ঢাকা, শনিবার, ৫ আশ্বিন ১৪২৬, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

বছর শেষে শান্তির ইঙ্গিত

শাহেদ হোসেন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৮-১২-২৯ ১২:২৬:০০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-১২-২৯ ৮:৪২:৫৩ পিএম
বছর শেষে শান্তির ইঙ্গিত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যে বিগত বছরের যুদ্ধের রেশ, যুক্তরাষ্ট্র-উত্তর কোরিয়ার হুমকি-পাল্টা হুমকি, অভিবাসী সংকটসহ হাজারো সমস্যা নিয়ে শুরু হয়েছিল ২০১৮ সাল। আর কয়েকদিন পরেই শুরু হতে যাচ্ছে নতুন আরেকটি বছর।

চলতি বছরের প্রথম দিকে বিশ্ব রাজনীতির অঙ্গনে উত্তেজনা-শঙ্কা থাকলেও বছরের মাঝামাঝিতে কমতে শুরু করে অস্থিরতা। চলতি বছরের আলোচিত ঘটনার মধ্যে ছিল ট্রাম্প-উন বৈঠক, ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা থেকে উত্তর কোরিয়ার সরে আসা, সিরিয়া থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে রাশিয়ার টানাপোড়েন, ওয়াশিংটন-বেইজিংয়ের বাণিজ্যযুদ্ধ, ইরান চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার, রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি, সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডে সৌদি যুবরাজের সংশ্লিষ্টতা, ৯২ বছর বয়সে মাহাথির মোহাম্মদের প্রধানমন্ত্রী হওয়া।

এছাড়া  শ্রীলংকার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে টানপোড়েন দেখা দিলেও বছরের শেষ দিকে সমঝোতার সুর বেজে উঠেছে। কয়েক বছরের গৃহযুদ্ধ অবসানের ইঙ্গিত দিয়ে শান্তির বাতাস বইতে শুরু করেছে ইয়েমেনে।

ভালো খবরের পাশাপাশি খারাপ খবরের সংখ্যাও কম ছিল না। চলতি বছর ব্রেক্সিট নিয়ে সবচেয়ে বেশি  ভুগেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে। নিজের দলের এমপি-মন্ত্রীদের বিদ্রোহের মুখে পড়তে হয়েছে তাকে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝাপটা সবচেয়ে বেশি সইতে হয়েছে ইন্দোনেশিয়াকে। এছাড়া বছরজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক হামলার খবর, ইয়েমেনে অনাহারী শিশুদের ছবি বিমর্ষ করেছে সবাইকে।

‘লিটল রকেট ম্যান’ আর বুড়ো ভামের বৈঠক : চলতি বছরের প্রথম দিকেই উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে বরফ গলার ইঙ্গিত মিলছিল। শেষ পর্যন্ত এপ্রিলে উত্তরের শীর্ষ নেতা উন আর দক্ষিণের প্রেসিডেন্ট মুন জায়ের সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে ৬৮ বছরের বরফ গললো। এর রেশ ধরেই ১২ জুন সিঙ্গাপুরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের প্রথম বৈঠক হয়। বৈঠকের পর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়া তাদের প্রধান পারমাণবিক পরীক্ষা কেন্দ্রের টানেল ধ্বংস করাসহ একটি রকেট উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ধ্বংস ও মার্কিন সেনাদের দেহাবশেষ ফেরত দেয়। আগামী বছরের শুরুতে আবারও ট্রাম্প-উনের বৈঠক হতে যাচ্ছে এরই সূত্র ধরে।

জামাল খাশোগি সৌদি যুবরাজ : ২ অক্টোবর তুরস্কের সৌদি কনস্যুলেটে সৌদি রাজপরিবারের কট্টোর সমালোচক সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের দিকে অভিযোগের তীর ওঠে। এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে তুরস্ক-সৌদি কূটনীতিক সম্পর্কে টানপোড়েন দেখা দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে মঞ্চে হাজির হন বাদশাহ সালমান। তারই হস্তক্ষেপে খাশোগি হত্যায় সৌদি কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি স্বীকার করে নেওয়া হয় এবং জড়িতদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তবে যুবরাজকে যথারীতি নির্দোষই দাবি করা হয়। যুবরাজের ক্ষমতাকে আরো সংহত করতে মন্ত্রিসভাতেও রদবদল আনেন বাদশাহ।

মাহাথির ভেলকি : ৯২ বছর বয়সের মাহাথির মোহাম্মদ চলতি বছর নিজের দেশে আর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একের পর এক চমক দেখিয়েছেন। এই বয়সে নির্বাচন করাটা ছিল তার প্রথম চমক। এরপর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে সবচেয়ে বড় চমকটিই দেখান তিনি। শুধু তাই নয় সবাইকে অবাক করে দিয়ে এক সময়ের শিষ্য পরে শত্রু বনে যাওয়া আনোয়ার ইব্রাহিমকে নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বলে ঘোষণা করেছেন মাহাথির।  এছাড়া ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত  প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক ও তার স্ত্রীকে দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন মাহাথির।

ইরান চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিদায় : ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ইরান নিয়ে সরগরম ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওবামা আমলে ছয় জাতির সঙ্গে ইরানের স্বাক্ষরিত পরমাণু চুক্তিকে ‘বাজে চুক্তি’ আখ্যা দিয়ে সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে মে মাসে প্রত্যাহার করে নেন ট্রাম্প। শুধু তাই নয় এর পরের মাসেই মিত্রদের অনুরোধ অগ্রাহ্য করে তিনি তেহরানের ওপর পুরনো সব নিষেধাজ্ঞা বহাল করেন। অবশ্য ট্রাম্পের ইউরোপীয় মিত্ররা ইরানকে ছেড়ে যায়নি। এ সুযোগে ইরানও যুক্তরাষ্ট্রকে পাল্টা ধমকি দিতে ছাড় দিচ্ছে না।

চাপের মুখে মিয়ানমার : আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সারাবছরই রোহিঙ্গা সংকট প্রাধান্য পেয়েছে । ফেব্রুয়ারিতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স রোহিঙ্গাদের গণহত্যা ও তাদের ওপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বর্বর নির্যাতনের বিষয়টি প্রথম প্রমাণসহ হাজির করে। মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি রোহিঙ্গা ইস্যুতে তার নীরব ভূমিকা ও সেনাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। রোহিঙ্গা ইস্যুতেই কয়েকটি দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা সুচিকে  দেওয়া তাদের পদক ও সম্মাননা ফিরিয়ে নেয়। যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি দেশ মিয়ানমারের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

দুই দেশের বাণিজ্যযুদ্ধ : এ বছর শুল্ক নিয়ে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুই অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। মে মাসে হোয়াইট হাউস থেকে হাজারের বেশি চীনা পণ্যে ২৫ শতাংশ শুল্কারোপের ঘোষণা দেয়া হয়। এরপর একইভাবে পাল্টা পদক্ষেপ নেয় চীন। জুলাইয়ে চীনা পণ্যের আমদানিতে ২৫ শতাংশ শুল্কারোপ কার্যকর করে যুক্তরাষ্ট্র। ৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের চীনা পণ্যের ওপর এ শুল্ক কার্যকর হয়। এর জবাবে ৫৪৫টি মার্কিন পণ্যের ওপর সমহারে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে চীন।  এরপর আগস্টে ও সেপ্টেম্বরে পাল্টাপাল্টি শুল্কারোপ করে দুই দেশ। শেষ পর্যন্ত ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে জি-২০ সম্মেলনের সময় ট্রাম্প-শি জিনপিংয়ের বৈঠকে বাণিজ্য যুদ্ধে তিন মাসের বিরতির ঘোষণা দেওয়া হয়।

শ্রীলংকায় রাজনৈতিক অস্থিরতা : বছরের শেষ প্রান্তিকে বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয় শ্রীলঙ্কায়। ক্ষমতা নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরে প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা তার প্রধানমন্ত্রী বিক্রমাসিংহকে বরখাস্ত করেন। বিরোধী দলীয় নেতা রাজাপাকসেকে ওই পদে নিয়োগ দেন প্রেসিডেন্ট। পার্লামেন্টের বিরোধিতা ঠেকাতে নতুন জাতীয় নির্বাচনের তারিখও ঘোষণা করেন তিনি। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত আদালত পর্যন্ত গড়ায় এবং সুপ্রিম কোর্ট সিরিসেনার সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেয়। শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করেন রাজাপাকসে। ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে পুনঃনিয়োগ দেওয়া হয় বিক্রমাসিংহকে।

ব্রেক্সিট নিয়ে থেরেসার ভোগান্তি : ব্রেক্সিট নিয়ে বিরোধীদের পাশাপাশি নিজ দলেও বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়েছে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মেকে।  ব্রেক্সিট চুক্তি নিয়ে অসন্তোষের জের ধরে মন্ত্রিসভার কয়েকজন বাঘা বাঘা মন্ত্রীও পদত্যাগ করেছেন। এমনকি শেষ পর্যন্ত দলের নেতৃত্ব নিয়ে আস্থা ভোটের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন মে।  শেষ পর্যন্ত অবশ্য আস্থা ভোটে উৎরে যেতে পেরেছেন মে। তবে আগামী বছল কার্যকর হতে যাওয়া ব্রেক্সিট  চুক্তির মাধ্যমে নাকি চুক্তি ছাড়া সম্পন্ন হবে তা এখনও স্পষ্ট হয়নি। এই পরিস্থিতিতে ব্রেক্সিট নিয়ে নতুন গণভোটের দাবিও শক্তিশালী হচ্ছে।

সিরিয়া থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার : সাত বছর ধরে গৃহযুদ্ধ সামাল দিতে হচ্ছে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে।  ইতোমধ্যে আসাদ সিরিয়ার ৭০ শতাংশ অঞ্চলে তার দখল প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই সাত বছরে বিদ্রোহীদের অস্ত্র-অর্থ-প্রশিক্ষণ দিয়ে সহযোগিত করে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর জন্য সেখানে কয়েক হাজার মার্কিন সেনাও মোতায়েন রয়েছে। তবে আসাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কোনো সফলতাই অর্জন করতে পারেনি। সিরিয়া যুদ্ধ লাভজনক হবে না ভেবেই শেষ পর্যন্ত গত সপ্তাহে সিরিয়া থেকে দুই হাজার সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট  ডোনাল্ড ট্রাম্প।

শান্তির সুর ইয়েমেনে : ইয়েমেনে প্রায় চার বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধের কারণে ক্ষুধা ও দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে দেশটির জনগণ। ২০১৫ সালের মার্চে হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সৌদি জোটের সামরিক অভিযান শুরু করার পর এ পর্যন্ত দেশটিতে বহু শিশুসহ কয়েক লাখ মানুষ নিহত হয়েছে। সংঘাত বন্ধে দুই পক্ষের মধ্যে শান্তি আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছিল জাতিসংঘ। শেষ পর্যন্ত চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে সুইডেনে জাতিসংঘ প্রস্তাবিত শান্তি আলোচনা শুরু হয়। দু’পক্ষ শেষ পর্যন্ত বন্দিবিনিময় চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে।  দুই বছরের চেষ্টায় দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে বসানো এবং চুক্তিতে রাজী করানোকে যুদ্ধ বন্ধ করার পথে অন্যতম প্রধান সফলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৯ ডিসেম্বর ২০১৮/শাহেদ/এনএ

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন