ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১ কার্তিক ১৪২৬, ১৭ অক্টোবর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

অন্যরকম সেঞ্চুরির সামনে পঞ্চপাণ্ডব

ইয়াসিন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৮-১২-১০ ৮:০৪:৩১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-১২-১১ ১২:৫৬:২২ পিএম

ক্রীড়া প্রতিবেদক : মাশরাফি বিন মুর্তজা, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম, তামিম ইকবাল ও মাহমুদউল্লাহ- বাংলাদেশ ক্রিকেটের পঞ্চপাণ্ডব।

১৮ সেপ্টেম্বর ২০০৭, যদি বলা হয় বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিন সেটি, তাহলে বাড়াবাড়ি হবে না। বাংলাদেশের ক্রিকেট এখন যে অবস্থানে এসে পৌঁছেছে, তার শুরুটা তো ওই দিনেই হয়েছিল।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জোহানেসবার্গে বাংলাদেশের ম্যাচ। ৬৪ রানে ম্যাচ হারলেও বাংলাদেশ একইসঙ্গে পেয়েছিল ‘পঞ্চপাণ্ডব’কে। মাশরাফি, সাকিব, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহ ও তামিম একইসঙ্গে দেশের হয়ে খেলতে নেমেছিলেন প্রথমবারের মতো।

এরপর পদ্মা-মেঘনায় গড়িয়েছে অনেক জল, তার কোনো সীমা নেই। সময়ও অনেক চলে গেছে। সাফল্য দুহাত ভরে এসেছে, আবার রয়েছে ব্যর্থতার মিছিল। সবকিছুতেই জড়িয়ে আছেন এ পঞ্চপাণ্ডব। সময়ের ধারাবাহিকতায় তারা এবার মাইলফলকের সামনে, অন্যরকম এক সেঞ্চুরির সামনে।

 



মঙ্গলবার মিরপুরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে তারা মাঠে নামলে একসঙ্গে একশ আন্তর্জাতিক ম্যাচের স্বাদ পাবেন। এখন পর্যন্ত দেশের সেরা পাঁচ তারকা একসঙ্গে নেমেছেন, এমন আন্তর্জাতিক ম্যাচের সংখ্যা ৯৯টি। এই ৯৯ ম্যাচে বাংলাদেশ জিতেছে ৪৭টি, হেরেছে ৪৮টি। ফলাফল আসেনি ৪ ম্যাচে।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ‘পাঁচক’-র কীর্তি খুব বেশি নেই। এর আগে ৬৪ ‘পাঁচক’ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। বাংলাদেশে এবারই প্রথম।

কোনো সন্দেহ ছাড়াই পণ্ডপাণ্ডবের সেরা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান। বিশ্বের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার প্রতিদিনই নতুন মাইলফলক ছুঁয়ে যাচ্ছেন। নিজেকে নিয়ে যাচ্ছেন নতুন উচ্চতায়। তামিম ইকবাল ব্যাটিংয়ে সবচেয়ে বেশি রেকর্ড বহন করছেন। দেশের বাইরে মুশফিকুর রহিম সবচেয়ে বেশি টেস্ট সেঞ্চুরি পেয়েছেন। বাংলাদেশের সেরা উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যানও তিনি। মিডল অর্ডারের সবচেয়ে বড় ভরসাও তিনি।

মাহমুদউল্লাহ সব সময়ই বিশেষ ভূমিকায়। সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটে ডেথ ওভারে বিগ হিটারের ভূমিকা পালন করছেন শেষ কয়েক বছর ধরে। টেস্টে মিডল অর্ডারে বিশেষ ব্যাটসম্যানের ভূমিকা তার।

 



এ পাঁচের মধ্যে সবচেয়ে বড় মাশরাফি এখনো বোলিংয়ে সবার সেরা। ২০১৫ সাল থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেটের চিত্রই পাল্টে দিয়েছেন মাশরাফি। ঘরের মাঠে এবং দেশের বাইরে সাফল্যর রূপকার তো মাশরাফিই। মাঠ ও মাঠের বাইরে দারুণভাবে দলকে সামলেছেন মাশরাফি।

২০০৭ সালে মাহমুদউল্লাহর অভিষেকের পর থেকে এ পাঁচ ক্রিকেটার একসঙ্গে খেলে আসছেন। বলার অপেক্ষা রাখে না তাদের হাত ধরে এসেছে সবচেয়ে বড় সাফল্য। ২০১৫ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল,  পাকিস্তান, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজ জয় এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দেশে ও দেশের বাইরে সিরিজ জয় তো এসেছে তাদের হাত ধরে। 

মাশরাফি টেস্ট খেলছেন না দীর্ঘদিন ধরেই। টেস্টে তার অভাব ভালোভাবে পুষিয়েছেন বাকি চারজন। শেষ দুই বছরে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড এবং শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট জিতেছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি ঘরের মাঠে হোয়াইটওয়াশ করেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে।

২০০৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ১৪৭ আন্তর্জাতিক ম্যাচের মধ্যে হেরেছিল ১১৪টিতে। ২০০৭ সাল থেকে তামিম, সাকিব ও মুশফিকের আর্বিভাবে পাল্টাতে থাকে চিত্র। আগের থেকেই ছিলেন মাশরাফি। এ ব্রিগেডে যোগ দেন মাহমুদউল্লাহ। তখনকার প্রধান নির্বাচক ফারুক আহমেদ একটি বিষয়ে জোর দিয়েছিলেন, একসঙ্গে দীর্ঘদিন একাধিক খেলোয়াড়কে খেলানো। নতুন ইউনিট তৈরি, নতুন দল গঠন।

 



সেই পরিকল্পনায় তাদের নিয়ে শুরু হয় স্বপ্নযাত্রা। ডেভ হোয়াটমোরের কোচিংয়ে শুরুটা দারুণ করে বাংলাদেশ। ২০০৭ বিশ্বকাপে ভারতকে হারিয়ে বিদায় করে দেয় বাংলাদেশ। এরপর কোচ জেমি সিডন্সের অধীনে জয়ের অভ্যাস তৈরি করে বাংলাদেশ। ২০০৮ সালে একটা ধাক্কা হজম করতে হয়েছিল। বিতর্কিত টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট আইসিএল খেলতে গিয়েছিলেন একদল ক্রিকেটার। এ পাঁচ ক্রিকেটারকে অবশ্য অর্থের ঝনঝনানি টানতে পারেনি।

২০১০ সালে সাকিবের একক প্রদর্শনীতে নিউজিল্যান্ডকে ৪-০ তে হোয়াইটওয়াশ করে বাংলাদেশ। চোটের কারণে ওই সিরিজে খেলতে পারেননি তামিম ও মাশরাফি। ২০১১ বিশ্বকাপ বাজে গেলেও ২০১২ এশিয়া কাপে বাংলাদেশ খেলেছিল ফাইনাল। ওই পঞ্চপাণ্ডবে ভর করেই যত সাফল্য বাংলাদেশের। এর আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৩-২ ব্যবধানে সিরিজ জয় এবং এক বছর পর আবার নিউজিল্যান্ডকে ৩-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ করে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি ধারাবাহিক হয় ২০১৫ সাল থেকে। মাশরাফি দ্বিতীয় দফায় দায়িত্ব নেওয়ার পর দলকে একে একে সাফল্য এনে দেন। ঘরের মাঠে পাকিস্তান, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, আফগানিস্তান, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজ জেতে মাশরাফির দল। পাশাপাশি র‌্যাঙ্কিংয়ে মাশরাফি দলকে নিয়ে আসেন সাতে। জয়ের অভ্যাস তৈরি করে ৫৪ শতাংশ ম্যাচ জয় করে বাংলাদেশ। যেখানে ২০০৭ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত জয়ের পরিসংখ্যান ছিল মাত্র ৩৯.৬০ শতাংশ।

পঞ্চপাণ্ডবের জন্য মঙ্গলবারের ম্যাচটি বিশেষ কিছু। তামিমের কন্ঠে পাওয়া গেল সেই উচ্ছ্বাস, ‘সত্যি বলতে এটা বিশেষ মুহূর্ত। আমরা পাঁচজন একে অপরকে ১৫ বছর ধরে চিনি। পাশাপাশি এ সময়ে আমরা একইসঙ্গে অনেক সাফল্য পেয়েছি, আবার অনেক ব্যর্থতায় সঙ্গী ছিলাম। আশা করছি আমাদের পাঁচজনের ল্যান্ডমার্ক দিনটি আমরা রাঙিয়ে রাখতে পারব।’

 



মাশরাফি নিঃসন্দেহে সফল অধিনায়ক। তবে দলকে সফলভাবে পরিচালনার জন্য তিনি কৃতিত্ব দিলেন বাকি চার সিনিয়র ক্রিকেটারকে, ‘তারা সবাই ভালো পারফরম্যান্স করেছে বলে আমার অধিনায়কত্ব করা সহজ হয়েছে। দলগত পারফরম্যান্সে আজ আমরা এখানে।’

‘সাকিব অবিশ্বাস্য প্রতিভাবান। দলে ওর ভূমিকা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। মুশফিক সবচেয়ে কোয়ালিটি খেলোয়াড়। তামিম ও মাহমুদউল্লাহ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেদের প্রয়োজনীয়তা বুঝিয়েছেন। তাই তাদের নিয়ে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করার কিছু নেই’– বলেছেন মাশরাফি।

পঞ্চপাণ্ডবের অনেক সুখস্মৃতি থাকলেও রয়েছে একাধিক আক্ষেপ। ২০১২ ও ২০১৬ এশিয়া কাপ ফাইনাল, ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে নাটকীয় হার, চলতি বছরের ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনাল, নিদাহাস ট্রফির ফাইনাল (মাশরাফি ছাড়া) এবং চলতি বছরের এশিয়া কাপ ফাইনাল (সাকিব ও তামিম ছাড়া) আক্ষেপ হয়ে আছে তাদের কাছে। সামনেই ২০১৯ বিশ্বকাপ। পঞ্চপাণ্ডবের হাত ধরে শিরোপা-খরা দূর হয় কি না, সেটাই দেখার।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১০ জানুয়ারি ২০১৮/ইয়াসিন/পরাগ

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন