ঢাকা, শুক্রবার, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০৫ জুন ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

টিসিবির পণ্য বিক্রি : ক্রেতাদের ভিড়ে বাড়ছে ঝুঁকি

মামুন খান : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৪-০৯ ৭:৪১:৩১ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৪-০৯ ৭:৪১:৩১ এএম

করোনাভাইরাসের কারণে কর্মহীন হয়েছেন অনেক মানুষ। রোজগার নেই। সঞ্চয়ে টান পড়েছে। তাই কম খরচে পণ্য কিনতে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ট্রাকের সামনে প্রতিদিন বাড়ছে ভিড়। এ সময় সামাজিক দূরত্ব না মানায় করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে।

টিসিবির প্রায় প্রতিটি ট্রাকের সামনে ক্রেতার সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় তাদের নিয়ন্ত্রণ করা ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে পণ্য বিক্রি সম্ভব হচ্ছে না। টিসিবি দাবি করছে, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে যথেষ্ট উদ্যোগে নেওয়া হলেও ক্রেতারা তা মানছেন না।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় টিসিবির গাড়ির সামনে দেখা যায়, ক্রেতাদের মধ্যে পণ্য কেনার প্রতিযোগিতার কারণে বিশৃঙ্খলা হচ্ছে বেশি। তীব্র রোদ ও সড়কে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার ফলেও ঘটছে ধৈর্যচ্যুতি।

সোমবার বিকেলে দেখা যায়, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল ইনস্টিটিউট হাসপাতাল, রাজধানীর রায় সাহেব বাজার মোড় এলাকায় টিসিবির ট্রাকের সামনে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। কার আগে কে কিনবেন তা নিয়ে প্রতিযোগিতা চলছে।

এ সময় টহলরত সেনা ও পুলিশ সদস্যরা ক্রেতাদের সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে লাইনে দাঁড় করিয়ে দেন। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা চলে যাওয়ার পর আবার বিশৃঙ্খলা শুরু হয়। একপর্যায়ে টিসিবির পণ্য বিক্রেতা তাদের লাইনে দাঁড়াতে বললেও ক্রেতারা কর্ণপাত করেননি। এ অবস্থা কিছুক্ষণ চলার পর পুলিশ সদস্যরা এসে বারবার তাগাদা দেন সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে। তবে, কে শোনে কার কথা। অনেককে টিপ্পনী কাটতেও দেখা যায়।

একই চিত্র দেখা যায় যাত্রাবাড়ী, কমলাপুর, ইত্তেফাক মোড় এলাকাতেও।

রায়সাহেব বাজার মোড়ে টিসিবির ট্রাকের পাশে দাঁড়িয়ে সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা ক্রেতাদের দূরত্ব বজায় রাখার অনুরোধ করেন। তিনি সবার উদ্দেশে বলেন, আপনারা দূরত্ব বজায় রাখুন। এটি এমন একটি রোগ (করোনাভাইরাস), যা আপনার মাধ্যমে পুরো পরিবারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। পুরো পরিবার শেষ হয়ে যেতে পারে আপনার কারণে। কাজেই পরিবারের কথা চিন্তা করে হলেও আপনারা সামাজিক নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন।

সেলিম নামে টিসিবির এক বিক্রেতা বলেন, বার বার তাদের দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়াতে বলি। তারা আমাদের কথায় পাত্তাই দেন না। একজন আরেকজনের গা ঘেঁষে দাঁড়ান। আমরা আর কী করতে পারি।
 


টিসিবির উপ-ঊর্ধব্তন কার্যনির্বাহী মো. হুমায়ুন কবির বলেন, মানুষ যেন খাবার থেকে বঞ্চিত না হয়, সেজন্য সরকারের চেষ্টার কমতি নেই। টিসিবি এমনই এক কার্যক্রম পরিচালনা করছে যার মাধ্যমে মানুষ সহজে খাদ্যপণ্য কিনতে পারে। যা সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু মানুষের কল্যাণেই এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। করোনাভাইরাসের কারণে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে ডিলারদের ভালোভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ক্রেতাদের ৩ ফুট দূরে দূরে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজনে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ইতোমধ্যে জেলা পর্যায়ে ডিসিরা ফোর্স পাঠিয়ে নির্দিষ্ট দূরত্বে বৃত্ত এঁকে দিয়েছেন। ঢাকাতেও মাঝে-মধ্যে দেখলাম আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্দিষ্ট দূরত্ব রেখে ক্রেতাদের লাইনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা জনগণের সুবিধার জন্য কাজ করছি। অন্তত মানুষ যেন না খেয়ে মারা না যায়। সেজন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ব্যাপারটা সবাইকে বুঝতে হবে। আমাদের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক নির্দেশনা দেওয়া আছে। এরপরও যদি ক্রেতারা না মানেন তাহলে তাৎক্ষণিক সে স্থানে বিক্রি বন্ধের কথাও বলা হয়েছে।’

এ ব্যাপারে পুলিশের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) মো. সোহেল রানা বলেন, পুলিশ সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং জনগণের ঘরে অবস্থানের বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য কাজ করছে। জনগণের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখার জন্য যেকোনো জরুরি প্রয়োজন ব্যতীত এককভাবে বা দলবদ্ধভাবে বাইরে ঘোরাফেরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। টিসিবি পণ্য বিক্রির সময় পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত থেকে করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকারি নির্দেশ এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কাজে সহযোগিতা করছে ক্রেতাদের।

এ সম্পর্কে প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘কোভিড-১৯ প্রতিরোধের যে কয়েকটি ধাপ রয়েছে, তার অন্যতম সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা। এক গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখলে ৬০ ভাগেরও বেশি রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। করোনা একজন মানুষ থেকে অন্য মানুষে ৩ থেকে ৬ ফুট পর্যন্ত দূরত্বে ছড়াতে পারে। তাই নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা জরুরি।’

লেলিন চৌধুরী আরো বলেন, ‘বাজারে যেভাবে ভিড়ের কারণে সামাজিক দূরত্ব লঙ্ঘিত হয়, তাতে যেকোনো সময় বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটে যেতে পারে। শুধু বাজার নয়, যেকোনো জনসমাগমস্থলে বিপর্যয় ঘটতে পারে। তাই আমাদের নিরাপদ সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা উচিত।’

টিসিবির পণ্য কিনতে এসেছেন ফারজানা আলম। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা এ ক্রেতা বলেন, ‘ছেলে-মেয়ের বাবা চট্টগ্রাম থেকে আসতে পারছেন না। তাই বাধ্য হয়ে আমি আসলাম। বাসায়-টাকা পয়সাও তেমন নেই। তাই এখান থেকে কম দামে পণ্য কিনতে এসেছি। হাতে সময়ও কম। সবই বুঝি। বাচ্চা বাসায় রেখে আসার কারণে তাড়াহুড়ো করছি। আমার মতো অনেকেই তাড়াহুড়ো করছেন। তাই বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হচ্ছে। এ কারণেই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না।’

শাহ আলম নামে এক ক্রেতা বলেন, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সবারই নিয়ম-নীতি মেনে চলা উচিত। দীর্ঘ লাইনের পেছনে থাকলে মাল পাবেন না, এ আশঙ্কা থেকেই অনেকে সামনে এগিয়ে যেতে চান। এতে যেমন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, পাশাপাশি সামাজিক দূরত্বও বজায় থাকে না। তবে নিজেদের জন্য হলেও সবাইকে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা উচিত।   

আসিফ উদ্দিন নামে এক ডিলার বলেন, আমরা ক্রেতাদের বার বার সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়াতে অনুরোধ করি। এজন্য লোকও নিয়োগ দিয়েছি। তারপরও তারা মানছেন না। সেনাবাহিনী, পুলিশও তাদের সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়াতে অনুরোধ করলেও তারা শুনছেন না। সবাইকে তো বিপদের কথা মনে রাখতে হবে।’



ঢাকা/মামুন/রফিক