ঢাকা, রবিবার, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৭ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

‘যেন এক মুরগি বার বার বিক্রি’

আসাদ আল মাহমুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১১-০২ ৫:৪৮:২৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১১-০৩ ৮:১৭:১০ এএম

‘দুখের কথা কী বলব ভাই, সরল বিশ্বাসে ১১ লাখ টাকা দিয়ে দুই বেড, এক ডাইনিংয়ের ফ্ল্যাট মর্টগেজ ( বন্ধক) নিয়েছি। ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে চুক্তি হয়েছে। ফ্ল্যাটে উঠতে গিয়ে দেখি ফ্ল্যাটটি আরো দুই পরিবারের কাছে মর্টগেজ দেয়া হয়েছে। এটা দেখে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ছে। এ যেন এক মুরগি বার বার বিক্রি করার মতো।'

এসব কথা রাজধানীর পুরান ঢাকার কাজী আলাউদ্দীন রোডের ৩০ নম্বর বাড়ির বাসিন্দা মো. জামিল মিয়ার। শনিবার রাইজিংবিডিকে এসব অভিযোগের কথা বলেন তিনি। 

শুধু জামিল মিয়া নন, পুরান ঢাকায় এরকম শত শত মানুষ ফ্ল্যাট মর্টগেজ (বন্ধক) নিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর পুরান ঢাকায় কয়েক যুগ ধরে চলে আসছে ফ্ল্যাট মর্টগেজ (বন্ধক) পদ্ধতি। কিছু মানুষ ফ্ল্যাট ভাড়া নেয়ার বিকল্প হিসেবে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করেন, যা মর্টগেজ (বন্ধক) নামে পরিচিত। ফ্ল্যাট মর্টগেজে কেউ কেউ লাভবান হলেও অনেকেই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। একটি বাড়ি কিংবা একটি ফ্ল্যাট একাধিক ব্যক্তির কাছে মর্টগেজ দিয়ে সটকে পড়েছেন অনেক বাড়ির মালিক।

পুরান ঢাকায় মর্টগেজ পদ্ধতির বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিয়ে ৩ থেকে ৭ বছরের জন্য মালিকের কাছ থেকে বাড়ি বা ফ্ল্যাট বসবাসের জন্য নেন দ্বিতীয় পক্ষ (মর্টগেজকারী)। এ বিষয়ে ১০০ টাকার তিনটি স্ট‌্যাম্পে চুক্তি করা হয়। কেউ কেউ ব্যাংকের চেকও জমা রাখেন। চেকে একটি নির্দিষ্ট তারিখ থাকে।

মর্টগেজে শর্ত থাকে, চুক্তি শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিদুৎ, গ্যাস ও পানির বিল বাড়ির মালিক দেবেন। কিছু বাড়ির মালিক বিদুৎ ও গ্যাস বিল নেন, তবে অন‌্য খাতে ফ্ল্যাট মর্টগেজকারীর কাছ থেকে টাকা নেন না। মেয়াদ শেষে বাড়ির মালিক এককালীন নেয়া সব টাকা মর্টগেজকারীরকে ফেরত দেন। কিন্তু অনেক ফ্ল্যাট মালিক এক ফ্ল্যাট একাধিক ব্যক্তির কাছে মর্টগেজ রেখে প্রতারণা করছেন।

পুরান ঢাকার বংশাল, দয়াগঞ্জ, নারিন্দা, নয়াবাজার, সুরিটোলা, সিদ্দিকবাজার, আগামসিহ লেন, সিক্কাটুলী, তাঁতীবাজারসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় মর্টগেজ নিয়ে প্রতারণার প্রবণতা বেশি।

পুরান ঢাকার সিদ্দিক বাজার এলাকায় কথা হয় ভোগান্তিতে পড়া কয়েকজনের সঙ্গে। তারা রাইজিংবিডিকে জানান, ১১ নম্বর ভবনটি ১০তলা বিশিষ্ট। ভবনটিতে ২০টি ফ্ল্যাটের নয়টি বিক্রি করা হয়েছে। বাড়ির মালিক মো. মাসুদ বেপারী দ্বিতীয় তলায় থাকেন। ১০টি ফ্ল্যাট মর্টগেজ নিয়েছে ১৮টি পরিবার। কোনো কোনো ফ্ল্যাট দুই-তিনটি পরিবারের কাছে মর্টগেজ দেয়া হয়েছে। কিন্তু চুক্তিমাফিক নিজেদের  ফ্ল্যাট না পেয়ে তিনটি পরিবার দ্বিতীয় তলায় বাড়ির মালিকের ফ্ল্যাটে উঠেছেন। তিন রুমের ফ্ল্যাটে থাকছে তিনটি পরিবার। ওই তিন পরিবারে সদস্য ১৬ জন। কয়েক মাস ধরে বাড়ির মালিক লাপাত্তা।

তারা আরো জানান, ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে এই ফ্ল্যাটটি তিন বছরের চুক্তিতে ১০ লাখ টাকায় মর্টগেজ নেন রফিক। এর এক বছর পর (জানুয়ারি, ২০১৮) ৯ লাখ টাকায় মর্টগেজ নেন হাসিবা বেগম। মো. আতাহার ছয় মাস আগে (মে, ২০১৯) ১০ লাখ টাকায় পাঁচ বছরের জন্য মর্টগেজ নেন।

হাসিবা বেগম রাইজিংবিডিকে বলেন, চার তলার ফ্ল্যাট মর্টগেজ নিতে গেলে আমাকে দেখানো হয় নিচতলা। মালিক বলেন, ওপরে পরিবার আছে, তাই দেখানো যাচ্ছে না। তারা আগামী মাসে চলে যাবে। কিন্তু ফ্ল্যাটে উঠতে এসে শুনি, তাদের কাছে আছে বিভিন্ন মেয়াদে মর্টগেজ নেয়ার দলিল।

তিনি বলেন, নিয়েছি তিন রুমের ফ্ল্যাট। পরে উঠতে গিয়ে দেখি, এক রুমও পাচ্ছি না। আমাদের এই ফ্ল্যাটের মর্টগেজের জন্য আরো দুজনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে মালিক লাপাত্তা।

মর্টগেজ নেয়ার আগে কাগজপত্র দেখেছেন কি না? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দলিল দেখিয়েছিল। পরে খোঁজ নিয়ে জানলাম, সেটি জাল দলিল।

মর্টগেজ নেয়া আতাহার রাইজিংবিডিকে বলেন, ঝামেলায় পড়ব ভাবিনি। ফ্ল‌্যাটে দুটি টয়লেট আর একটি রান্নাঘর। এখানে ১৬ জন মানুষ কীভাবে থাকা যায়? সন্তান বড় হয়েছে, সবাইকে নিয়ে এক রুমে থাকা যায় না।

এ বিষয়ে জানতে বাড়ির মালিক মো. মাসুদ বেপারীর মোবাইল ফোন নম্বরে বেশ কয়েকবার কল দিলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হাজি মো. আবু সাঈদ রাইজিংবিডিকে বলেন, এ এলাকায় অনেক বাড়িতে এ অবস্থা চলছে। একাধিক ব্যক্তির কাছে মর্টগেজ দিয়ে মালিক উধাও হন। বন্ধক নেয়া মানুষদের টাকা ওঠাতে অনেক কষ্ট হয়।

তিনি আরো বলেন, বাসা ভাড়া দিতে হবে না, তাই সাধারণ মানুষ মর্টগেজ নিচ্ছে। কিছু অসাধু মানুষ এ থেকে ফায়দা লুটছে। অভিযুক্ত এসব অসাধু ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মীর সমীর বলেন, আমার এলাকার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বাড়িতে মর্টগেজ চলছে। একাধিক ব্যক্তির কাছে মর্টগেজ দিয়ে কিছু অসাধু মালিক অন্যত্র থাকেন। তবে এর সংখ্যা কম। ইতিমধ্যে কয়েক বাড়ির মালিককের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে। এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

বংশাল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. শহিদ হোসেন বলেন, মর্টগেজ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ আসে। তখন দুই পক্ষকে নিয়ে বসে সমাধান করা হয়। এ বিষয়ে কেউ মামলা করেনি।


ঢাকা/আসাদ/রফিক

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন