ঢাকা, বুধবার, ২৫ চৈত্র ১৪২৬, ০৮ এপ্রিল ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

চা বিক্রেতা থেকে কাউন্সিলর (ভিডিও)

মাহমুদুল হাসান মিলন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০২-২৯ ১০:০৬:০২ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৩-০২ ৯:৪৮:২৮ এএম
নিজের দোকানে চা তৈরি করছেন কাউন্সিলর মোহাম্মদ হাবুল খান

‘এক কাপ চা-ই যদি বানাইয়া না খাওয়াইতে পারি, কমিশনার হওয়ার পর কী করমু?’ টিভি বিজ্ঞাপনে চা বিক্রেতা থেকে কাউন্সিলর হওয়ার পর এই ডায়ালগটি করেন অভিনেতা মোশাররফ করিম।

কাল্পনিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিজ্ঞাপনটি তৈরি হয়েছে। তবে বাস্তবেও এমনই এক চা-বিক্রেতা কমিশনারের দেখা মিলেছে নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলায়। কেন্দুয়া পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তিনি। নাম, মোহাম্মদ হাবুল খান। বয়স ৪৫ বছর। ২০১৫ সালে পৌর নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে নির্বাচিত হন তিনি।

পেশায় চা-পানের দোকানদার। কেন্দুয়া উপজেলা পরিষদের পাশেই তার চায়ের দোকান। এই দোকানই তার অফিস। দিনভর চায়ের দোকানে বসেই এলাকার মানুষের সমস্যার কথা শোনেন। ওয়ার্ডবাসীর সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন ও সবার পরিবারের সদস্যদের খোঁজ-খবর নেন। প্রয়োজন হলে সই বা সিল মেরে দেয়ার কাজও করেন এই দোকানে বসেই।

রাইজিংবিডির ময়মনসিংহ প্রতিনিধি মাহমুদুল হাসান মিলনের সঙ্গে কথা হয় এই জনপ্রতিনিধির। উঠে আসে তার জীবনের নানা বাঁকের কথা। উঠে আসে চা বিক্রেতা থেকে কাউন্সিলর হওয়ার গল্পটিও।

জন্মের কয়েকমাস পরই বাবাকে হারান হাবুল খান। সংসারের টানাপোড়েন দেখে বড় হয়েছেন। লেখাপড়ার সুযোগ হয়নি। মাত্র ১০ বছর বয়সে দূর সম্পর্কের এক চাচা আব্দুর রউফের চায়ের দোকানে কাজ শুরু করেন তিনি।

আট বছর বিনা বেতনে চাকরি করেন হাবুল। কাজ ও সততায় মুগ্ধ হয়ে দোকানের দায়িত্ব ভাতিজার হাতে তুলে দিয়ে নিজ এলাকায় ফিরে যান চাচা আব্দুর রউফ। সেই থেকে এই চায়ের দোকান হাবুল খানের।

হাবুল খান বলেন, ‘‘দীর্ঘদিন ধরে এখানে চায়ের দোকান করি। এলাকার সবার সাথে আমার অন‌্যরকমের একটা ঘনিষ্ঠতা হয়ে গেছে। অনেকটা পরিবারের সদস‌্যদের মতো। এলাকার মানুষ নিজেদের বিভিন্ন সমস্যার কথা আমার সাথে আলোচনা করেন। আমিও তাদের পাশে থাকতে ও সমস‌্যা সমাধানে চেষ্টা চালাই।

‘এভাবেই চলছিল। এক সময় সবাই আমাকে কাউন্সিলর পদে নির্বাচনের কথা বলেন। প্রথমে লজ্জা ও সংকোচ পেয়ে বসে। তবে সবার প্রেরণা ও সাহসে মনে সখ জাগে। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করি। অনেকেই আছেন এমন যারা অন‌্যকে বিপদে ফেলতে বা রসিকতা করতে ভোটে দাঁড়ানোর জন‌্য ফুসলায়। পরে ভোটে জিততে না পারলে মেকি সহানুভূতি জানায়।

‘তবে এ এলাকার মানুষ সত‌্যিই যে আমাকে ভালোবাসেন, তা বিপুল ভোটে নির্বাচিত হওয়ার পর উপলব্ধী করতে পেরেছি। নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর অনেকে আমাকে চায়ের দোকান ছেড়ে দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু দোকান ছেড়ে দেয়ার কথা একবারও মনে স্থান পায়নি।

‘যদি দোকান ছেড়ে দিই তাহলে আমার উপর্জনের রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে। সংসার চলবে কী করে? সৎভাবে চলার চেষ্টা করেছি জীবনভর। বাকি জীবনও সেই চেষ্টা অব‌্যাহত রাখতে চাই। দোকান ছেড়ে দিলে অসৎ পথে চলার ভয়, তাই ছাড়িনি। এই চায়ের দোকান করেই আমি কাউন্সিলর হয়েছি। কাউন্সিলর হওয়ার পর চায়ের দোকান খুলিনি।”

হাবুল খান গড়ে প্রতি মাসে চায়ের দোকান থেকে খরচ বাদে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় করেন। কর্মচারী নেই। একাই দোকান চালান তিনি। চা ছাড়াও বিক্রি করেন বিস্কুট, চানাচুরসহ অন্যান্য পণ্য। এছাড়া কাউন্সিলর হিসেবে চার হাজার টাকা সম্মানী ভাতা পান। এতেই চলে তার সংসার। অনেককেই বিনা পয়সায় চা খাওয়ান এই জনদরদী কাউন্সিলর।

হাবুল খানের চায়ের দোকানে নিয়মিত চা খেতে আসেন আবুল হোসেন। তিনি বলেন, ‘এই এলাকার কোনো মুসলিম ব্যক্তি মারা গেলে তার খাঁটিয়া হাবুলের কাঁধে উঠবেই। শুধু মুসলিম না, হিন্দু ধর্মের কেউ মারা গেলেও তার সৎকারের সময় পানি-বিস্কুট নিয়ে হাজির হয় হাবুল।’

স্থানীয় কলেজছাত্র মারুফ বলেন, ‘হাবুল ভাইয়ের কাছ থেকে সরকারের দেয়া কোনো ভাতার কার্ড নিতে টাকা লাগে না। তিনি খুব ভাল মনের মানুষ।’

কেন্দুয়া পৌরসভার মেয়র আসাদুল হক ভূইয়া বলেন, ‘হাবুল খান আমার পরিষদের একজন ভাল সদস্য। তার বিরুদ্ধে আমি কখনো কোনো অভিযোগ পাইনি।’

কেন্দুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল ইমরান রুহুল ইসলাম বলেন, ‘কাউন্সিলর হওয়ার পরও চায়ের দোকান করে জীবিকা নির্বাহ করেন হাবুল খান। সেজন্য তিনি অবশ্যই প্রশংসার দাবীদার। অনেকেই নেতৃত্বের স্বাদ পাওয়ার পর খুব দ্রুতই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটে। নৈত্তিারও স্খলন ঘটে। তার ক্ষেত্রে এসব কিছুই ঘটেনি। তার কাছ থেকে আমরা জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তারা শিক্ষা নিতে পারি।’

কেন্দুয়া উপজেলা চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বলেন, ‘হাবুল খান ছোট বেলা থেকে এখানে চায়ের দোকান করে। কাউন্সিলর হওয়ার পরও দোকান চালাচ্ছে। কোনো অহংকার নেই। সে বিনয়ী ও ভালো মনের মানুষ।’

কেন্দুয়া পৌরসভার আরামবাগ এলাকায় বাড়ি হাবুল খানের। মা, স্ত্রী ও চার সন্তান নিয়ে তার সংসার। মৃত রইছ উদ্দিনের তিন সন্তানের মধ্যে সবার ছোট তিনি।

বিয়ের পর নিজের সংসার নিয়ে ব‌্যস্ত বড় বোন। বড় ভাই কৃষি কাজ ও অটো রিক্সা চালিয়ে সংসার চালান। ছোট বেলায় এই ভাইকে শেয়ালে কামড়ে দেয়। শেয়ালের কামড়ে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায় তার শরীরের বিভিন্ন স্থান। এতে প্রায় শারিরীক প্রতিবন্ধীর পর্যায়ে পড়ে যান তিনি। তবু মাথা নত করেননি, সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার জন‌্য লড়ে চলেছেন। অন‌্য ভাইটি ছোট বেলায় কলেরা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।

হাবুল খানের স্ত্রী রুনা লায়লা। ২০০২ সালে বিয়ে হয় তাদের। সংসারে চার সন্তানের মধ‌্যে তাদের বড় মেয়ে রুমানা অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। আরেক মেয়ে সুমনা ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। জমজ দুই ছেলে কিন্ডার গার্ডেনে নার্সারিতে পড়ছে।

হাবুল খান বলেন, ‘আমার যা উপার্জন, তাতেই জীবন কেটে যাবে। আমি নিজ পরিবারের সদস্যদের মতোই এলাকাবাসীকে ভালোবাসি। চা বিক্রি করছি বলে লজ্জা পাই না। এটাই আমার পেশা। অবশ‌্য এজন‌্য আমার নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বীরা ঠাট্টা উপহাস করে। আমি তা গায়ে মাখিনি কখনো। কারণ, আমার কাছে আমার পেশাই বড়। এতে আমি ও আমার পরিবার খুবই গর্বিত।’




ময়মনসিংহ/সনি