ঢাকা, সোমবার, ৪ ভাদ্র ১৪২৬, ১৯ আগস্ট ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

রোহিঙ্গা পুনর্বাসনে প্রশংসা, জাতীয় নির্বাচন আয়োজনে সফলতা

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৮-১২-২৭ ১০:২১:১০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-১২-২৮ ৯:১৯:২৫ এএম
রোহিঙ্গা পুনর্বাসনে প্রশংসা, জাতীয় নির্বাচন আয়োজনে সফলতা
Walton E-plaza

হাসান মাহামুদ : গত বছরের আগস্ট থেকে বাংলাদেশে স্রোতের মতো প্রবেশ করে মিয়ানমারে নিপীড়িত জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গা। ১০ লাখের বেশি এ জনগোষ্ঠীকে শেখ হাসিনার সরকার পরম আন্তরিকতায় জায়গা দিয়েছে। তাদের পুনর্বাসন করেছে। বিষয়টি এরই মধ্যে বিশ্বে অন্যতম ইতিবাচক দিক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

এসব ভাগ্যাহত জনগোষ্ঠেীকে শুধু আশ্রয় দিয়েই বাংলাদেশ দায়িত্ব শেষ করেনি। এসব ঘরছাড়া মানুষকে আবার প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে নিরাপদে মিয়ানমারে পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। নভেম্বরের মাঝামাঝি প্রত্যাবাসন কাজ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা স্থগিত করা হয় প্রক্রিয়াগত কিছু বিষয়ের কারণে। চলতি বছরের শেষে একাদশ সাধারণ নির্বাচনের পর প্রত্যাবাসন বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বছরের শেষ দিকে (৩০ ডিসেম্বর) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দশম সংসদ নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ থাকলেও এই নির্বাচনে দেশের সব রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি বিবেচনায় একে বছরের অন্যতম সাফল্য বলে বিবেচনা করছেন রাজনীতিবিদরা।

এর বাইরেও চলতি বছরে দেশের অনেক সাফল্য রয়েছে। বিশেষ করে রাজস্ব আহরণ, বড় আকারের বাজেট ঘোষণা, প্রবৃদ্ধি অর্জনে রেকর্ড সৃষ্টি, খাদ্য ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে সাফল্যসহ বেশকিছু বিষয়ে দেশ সফল হয়েছে। বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে বাংলাদেশের উন্নতি, বিশ্ব ব্র্যান্ড ভ্যালু র‌্যাঙ্কিংয়ে কয়েক ধাপ এগুনো, মানব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি, দেশের অঞ্চলভিত্তিক দারিদ্র্য দূরের উদ্যোগ প্রভৃতিও এই বছরের বিশেষ বিশেষ অর্জন।

দুয়ারে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন :
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদের মেয়াদ পূর্ণ হবার পর বা সংসদ ভেঙে দেওয়ার পর ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচনের আয়োজন করতে হয়। বর্তমান সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে ২০১৪ সালের ২৯ জানুয়ারি। তাই সংবিধানের ১২৩/২(ক) ধারা অনুযায়ী চলতি বছরের ৩১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৮ এর মধ্যে নির্বাচনের আয়োজন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সে হিসেবেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে সরকার।

১০ বছর পর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক রাজনৈতিক দল ও প্রার্থী অংশ নেওয়ায় অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এবার নিবন্ধিত সব (৩৯টি) রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এক হাজার ৮০০-এর বেশি প্রার্থী। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রার্থী প্রায় এক হাজার ৭৫০ জন। বাকিরা স্বতন্ত্র প্রার্থী। এবার সব দল অংশ নেওয়ায় সারা দেশে নির্বাচনী আবহ বিরাজ করছে।

নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে জানা গেছে, এবার ৩০০ আসনে ভোটার ১০ কোটি ৪২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৭৩। এ নির্বাচনে নতুন প্রায় এক কোটি ২৩ লাখ ভোটার প্রথমবার জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেবেন। সারা দেশে ৪০ হাজার ১৮৩ ভোটকেন্দ্র ও দুই লাখ ৬ হাজার ৪৭৭টি ভোটকক্ষ রয়েছে। এবারই প্রথম ছয়টি আসনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করা হবে। ঢাকা-৫, ঢাকা-১৩, চট্টগ্রাম-৯, রংপুর-৩, খুলনা-২ এবং সাতক্ষীরা-২ আসনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে।

ভোটগ্রহণ কাজে নিয়োজিত থাকবেন প্রায় সাত লাখ কর্মকর্তা। আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মাঠে থাকবেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ছয় লাখের বেশি সদস্য। এরই মধ্যে সেনা ও নৌবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশসহ (বিজিবি) অন্য বাহিনীর সদস্যরা মাঠে নেমেছেন। এ ছাড়া সারা দেশের আইনশৃঙ্খলা মনিটরিংয়ে আগামীকাল শুক্রবার ইসিতে আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় ও মনিটরিং কমিটি কার্যক্রম শুরু করবে।

রোহিঙ্গা পুনর্বাসন এবং প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের সফলতা :
মিয়ানমারের রাখাইন সংকটের জের ধরে গত বছরের ২৫ আগস্ট থেকে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তবর্তী কক্সবাজার জেলার সীমান্ত সংলগ্ন বিভিন্ন উপজেলা রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে সয়লাব হয়ে যেতে থাকে। এই বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন বাংলাদেশের জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার এতে সফল হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনে বিভিন্ন রকমের কর্মসূচীর পাশাপাশি ২ হাজার ৩১২ কোটি টাকার আশ্রয়ণ-৩ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। নৌবাহিনী এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনেও মিয়ানমারের সাথে কয়েক দফা আলোচনার পরে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়।বিষয়টিকে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশে আশ্রয় নে্ওয়া রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত ৩০ দফা ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট নামে চুক্তি সই হয় বছরের প্রথমদিকে। মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোতে দু’দেশের পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রথম বৈঠকের পর এ চুক্তি সই হয়।

চুক্তি অনুযায়ী, মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আগামী দুই বছরের মধ্যে ফেরত নেওয়া শেষ হবে। প্রতিদিন ৩০০ রোহিঙ্গাকে ফেরত নেবে মিয়ানমার। তবে চুক্তিতে বলা হয়েছে তিন মাস পর এ সংখ্যা পর্যালোচনা করে বাড়ানো হবে।

প্রত্যাবাসন শুরুর কথা ছিল ফেব্রুয়ারিতে। কিন্তু মিয়ানমারের কারণে কয়েকদফা তারিখ পরিবর্তন হয়ে চলতি বছরের নভেম্বরের ১৫ তারিখ থেকে প্রত্যাবাসন শুরুর বিষয় চূড়ান্ত হয়। পরবর্তীতে তা স্থগিত হয় রোহিঙ্গাদের কিছু আপত্তির কারণে। জাতীয় নির্বাচনের পর সেসব বিষয়ে সমাধান করে প্রত্যাবাসন কাজ শুরু হবে। 

দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ শুরু :
কক্সবাজার জেলার মহেশখালীর মাতারবাড়ি এলাকায় দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে এই বছরের মে মাসের প্রথম সপ্তাহে। কার্যক্রমের অংশ হিসেবে মের প্রথম সপ্তাহে সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ চূড়ান্ত করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। তবে মূল বন্দর নির্মাণে ফিজিক্যাল ওয়ার্ক শুরু হতে ২০২০ সাল পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। এছাড়া ২০২২ সালের মাঝামাঝিতে একটি টার্মিনাল এবং ২০২৩ সালের শেষে একটি মাল্টিপারপাস টার্মিনাল নির্মাণ কাজ শেষ হবে।

ভারতে বিদ্যুৎকেন্দ্র করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ :
দেশে বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে গত কয়েক বছরে বেশকিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র নির্মাণসহ বিভিন্ন পদক্ষেন নিয়েছে। এর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হচ্ছে, ভারতে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কার্যক্রম শুরু করা।

বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ কোম্পানির (বিআইএফসিএল) মাধ্যমে এ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এতে কয়লা অথবা সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ জন্য দুই দেশের প্রতিনিধির সমন্বয়ে একটি কমিটির করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিদেশে নিজস্ব জমিতে নির্মিত হচ্ছে বাংলাদেশের দূতাবাস :
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিজস্ব জায়গায় বাংলাদেশ দূতাবাস ভবন নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলেছে পুরোদমে। এর মধ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নির্মাণ কাজ চলছে সৌদি আরব, পাকিস্তান, তুরস্ক, মালয়েশিয়া ও ভুটান এই পাঁচটি দেশে। একে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অন্যতম সফলতা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বিদেশে নিজস্ব জমিতে বাংলাদেশের দূতাবাস নির্মানের জন্য চলতি অর্থবছরে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে মন্ত্রণালয়। এরপরই এ কাজে গতি আসে।

২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভুটান সফরে গেলে দেশটি বাংলাদেশকে ১৫ বিঘা জমি দূতাবাস নির্মাণে উপহার হিসেবে দেয়। সেখানে নির্মাণ করা হচ্ছে বাংলাদেশ দূতাবাসের নিজস্ব ভবন। সৌদি আরবের রিয়াদে ৭ হাজার ৯৫০ বর্গমিটার ও পাকিস্তানের ইসলামাবাদে ২৫ হাজার বর্গমিটার জমি পারস্পরিক বিনিময়ের ভিত্তিতে পাওয়া গেছে। এরই মধ্যে সৌদি আরবের রিয়াদে দূতাবাস ভবনের নির্মাণ কাজ পুরোদমে চলছে। প্রায় ৪ হাজার বর্গমিটার এলাকা নিয়ে নির্মিত হচ্ছে এ ভবন।

পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদেও বাংলাদেশ হাইকমিশনের ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। বিশাল এলাকাজুড়ে দ্বিতল এ চ্যান্সেরি ভবন হবে। এখানে হাইকমিশনার ছাড়াও সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ কর্মীদের আবাসনের ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়া তুরস্কের আঙ্কারায় বাংলাদেশ দূতাবাসের ভবন নির্মাণে ইতোমধ্যে পরামর্শক নিয়োগ করা হয়েছে। মালয়েশিয়ার পুত্রাজায়ায় ভবন নির্মাণও প্রক্রিয়াধীন। হিমালয়ের দেশ নেপালের কাঠমান্ডুতেও ১৩ কোটি টাকায় দূতাবাস ভবন নির্মাণের জমি কেনা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের মে মাসে জাপানের রাজধানী টোকিওতে বাংলাদেশ দূতাবাসের অত্যাধুনিক নকশার নতুন চ্যান্সেরি ভবনের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ৭১৪ বর্গফুট জায়গায় অত্যাধুনিক নকশায় চারতলা চ্যান্সেরি ভবনটি নির্মাণ করেছে জাপানেরই নির্মাণ সংস্থা মোরামোতো করপোরেশন। টোকিওতে দূতাবাস ভবন নির্মাণে সব মিলিয়ে মোট ৮৮ কোটি টাকা খরচ হয়। পরিকল্পনামাফিক কাজ সম্পন্ন হলে ২০১৯ সাল নাগাদ বিশ্বের ৬টি দেশে বাংলাদেশের নিজস্ব জমিতে চালু হবে স্থায়ী দূতাবাস।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৭ ডিসেম্বর ২০১৮/হাসান/এনএ

Walton AC
ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন
       

Walton AC
Marcel Fridge