ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৭ কার্তিক ১৪২৬, ১২ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

অন্য রবীন্দ্রনাথ : বাংলা ভাষাচর্চা প্রসঙ্গে

মোহাম্মদ আজম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৭-০৮-০৬ ৮:০২:১৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৮-০৬ ১১:৩১:৫৫ এএম


রবীন্দ্রনাথের বাংলা ভাষা-বিষয়ক প্রথম প্রবন্ধ-সংকলন ‘শব্দতত্ত্ব’ প্রকাশিত হয় ১৯০৯ সালে। ১৩৪২ বঙ্গাব্দে ‘বাংলা শব্দতত্ত্ব’ নামে এর একটি নতুন সংস্করণ বের হয়। পরে আরো অনেক প্রবন্ধ, টুকরো আলোচনা-মন্তব্য, পত্রাংশ ইত্যাদি যোগে বড় আকারে বইটি বর্তমান রূপ পায় (তৃতীয় স্বতন্ত্র সংস্করণ ১৩৯১)। ফলে এই বইটিতে রবীন্দ্রনাথের প্রায় সারাজীবনের (১২৯২ বঙ্গাব্দ থেকে শেষ পর্যন্ত) ভাষাচিন্তার পরিচয়- মত, মতান্তর, বিশ্লেষণ-প্রবণতা, ধারণার বিবর্তন- মুদ্রিত হয়ে আছে। ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত তাঁর ভাষা-বিষয়ক দ্বিতীয় ও শেষ গ্রন্থ বাংলাভাষা-পরিচয় গ্রন্থ হিসাবেই পরিকল্পিত ও মুদ্রিত। এই বই মূলত বাংলাভাষার স্বভাব ও স্বাতন্ত্র্য আবিষ্কারের চেষ্টা। একদিকে ভাষার সর্বাঙ্গীণ রূপ সম্বন্ধে পাশ্চাত্য ভাষাবিজ্ঞানীসুলভ সচেতনতা, অন্যদিকে বাংলাভাষার বিশিষ্ট প্রকৃতি সম্বন্ধে তীক্ষ্ম বোধ- রবীন্দ্রনাথের এই বইটি সমস্ত পণ্ডিতি আলোচনা থেকে এক অভিনব স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে।

ভাষা-আলোচনার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ প্রায়শই বিনয় দেখিয়েছেন, যদিও মতামতে দৃঢ়তার কোনো কমতি ছিল না। বিনয় দেখানোর একটা মূল কারণ, তিনি প্রথাগত অর্থে বৈয়াকরণ ছিলেন না। ‘ভাষার ইঙ্গিত’ (১৩১১) প্রবন্ধে লিখেছেনও সে কথা : ‘বৈয়াকরণের যে সকল গুণ ও বিদ্যা থাকা উচিত তাহা আমার নাই, শিশুকাল হইতে স্বভাবতই আমি ব্যাকরণভীরু’। তাহলে তাঁর ব্যাকরণচর্চার বৈধতা কোথায়? তিনি নিজেই বলেছেন: ‘বাংলা ভাষাকে তাহার সকল প্রকার মূর্তিতেই আমি হৃদয়ের সহিত শ্রদ্ধা করি, এইজন্য তাহার সহিত তন্ন তন্ন করিয়া পরিচয়সাধনে আমি ক্লান্তিবোধ করি না’। কিন্তু এই ‘পরিচয়সাধনে’র উদ্দেশ্য কী? রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন: ‘আমার এই চেষ্টায় কাহারো মনে যদি এরূপ ধারণা হয় যে, প্রাকৃত বাংলা ভাষার নিজের একটি স্বতন্ত্র আকার-প্রকার আছে এবং এই আকৃতি-প্রকৃতির তত্ত্ব নির্ণয় করিয়া শ্রদ্ধার সহিত অধ্যবসায়ের সহিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ রচনায় যদি যোগ্য লোকের উৎসাহ বোধ হয়, তাহা হইলে আমার এই বিস্মরণযোগ্য ক্ষণস্থায়ী চেষ্টাসকল সার্থক হইবে’।

সমধর্মী উল্লেখ রবীন্দ্রনাথের লেখায় আরো পাওয়া যাবে। কিন্তু উদ্ধৃত মন্তব্য কটি পরীক্ষা করলেই তাঁর ভাষাচর্চার কয়েকটি মূল বৈশিষ্ট্য বোঝা যায়। বৈয়াকরণের যে ‘গুণ ও বিদ্যা’র কথা রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, তা আসলে ভাষা-বিশ্লেষণের প্রচলিত বিদ্যা, আর প্রচলিত কাঠামোয় বিশ্লেষণের ক্ষমতা। সমকালীন ভাষাচর্চার গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে তাঁর পরিচ্ছন্ন ধারণা ছিল এবং তিনি অন্তত ভারতীয় ভাষা-সম্পর্কিত রচনাগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়েছিলেন। পরবর্তী আলোচকগণ এ ব্যাপারে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য দিয়েছেন। তারচেয়ে বড় কথা, তাঁর রচনাতেই সেই পরিচয়ের ছাপ মুদ্রিত হয়ে আছে। কিন্তু তিনি যে প্রচলিত কোনো কাঠামো অনুসরণ করেননি, তা বোঝা যায়। আসলে তিনি প্রচলিত কাঠামোতে বাংলা ভাষা-বিশ্লেষণের বিরুদ্ধেই দাঁড়িয়েছিলেন। পেশ করেছেন নতুন তত্ত্ব ও প্রণালি-পদ্ধতি। উদ্ধৃত মন্তব্যে তিনি বাংলা ভাষার ‘সকল প্রকার মূর্তি’র কথা বলেছেন, আর বলেছেন ‘তন্ন তন্ন করিয়া পরিচয়সাধনে’র কথা। দুটিই তাঁর ভাষাচর্চার ক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা ভাষার নিরূপিত কোনো রূপের ভিত্তিতে তিনি ‘ভাষাতত্ত্ব’ করেননি, খোদ বাংলা ভাষা আবিষ্কারই তাঁর আলোচনা-পর্যালোচনার লক্ষ্য। পরবর্তীদের ভাষা-আলোচনায় উৎসাহী করতে যতবার তিনি মন্তব্য করেছেন, তার সব ক্ষেত্রেই বাংলা ভাষার ‘সকল প্রকার মূর্তি’র কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। আর ‘তন্ন তন্ন’ করে খোঁজার আক্ষরিক প্রমাণ তাঁর লেখাতেই পাওয়া যায়। কিন্তু এই খোঁজাখুঁজিরও রকমফের আছে। প্রচলিত অভিধান, ব্যাকরণ আর লিখিত সাহিত্য থেকে উপাত্ত সংগ্রহের পাশাপাশি অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে রবীন্দ্রনাথ কথ্য উৎসের আশ্রয় নিয়েছেন।

এরপর তিনি তাঁর উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেছেন, ‘যোগ্য লোকে’রা তাঁর কাজ থেকে উৎসাহ পাবে। একদিক থেকে তাঁর এই আশা পূরণ হয়েছে। বাংলা ভাষার প্রায় সকল বিখ্যাত ভাষাতাত্ত্বিক নিজেদের অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের ঋণ স্বীকার করেছেন। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন: ‘কোন্ পথ ধরে বাঙলা ভাষার চর্চা করতে হবে তা এমন করে তাঁর আগে আর কেউ দেখাতে পারেন নি’। অন্যত্র তিনি ব্যক্তিগত শিক্ষা ও উপলব্ধির উৎস হিসেবে রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করেছেন:

‘‘এমন সময় পেয়ে গেলুম রবীন্দ্রনাথের বাঙলা-ভাষাতত্ত্ব-বিষয়ক প্রবন্ধের সংগ্রহ ‘শব্দতত্ত্ব’। এগুলির মধ্যে একটি জিনিস দেখে মনে মনে কবির সমীক্ষাশক্তির শত-সহস্র সাধুবাদ দিতে লাগ্‌লুম। এমন ক’রে তাঁর পূর্বে বাঙলা ভাষার বৈশিষ্ট্য আর কারও তো চোখে পড়ে নি! আর বৈশিষ্ট্যগুলি শুধু যে ধরেছেন তা নয়, বৈশিষ্ট্যগুলি কেমনভাবে কাজ ক’রছে সে বিষয়ে যেন তাঁর একটা দিব্য দৃষ্টি এসে গিয়েছে। ইউরোপের যেসব ভাষাতত্ত্বের পণ্ডিত, সাধারণ মানুষের ভাষা নিয়ে কাজ করেছেন, তাঁদের অনুসৃত পদ্ধতি তো আমার জন্য তৈরিই ছিল। তা ছাড়া, সহজ মোটা কথা যা আমরা সকলেই জানি, তার ভিতরে কী সূক্ষ্ম ধ্বনি-বিষয়ক বা ভাব-বিষয়ক রীতি কাজ কর্‌’ছে, সেটা আমার কাছে এ পর্য্যন্ত অজ্ঞাত থাক্‌ছিল, তার কতকগুলি বিষয়ে ইঙ্গিত রবীন্দ্রনাথেই পাওয়া গেল। এই জন্যেই আমার মনে হ’ল যে, বাঙলা ভাষাতত্ত্বের বা বাঙলাভাষার ইতিহাসের আলোচকদের মধ্যে একজন পাইওনিয়র বা অগ্রণী পথিকৃৎ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ।’’

মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ জানিয়েছেন, ‘রবীন্দ্রনাথের গবেষণার দ্বারা পরিচালিত হইয়া আমরা বাংলাভাষার স্বর-সাম্যের নিয়ম (Law of Harmonic Sequence or vocalic Harmony) আবিষ্কার করিতে সক্ষম হইয়াছি’। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে বাংলা ভাষার ‘স্বতন্ত্র আকার-প্রকারে’র কথা ছিল, এবং সেই আকার-প্রকার থেকে তত্ত্ব নির্ণয়ের কথা ছিল। ভাষ্যকারেরা মোটামুটি একমত যে, তাঁর সে আশা অপূর্ণ থেকে গেছে। যেমন, সুনীল সেনগুপ্ত লিখেছেন: ‘যে অভাব মেটানোর কথা রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন তা আজও মেটেনি। রবীন্দ্রনাথের ভাষাচিন্তা আমাদের যেভাবে সমৃদ্ধ করতে চেয়েছিল তার কাছাকাছি আমরা পৌঁছতে পারিনি’। তাঁর চিন্তার সঙ্গে পরিচয়ের অভাব এর কারণ নয়- চিন্তার উচ্চাভিলাষই, সম্ভবত, মূল কারণ। চিন্তার এই অভিলাষকে সরল করে এভাবে বর্ণনা করা যায়: কোনো কাঠামোর অধীনে বিশ্লেষণ না করে বিশ্লেষণ থেকে ভাষা-কাঠামোর উপলব্ধিতে পৌঁছানো।

‘বাংলাভাষা-পরিচয়’ গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ ভাষার কাঠামো তুলনা করেছেন কোঠাবাড়ির সঙ্গে। তাতে সমগ্র তুলনাটা দাঁড়িয়েছে এ রকম: ‘কোঠাবাড়ির প্রধান মসলা ইঁট, তার পরে চুন-সুর্‌কির নানা বাঁধন। ধ্বনি দিয়ে আঁটবাঁধা শব্দই ভাষার ইঁট, বাংলায় তাকে বলি ‘কথা’। নানারকম শব্দচিহ্নের গ্রন্থি দিয়ে এই কথাগুলোকে গেঁথে গেঁথে হয় ভাষা’। জনগোষ্ঠীর সামষ্টিক জীবনযাপনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভাষার নানা উপাদানের পরিবর্তন ঘটে। কিন্তু কাঠামোটা ঠিকই থাকে। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন:

‘দু-তিনশো বছর আগেকার ভাষার সঙ্গে পরের ভাষার তফাত ঘটে আসছেই। তবু বিশেষ জাতের ভাষার মূল স্বভাবটা থেকে যায়, কেবল তার আচারের কিছু কিছু বদল হয়ে চলে। সেইজন্যেই প্রাচীন বাংলাভাষা বদল হতে হতে আধুনিক বাংলায় এসে দাঁড়িয়েছে, অমিল আছে যথেষ্ট, তবু তার স্বভাবের কাঠামোটাকে নিয়ে আছে তার ঐক্য। ভাষাবিজ্ঞানীরা এই কাঠামোর বিচার করে ভাষার জাত নির্ণয় করেন।’

অর্থাৎ, বিশেষ উপাদানের পরিবর্তন বা বাড়তি-কমতি নয়, ভাষার স্বাতন্ত্র্য তার স্বভাবে, তার আকারে, যা তাকে অন্য ভাষা থেকে পৃথক করে। ভাষার এই স্বাতন্ত্র্য কত গভীর আর অপরিবর্তনীয় তা বোঝা যায় সাপিরের মন্তব্য থেকে। সাপির লিখেছেন, ‘Language is probably the most self-contained, the most massively resistant of all social phenomena. It is easier to kill it off than to disintegrate its individual form.’

কাঠামো যদি ভাষার প্রধান পরিচয় হয়, তাহলে ভাষা-বিশ্লেষকের কাজ হবে সেই কাঠামোর পরিচয় নিয়ে তার সাপেক্ষে ব্যাকরণ রচনা করা। অন্য উপকরণ-উপাদানগুলো বিশ্লেষিত হবে কাঠামোর সাপেক্ষে, আবার উপকরণ-উপাদানগুলোর পরিচয়ের সাপেক্ষেই কাঠামোর পরিচয় নির্ধারিত হবে। কাজের দিক থেকে কথাটার মানে দাঁড়ায় এ রকম: ভাষার উপাদান বিচ্ছিন্নভাবে বিশ্লেষিত হওয়ার উপায় নেই; যদি করতেই হয়, বৃহত্তর কাঠামোর সাপেক্ষেই করতে হবে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজের আলোচনায় এ রকমই করেছেন। ব্যাকরণকারের যে দায়িত্ব তিনি সাব্যস্ত করেছেন, তাতেও এ প্রক্রিয়ার কথাই বলা হয়েছে। বিখ্যাত ‘বাংলা ব্যাকরণ’ প্রবন্ধে লিখেছেন:

‘প্রত্যেক ভাষার নিজের একটা ছাঁচ আছে। উপকরণ যেখান হইতেই সে সংগ্রহ করুক, নিজের ছাঁচে ঢালিয়া সে তাহাকে আপনার সুবিধামত বানাইয়া লয়। সেই ছাঁচটাই তাহার প্রকৃতিগত, সেই ছাঁচেই তাহার পরিচয়। উর্দু ভাষায় পারসি আরবি কথা ঢের আছে, কিন্তু সে কেবল আপনার ছাঁচেই চতুর ভাষাতত্ত্ববিদের কাছে হিন্দির বৈমাত্র সহোদর বলিয়া ধরা পড়িয়া গেছে। আমাদের বাঙালি কেহ যদি মাথায় হ্যাট, পায়ে বুট, গলায় কলার এবং সর্বাঙ্গে বিলাতি পোশাক পরেন, তবু তাঁহার রঙে এবং দেহের ছাঁচে কুল-লক্ষণ প্রকাশ হইয়া পড়ে। ভাষার সেই প্রকৃতিগত ছাঁচটা বাহির করাই ব্যাকরণকারের কাজ। বাংলায় সংস্কৃত শব্দ কটা আছে, তাহার তালিকা করিয়া বাংলাকে চেনা যায় না, কিন্তু কোন বিশেষ ছাঁচে পড়িয়া সে বিশেষরূপে বাংলা হইয়া উঠিয়াছে, তাহা সংস্কৃত ও অন্য ভাষার আমদানিকে কি ছাঁচে ঢালিয়া আপনার করিয়া লয়, তাহাই নির্ণয় করিবার জন্য বাংলা ব্যাকরণ।’

নিজের রচনায় রবীন্দ্রনাথ এ প্রণালি-পদ্ধতি প্রায় হুবহু মান্য করেছেন। তত্ত্ব প্রণয়ন আর তার আংশিক বাস্তবায়ন রবীন্দ্রনাথকে আসলে প্রতিষ্ঠা দেয় ‘আধুনিক’ ভাষাবিজ্ঞানী হিসাবে; যদিও তিনি ‘ভাষাবিজ্ঞান’ চর্চা করেননি, আর কাজগুলো করেছেন ‘আধুনিক’ ভাষাবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার যথেষ্ট আগে। যেসব প্রত্যয়ের উপর আজকের ভাষাতত্ত্ব দাঁড়িয়ে আছে, তার সঙ্গে শব্দবিদ্যা আর আনুশাসনিক ব্যাকরণের যোগাযোগ নেই বললেই চলে। দেবপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় সোস্যুরের জীবনের দুই অংশের বিবরণ দিয়েছেন, যার এক অংশে তিনি ছিলেন ‘শব্দবিদ’, অন্য অংশে আবির্ভূত হয়েছিলেন ‘ভাষাবিজ্ঞানী’ হিসেবে। সোস্যুর ভাষাকে কাঠামো আকারে ব্যাখ্যা করার তত্ত্ব প্রস্তাব করেছিলেন, যে কাঠামোর মধ্যে স্বেচ্ছাচারী (arbitrary) শাব্দ-উপাদান সুশৃঙ্খলভাবে কাজ করে। এদিক থেকে ‘আকারধর্মী ভাষাতত্ত্বের সঙ্গে কাঁচামাল-নির্ভর শব্দবিদ্যার পার্থক্য দুস্তর’। রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রস্তাবে সে পার্থক্য পুরোমাত্রায় রক্ষা করেছেন। শব্দনির্ভর ভাষাচর্চা যে শেষ পর্যন্ত ভাষা-বিশ্লেষণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না, তাঁর এই উপলব্ধির স্মারক হয়ে আছে নিম্নোক্ত বিস্ময়কর মন্তব্য: ‘‘আমাকে তোমার পড়াতে হবে’ বাক্যটির প্রত্যেক শব্দই সংস্কৃতমূলক, অথচ ইহার প্রত্যেক শব্দটিতেই সংস্কৃত নিয়ম লঙ্ঘন হইয়াছে’।

বাংলা ভাষা-চর্চাকারীদের মধ্যে ঐতিহাসিক কারণে শব্দকেন্দ্রিকতা আর শব্দের বাছবিচার খুব বড় ভূমিকা রাখে। এ বাস্তবতা জানতেন বলেই রবীন্দ্রনাথ ভাষা-বিবেচনায় বিচার্য শব্দভাণ্ডারের আওতা সম্পর্কে বারবার সতর্ক করেছেন। কোনো শব্দ লেখায় ব্যবহৃত হয়েছে কি না, বা ভদ্রসমাজে ব্যবহারের উপযোগী কি না, তা বিচার করা-তাঁর মতে- ব্যাকরণকারের কাজ নয়। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল, ‘অকিঞ্চিৎকর’ কথা বাংলায় গ্রাহ্য করে তিনি ভাষা নষ্ট করছেন। উত্তরে তিনি যা বলেছিলেন তা শুধু তখনকার দায়িত্ব পালন করেনি, ভাষা-বিশ্লেষণের একটি গোড়ার সত্যও প্রতিষ্ঠিত করেছে: ‘ওই কথাগুলো আমার এবং তাঁহার বহু-পূর্ব পিতামহ-পিতামহীরা প্রচলিত করিয়া গেছেন, আমি তাহাদের রাখিবারই বা কে, মারিবারই বা কে’। ভাষা সম্পর্কে এই প্রাথমিক কাণ্ডজ্ঞানের কথাই রবীন্দ্রনাথ বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন। আর সমষ্টির মধ্যে প্রচলিত সেই উপাদানগুলোকে বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে চেয়েছেন বৈজ্ঞানিক নিরাসক্তি। বিজ্ঞানের কার্যপ্রণালি সম্পর্কে তাঁর সিদ্ধান্ত:

‘জগতে যে-কোনো জিনিসই আছে, তাহা ছোটো হউক আর বড়ো হউক, কুৎসিত হউক আর সুশ্রী হউক, প্রাদেশিক হউক আর নাগরিক হউক, তাহার তত্ত্বনির্ণয় বিজ্ঞানের কাজ। শরীরতত্ত্ব কেবল উত্তমাঙ্গেরই বিচার করে এমন নহে, পদাঙ্গুলিকেও অবজ্ঞা করে না। বিজ্ঞানের ঘৃণা নাই, পক্ষপাত নাই।’

ভাষাবিজ্ঞানীও এই বৈজ্ঞানিক নিরাসক্তিরই পরিচয় দেবেন-এই তাঁর প্রত্যাশা:

‘বাংলা বলিয়া একটা ভাষা আছে, তাহার গুরুত্ব মাধুর্য ওজন করা ব্যাকরণকারের কাজ নহে। সেই ভাষার নিয়ম বাহির করিয়া লিপিবদ্ধ করাই তাঁহার কাজ। সে-ভাষা যে ইচ্ছা ব্যবহার করুক বা না-করুক, তিনি উদাসীন। কাহারো প্রতি তাঁহার কোনো আদেশ নাই, অনুশাসন নাই।’

রবীন্দ্রনাথ আশা করেছিলেন, এই নিরাসক্তি নিয়ে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বাংলা ভাষা বিশ্লেষিত হবে। তাঁর সেই আশা- বলা যায়- অপূর্ণই থেকে গেছে। কিন্তু নিজে তিনি বাংলা ভাষার যে অংশ ব্যাখ্যা করতে উদ্যোগী হয়েছেন, তাতে যথাসম্ভব এই তত্ত্ব, প্রণালি আর দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন পাওয়া যায়। 
 

 

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৬ আগস্ট ২০১৭/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন