ঢাকা, বুধবার, ২৫ চৈত্র ১৪২৬, ০৮ এপ্রিল ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

এখনো স্বপদে প্রশ্নফাঁসের আসামি

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০২-২৯ ১০:৫২:৫০ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৩-০১ ১:৩১:৩৮ এএম
প্রতীকী ছবি

পাবলিক পরীক্ষায় গত কয়েক বছর ধ‌রে সরকারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রশ্নপত্র ফাঁস। প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। জালিয়াতির সাথে সম্পৃক্ত থাকার অপরাধে অনেক শিক্ষককে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে শাস্তি দেয়া হয়েছে।

অনেকের নামে মামলা হয়েছে। কিন্তু তিন বছর আগেই আইনের হাতে ধরা পড়া এক অধ্যক্ষ এখনো স্বপদে বহাল রয়েছেন। এমনকি তিনি আদালত ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে ব্যাংক থেকে তুলে নিচ্ছেন পুরো বেতনও।

গত কয়েক বছর ধরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে জড়িত শিক্ষকদের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ ‌নিতে গিয়ে এসব তথ্য জানা গেছে। এর মধ্যে অন্যতম রাজধানীর কমলাপুর শেরেবাংলা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আবদুল আলীম। তিনি ফৌজদারী মামলার আসামি হয়েও স্বপদে বহাল আছেন। এটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিধিমালার পুরোপুরি পরিপন্থি।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে ২০১৭ সালের ১ মার্চ রাজধানীর কমলাপুর শেরেবাংলা স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইংরেজি শিক্ষক রফিকুল ইসলামসহ আটজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে শিক্ষক, কোচিং সেন্টারের স্টাফ ও অন্য মিলে একই অভিযোগে ১৬ জন গ্রেপ্তার হন। প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে তখন গ্রেপ্তার হওয়া অন্য আসামিদের মধ্যে ছিলেন জহিরুল ইসলাম শুভ, লিটন আলী, তারিকুজ্জামান হিমেল, আরিফুল ইসলাম, রুমন হোসেন, রাজিব আলী, ইয়াসিন আরাফাত অন্তর প্রমুখ।

দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন তারা। তাদের জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে কমলাপুর শেরেবাংলা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আবদুল আলীম ওই বছরের ৭ মার্চ গ্রেপ্তার হন। প্রশ্নফাঁস চক্রের মূল ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত হন তিনি।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে জড়িত থাকার অপরাধে গ্রেপ্তার হওয়ার পর পুলিশ তাকে চারদিনের রিমান্ডে নেয়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘এই আসামি ধূর্ত প্রকৃতির।’

জানা গেছে, প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে প্রতিষ্ঠানের গভনিং কমিটির ২০১৭ সালের ৮ মার্চ জরুরী সভা ডাকা হয়। সভায় আবদুল আলীমকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। সাত দিনের ‌মধ্যে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়। এই ঘটনার জের ধরে ওই বছরের ২ এপ্রিল ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড স্কুলের জেএসসি পরীক্ষার কেন্দ্র বাতিল করে।

অভিযুক্ত শিক্ষক আবদুল আলীম ও রফিকুল ইসলামকে বোর্ডের পরীক্ষা সংক্রান্ত সকল কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। একই বছরের ১৩ নভেম্বর কারিগরি শিক্ষা বোর্ড কমলাপুর শেরে বাংলা রেলওয়ে স্কুল এন্ড কলেজের এসএসসি ভোকেশনাল ফাইনাল পরীক্ষার কেন্দ্র বাতিল করে। প্রশ্নফাঁসে জড়িত স্কুলের দুই শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করতে রেলপথ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। রেল মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা না নিলে স্কুলটি বন্ধ করে দেবে বলেও মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

প্রতিষ্ঠানের গভনিং কমিটি ১২ এপ্রিল আরেকটি সভা আহ্বান করে এবং একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে তার বিরুদ্ধে আনা অন্যান্য অভিযোগ যাচাই করার জন্য। আব্দুল আলীমের বিরুদ্ধে তখন সাতটি অভিযোগ পাওয়া যায়।

অভিযোগগুলো ছিল- প্রশ্ন ফাঁস, জ্ঞানকোষ কোচিং সেন্টারের আড়ালে বিভিন্ন অপকর্মে লিপ্ত থাকা, অর্থ আত্মসাৎ, তার অপকর্মের কারণে জেএসসি কেন্দ্র বাতিল, প্রশাসন অবমাননা, ইতিপূর্বে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত ও প্রমাণিত হওয়া এবং অভ্যন্তরীণ অডিট কিংবা ২০০৯ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান সরকারি ও বেসরকারি অডিট না করানো।

তদন্ত কমিটির চেয়ারম্যান করা হয় আহসানুল হক কাউসার নামে এক ব‌্যক্তিকে। তদন্ত কমিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং কমিটিকে জানায়, তার বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ সত্য। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে ১৬ লাখ ৪২ হাজার ৭০০ টাকা অর্থ আত্মসাতেরও অভিযোগ আনা হয়।

এতকিছুর পরও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে তার প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে তাকে অধ্যক্ষ হিসেবে বহাল করা হয়। এখন পর্যন্ত তিনি ওই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

নিয়ম মোতাবেক সকল অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় স্কুল কর্তৃপক্ষ। কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা হলে তিনি সাময়িক বরখাস্ত হন এবং তার বেতন-ভাতা স্থগিত রাখার নিয়ম রয়েছে। আবদুল আলীমের ক্ষেত্রেও তেমনই হয়েছিল। কিন্তু চাতুরি করে তিনি মাত্র এক বছরের মাথায় আবার অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন প্রতিষ্ঠানের।

এর কয়েক মাসের মাথায় তিনি তুলে নিচ্ছেন তার বেতনও। অথচ তার বিরুদ্ধে এখনো মামলা চলছে। এমনকি আদালতের নির্দেশ এবং শিক্ষা অধিদপ্তরের নোটিশে মানবিক দিক বিবেচনা করে তাকে শুধুমাত্র খোরপোষ ভাতা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তিনি প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং কমিটিকে ভুল বুঝিয়ে ব্যাংক থেকে বেতনের পুরো টাকাই তুলে নিচ্ছেন।

আব্দুল আলীমের আবেদনের প্রেক্ষিতে মানবিক দিক বিবেচনা করে অধিদপ্তরের ২০১৯ সালের ১১ জুলাই মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের এক আদেশে বলা হয়, ‘তার বেতন স্থগিত বা বন্ধের আদেশ আদেশ প্রত্যাহার করে খোরপোষ ভাতা চালু করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ প্রদান করা হলো।’

আদেশের কপিটি সংশ্লিষ্ট ব্যাংক, স্কুল কর্তৃপক্ষ, গভর্নিং কমিটির সভাপতিসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় স্থানে প্রেরণ করা হয়। এই আদেশের প্রেক্ষিতে আব্দুল আলীমের বেতন-ভাতা স্থগিত থেকে শুধুমাত্র খোরপোষ ভাতা পাওয়ার কথা। কিন্তু তিনি সুকৌশলে বিষয়টিকে অন্যভাবে উপস্থাপন করেন এবং প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং কমিটির কাছ থেকে পূর্ণ বেতন উত্তোলনের অনুমতি লিখে নেন।

স্কুলের গভর্নিং কমিটির সভাপতির আবুল ফাতাহ মো. আহকাম উল্লাহ ইমাম খান বলেন, ‘আপৎকালীন সময়ের জন্য আমরা তাকে অধ্যক্ষ হিসেবে বহাল রেখেছি। এসময় তিনি নিয়ম অনুযায়ী ভাতা পাচ্ছিলেন। এরপর তিনি হাইকোর্টের একটি ভিডিও কপি নিয়ে আমাদের দেখান। তারপর থেকে তিনি পূর্ণ বেতন উত্তোলন করছেন।’

তিনি বলেন, ‘মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের আদেশের কপিটি তখন আমরা হাতে পাইনি। এখন এই বিষয়ে আমরা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব।’

এদিকে আবদুল আলীমের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে বেশকিছু অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। ২৮/বি দক্ষিণ কমলাপুরে অবস্থিত ‘কনকচাপা’য় একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে তার। বাসাবোতে রয়েছে ৬ কাঠার একটি প্লট। যার বাজার মূল্য প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

কমলাপুর শেরেবাংলা স্কুল অ্যান্ড কলেজের নামে আশেপাশে ২৪টি দোকান রয়েছে। আট হাজার টাকা মাসিক ভাড়া হিসেবে সেসব দোকানের গত ৫ বছরের ভাড়া এক কোটি ১৫ লাখ ২০ হাজার টাকা বিদ্যালয়ের কোষাগারে জমা না দিয়ে বিভিন্ন কৌশলে আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এসব দোকানের প্রতিটি তিন বছরের জন্য লিজ প্রদান করা হয়। অগ্রীম হিসেবে রাখা হয় ১০ লাখ টাকা করে। এক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে দুই কোটি ৪০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের সেশন চার্জ বাবদ প্রতি বছর প্রায় ৩০০০ টাকা হারে (গড়ে) ৫৫০ জন ছাত্রছাত্রীর কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়। এতে বছরে তিনি বাড়তি ‌নিচ্ছেন সাড়ে ১৬ লাখ টাকা। বিদ্যালয়ের প্রাথমিক শাখায় ১০০ জন ছাত্রছাত্রীর নিকট থেকে মাসে ৩০০ টাকা হারে, বছরে বাড়তি আদায় করেন ৩৬ হাজার টাকা।

এছাড়া প্রতিবছর পাবলিক পরীক্ষা‌র আগে বাড়তি ফি নেয়ার এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ভোকেশনালে ৯ম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করান তিনি। এ ক্ষেত্রে বিপুল অংকের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মো. সাজেদুর রহমান নামে প্রতিষ্ঠানের একজন অফিস সহকারী এসব বাড়তি ফি আদায়সহ বিভিন্ন কাজে আবদুল আলীমের সহকারী হিসেবে কাজ করেন। সাজেদুর রহমান তার পারিবারিক আত্মীয়, তিনিই তাকে নিয়োগ দেন এই প্রতিষ্ঠানে।

আবদুল আলীমের প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার পর স্কুলের গভর্নিং কমিটির করা তদন্ত কমিটির সভাপতি আহসানুল হক কাউসার রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানের পরিচালনার স্বার্থে কিছু শর্তসাপেক্ষে আমরা পুনরায় আবদুল আলীমকে বহাল করেছিলাম। তবে বলা হয়েছিল, রায়ে তার বিপক্ষে গেলে বা এর মধ্যে কোনো রকম প্রশ্নের উদ্ভব হলে তিনি আগের মতোই বরখাস্ত হয়ে যাবেন। এর মধ্যে কিছু কিছু ঘটনা এখন আমা‌দের কানে আসছে, যেগুলো আমরা আগে শুনিনি। আমরা এসবের অবশ্যই সত্যতা যাচাইপূর্বক ব্যবস্থা নেব।’

কমিটির অন্য সদস্য সুলতান মিয়া রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘এসব বিষয়ে গভর্নিং কমিটির সভাপতির সাথে আমাদের কথা হয়েছে। আবদুল আলীমকে নিয়ে আমরা বসবো।’

সার্বিক অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে আবদুল আলীম রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘এসব বিষয়ে কথা বলার সময় নেই আমার।’

ফৌজদারী মামলার আসামি হয়েও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধ‌্যক্ষ থাকা যায় কি না? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনি আইনের কপি নিয়ে আমার সাথে দেখা কইরেন।’


ঢাকা/হাসান/সনি