গী বিপ্রদাশ বড়ুয়া, শিক্ষাবিদ ড. সফিউদ্দিন আহমেদ, প্রচ্ছদশিল্পী ধ্রুব এষ, শিশুসাহিত্যিক আশরাফুল আলম পিনটু প্রমুখ। আলম ভাই নামগুলো শুনে বললেন, গুড চয়েজ। ঠিকানা বলেন। আমি টাইম মতো হাজির থাকব।

সেদিন ঠিকই আলম তালুকদার আমাদের পাঠাগারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। ঢাকাতেও শিশুসাহিত্যিক ফোরামের সকল অনুষ্ঠানে আলম ভাই যথাসময়ে হাজির থাকতেন। উল্লেখ্য, আলম তালুকদার বাংলাদেশ শিশুসাহিত্যিক ফোরামের উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য ছিলেন।

তিনি ছিলেন আপাদমস্তক শিল্পসাহিত্যের অন্তপ্রাণ একজন মানুষ। আজিজ সুপার মার্কেট, পাঠক সমাবেশ, কাঁটাবন ছিল তাঁর আড্ডা ও বিচরণের প্রিয় জায়গা।

শিশু সাহিত্যের প্রায় সব শাখায় তার স্বাভাবিক এবং স্বতঃস্ফূর্ত বিচরণ ছিল৷ রম্যসাহিত্যে রচনাতেও তার ছিল আগ্রহ। তাঁর লেখালেখির শুরু ১৯৬৮ সালে দেওয়াল পত্রিকায় লেখালেখির মাধ্যমে। এরপর তাঁর কলম থেমে থাকেনি কখনো। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১২০টি। তার প্রথম বই ‘ঘুম তাড়ানোর ছড়া’ প্রকাশিত হয় ১৯৮২ সালে। উল্লেখযোগ্য বই হচ্ছে—খোঁচান ক্যান, চাঁদের কাছে জোনাকি, ডিম ডিম ভূতের ডিম, ঐ রাজাকার, যুদ্ধে যদি যেতাম।

আলম তালুকদার ‘চাঁদের কাছে জোনাকি’ ছড়ার বইয়ের জন্য ২০০০ সালে অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হন। এছাড়া পালক অ্যাওয়ার্ড, জয়নুল আবেদিন পুরস্কার, কাদির নওয়াজ পুরস্কার, পদক্ষেপ সাহিত্য পুরস্কার, সাহস পুরস্কার, স্বাধীনতা সংসদ পুরস্কার, পশ্চিমবঙ্গের চোখ সাহিত্য পুরস্কারসহ বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

ভেবে অবাক ও বেদনাহত হই, গতকালও তিনি ফেসবুকে ছড়া ও ছবি পোস্ট করেছেন। আজ নেই হয়ে গেলেন। আমাদের শিল্পসাহিত্যে তাঁর অন্তর্ধানে যে শূন্যতার সৃষ্টি হলো, তা কখনো পূরণ হবার নয়। আলম তালুকদার এক এবং অনন্য।

আলম ভাই, আপনি যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন। শান্তিতে থাকুন। যে মানুষগুলোকে সারাজীবন হাসি-আনন্দে ভরপুর রাখতেন, আপনার মৃত্যুতে সবাই অশ্রুসিক্ত। ওপার থেকে আপনি নিশ্চয়ই দেখছেন, আপনাকে আমরা কতটা ভালোবাসি?

 

ঢাকা/শান্ত

রাইজিংবিডি.কম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়