ঢাকা, শুক্রবার, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৫ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

রবীন্দ্রজয়ন্তী পালনের ইতিকথা || মোসতাফা সতেজ

মোসতাফা সতেজ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৫-০৫-০৭ ৮:৩১:৫৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৮-০৫ ২:৪৮:২৯ পিএম

রবীন্দ্রজয়ন্তী বা কবিগুরুর জন্মোৎসব বর্তমানে একটি আন্তর্জাতিক উৎসবে পরিণত হয়ে উঠেছে। পঁচিশে বৈশাখ কবির জন্মদিন। শান্তিনিকেতনে ১৯১১ সাল থেকে অর্থাৎ কবির ৪৯ বছর পূর্তির সময় থেকে জন্মোৎসব পালিত হয়ে আসছে। নৃত্য, গীত,  অভিনয় আর আবৃত্তিতে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে দিনটি। আশ্রমবাসী সকলে মিলে দিনটি অর্থপূর্ণ করে তোলেন। কবির জীবদ্দশায় তিনি বিদেশে থাকাবস্থায়ও আশ্রমে তাঁর জন্মদিন পালিত হয়েছে। এই নিবন্ধে ১৯১১ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত  কবির জন্মদিন পালনের ইতিবৃত্ত উল্লেখ করা হলো। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনী ১৮৮০ সালে বিলেত থেকে ফিরে আসেন। ফেরার পর তিনি আয়োজন করে সন্তানদের জন্মদিন পালন করতে শুরু করেন। এরপর থেকেই ঠাকুর বাড়িতে এ প্রথা চালু হয়ে যায়।

১৯১১ : শান্তিনিকেতনের কয়েকজন ছাত্র-শিক্ষক কবির জন্মদিন পালন করেন। আকস্মিক সিদ্ধান্তে সন্ধ্যায় ‘প্রায়শ্চিত্ত’ মঞ্চস্থ হয়। কবি নিজে অভিনেতাদের সাজিয়ে দেন। বসেন দর্শকের আসনে। সকালেও অনুষ্ঠান করা হয়। কবি এদিন প্রিয়ম্বদা দেবীকে এক পত্রে লেখেন, ‘আজ এখানে প্রাতে আমার জন্মদিনের উৎসব হয়ে গেল। আমার যে একটা জন্মদিন আছে সে কথা ভুলে গিয়েছিলুম।... ঈশ্বর আমার এই জন্মকে সার্থক করুন এই প্রার্থনা করি।’

১৯১২ : কবি শিলাইদহে। ছেলেমেয়ে ও জামাই পরিবৃত হয়ে অনাড়ম্বরভাবে তাঁর ৫২তম জন্মদিন পালিত হয়। কবি এ প্রসঙ্গে লেখেন, ‘ঝড় জলের মধ্যে সমাধা হয়ে গেছে। এই ঝড়ে আমার জীবনের আর একটা পর্যায় বুঝি সূচনা করে দিচ্ছে।’

১৯১৩ :  কবি এ বছর তাঁর জন্মদিনে দেশের বাইরে ছিলেন। এ সময় তিনি শিকাগো ও হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তব্য রাখেন। সেখানে জন্মদিন পালনের তথ্য পাওয়া যায় নি।

১৯১৪ : শান্তিনিকেতনে কবির জন্মদিন পালিত হয়। এ উপলক্ষে ‘অচলায়তন’ নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। কবি এতে গুরুর ভূমিকায় অভিনয় করেন।

১৯১৫ : এ বছরও শান্তিনিকেতনে তাঁর জন্মদিন পালিত হয়। এবার ‘ফাল্গুনী’ মঞ্চস্থ হয়। কবি সাজেন অন্ধ বাউল।

১৯১৬ : কবি তোসামারু জাহাজে জাপানের পথে ২৪শে বৈশাখ রেঙ্গুনে এসে পৌঁছান।  তাঁর সাথে ছিলেন পিয়ার্সন, মুকুল দে এবং এন্ডরুজ। বিকেলে রেঙ্গুনের জুবিলি হলে কবিকে সংবর্ধনা জানানো হয়। বাঙালিদের পক্ষ থেকে সেদিন কবির হাতে যে মানপত্রটি তুলে দেওয়া হয় সেটি রচনা করেছিলেন স্বয়ং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।

১৯১৭ :  কবি  ৫৭ বছরে পদার্পণ করেন। শান্তিনিকেতনের আম্রকুঞ্জে জন্মদিন পালিত হয়। পদ্মপাতা ও পদ্ম ফুলে সাজানো একটি মাটির বেদির ওপর আসন তৈরি করা হয়েছিল। বেদগান, উপনিষদ পাঠ, সংস্কৃত শ্লোক পাঠ ও ব্যাখ্যা করা হয়। তিনটি বালক কবিকে চন্দন মালা ও দুর্বাদলের সূত্র উপহার দেয়। রাতে ‘অচলায়তন’ মঞ্চস্থ হয়।

১৯১৮ : শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তি স্থাপন। এ বছরও কবির জন্মদিন কলকাতায় পালিত হয়েছিল একশ অতিথির উপস্থিতিতে। আয়োজন করেন ইন্দিরা দেবী। অনুষ্ঠানে কবি গান গেয়ে শোনান। চার পৃষ্ঠার কবিতা পাঠ করেন সত্যেন্দ্র নাথ। খাবারের আয়োজন করা হয় বিচিত্রা হলে। প্রত্যেক অতিথির বসার জায়গায় আগতদের নাম লেখা কার্ড ছিল। যা পদ্মকলি দিয়ে চাপা দেয়া হয়েছিল যাতে উড়ে না যায়।

১৯১৯ : এবারের জন্মদিনের ভাবনা ২৪শে বৈশাখে লেখা একটি গানে ফুটে উঠেছে।
আমার জীর্ণ পাতা যাবার বেলায় বারে বারে ডাক দিয়ে যায় নতুন পাতার দ্বারে দ্বারে। তাই তো আমার এই জীবনের বনচ্ছায়ে ফাগুন আসে ফিরে ফিরে দখিন বায়ে।

১৯২০ : কবি বিলেত যাওয়ার আগে নিভৃতে কলকাতায় তাঁর জন্মোৎসব পালিত হয়। কয়েকজন মাত্র নিমন্ত্রিত ছিলেন। সীতা দেবীরা দুইবোন দুই ডালি শ্বেতপদ্ম এবং রক্ত পদ্ম কবির কাছে পাঠান। কবির পরিবারে এদিন জমিদারি ভাগ কার্যকর হয়। কবির ভাগ্যে কালীগ্রাম পরগণা নির্দিষ্ট হয়।

১৯২১ : কবি তখন জার্মানিতে। তাঁর জন্মদিনে জার্মানির মনীষীগণ কবিকে সংবর্ধনা জানিয়ে অভিনন্দনপত্র এবং জার্মানির আধুনিক লেখকদের গ্রন্থাবলী উপহার দেন। কবি এক চিঠিতে  জানান, আজ তাঁর জন্মদিন, কিন্তু তিনি তা অনুভব করছেন না। কারণ দিনটি তো তাদেরই যারা তাঁকে ভালোবাসেন। তাদের থেকে দূরে থাকায় ২৫শে বৈশাখ তাঁর কাছে পঞ্জিকার একটি তারিখ মাত্র।

১৯২২ : আশ্রমিকেরা দিনটি ঘরোয়াভাবে পালন করেন। সকালে ‘সবার মাঝারে তোমার স্বীকার করিব হে’ গানটি গাইতে গাইতে কবির সামনে উপস্থিত হয়ে তাঁকে মালা চন্দন দিয়ে প্রণাম করা হয়। কবি জলযোগের ব্যবস্থা করেছিলেন। দুপুরে আশ্রমের মহিলারা কবিকে নিমন্ত্রণ করেন। কবি বেশ কয়েকটি কবিতা পাঠ করে শোনান। এ দিন তিনি ‘পঁচিশে বৈশাখ’ কবিতাটি লেখেন।

১৯২৩ : কবির জন্মদিন পালিত হয় শিলঙে।

১৯২৪ :  জন্মদিনে কবি পিকিং শহরে ছিলেন। সঙ্গে ছিলেন ক্ষিতিমোহন সেন, ড. কালিদাস নাগ, নন্দলাল বসু। কবির জন্মদিন উপলক্ষে ক্রিসেন্ট মুন সোসাইটির উদ্যোগে ড. হু সির পৌরহিত্যে সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় কবিকে ‘চু-তেন-তান’ উপাধি দেওয়া হয়। যার অর্থ ভারতের মেঘ মন্দ্রিত প্রভাত। উৎসব শেষে চীনা ভক্তরা কবিকে সুন্দর সুন্দর চিত্র, বহুবিধ সামগ্রী এবং একটি চীনা মাটির পেয়ালা উপহার দেন।

১৯২৫ : জন্মদিন উপলক্ষে উত্তরায়ণে ভোরবেলা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সকাল সাড়ে সাতটায় কবি উত্তর সীমানায় পঞ্চবটী রোপণ ও উৎসর্গ করেন। সন্ধ্যায় ছাত্রীরা ‘লক্ষ্মীর পরীক্ষা’ নাটকটি কোনার্ক বাড়ির সুসজ্জিত মঞ্চে মঞ্চস্থ করেন। ৬৫ তম জন্মোৎসব পালন উপলক্ষে নিমন্ত্রণপত্র ছাপা হয়। এ বছর মহাত্মা গান্ধী জন্মোৎসবে অভিনন্দন জানান। ‘দৈনিক আনন্দবাজার’ পত্রিকা ফলাও করে অনুষ্ঠানের খবর প্রকাশ করে। এ দিন শান্তিনিকেতনে অতিথিরা নানা ফল ও মিষ্টিযোগে কবিকে বরণ করে অর্ঘ্য দেন। তারা জলযোগের পর দুপুর এবং রাতের খাবার খান।

১৯২৬ : শান্তিনিকেতনের আম্রকুঞ্জে জন্মোৎসব পালিত হয়। দেশ-বিদেশের অনেক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। সন্ধ্যায় ‘নটীরপূজা’ মঞ্চস্থ হয়।

১৯২৭ :  কলকাতায় কবির জন্মদিন পালন করা হয়।

১৯২৮ : এবারে কবির জন্মদিনে তাঁর ওজনের সমপরিমাণ গ্রন্থ নানা প্রতিষ্ঠান ও গ্রন্থাগারে দান করা হয়। এ বছর তাঁর জন্মদিন পালিত হয় প্রাচীন ভারতীয় রীতিতে। পৌরহিত্য করেন পন্ডিত বিধূ শেখর শাস্ত্রী।

১৯২৯ : ২৫শে বৈশাখ কবি জাহাজে জাপানের পথে। সমুদ্রে জাহাজেই কবির জন্মদিন পালিত হয়।

১৯৩০ : এ সময় কবি ছিলেন প্যারিসে। তাঁর জন্মদিন পালন করেন তাঁর ফরাসী বন্ধুগণ ও ভারতীয় ছাত্রেরা।

১৯৩১ : শান্তিনিকেতনের আম্রকুঞ্জে তাঁর জন্মোৎসব পালিত হয়। সেদিনের ভাষণে কবি বলেন, ‘একটি মাত্র পরিচয় আমার আছে; সে আর কিছু নয়, আমি কবি মাত্র। আমি তত্ত্বজ্ঞানী, শাস্ত্রজ্ঞানী বা নেতা নই, আমি বিচিত্রের দূত।’  ওদিকে কলকাতার বিদগ্ধ ব্যক্তিগণ কবির সংবর্ধনার জন্যে এবং সপ্তাহব্যাপী উৎসব করার জন্য একটি পরামর্শ সভা ডাকেন। রবীন্দ্রজয়ন্তীর সূচনার দিন বিকালে সাহিত্য সম্মেলনে শরৎচন্দ্র ছিলেন সভাপতি।
এ বছরই ভুটান সীমান্তে বকসা দূর্গে রাজবন্দীরা মহাসমারোহে কবির জন্মদিন পালন করেন ও কবিকে অভিনন্দনপত্র পাঠান। কবি প্রত্যভিনন্দন পাঠান কবিতায়।

১৯৩২ : জন্মদিনে কবি ছিলেন পারস্যে। পারস্যবাসী কবিকে প্রাণঢালা সংবর্ধনা জানান। তাঁর জন্মদিনে রাজার আদেশে বাগ নেয়েরেদ্দৌলেহতে নামক স্থানে দিনভর চলে উঃসব। কবি তেহরানে বসে লেখেন :  
‘ইরান তোমার যত বুলবুল
তোমার কাননে যত আছে ফুল
বিদেশী কবির জন্মোদিনেরে মানি
শুনালো তাহারে অভিনন্দন বাণী।’

১৯৩৩ :  কবি দার্জিলিং-এ। জন্মদিন এখানেই পালিত হয়।

১৯৩৪ :  কবি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অর্থ সংগ্রহের আশায় সিংহল যাচ্ছিলেন। সঙ্গে তার নাট্যদল ছিল। ২৫শে বৈশাখ কাটে সমুদ্রে ‘ইন চাংগা’ নামক জাহাজে।

১৯৩৫ :  জন্মোৎসব উপলক্ষে আম্রকুঞ্জে অনুষ্ঠান হয়। সন্ধ্যায় পরশুরাম রচিত ‘বিরিঞ্চি বাবা’ অভিনয়ের পর উৎসব শেষ হয়। রবীন্দ্রনাথ ব্যতীত অন্য নাট্যকারের লেখা নাটক শান্তিনিকেতনে এই প্রথম মঞ্চস্থ হয়।

১৯৩৬ : কবি ৭৬ বছরে পা দেন। এ বছর থেকেই শান্তিনিকেতনে পহেলা বৈশাখে তাঁর জন্মোৎসব পালনের ব্যবস্থা করা হয়। কারণ ২৫শে বৈশাখের আগেই বিশ্বভারতীর গ্রীষ্মাবকাশ শুরু হয়ে যায়। তাছাড়া শান্তিনিকেতন এখনকার মতো এমন ছায়া সুনিবিড় ছিল না। চৈত্রের মাঝামাঝি থেকেই সেখানকার মাঠ প্রান্তর দাবদাহে ধূ ধূ করত। গাছ-পালা বলতে ছিল শাল, তাল আর নিম। এই সময় পানির ভীষণ কষ্ট দেখা দিত। ফলে বর্ষবরণের সঙ্গে সঙ্গে জন্মদিনটাও আগাম পালনের অনুমতি দেন তিনি।

১৯৩৭: কবি তখন আলমোড়ায়। দিনটি স্মরণে রাখার জন্য ‘সেজুঁতি’ কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত ‘জন্মদিন’ কবিতাটি লেখেন।

১৯৩৮ : শান্তিনিকেতনে বাংলা নববর্ষের উপাসনার পর কবির জন্মোৎসব অনুষ্ঠিত হয়।
 
১৯৩৯ : কবি মংপুতে মৈত্রেয়ী দেবীর অতিথি ছিলেন। সেখানেই কবির জন্মোৎসব পালিত হয়। মৈত্রেয়ী দেবীর চিঠি থেকে জানা যায়, ঐ দিন তিনশ পাহাড়ি, ভূটিয়া, এবং লেপচা উপজাতিরা নিমন্ত্রিত ছিলেন। সেখানকার গ্রাম্য লোকেরা এ উপলক্ষে খুব আনন্দ করেন। তারা কবিকে ফুল এবং খদা নামে তিব্বতী স্কার্ফ উপহার দেন।

১৯৪০ :  কবি রোগশয্যায়। সন্ধ্যায় কবিকে উদয়নের চত্বরে আরাম কেদারায় বসিয়ে অনুষ্ঠান পালন করা হয়। এটাই শেষ জন্মোৎসব পালন। উৎসব উপলক্ষে মিষ্টি বিতরণ করা হয়। যতদূর জানা যায় ১৯৩৭ সাল থেকে এটি চালু হয়। আশ্রমিক সংঘের উদ্যোগে কলকাতায় একবার জন্মোৎসব হয়েছিল। সেখানে কবি আইসক্রীম খেয়ে বলেছিলেন, ‘শুধু গান, আবৃত্তি আর বক্তৃতায় জন্মোৎসব সার্থক হয় না। সঙ্গে একটু মিষ্টিমুখের ব্যবস্থাও থাকা দরকার।’ সেই থেকে আজো কবির জন্মোৎসবে মিষ্টিমুখের ব্যবস্থা করা হয়ে আসছে।

তথ্য সূত্র :
রবীন্দ্রজীবনী : প্রশান্ত পাল
বিশ্বভারতীর উৎসব : সুশীল কুমার মন্ডল


রাইজিংবিডি/ঢাকা/৮ মে ২০১৫/তাপস রায়
 

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন