ঢাকা, শুক্রবার, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০৫ জুন ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

‘সড়কে নিভে গেছে আমাদের স্বপ্ন প্রদীপ’

মামুন খান : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৪-০৬ ১:৫৯:০০ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৪-০৬ ২:১০:৩১ পিএম
সড়ক দুর্ঘটনা নিহত ফাহমিদা হক লাবণ্য

মেয়েটা চলে যাওয়ার পর থেকে একদিনও না কেঁদে ভাত খায়নি ওর মা। আমার ছেলেটাও নিশ্চুপ হয়ে গেছে। একটি সড়ক দুর্ঘটনায় আমাদের স্বপ্ন প্রদীপ নিভে গেছে।

সড়ক দুর্ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া একমাত্র মেয়ে ফাহমিদা হক লাবণ্যকে হারিয়ে এ কথা বলছিলেন তার বাবা এমদাদুল হক। 

গত বছরের ২৫ এপ্রিল রাজধানীর শেরে বাংলা নগরে হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের সামনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ফাহমিদা হক লাবণ্য। 

লাবণ্যের মৃত্যুর ঘটনায় তার বাবা শেরে বাংলা নগর থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলাটি সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে। সর্বশেষ গত ১৯ জানুয়ারি মামলাটি সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ধার্য ছিল। কিন্তু ওই দিন কোনো সাক্ষী আদালতে হাজির হননি। এজন্য  ঢাকার তৎকালীন মুখ্য মহানগর হাকিম জাহিদুল কবীর আগামী ৪ মে পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ ধার্য করেন।

লাবণ্যের বাবা এমদাদুল হক বলেন, ‘স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে আমার সংসার। আনন্দের কোনো কমতি ছিল না। ছেলেটা থাকতো চুপচাপ আর মেয়েটা ছিল উল্টো। তার স্বপ্ন ছিল আকাশ ছোঁয়া। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় সেই স্বপ্নটাও নিভে গেল।  লাবণ্য  ছিল মেধাবী ছাত্রী। ঘটনার দিন ব্যস্ততার কারণে সে উবারে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়। কে জানতো ওটায় শেষ যাওয়া। ওটা তো দুর্ঘটনা না, আমাদের স্বপ্নকে চুরমার করে দেওয়ার যন্ত্রণা।’

লাবণ্যর বাবা বলেন, ‘প্রাণবন্ত মেয়েকে হারিয়ে আমার পরিবার যেন থমকে গেছে। কবে স্বাভাবিক হবে জানি না। যাদের কারণে মেয়েকে হারিয়েছি তাদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা চাই। আর মামলার বিচার যেন দ্রুত শেষ হয় সেই প্রত্যাশা করেন তিনি।’ মেয়ের নামে একটি এতিমখানা তৈরি করার কথাও জানান এমদাদুল হক।

মেয়েকে হারিয়ে অনেকটা নিশ্চুপ হয়ে গেছেন মা ফারজানা হক। এখনো তার ফেরার অপেক্ষায় বসে থাকেন। ফারজানা হক বলেন, ‘মাঝে মধ্যে মনে হয় এই বুঝি লাবণ্য এসেছে, মা বলে ডাকছে। তখন বুকটা ফেঁটে যায়। এভাবে সড়ক দুর্ঘটনা যেন আর কোনো মায়ের কোল খালি না হয়।’ এজন্য বিচার ব্যবস্থাকে কঠোর করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। আর আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা চান তিনি।

সংশ্লিষ্ট আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর মো. শাহজাহান বলেন, ‘এটি একটি  আলোচিত মামলা। একজন শিক্ষার্থী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। মামলায় দুই আসামির বিরুদ্ধে চার্জগঠন হয়ে গেছে। বিচারকাজ দ্রুত শেষ করতে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। তবে এতে করোনারভাইরাসের প্রভাব পড়তে পারে। তারপরও সাক্ষীরা যেন আদালতে এসে সাক্ষ্য দেন সেজন্য সমন পাঠানো হয়েছে। সাক্ষীরা যদি নিয়মিত আদালতে এসে সাক্ষ্য দেন তাহলে মামলাটির বিচার দ্রুত শেষ হয়ে যাবে। ভূক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার পাবে।’

আসামি আনিছুরের আইনজীবী আনোয়ারুল ইসলাম শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘মামলাটি সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ে আছে। যেহেতু আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জগঠন হয়ে গেছে, ট্রায়ালের মাধ্যমে আসামিদের নির্দোষ প্রমাণ করতে চেষ্টা করব। ’

আসামি সুমনের আইনজীবী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘সুমন এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তারপরও যেহেতু তার বিরুদ্ধে চার্জগঠন হয়েছে। সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে সে খালাস পাবে বলে আশা করছি।’

উল্লেখ্য, গত বছর ২৫ এপ্রিল রাজধানীর শেরে বাংলা নগরে হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের সামনে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ফাহমিদা হক লাবণ্য সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। লাবণ্য ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।

মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ারিং ব্যবহার করে শ্যামলী থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনার কবলে পড়েন তিনি। আহত অবস্থায় লাবণ্যকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে নেওয়া হলে সেখানে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় লাবণ্যের বাবা ব্যবসায়ী এমদাদুল হক ২৬ এপ্রিল শেরে বাংলা নগর থানায় মামলা করেন।

মামলা দায়েরের পর দিন ঢাকার আশুলিয়ার বাইশমাইল এলাকা থেকে কাভার্ডভ্যানসহ চালক আনিসুর রহমানকে ও মোহাম্মদপুর থানাধীন নবীনগর হাউজিং থেকে উবারের মোটরসাইকেল চালক সুমন হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২৮ এপ্রিল আনিছুরের চার দিন ও সুমনের দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। পরবর্তীতে দুই আসামিই দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন।

মামলাটি তদন্ত করে গত বছরের ৯ জুলাই ওই দুইজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শেরে বাংলা নগর থানার এসআই নুরুল ইসলাম। চার্জশিটে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, উবার চালক সুমন ঘটনার সময় তার বাইকটি দ্রুত ও বেপরোয়া গতিতে চালাচ্ছিলেন।

গত বছর ১০ অক্টোবর দুই আসামির বিরুদ্ধে চার্জগঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন তৎকালীন ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম জাহিদুল কবীর।

বর্তমানে মামলাটিতে দুই আসামি জামিনে আছেন। এদিকে আসামিদের বিরুদ্ধে যে দুই ধারায় চার্জগঠন করা হয়েছে, ওই ধারায় আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ সাজা তিন বছর করে কারাদণ্ড হতে পারে। 


মামুন খান/ইভা