ঢাকা, মঙ্গলবার, ৬ কার্তিক ১৪২৬, ২২ অক্টোবর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

আওয়ামী লীগের নজর ‘পরগাছা’য়

এসকে রেজা পারভেজ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৯-২২ ৯:৫৯:৪৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৯-২৩ ৪:৫০:০৭ পিএম

আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যে শুরু হওয়া শুদ্ধি অভিযানে এবার পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে দলটিতে অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে। যারা বিভিন্ন দল থেকে ছুটে এসে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে দুর্নীতির মাধ্যমে নিজের আখের গোছাতে গিয়ে দলের বদনাম করছে। এরই মধ্যে দলের তৃনমুল থেকে কেন্দ্র পর্যায়ে জোর দাবি উঠেছে এসব নেতাদের চিহ্নিত করে দল থেকে বহিস্কারের।

দলীয় নেতা-কর্মীরা অভিযোগ করে বলেন, বিভিন্ন সময়ে যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আছে এবং এখন নতুন করে উঠছে, তাদের বেশিরভাগই অন্য দল থেকে আসা। এসব নেতারা ‘অনুপ্রবেশকারী বা পরগাছা’।

এ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম বলেন, ‘আমরা তো এ পর্যন্ত যাদের দেখছি এরা সবাই অনুপ্রবেশকারী। আমাদের দলের মধ্যেই দীর্ঘদিন ধরে দাবি উঠেছিল, এই অনুপ্রবেশকারীরা আমাদের ভয়ানক ক্ষতি করছে। তাদের এখন আমরা চিহ্নিত করেছি। দেখা যাচ্ছে তাদের সবাই এক সময় হয় যুবদল কিংবা বিএনপি করত। কেউ আবার জামায়াত-শিবিরের সদস্য।’

‘এখানে আমাদের নীতি খুব পরিষ্কার। আমরা পরিচ্ছন্ন রাজনীতিতে বিশ্বাস করি। আমরা দলকে পরিচ্ছন্ন করতে চাই।’

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘কোনো দুর্নীতিবাজ বা দলের দুর্নাম হচ্ছে যার দ্বারা, এমন কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। জননেত্রী শেখ হাসিনা যে অভিযান শুরু করেছেন, সেই অভিযানে দল ও সমাজ থেকে দুর্নীতি সমুলে উৎপাটন হবে। বিভিন্ন সময়ে অনুপ্রবেশকারীরাই দুর্নীতি করে আওয়ামী লীগের বদনাম করছে। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।  হবে।’

আওয়ামী লীগের নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি ও যুবলীগের সমবায় বিষয়ক সম্পাদক পরিচয় দিয়ে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত থাকা জিকে শামীমকে গ্রেপ্তারের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ দু-জায়গা থেকেই বলা হয়েছে, জিকে শামীমের সঙ্গে দল ও সংগঠনের সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এর আগে গ্রেপ্তার হওয়া যুবলীগের সাংগঠনিক খালেদ মাহমুদ ভুইয়াও আগে অন্য দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। 

জানা গেছে, যুবলীগ পরিচয় দেয়া জিকে শামীম বিএনপির আমলে গণপূর্ত ভবনের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন। তিনিও ছিলেন মির্জা আব্বাসের ঘনিষ্ঠ। যুবদলের সহসম্পাদক পদে ছিলেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। গ্রেপ্তার হওয়া খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ফ্রিডম পার্টির কর্মী ছিলেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন একসময়। ২০১২ সালে যুবলীগের মহানগরী কমিটিতে পদ পান তিনি।

আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, বিভিন্ন সময়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিচ্ছিন্ন অনেক ঘটনা ঘটেছে, যেখানে সংশ্লিষ্টরা আওয়ামী লীগের নেতা পরিচয় দিয়ে অন্যায় করেছে। প্রভাব খাটিয়েছে। দুর্নীতি করেছে। হত্যকাণ্ড ঘটিয়েছে। ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহানকে হত্যার ঘটনার প্রধান অভিযুক্ত মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা আগে জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দলটির স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করেছিলেন। সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের ছাত্রী খাদিজা বেগমকে চাপাতি দিয়ে কোপানো সেই বদরুল আলমও ছাত্রলীগের কেউ ছিলেন না। নিজেকে ছাত্রলীগ পরিচয় দিতেন।

দলীয় সূত্র বলছে, তৃণমূলে এমন আরো ঘটনা আলোচনার জন্ম দিলেও দলে অনুপ্রবেশকারীদের বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্তে যায়নি আওয়ামী লীগ। তবে এবার এসব নেতাদের ভাগ্য বিপর্যয় ঘটতে যাচ্ছে। দলের বিভিন্ন পর্যায়ে অনুপ্রবেশকারী ও দুর্নীতির সঙ্গে সখ্য-এমন নেতাদের ছেটে ফেলে দিতে কাজ শুরু করেছে দলটির। দলের কোন পর্যায়ের কোন নেতা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত এরই মধ্যে সেই তালিকা দলটির সভাপতির কাছে পৌঁছেছে। জাতিসংঘ অধিবেশন থেকে দলের সভাপতি শেখ হাসিনার ফিরে আসার পর এই বিষয়ে আরো কঠোর হতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ। পর্যায়ক্রমে তৃণমূলেও  শুরু হবে শুদ্ধি অভিযান।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘শুধু রাজধানী কেন্দ্রিক- এটা ঠিক নয়। সারা দেশে যেখানেই অপকর্ম, দুর্নীতি, অনিয়ম হবে, শৃঙ্খলা ভঙ্গ হবে, সর্বত্রই একই নিয়মে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা কার্যকর হবে। দুর্নীতি, অনিময়, বিশৃঙ্খলার সঙ্গে যারা জড়িত, যাদের আচরণে পার্টি এবং সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। ঠিক তাদের বিরুদ্ধেই ‘কেইস টু কেইস’ খোঁজ-খবর নিয়ে ‘অ্যাকশন’ নেয়া হচ্ছে।’

আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার কারণে দলে অনুপ্রবেশকারী-দুর্নীতিবাজদের আনাগোনা বেড়েছে। এখনই লাগান টেনে না ধরলে আওয়ামী লীগের অর্জন ম্লান করে দেবে এরা। কারণ সুযোগসন্ধানী এসব নেতা নামধারীরা সুযোগ-সুবিধা নিয়ে মত্ত থাকে আর বদনাম হয় সরকারের। দলের ভাবমূর্তি ফেরাতে তাই শুদ্ধি অভিযানের দরকার ছিল। দলের মধ্যেও এই ধরনের তালিকা শুরু করবে দলটি। এছাড়া দলের সদস্য নবায়ন ও নতুন সদস্য সংগ্রহের অভিযানে যাতে অন্য দলবাজরা ঢুকতে না পারে, সেই বিষয়ে বিশেষ সতর্ক দৃষ্টি রাখার কথা জানিয়েছেন তারা। 


ঢাকা/পারভেজ/সাইফ

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন