ঢাকা, শনিবার, ৯ ফাল্গুন ১৪২৬, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

বিদ্রোহীতে বিপাকে আওয়ামী লীগ

এসকে রেজা পারভেজ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০১-০৬ ৮:৩৮:৫৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০১-০৭ ৫:২৯:৪৬ পিএম

উপজেলা নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ে গত বছর বেশ বিপাকে পড়েছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। বিদ্রোহীদের বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েও শেষ পর্যন্ত কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে ক্ষমা করে দেয়া হয়। উপজেলা নির্বাচনের সেই ‘বিদ্রোহী ধাক্কা’ এবার ঢাকা সিটি করপোরেশনেও লেগেছে।

আগামী ৩০ জানুয়ারি হতে যাওয়া সিটি নির্বাচনে প্রায় সব ওয়ার্ডেই কাউন্সিলর পদে আওয়ামী লীগের সমর্থন প্রত্যাশী একাধিক প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে রেখেছেন। যদিও দল থেকে একজনকে সমর্থন জানানো হয়েছে। তবুও এর বাইরে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার না করে ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর তকমা পাওয়া প্রার্থীরা নির্বাচন করার বিষয়ে অনঢ় রয়েছেন। এ নিয়ে বেশ বিপাকে পড়েছে আওয়ামী লীগ। আগামী ৯ জানুয়ারির মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিনের আগে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন দলটির দায়িত্বশীল নেতারা।

তারা বলেছেন, জনমত ও বিভিন্ন সংস্থার রিপোর্ট বিবেচনায় নিয়ে ঢাকা সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর প্রার্থীদের মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। মনোনয়ন বঞ্চিতদের ভবিষ্যতে মূল্যায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নেতারা বলেছেন, ‘রাজনীতি একদিনের মাঠ নয়। আজ যারা পাননি কাজ করুন। আগামীতে মূল্যায়িত হবেন। দল করলে নেত্রীর নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে, মানতে হবে।’

সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কোনো বিদ্রাহী প্রার্থী দেখতে চায় না জানিয়ে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কর্নেল (অব.) ফারুক খান বলেন, ‘আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ড বিভিন্ন আঙ্গিকে বিভিন্ন রিপোর্ট বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত দিয়েছে কে মেয়র প্রার্থী, কে কাউন্সিলর প্রার্থী ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর প্রার্থী।’

‘আমরা বিশ্বাস করতে চাই কোনো কাউন্সিলর প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো বিদ্রোহী প্রার্থী থাকবে না। মনে রাখতে হবে রাজনীতিতে আবেগের চেয়ে বেশি বাস্তববাদী হতে হবে। দলকে ভালোবাসতে হবে। নেত্রীর কথা শুধু বললে হবে না, নেত্রীর হাতকে শক্তিশালী করতে হবে।’

তবে দলের মনোনীত প্রার্থীর বাইরে গিয়ে যারা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন, তাদের কেউ কেউ নিজেদের দলীয় সমর্থন পাওয়া প্রার্থীর চেয়ে যোগ্য বলে দাবি করেছেন। তারা বলছেন, স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করলেও তারা জয় নিয়ে ফিরবেন। তারা আশা করছেন, জনপ্রিয়তার বিষয়টি বিবেচনা করে দল কিছু ওয়ার্ডে প্রার্থী পরিবর্তন করবেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১১ নম্বর ওয়ার্ডে দল থেকে মনোনয়ন না পেয়েও কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন নুর নবী ভুইয়া রাজু। রাইজিংবিডিকে তিনি বলেন, ‘একটু খোঁজ নিয়ে দেখবেন যিনি দল থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন, তিনি যদি আমার চেয়ে জনপ্রিয় হয়, তাহলে আমার কিছু বলার নেই। আমি তারচেয়ে তিনগুণ জনপ্রিয় না হলে রাজনীতি ছেড়ে দেব। আমি যদি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও নির্বাচন করি বিপুল ভোটে জয়ী হবো।’ এই ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন বর্তমান কাউন্সিলর মো. হামিদুল হক শামীম।

বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে অন্তত ১১ জন আছেন যারা গত বছর নির্বাচিত কাউন্সিলর ছিলেন। এবার তারা দলের মনোনয়ন পাননি। তবে দলের মনোনয়ন না পেলেও শেষ পর্যন্ত সমর্থন পাবেন সেই আশায় মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এমন একজন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর মুন্সী কামরুজ্জামান কাজল। এবার তাকে মনোনয়ন দেয়া হয়নি। এবার মনোনয়ন পেয়েছেন মো. আবুল বাশার। তিনি গতবার নির্বাচন করে তিনি ৬৩ ভোট পেয়েছিলেন। গত তিন বছরের কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করে জিততে পারেননি। অভিযোগ উঠেছে, আবুল বাশার অনৈতিক কর্মকাণ্ডের দায়ে রেড ক্রিসেন্ট থেকে বহিস্কৃত হয়েছেন। তিনি ফ্রিডম পার্টি এবং পরে জাতীয় পার্টিতে যুক্ত ছিলেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আবুল বাশার রাইজিংবিডিকে বলেছেন, এসব তার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার। তার বিরোধীরা এগুলো ছড়াচ্ছে।

বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া নিয়ে জানতে চাইলে মুন্সী কামরুজ্জামান কাজল রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘দল যাকে মনোনয়ন দিয়েছে তার চেয়ে আমি শতভাগ যোগ্য। গত পাঁচ বছরে আমি এলাকার জন্য যে কাজ করেছি তাতে জনগণের ভালোবাসা আমার জন্য রয়েছে। আমি এবার মনোনয়ন পাইনি। আশা করছি, শেষ পর্যন্ত দল আমাকে মূল্যায়ন করবে। আমি নির্বাচন করলে এলাকার মানুষ আমাকের বিপুল ভোটে বিজয়ী করবে বলে বিশ্বাস করি।’

দলীয় সূত্র বলছে, ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে যারা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হয়েছেন, তাদের সঙ্গে আলোচনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগ। দু-একদিনের মধ্যেই ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলবেন নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। চেষ্টা থাকবে একটি ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত একজন প্রার্থীই যাতে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তবে পুনরায় খোঁজ খবর নিয়ে প্রয়োজনে কয়েকটি ওয়ার্ডে দল-সমর্থিত প্রার্থী পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে। তবে যারা দলের সিদ্ধান্ত মানবেন না, তাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এরই মধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে চার‌টি ওয়া‌র্ডে পরিবর্তন এনেছে দলটি। ঢাকা দ‌ক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১২ নম্বর ওয়া‌র্ডে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মামুনুর রশীদ শুভ্র‌কে প‌রিবর্তন ক‌রে গোলাম আশরাফ তালুকদার‌কে এবং ৩৩ নম্বর ওয়া‌র্ডে মো. ইলিয়াস রশীদ‌কে প‌রিবর্তন ক‌রে মো. আউয়াল হো‌সেনকে মনোনয়ন দেয়া হ‌য়ে‌ছে। উত্তর সি‌টি করপো‌রেশ‌নের ১২ নম্বর ওয়া‌র্ডে মুরাদ হো‌সেন‌কে প‌রিবর্তন ক‌রে মো.  ইকবাল হো‌সেন তিতু‌কে ম‌নোনয়ন দেয় আওয়ামী লীগ। প‌রে আবার ইকবাল‌কে প‌রিবর্তন ক‌রে মুরাদ হো‌সেন‌কে ম‌নোনয়ন দেয়া হয়। এছাড়া উত্তর সি‌টি ক‌রপো‌রেশনে  ৪১ নম্বর ওয়া‌র্ডে আবদুল ম‌তিন‌কে প‌রিবর্তন ক‌রে শফিকুল ইসলাম‌কে ম‌নোনয়ন দেয়া হ‌য়ে‌ছে।

সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীর বাইরে কোনো বিকল্প কাউকে দল চায় না উল্লেখ করে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, ‘প্রতিটি নেতাকর্মীকে মাঠে নেমে কাজ করতে হবে। যেকোনো মূল্যে জনগণের কাছে পৌঁছাতে হবে। প্রতিটি নেতাকর্মীর দায়িত্ব হচ্ছে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের জয়লাভ করানো। বিকল্প নেই, আমরা দেখতে চাই না।’

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও ঢাকা উত্তর সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘কাউন্সিলর পদে যাদের মনোনয়ন দিয়েছি, অনেককেই দিতে পারি নাই। দয়া করে কেউ অন্য কোনো প্রার্থী হবেন না। যদি হন মনে করবো দলের প্রতি আনুগত্য নেই। প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মনোনয়ন বোর্ডের সকলে একমত হয়ে জনমত ও বিভিন্ন সংস্থার রিপোর্ট নিয়ে আমরা মনোনয়ন দিয়েছি।’

আগামী ৩০ জানুয়ারি দুই সিটির মেয়র ও কাউন্সিলর পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আগামী ৯ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। ওইদিনই চূড়ান্ত হবে দুই দলে কোনো বিদ্রোহী প্রার্থী থাকছেন কি না।


ঢাকা/পারভেজ/সাইফ