ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৭ কার্তিক ১৪২৬, ১২ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

দ. আফ্রিকায় হত্যাকাণ্ড, প্রতিনিয়ত শঙ্কায় বাংলাদেশিরা

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৯-১০ ৯:০৮:১৩ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৯-১৭ ৯:২৫:২২ পিএম

হাসান মাহামুদ : আফ্রিকা মহাদেশের অন্যতম বিকাশশীল অর্থনীতির দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা, বাংলাদেশের একটি সম্ভাবনাময় শ্রমবাজার রয়েছে এ দেশে। কিন্তু দেশটির কিছু উচ্ছৃঙ্খল কৃষ্ণাঙ্গের কারণে প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের কাছে দেশটি অনেকটা মৃত্যুপুরিতে পরিণত হয়েছে। শুধুমাত্র চলতি বছরেই দেশটিতে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ৪৪ জন।

আইনি মারপ্যাচের কারণে এসব হত্যাকাণ্ডের কোনো প্রতিকার পাওয়া যায় না। পাওয়া যায় না ক্ষতিপূরণ কিংবা বিচারও। সবচেয়ে হতাশার বিষয় হচ্ছে- যেসব বাংলাদেশি বৈধভাবে দেশটিতে যায়নি, তারা হত্যাকাণ্ডের শিকার হলে এ বিষয়ে মামলাও করা যাচ্ছে না। ফলে প্রতিরোধ ব্যবস্থার অভাবে বন্ধও হচ্ছে না এসব হত্যাকাণ্ড।

দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থানরত একটি ব্যবসায়ী কমিউনিটির একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করে রাইজিংবিডিকে বলেন, নাম পরিচয়হীন লাশকে আমরা যেমন বেওয়ারিশ বলি, এখানেও তেমন পরিস্থিতি চলছে।

তিনি বলেন, সামগ্রিক দক্ষিণ আফ্রিকার পরিস্থিতি এক রকম নয়। কিন্তু বিশেষ করে যেসব বাংলাদেশি ব্যবসার সাথে জড়িত তারা প্রতিনিয়ত প্রাণের হুমকি নিয়েই বসবাস করছেন। গত দেড় বছরে এখানে প্রায় দুশোর মতো বাংলাদেশি খুন হয়েছেন, কিন্তু এর কোনো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানও নেই। এমনকি এই সংখ্যা শুনলে অনেকে অবাক হন, বিশ্বাস করতে চাননা। কিন্তু পরিস্থিতি এমনই ভয়াবহ। পরিপূর্ণ তথ্য না আছে হাইকমিশনের কাছে, না আছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে।

তবে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশন সূত্র জানিয়েছে, এসব হত্যাকাণ্ডের প্রতিকার চেয়ে এরই মধ্যে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এখনো তারা কোনো উত্তর দেয়নি।

জানা গেছে, ২০১৮ সালে দেশটিতে অন্তত ১৫০ জন বাংলাদেশির খুন হওয়ার ঘটনা ঘটে। হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি গুলিবিদ্ধ হয়ে পঙ্গু হয়েছেন ৫৬ বাংলাদেশি। অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ১৮টি। দোকানে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে ৫৩৩টি। আর গত ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খুন হয়েছেন অন্তত ৪৪ জন।

এর মধ্যে জানুয়ারি মাসেই চার জন যুবক খুন হন। ফেব্রুয়ারিতে খুন হন পাঁচজন। ২ ফেব্রুয়ারি রাতে জোহানেসবার্গের একটি দোকানে নাজমুল হুদা বিপ্লব নামে এক প্রবাসীকে গুলি করে হত্যা করে কৃষ্ণাঙ্গ সন্ত্রাসীরা। সর্বশেষ গত শুক্রবার দেশটির ইস্টার্ন ক্যাপ প্রভিন্সের স্টের্কস্পিরিট পলমিট এলাকায় ইকবাল হোসেন নামে এক বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা।

প্রবাসী বাংলাদেশিরা বলছেন, যারা খুন হচ্ছেন, তাদের বেশির ভাগই দোকানমালিক ও ব্যবসায়ী। আর এসব প্রবাসী খুনে মেতেছে দেশটির কৃষ্ণাঙ্গ সন্ত্রাসীরা। এদের দাপটে বাংলাদেশিদের জন্য দেশটি ক্রমেই আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।

এসব খুনের নেপথ্যে যেসব কারণ রয়েছে, তার মধ্যে ডাকাতি বা ছিনতাই উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া নিজেদের মধ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্বে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আঁতাত করে খুন করানো, নারী ঘটিত ঘটনা ও কৃষ্ণাঙ্গ সন্ত্রাসীদের সঙ্গে মিশে মাদকের জগতে হাবুডুবুসহ বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এসব খুনের শিকার বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ ২০ থেকে ৩০ বছরের তরুণ।

জানা গেছে, ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রির অভিযোগে গত ২৯ ও ৩০ সেপ্টেম্বর বিদেশিদের দোকানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় জোহানেসবার্গ সংলগ্ন সোয়েটো এলাকার কৃষ্ণাঙ্গরা। এ ঘটনায় বাংলাদেশিসহ অন্তত এক হাজার ৫০০ বিদেশির দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘটনা চলাকালে চার কৃষ্ণাঙ্গ নিহত হলে ‘সেভ অ্যান্ড ক্লিন সাউথ আফ্রিকা’ নামে একটি সংগঠন সব বিদেশিদের দোকান থেকে বের করে দেয়ার আল্টিমেটাম দেয়। এরপর থেকে বিদেশি নাগরিক খুনের ঘটনা বেড়ে যায়।

জনশক্তি রপ্তানিকারকরা বলছেন, বৈধভাবে দক্ষিণ আফ্রিকায় যাওয়ার সুযোগ খুব কম হলেও এক শ্রেণির দালাল ছয়-সাত লাখ টাকা নিয়ে মোজাম্বিক, জাম্বিয়া, তানজানিয়া, লাইবেরিয়াসহ বিভিন্ন দেশ হয়ে অবৈধভাবে দক্ষিণ আফ্রিকায় লোক পাঠায়। এ প্রক্রিয়ায় যারা দেশটিতে যান, তাদের বেশির ভাগেরই বাড়ি নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, কুমিল্লা, মুন্সীগঞ্জ ও শরীয়তপুরের।

এদের বেশির ভাগই সেখানে দোকান চালান। কিন্তু বৈধ নন, ফলে তাদের ব্যাংক হিসাবও নেই। যে কারণে নিজেদের কাছেই তারা নগদ টাকা রাখেন। আর ওই টাকা ছিনিয়ে নিতেই কৃষ্ণাঙ্গরা এসব হামলা চালায়।

দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের শিকারের পর পুলিশের পক্ষে একটি ইউডি মামলা ছাড়া ভুক্তভোগীর পক্ষে কোনো মামলা হয় না। তাই খুনের ঘটনার কারণ নিয়ে তদন্তও হয় না। কী কারণে এ হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছে তা পুলিশি তদন্তের বাইরেই থেকে যায়।

অভিযোগ রয়েছে, দক্ষিণ আফ্রিকায় অন্য কোনো দেশের নাগরিক সেখানে হত্যাকাণ্ডের শিকার হলে ওই দেশের কমিউনিটি নেতারা সংশ্লিষ্ট থানায় অজ্ঞাত আসামির নামে মামলা করেন। মামলার চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত ওই মামলার তদারকিও করে যান। এমনকি ওই দেশের অ্যাম্বাসি পর্যন্ত মামলার তদারকির জন্য নিজস্ব আইনজীবী নিয়োগ করে থাকেন।

হাইকমিশনের অসহযোগিতায় বাংলাদেশি প্রবাসীরা এসব সুবিধা পান না বলে অভিযোগ করছেন অনেকে। বরং যেকোনো এলাকায় কোনো বাংলাদেশি নাগরিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হলে স্থানীয় বাংলাদেশিরা চাঁদা তুলে লাশ কোনোরকমে দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কমিউনিটির কোনো নেতা একটি লাশের তদারকি করতে বা কমিউনিটি বাদি হয়ে মামলা করে না।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (অভিবাসী কল্যাণ অনুবিভাগ) ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকা আমাদের লেবার সেন্ডিং কান্ট্রি নয়। দেশটির সাথে আমাদের শ্রমচুক্তি নেই। তাই অনেক কিছু চাইলেও করা যায় না। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে আলোচনা অব্যাহত রেখেছে বলে জানি।

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯/হাসান/নবীন হোসেন

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন