ঢাকা     মঙ্গলবার   ১১ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২৭ ১৪২৭ ||  ২০ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

‘জ্ঞানভিত্তিক রাজনৈতিক চর্চায় ডাকসু নির্বাচন জরুরি’

36 || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০২:০৮, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮  
‘জ্ঞানভিত্তিক রাজনৈতিক চর্চায় ডাকসু নির্বাচন জরুরি’

আবু বকর ইয়ামিন : জ্ঞানভিত্তিক রাজনৈতিক চর্চা, সুষ্ঠু রাজনীতি এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে নিয়মিতভাবে ডাকসু নির্বাচন প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন শিক্ষাবিদ এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে আগামী বছর এই নির্বাচন করার ঘোষণা এসেছে। দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এবার ডাকসু নির্বাচনের সম্ভাবনাও দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান বলেছেন, উচ্চ আদালতের রায় ও সবার আশা আকাঙ্খার সাথে আমরা একমত। তবে অগ্রীম উস্কানিও হটকারীমূলক কোনো বক্তব্য আমরা প্রত্যাশা করি না।

দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে অচল দেশের দ্বিতীয় সংসদখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। ডাকসু যতদিন সক্রিয় ছিল ততদিন শিক্ষার্থীদের যেকোনো গণতান্ত্রিক দাবি আদায়ে কণ্ঠস্বরের ভূমিকা রাখত। বর্তমানে তা বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বমূলক ছাত্র রাজনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে। সে সঙ্গে গড়ে উঠছেনা সৎ, মেধাবী এবং যোগ্য নেতৃত্বও।

ডাকসু বিধান অনুযায়ী, প্রতি বছর নির্বাচন হওয়ার কথা। কিন্তু তা হচ্ছে না। ১৯৯০ সালের ৬ জুলাই ডাকসুর সর্বশেষ নির্বাচন হয়। এর পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। তাদের এ ব্যর্থতার কারণে হাজার হাজার শিক্ষার্থী তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ডাকসু জাতীয় নেতৃত্ব গঠন ও ছাত্রদের অধিকার সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।  নানা কারণে এটি এতদিন বন্ধ ছিল।  সম্প্রতি হাইকোর্ট এ বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছে।  আশা করছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ বিষয়ে কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

তিনি বলেন, ‘আমি আশা করছি ২০১৯ সালের মধ্যে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। শুধু একবারই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে চলবে না। প্রতিবছর আগের কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার আগেই নতুন নেতৃত্বের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে।‘

ডাকসু গঠন এবং এর সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য অবশ্যই দলমত নির্বিশেষে সকল নিয়মিত ছাত্রকে ক্যাম্পাসে অবস্থানের সুযোগ দিতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে শুধু সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠন নয়, তাদের রাজনৈতিক দলগুলোর উর্ধ্বতন নেতৃবৃন্দেরও সদিচ্ছার প্রয়োজন রয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. আবুল বারাকাত বলেন, লোকাল এরিয়া থেকে শুরু করে যেকোনো নির্বাচনই নিয়মিত হওয়া উচিত। ডাকসু নির্বাচন গণতান্ত্রিক ধারার অন্যতম একটি অংশ।  এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তাদের অধিকার আদায় করতে পারে সহজেই। ছাত্রপ্রতিনিধিরা প্রশাসনের সাথে মিলে যেকোনো সমস্যা সমধান করতে পারেন সহজেই।

তিনি বলেন, অজ্ঞাত কারণে ডাকসু নির্বাচন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে।  এ দায়িত্বটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। তারাই এটি সঠিক সময়ে কার্যকর করতে পারতেন। তাহলে এটি কোর্ট পর্যন্ত যেতো না।

এখন কেন নির্বাচন নয়- সে বিষয়ে তিনি বলেন, ভোটার হালনাগাদ করতে খুব বেশি সময় লাগার কথা না। প্রত্যেক ডিপার্টমেন্টে খোঁজ নিলেই নিয়মিত শিক্ষার্থীদের তালিকা করতে খুব বেশি সময় লাগবে না।   এটি বিলম্বের কোনো কারণ হতে পারে না। তবে সামনে জাতীয় নির্বাচন। এ নিয়ে একটু ভিন্নতর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সে হিসেবে এখনই এ ডাকসু নির্বাচন করতে গেলে অন্য সমস্যাও হতে পারে। তবে জাতীয় নির্বাচনের পরপরই একটি সুষ্ঠু পরিবেশে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ডাকসু নেতৃত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকা পালন করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ বিষয়ে কাজ করছেন।  ওনারা এ বিষয়ে ভাল বলতে পারবেন।

শিক্ষাবীদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানভিত্তিক রাজনৈতিক চর্চা, সুষ্ঠু রাজনীতি এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি ও জাতীয় নেতৃত্ব গড়ে তোলার লক্ষ্যে নিয়মিতভাবে ডাকসু নির্বাচন অবশ্যই জরুরি।  তবে এজন্য আগে প্রয়োজন একটি সুষ্ঠু পরিবেশ।  বর্তমান রাজনৈতিক যে অবস্থা তাতে কোনোভাবেই মনে হচ্ছে না যে ডাকসু নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হবে।

এখানে বিরোধী ছাত্রসংগঠনগুলোকে ক্যাম্পাসে আসতে পারবে কি না, তারা তাদের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে পারবে কি না, সকল শিক্ষার্থী তাদের পছন্দের প্রতিনিধিকে ভোট দিতে পারবে কি না, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে আগে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। অন্য ছাত্র সংগঠনের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ক্যাম্পাসে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে কি না সেটি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এ নির্বাচন যথাযথ হবে বলে মনে হয় না।  

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিএনপি পন্থী শিক্ষকদের নেতা ড. আখতার হোসেন খান বলেন, প্রায় ২৮ বছর ধরে ডাকসু নির্বাচন বন্ধ আছে। এর ফলে আমরা অনেকগুলো জাতীয় মেধাবী নেতৃত্ব হারিয়েছি। সম্প্রতি হাইকোর্টের আদেশে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটু নড়েচড়ে বসেছে। এটা নামমাত্র লোক দেখানো হলে চলবে না।  আশা করছি প্রশাসন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ডাকসু নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে এবং এটি অবশ্যই নিয়মিত হওয়া উচিত।

তিনি বলেন, অনেক দিন ধরে সরকারি দলের বাইরের কোনো ছাত্র সংগঠন ক্যাম্পাসে বিশেষ করে মধুর ক্যান্টিনে বসে তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না।  এটির পূর্ণ সুযোগ নিশ্চিত না করা পর্যন্ত সুষ্ঠুভাবে ডাকসু নির্বাচন হওয়া নিয়েও শঙ্কা রয়েছে।

প্রসঙ্গত, গত জানুয়ারিতে ছয় মাসের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন দিতে নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। হাইকোর্টের নির্দেশের পরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংগঠন ডাকসুর নির্বাচন অনুষ্ঠানে পদক্ষেপ না নেওয়ায় উপাচার্য আখতারুজ্জামানসহ তিনজনের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা করা হয়।

১২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এ মামলা করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। মামলার বাকি আসামিরা হলেন- বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার এনামউজ্জামান ও ট্রেজারার কামাল উদ্দিন।

এরপর ছাত্রসংগঠনগুলোর সঙ্গে বসে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এতে সংগঠনগুলো ক্যাম্পাসে তাদের সহাবস্থান, ক্যাম্পাসে সকল ছাত্রসংগঠনের স্বাধীনভাবে চলাচল ও সুষ্ঠুভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ চেয়েছেন।  পাশাপাশি যত দ্রুত সম্ভব ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানান তারা।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮/ইয়ামিন/এনএ

রাইজিংবিডি.কম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়