ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১ কার্তিক ১৪২৬, ১৭ অক্টোবর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

অনাকাঙ্ক্ষিত ওজন হ্রাসের বিপজ্জনক ২০ কারণ

এস এম গল্প ইকবাল : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৯-২১ ১২:০৭:৫২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৯-২১ ১২:০৭:৫২ পিএম
প্রতীকী ছবি

এস এম গল্প ইকবাল : অপ্রত্যাশিতভাবে ওজন কমে যাচ্ছে? তাহলে এটি হতে পারে মারাত্মক কোনো রোগের লক্ষণ। এ নিয়ে দুই পর্বের প্রতিবেদনের আজ থাকছে প্রথম পর্ব।

* পুষ্টিহীনতা
বিশ্বব্যাপী ৫০ শতাংশ হাসপাতালে ভর্তিকৃত রোগী পর্যাপ্ত পুষ্টি পায় না অথবা পুষ্টিহীনতার ঝুঁকিতে থাকে। অ্যাবটের রেজিস্টার্ড ডায়েটিশিয়ান অ্যাবি সাউয়ের বলেন, ‘হাসপাতালে ভর্তি বা হসপিটালাইজেশন পুষ্টিহীনতার কারণ হয়, কারণ যখন হাসপাতালে চিকিৎসা করা হয়, রোগীরা স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে সঠিক পুষ্টি পায় না।’ যদি দীর্ঘদিন ধরে পুষ্টিহীনতা চলতে থাকে, এটি কোনো ব্যক্তির স্বাস্থ্যে উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যেমন- অনাকাঙ্ক্ষিত ওজন হ্রাস। যেখানে বয়স্কদের ওষুধ বা স্বাভাবিক ক্ষুধা হ্রাসের কারণে ওজন কমে যেতে পারে, সেখানে অল্প বয়স্কদের পুষ্টিগতভাবে ভারসাম্যহীন ডায়েট ওজন হ্রাসে অবদান রাখতে পারে। পুষ্টিহীনতা প্রতিরোধের জন্য সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে, ভালো ভারসাম্য বজায় রেখে সঠিক পরিমাণে প্রোটিন, ফ্যাট ও কার্বোহাইড্রেটের খাবার খাওয়া।

* মাংসপেশী ক্ষয় (সারকোপেনিয়া)
গবেষণায় দেখা গেছে যে, প্রায় ৪৫ শতাংশ বয়স্ক আমেরিকানের মাংসপেশীর ক্ষয় হয়, কারণ তারা মাংসপেশীর স্বাস্থ্য বজায় রাখার ব্যাপারে উদাসীন থাকে অথবা মাংসপেশীর স্বাস্থ্য বজায় রাখতে পারে না। ডা. সাউয়ের বলেন, ‘এই ধরনের মাসল অ্যাট্রফিকে সারকোপেনিয়া বলা হয়, যা আপনার বয়স ৪০ দশকের দিকে শুরু হতে পারে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ওজন, নিম্ন শক্তি ও নিম্ন গতিশীলতার কারণ হয়। হরমোনগত পরিবর্তন আপনার শরীরে মাংসপেশীর গঠন ও মাংসপেশী কি রকম থাকবে তাতে অবদান রাখলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সারকোপেনিয়ার সঙ্গে পুষ্টিহীনতা ও নিষ্ক্রিয়তার সংযোগ রয়েছে। মাংসপেশীর ক্ষয় প্রতিরোধ ও চিকিৎসার একটি সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে: আপনার ডায়েটে বেশি করে প্রোটিন ও ভিটামিন ডি রাখুন। ডা. সাউয়ের বলেন, ‘বয়স্কদের মাংসপেশী গঠনের জন্য অধিক প্রোটিনের প্রয়োজন হয়, কারণ তাদের শরীরে কম কার্যকরভাবে প্রোটিন প্রক্রিয়া হয়।’ এছাড়া আপনার ব্যায়ামে ভারোত্তোলন অন্তর্ভুক্ত করুন, এটি মাংসপেশীর ঘনত্ব গঠন ও মাংসপেশীকে মজবুত করতে সাহায্য করবে।

* ক্যানসার
ক্যানসার সাধারণত ওজন কমায়, কিন্তু কিছু প্রকারের ক্যানসার যেমন- ফুসফুস ক্যানসার, অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার, পিত্ত ক্যানসার ও মলাশয়ের ক্যানসার অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ওজন হ্রাস করতে পারে। ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত অরেঞ্জ কোস্ট মেমোরিয়াল মেডিক্যাল সেন্টারের অন্তর্গত মেমোরিয়াল কেয়ার সেন্টার ফর ওবেসিটির জেনারেল সার্জন মাইকেল রুশো বলেন, ‘অস্বাভাবিক কার্যক্রমের ক্যানসার কোষ অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিকশিত হয় এবং মেটাবলিজম বৃদ্ধি করে ও পুরো শরীরের শক্তি ব্যবহার করে এটিকে জীর্ণ করে তোলে, যা ওজন হ্রাসের কারণ হয়।’ রেডিয়েশন ও কেমোথেরাপি প্রায়শ ক্ষুধা হ্রাস করে এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, যেমন- বমিবমি ভাব, বমি ও মুখে সোর বা ক্ষত, যা খেতে অনুৎসাহিত করে।

* হাইপারথাইরয়েডিজম
অপ্রত্যাশিত ওজন হ্রাস থাইরয়েড সমস্যার একটি লক্ষণ হতে পারে। ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত প্রভিডেন্স সেন্ট জন’স হেলথ সেন্টারের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ শেরি রস বলেন, ‘গ্রেভস নামেও পরিচিত হাইপারথাইরয়েডিজম হচ্ছে একপ্রকার অটোইমিউন রোগ, যেখানে থাইরয়েড গ্রন্থি অত্যধিক পরিমাণে থাইরয়েড হরমোন উৎপাদন করে, যা মেটাবলিজম বৃদ্ধি করে- যেখানে শরীর ভোগের তুলনায় বেশি ক্যালরি পোড়ায়।’ তিনি বলেন, ‘হাইপারথাইরয়েডিজম হওয়ার কারণের মধ্যে হ্যাশিমোটো’স থাইরয়েডাইটিস, লিথিয়ামের মতো কিছু ওষুধ, ঘাড়ে রেডিয়েশন চিকিৎসা, থাইরয়েড সার্জারি, গর্ভাবস্থা ও আয়োডিন ঘাটতি উল্লেখযোগ্য।’ রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ওভারঅ্যাক্টিভ থাইরয়েড নির্ণয় করা যেতে পারে।

* এইচআইভি ও এইডস
এইডস নামে পরিচিত অ্যাকুইয়ার্ড ইমিউনোডেফিশিয়েন্সি ভাইরাস হচ্ছে একটি ক্রনিক, জীবনহুমকিমূলক রোগ যা হিউম্যান ইমিউনোডেফিশিয়েন্সি ভাইরাস (এইচআইভি) দ্বারা হয়ে থাকে। ইন্টারনাল মেডিসিন ফিজিশিয়ান লিসা অ্যাশে বলেন, ‘এইচআইভি শরীরে পুষ্টি শোষণ কঠিন করে তোলে, যা পুষ্টিহীনতার কারণ হয় এবং এর ফলে ক্ষুধা হ্রাস পেতে পারে।’ এইচআইভি বা এইডসের কোনো নিরাময় না থাকলেও কিছু ওষুধ এই রোগের অগ্রগতি ধীর করতে পারে এবং অন্যভাবে সুখী জীবনযাপনে সাহায্য করে।

* পেপটিক আলসার
ডা. অ্যাশে বলেন, ‘পেপটিক আলসার হচ্ছে পাকস্থলীর স্তর ও ক্ষুদ্রান্তের উপরিভাগে ওপেন সোর বা ক্ষত। এটি ব্যথা সৃষ্টি করে এবং অ্যাসিড উৎপাদন বৃদ্ধি করে, রিফ্লাক্সের দিকে নিয়ে যায়। পেপটিক আলসারের প্রধান উপসর্গ পাকস্থলী ব্যথা, কিন্তু এটি প্রায়ক্ষেত্রে ক্ষুধাও হ্রাস করে।’ পেপটিক আলসার রোগ এবং এর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ওজন হ্রাসের চিকিৎসা করার সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে, জীবনযাপনে পরিবর্তন আনা এবং ওষুধ গ্রহণ করা।

* বিষণ্নতা
আপনি সম্ভবত জানেন যে বিষণ্নতা একটি মুড ডিসঅর্ডার যা প্রতিনিয়ত দুঃখের অনুভূতি এবং অধিকাংশ বিষয়ে উদাসীনতা তৈরি করে। আপনি হয়তো এটাও জানেন যে ওজন বৃদ্ধি হচ্ছে বিষণ্নতার সঙ্গে জড়িত একটি কমন উপসর্গ, কিন্তু বিষণ্নতা ওজনও কমাতে পারে। ডা. অ্যাশে বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই রোগের অন্যতম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হচ্ছে ক্ষুধা হ্রাস, যা স্বাভাবিকভাবে কোনো ব্যক্তির ওজন কমিয়ে ফেলে।’ বিষণ্নতার একক কোনো কারণ নেই, কিন্তু ওষুধ ও থেরাপি দিয়ে কার্যকরভাবে অনেক বিষণ্নতার চিকিৎসা করা যায়। কিছু অ্যান্টিডিপ্রেস্যান্টও ওজন হ্রাসের কারণ হতে পারে।

* কনজেস্টিভ হার্ট ফেইলিউর
এই মারাত্মক রোগটি হার্ট পর্যাপ্ত রক্ত ও অক্সিজেন হার্ট ও শরীরের অন্যান্য অংশে পাম্প করতে না পারলে হয়ে থাকে। এই কন্ডিশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হচ্ছে দ্রুত অপ্রত্যাশিত ওজন হ্রাস (ছয়মাসের মধ্যে স্বাভাবিক ওজনের ৭.৫ শতাংশ কমে যায়), যা কার্ডিয়াক ক্যাশেক্সিয়া নামেও পরিচিত। ওজন-হ্রাস বিশেষজ্ঞ অ্যাড্রিয়েন ইউডিম বলেন, ‘শরীরের অন্যান্য অংশের মতো অন্ত্রেও পর্যাপ্ত রক্তপ্রবাহ প্রয়োজন, গবেষকরা ধারণা করছেন যে অন্ত্রে হ্রাসমান রক্তপ্রবাহ হার্টের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত গ্যাস্ট্রোইন্টেস্টাইনাল উপসর্গ ও ওজন হ্রাসের মতো উপসর্গের জন্য দায়ী হতে পারে।’ যদি আপনার শ্বাসকষ্ট, দীর্ঘস্থায়ী কাশি, ক্লান্তি ও বমিবমি ভাবের সঙ্গে দ্রুত ওজন কমে যায়, তাহলে অবিলম্বে চিকিৎসা গ্রহণ করুন।

* ডায়াবেটিস
আমরা জানি যে ডায়াবেটিসের সঙ্গে ওজন বৃদ্ধি বা স্থূলতার সম্পর্ক আছে, কিন্তু ওজন হ্রাসও প্রকৃতপক্ষে ডায়াবেটিসের একটি বিস্ময়কর উপসর্গ হতে পারে। যখন শরীর পর্যাপ্ত ইনসুলিন উৎপাদন করতে পারে না, তখন শরীর গ্লুকোজকে শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে পারে না। ডা. অ্যাশে বলেন, ‘যখন ইনসুলিনের ঘাটতি হবে, শরীর শক্তির জন্য চর্বি ও মাংসপেশী পোড়াতে থাকবে, যা সার্বিকভাবে শরীরের ওজন কমায়।’ আপনার চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন, যদি মনে করেন যে অনাকাঙ্ক্ষিত ওজন হ্রাসের সঙ্গে ডায়াবেটিসের সম্পর্ক আছে।

* অ্যালকোহলিজম
অ্যালকোহলে প্রচুর ক্যালরি থাকতে পারে এবং এটি পেটফাঁপা সৃষ্টি করে, কিন্তু অ্যালকোহলের প্রতি আসক্তি ওজনও কমাতে পারে। ডা. অ্যাশে বলেন, ‘অ্যালকোহল পানে ওজন হ্রাস পায়, কারণ অ্যালকোহল পানে পেটভরা মনে হয় ও তাড়াতাড়ি তৃপ্তি চলে আসে। এছাড়া অ্যালকোহলিজম পেপটিক আলসার রোগ সৃষ্টি করতে পারে, এটিও ওজন হ্রাস ঘটিয়ে থাকে।’

(আগামী পর্বে সমাপ্য)




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮/ফিরোজ

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন