ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৮ চৈত্র ১৪২৬, ০২ এপ্রিল ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

নির্বাচনী পোস্টারে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের খাতা

জাহিদ সাদেক : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০২-০৭ ৮:৫০:০৫ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০২-০৭ ২:৪৮:৪৮ পিএম
চলছে খাতা তৈরির কাজ

অনুষ্ঠিত হলো রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন। নির্বাচনে বিভিন্ন প্রার্থী পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর  লেমিনেটেড পোস্টার ব্যবহার করেছেন। বিষয়টি ভীষণভাবে সমালোচিত হয়। এমনকি শেষ দিকে এসে আদালত এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞাও দেন।

নির্বাচন শেষ হয়েছে। কিন্তু এখনও নগরীর বিভিন্ন জায়গায় ঝুলছে লেমিনেটেড পোস্টার। কারণ নির্বাচন পরবর্তী সময়ে প্রার্থীদের বেশিরভাগই দায়িত্ব নিয়ে পোস্টার সরাতে চান না। যদিও সিটি করপোরেশন থেকে উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু সেগুলো যথেষ্ট নয়। এই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে এসেছেন একদল তরুণ স্বেচ্ছাসেবী। তারা উদ্যোগী হয়ে পোস্টারগুলো বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করছেন। না, নির্দিষ্ট কোনো ডাস্টবিনে ফেলে দেয়ার জন্য নয়। তারা সেই কাগজ পুনরায় ব্যবহারের পরিকল্পনাও করেছেন। ফলে একদিকে যেমন পরিবেশ দূষণমুক্ত হবে, অন্যদিকে উপকৃত হবে দেশের মানুষ।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নাম বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন। এসব পোস্টার থেকে ৪০ হাজার খাতা তৈরি করবেন বলে জানিয়েছেন বিদ্যানন্দ মিরপুর শাখার মুখপাত্র সম্রাট হোসেন। তিনি রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘এবার দুই সিটি নির্বাচনে প্রায় ৩০ কোটি পোস্টার ছাপানো হয়েছিল। এই বিপুল পরিমাণ পোস্টারের জায়গা হতো ডাস্টবিনে, না হলে বিভিন্ন জলাশয়ে। সেগুলো সংগ্রহ করে ইতোমধ্যে ব্যাগ, ঠোঙ্গা, প্রেসক্রিপশন প্যাড, রশিদ স্লিপ বানানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দুই পাশে ছাপানো পোস্টারগুলো দিয়ে তৈরি করব ঠোঙ্গা। এগুলো রোজার মাসে ইফতার বিতরণের কাজে ব্যবহার করব। লেমিনেটিং করা পোস্টার দিয়ে হবে শপিং ব্যাগ। এছাড়া লিফলেটগুলোর পেছনের সাদা পৃষ্ঠা ফাউন্ডেশনের চিকিৎসা প্রকল্পে প্রেসক্রিপশন লেখার কাজে ব্যবহারের চিন্তা রয়েছে। সরকারি কিংবা রিরোধী দল; সব প্রান্ত থেকে আমরা সাড়া পাচ্ছি। ইতোমধ্যে কয়েক ট্রাক পোস্টার আমরা খাতা তৈরির জন্য পাঠিয়ে দিয়েছি। আশা করছি ৪০ হাজারেরও বেশি খাতা তৈরি হবে এই পোস্টারগুলো থেকে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন রিসাইক্লিং নিয়ে কাজ করছি। এজন্য চলমান অমর একুশে বইমেলাতে স্টল দিয়েছি। আমাদের স্টল সাজানো হয়েছে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়া পরিত্যক্ত বোতল, পুরাতন খবরের কাগজ, নির্বাচনী পোস্টার, অব্যবহৃত ইলেক্ট্রনিক্সের যন্ত্রপাতি এবং মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ দিয়ে। পেছনের ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মানুষসহ জলজ প্রাণীদেহে প্লাস্টিক বর্জ্যের ক্ষতিকর প্রভাব। আমরা চেষ্টা করেছি যাতে বই বিক্রির পাশাপাশি মানুষের ভেতরে সম্পদের রিসাইক্লিং-এর ধারণা ছড়িয়ে দিতে পারি। ঘরে পড়ে থাকা পুরাতন ল্যাপটপ, মোবাইল বা ওষুধের বিনিময়ে বই কিনতে পারবেন আমাদের স্টল থেকে।

নির্বাচনের পরদিন থেকেই সংস্থার স্বেচ্ছাসেবীরা সকাল-সন্ধ্যা নগরীর বিভিন্ন জায়গা থেকে পোস্টার সংগ্রহ করেছেন। যেসব পোস্টারের শুধু একপাশে লেখা, অন্য পাশ সাদা, সেগুলো দিয়ে বানানো হবে এতিম ও অসচ্ছল শিশুদের জন্য লেখার খাতা। দড়ি চাল ডালের বস্তা প্যাকেজিংয়ের কাজে ব্যবহার করা হবে। এই মহৎ উদ্যোগে পাশে দাঁড়িয়েছেন উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম ও বিভিন্ন ওয়ার্ডের কাউন্সিলররাও।

খাতা পেয়ে খুশি শিশুরা

 

তারা জানান, কোটি কোটি টাকার নির্বাচনী পোস্টার নির্বাচন শেষে মূল্যহীন। কবে সরানো হবে এসব পোস্টার, তার অপেক্ষায় না থেকে এগুলো কাজে লাগাচ্ছেন। বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করা হচ্ছে। অর্থের বিনিময়ে নয়, শুধু দূষণ থেকে ঢাকাকে বাঁচাতে তাদের এই উদ্যোগ। না হলে আসছে বর্ষায় নালা-নর্দমায় পানি জমে আবারও ছড়াবে মশাবাহিত রোগ।

সম্রাট জানান, অনেক কাউন্সিলর নিজেরাই তাদের হাতে পোস্টার তুলে দিচ্ছেন। আগারগাঁও, মিরপুর, শ্যামলীর বিভিন্ন ওয়ার্ডের প্রার্থীরা নিজ থেকে যোগাযোগ করছেন। যে প্রার্থী নির্বাচনের আগে সেভাবে পোস্টারগুলো ব্যবহার করতে পারেননি, তিনিও ফোন দিয়ে বাসায় জমে থাকা পোস্টার নিয়ে যেতে বলছেন।

স্বেচ্ছাসেবকদের একজন সাব্বির রহমান বলেন, ‘আমাদের তৈরি খাতা যখন বাচ্চাদের দিচ্ছি তখন তারা দ্বিগুণ আনন্দে সেগুলো নিচ্ছে।’ তিনি টুম্পা নামে এক দরিদ্র শিশুর কথা স্মরণ করে বলেন, ‘শিশুটি খাতার অভাবে লিখতে পারছিল না। এখন সে লিখতে পারছে আমাদের তৈরি পোস্টারের খাতায়। দেশের জন্য ভালো কাজেও সুখ আছে। টুম্পার হাসি মুখ আমি কখনও ভুলব না।’

অব্যবহৃত পোস্টারগুলো সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের চিত্রাঙ্কনে ব্যবহারের পরিকল্পনাও বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের রয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রঙ তুলিতে রঙিন হোক এই দেশ, এটাই তাদের প্রত্যাশা।

বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন সরকারের নিবন্ধিত একটি শিক্ষা সহায়ক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। ৪০ জন কর্মকর্তা, কয়েকশ স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে ৮টি শাখায় ফাউন্ডেশনের কাজ চলছে। এর আগে ১ টাকায় আহার, ১ টাকায় চিকিৎসা, ১ টাকায় আইনি সেবা বা ইফতার বিতরণ করেও এই সংগঠন প্রশংসিত হয়েছে।

 

ঢাকা/তারা