ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০২ জুন ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

করোনাভাইরাস সংক্রমণের ৭ ব্যতিক্রমী উপসর্গ

এস এম গল্প ইকবাল : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৪-২৭ ১০:৪৯:৩৮ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৪-২৭ ১০:৪৯:৩৮ এএম

চলছে কোভিড-১৯ মহামারি। এর জন্য দায়ী করোনাভাইরাসটি ইতোমধ্যে চিকিৎসক ও বিশ্বকে স্তম্ভিত করেছে। দিন দিন সংক্রমণটির উপসর্গ-তালিকা লম্বা হচ্ছে। এই তালিকায় প্রচলিত উপসর্গ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে অদ্ভুত বা ব্যতিক্রমী উপসর্গও।

করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রচলিত উপসর্গ সম্পর্কে আপনি হয়তো ইতোমধ্যে অবগত হয়েছেন, যেমন- জ্বর, শুষ্ক কাশি, ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট, শরীর ব্যথা, গলা ব্যথা ও মাথাব্যথা। এসব উপসর্গ লক্ষ্য করলে নিজেকে আইসোলেট করে করোনাভাইরাস টেস্ট করতে হবে। এর পাশাপাশি কিছু ব্যতিক্রমী উপসর্গ সম্পর্কেও সচেতন থাকতে হবে। এখানে কোভিড-১৯ এর সাতটি ব্যতিক্রমী উপসর্গ উল্লেখ করা হলো।

পায়ের আঙুল লাল বা নীল হয়ে যাওয়া: করোনাভাইরাস রোগীর পায়ের আঙুল ও পায়ে একটি অদ্ভুত উপসর্গ দেখা গেছে। ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার অন্তর্গত স্কুল অব মেডিসিনের প্রধান এবিং লটিনবাচ ইউএসএ টুডেকে জানান, ‘মার্চে ইতালির চিকিৎসকেরা নতুন এই উপসর্গটি আবিষ্কার করেছেন, যা কোভিড টোস নামে পরিচিতি পেয়েছে।’ যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কোভিড-১৯ রোগীর মধ্যে এই উপসর্গ পাওয়া গেছে। উপসর্গটি সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে শিশু ও কিশোরদের মধ্যে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কিছু শিশু-কিশোরের মধ্যে কোভিড টোস ছিল প্রথম উপসর্গ। নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির মতে, পায়ের আঙুল অথবা পায়ের ত্বক পার্পল, নীল অথবা লাল হলে কোভিড টোস হিসেবে সন্দেহ করতে পারেন। ডা. লটিনবাচ বলেন, ‘কোভিড টোস স্পর্শ করলে ব্যথা অনুভূত হয় এবং জ্বালাপোড়ার অনুভূতিও থাকতে পারে।’

ফিজিং: কিছু করোনাভাইরাস রোগী অভিযোগ করেছেন যে তারা ত্বকে বৈদ্যুতিক অথবা বরফাচ্ছন্ন অনুভূতি পেয়েছেন। করোনাভাইরাসে সংক্রমিত ইলিনয়েসের এক নারী জানিয়েছেন, তিনি এমন অনুভব করেছেন যেন বরফের মধ্যে আছেন। কেউ কেউ বলেছেন তারা বুদবুদ অনুভব করেছেন, আবার কেউ কেউ সূচ ফুটলে যেরকম ব্যথা হয় তেমন অনুভূতি পেয়েছেন। কারো কারো ঝিনঝিনে অনুভূতিও হয়েছে। চিকিৎসকেরা এসব অনুভূতির নামকরণ করেছেন ফিজিং সেনসেশন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উপসর্গটি করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার শেষ পর্যায়ে প্রকাশ পেয়েছে। মাউন্ট সিনাই ডাউনটাউনের ইনফেকশন প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোলের পরিচালক ওয়ালিদ জাভেদ টুডেকে বলেন, ‘আমাদের ইমিউন কোষগুলো সক্রিয় হওয়ার কারণে শরীরে প্রচুর কেমিক্যাল নিঃসরিত হয়, যার ফলে এ ধরনের অনুভূতি হয়ে থাকে। যখন ইমিউন সিস্টেম অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখায় তখন একেক মানুষ একেক রকম অনুভূতি পেয়ে থাকে। অতীতে অন্যান্য রোগেও এসব অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে।’

ঘ্রাণশক্তি হ্রাস: কিং’স কলেজ লন্ডনের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, করোনাভাইরাস টেস্টে পজিটিভ রেজাল্ট আসা ৫৯ শতাংশ রোগীর ঘ্রাণশক্তি হ্রাস পেয়েছে। ইউএস নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব অটোল্যারিঙ্গোলজি-হেড অ্যান্ড নেক সার্জারির বিশেষজ্ঞরা এই উপসর্গ দেখে মোটেই বিস্মিত হননি। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাইরাস সংক্রমণ হচ্ছে ঘ্রাণশক্তি হারানোর একটি প্রধান কারণ। এটা নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই যে কোভিড-১৯ সৃষ্টি হয় একটি ভাইরাস থেকে।

স্বাদ নেয়ার ক্ষমতা হ্রাস: কোভিড-১৯ এর আরেকটি ব্যতিক্রমী উপসর্গ হচ্ছে স্বাদ বোঝার ক্ষমতা কমে যাওয়া, যদিও প্রায়ক্ষেত্রে করোনাভাইরাস রোগীদের ঘ্রাণশক্তি ও স্বাদ নেয়ার ক্ষমতা একই সময়ে হ্রাস পেয়ে থাকে। ইস্টার্ন ভার্জিনিয়া মেডিক্যাল স্কুলের ডিভিশন অব অ্যালার্জির মেডিক্যাল ডিরেক্টর জোসেফ কে. হান ইউ.এস নিউজকে বলেন, ‘এটি খুবই অনন্য প্রকৃতির উপসর্গ। স্বাদ নেয়ার ক্ষমতা হারায় একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন স্নায়ু প্রক্রিয়া থেকে, যাকে ভিন্ন একটি রোগ প্রক্রিয়া বলা চলে। গবেষকরা এটা উদঘাটনের চেষ্টা করছেন যে করোনাভাইরাস ঠিক কিভাবে উপসর্গটির উৎপত্তি ঘটায়। বিষয়টি এখনো বিশেষজ্ঞদের কাছে গোলকধাঁধার মতো।’

পেটের সমস্যা: হঠাৎ করে পেটের সমস্যায় ভুগতে থাকলে এখনই সতর্ক হয়ে যান। কেন? উহান মেডিক্যাল ট্রিটমেন্ট এক্সপার্ট গ্রুপ ফর কোভিড-১৯ এর একটি গবেষণায় ৪৮.৫ শতাংশ করোনাভাইরাস রোগী পেটের সমস্যার কথা জানিয়েছেন, যেমন- ডায়রিয়া, পেটের অস্বস্তি, ক্ষুধামান্দ্য, পেটব্যথা ও বমি। এই গবেষণার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেটের সমস্যার অভিজ্ঞতা হয়েছে এমন তিন শতাংশ কোভিড-১৯ রোগীর শ্বাসতন্ত্রীয় উপসর্গ ছিল না।

চোখ লাল হওয়া: করোনাভাইরাস সংক্রমণের একটি বিরল উপসর্গ হচ্ছে কনজাঙ্কটিভাইটিস বা চোখের কনজাঙ্কটিভা নামক পর্দায় প্রদাহ। কনজাঙ্কটিভাইটিসে চোখ লাল ও চুলকানি হয়। কিন্তু চোখ লাল হলেই আতঙ্কিত হবেন না, অন্য কারণেও এই উপসর্গ প্রকাশ পেতে পারে। তাছাড়া খুব কম সংখ্যক করোনাভাইরাস রোগীদের মধ্যে উপসর্গটি দেখা গেছে। আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব অপথালমোলজির মতে মাত্র এক থেকে তিন শতাংশ কোভিড-১৯ রোগীদের কনজাঙ্কটিভাইটিস হয়। ইউনিভার্সিটি অব উতাহের ডিপার্টমেন্ট অব অফথালমোলজি অ্যান্ড ভিজুয়াল সায়েন্সেসের সহকারী অধ্যাপক জেফ পিটি বলেন, ‘জ্বর, কাশি অথবা শ্বাসকষ্টের মতো করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রচলিত উপসর্গ না থাকলে লাল চোখের কোভিড-১৯ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।’

বিভ্রান্তি: একটি ভীতিকর খবর হচ্ছে, চিকিৎসকেরা কোভিড-১৯ রোগীদের মধ্যে মস্তিষ্কের সঙ্গে সম্পৃক্ত উপসর্গও দেখেছেন। চিকিৎসকদের মতে, কোভিড-১৯ এর জন্য দায়ী করোনাভাইরাস কখনো কখনো মস্তিষ্কের কার্যক্রমে বিঘ্নতা ঘটাতে পারে, যার ফলে বিভ্রান্তি ও স্ট্রোকের মতো সমস্যা হতে পারে। একটি করোনাভাইরাস সংক্রমণ কেসে দেখা গেছে, ফ্লোরিডার ৭৪ বছর বয়স্ক এক ব্যক্তি কথা বলার ক্ষমতা হারিয়েছেন। এপ্রিলের প্রথমদিকে অন্য একটি কোভিড-১৯ কেসে ৫০ উর্ধ্ব এক নারী নিজের নামটি ছাড়া আর তেমনকিছু বলতে পারেননি। হেনরি ফর্ড হেলথ সিস্টেমের নিউরোলজিস্ট এলিসা ফরি নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ‘এসব সমস্যার প্যাটার্ন মস্তিষ্কে ভাইরাস জনিত প্রদাহকে ইঙ্গিত করছে। করোনাভাইরাসটি বিরল পরিস্থিতিতে মস্তিষ্ককে সরাসরি আক্রমণ করতে পারে।’



ঢাকা/ফিরোজ