ঢাকা     শুক্রবার   ০৭ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২৩ ১৪২৭ ||  ১৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

বাংলাদেশ ক্রিকেটের হতাশা ও দুঃস্বপ্নের বছর

|| রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৫:৫১, ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯  

হার, হার আর হার! হারের বৃত্তে যেন ২০১৯ সালে ঘুরপাক খেয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেট। পরাজয়ের একেকটি গল্প বছর শেষে রূপ নিয়েছে ব্যর্থতার মহাকাব্যে। সাফল্যে এসেছে কালেভদ্রে। সেগুলো চাপা পড়েছে ব্যর্থতার ভারে। হতাশা ও দুঃস্বপ্নের মতো কেটেছে দশকের শেষ বছর। অপ্রাপ্তির বছরে কষ্ট বাড়িয়েছে মাঠের বাইরের ইস্যু। বিতর্কিত হয়েছে দেশের ক্রিকেটাঙ্গন।সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট মনে রাখতে চাইবে না ২০১৯ সাল।

ঘটনাবহুল বছরের বিভিন্ন স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে রাইজিংবিডি’র ক্রীড়া বিভাগ। পাওয়া না-পাওয়ার হিসাব-নিকাশ তুলে ধরেছেন ক্রীড়া বিভাগের জ্যৈষ্ঠ প্রতিবেদক ইয়াসিন হাসান।

শুধু দেশের ক্রিকেট নয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি হজম করে এ বছর। ক্রিকেটের নক্ষত্রের পতনে বিশ্ব কাঁপবে, এমনটাই স্বাভাবিক। ধ্রুবতারা সাকিব আল হাসান অভিযুক্ত ফিক্সিংয়ের অভিযোগে! ৩০ অক্টোবর আইসিসি জানায়, তিনবার জুয়ারির থেকে ম্যাচ পাতানোর প্রস্তাব পান সাকিব। কিন্তু একবারও আইসিসির দুর্নীতি দমন বিভাগকে জানাননি। জানাননি বিসিবিকেও।

২০১৮ সালে চার মাসের মধ্যে তিনবার জুয়ারির থেকে ম্যাচ পাতানোর প্রস্তাব পান বাংলাদেশের টেস্ট অধিনায়ক। জুয়ারির সঙ্গে কথোপকথন গোপন করায় এক বছরের স্থগিত নিষেধাজ্ঞাসহ দুই বছরের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয় বিশ্বের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডারকে। আইসিসির জেরায় সাকিব স্বীকার করেছেন অনেককিছু! কিন্তু সব আইসিসি প্রকাশ করেনি। ভাবনার বিষয় ছিল আরও, সাকিব জুয়ারির সঙ্গে তার কথোপকথোন মুছে দেন মুঠোফোন থেকে এবং দেশের বাইরে জুয়ারির সঙ্গে দেখাও করতে চেয়েছিলেন!

সাকিবের নিষেধাজ্ঞা উঠবে ২০২০ সালের ২৯ অক্টোবর। অথচ সাকিবকে এমনটা দেখতে হতো কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন। হয়তো বছর শেষে সাকিব পেতেন অমরত্বের স্বীকৃতি! ৮ ম্যাচে ২ সেঞ্চুরি ও ৫ হাফ সেঞ্চুরিতে ৬০৬ রান করে বিশ্বকাপের তৃতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক সাকিব। বল হাতেও নেন ১১ উইকেট। সব মিলিয়ে অলরাউন্ড পারফরম্যান্সে বিশ্বকাপ ইতিহাসেই অন্যতম সেরা হিসেবে নাম লিখিয়েছেন। অথচ ১০ দলের বিশ্বকাপে বাংলাদেশ শেষ করে অষ্টম স্থানে থেকে। সেখানে সাকিবের এমন পারফরম্যান্স আয়োজকদের টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কারের জন্যও তাকে বিবেচনায় এনেছিল। 

সাকিব বিশ্বকাপ রঙিন করলেও পারেনি বাংলাদেশ। দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু করলেও বাংলাদেশ এরপর হারাতে পারে শুধু ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও আফগানিস্তানকে। অথচ বাংলাদেশ যে অভিজ্ঞ দল নিয়ে বিশ্বকাপে গিয়ে তাতে সেমিফাইনালের আলোচনা হচ্ছিল সর্বত্র। কিন্তু মাশরাফির দল হতাশ করে সবাইকে।

বিশ্বকাপের আগে-পারেও রঙিন পোশাকে সাফল্য নেই বাংলাদেশের। বছর শুরু হয়েছিল নিউজিল্যান্ডের মাটিতে তিন ওয়ানডে হেরে। বিশ্বকাপের আগে অবশ্য ত্রিদেশীয় সিরিজের শিরোপা জেতে মাশরাফির দল। অরাধ্য শিরোপা ঘরে তুললেও পরের দিকে ব্যাকফুটে যেতে থাকে লাল-সবুজের জার্সিধারীরা। 

বিশ্বকাপের পর সাকিবের অনুপস্থিতি ও মাশরাফির চোটে তামিম ইকবাল দল নিয়ে গিয়েছিলেন শ্রীলঙ্কায়। লাসিথ মালিঙ্গার বিদায়ী ওয়ানডে সিরিজে বাংলাদেশ হয়েছে হোয়াইটওয়াশ। তবুও বছর শেষে ভারতের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি জয় প্রাপ্তির খাতায় দাগ কাটে। কিন্তু ওই এক অর্জনও হতাশায় পরিণত হয় সিরিজ হাতছাড়ায়। হাতের মুঠোয় থাকা সিরিজ হেরে বাংলাদেশ রঙিন পোশাকের মিশণ শেষ করে।

টেস্ট ক্রিকেটের ব্যর্থতার কথা এক বাক্যে শেষ করা যাবে। গত ৭ বছরে এই প্রথমবার বছরের সব টেস্টে হেরেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ এ বছর পাঁচ টেস্টের একটিও ড্র করতে পারেনি। হেরেছে সবকটিতে। ইনিংস ব্যবধানে হেরেছে চারটিতে। আর দেশের মাটিতে হেরেছে আফগানিস্তানের বিপক্ষে।

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বছরের শুরুতে দুই টেস্টে ইনিংস ব্যবধানে হার। তৃতীয় টেস্ট হওয়ার কথা ছিল ক্রাইস্টচার্চে। কিন্তু ম্যাচ শুরুর আগের দিন ক্রিকেটাররা বেঁচে যান অল্পের জন্য। ক্রাইস্টচার্চের একটি মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করতে যাচ্ছিল বাংলাদেশ দলের বেশ কয়েকজন। বাংলাদেশ দল পৌঁছার আগে মসজিদে ঢুকে এক ব্যক্তি প্রায় ২০ মিনিট এলোপাথারি গুলি চালায়। পরিস্থিতি বুঝে সেখান থেকে সরে যান ক্রিকেটাররা। বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ডের টেস্ট বাতিল হয় এবং ঘটনার পরদিনই বাংলাদেশ দলকে ফিরিয়ে আনা হয়।

নিউজিল্যান্ডের পর ঘরের মাঠে আফগানিস্তানকে আতিথেয়তা দিয়ে বাংলাদেশ ম্যাচ হারে বিশাল ব্যবধানে। টেস্ট ক্রিকেটে যা বাংলাদেশের অন্যতম বড় পরাজয় বলে মনে করেন ক্রিকেট সংশ্লিষ্টরা। এরপর ভারত সফরে বাংলাদেশের অসহায় আত্মসম্পর্ণ। ভারতের পেসারদের সামলানোর কোনো উত্তর জানা ছিল না বাংলাদেশের। ব্যাটসম্যানদের বিরুদ্ধে ভালো বোলিংয়ের সামর্থ্য ছিল না। সব মিলিয়ে টেস্ট ক্রিকেটে এ বছর বাংলাদেশের পারফরম্যান্স ছিল ইউ টার্ন! এমন দুঃস্বপ্নের সময়ে বাংলাদেশ খেলেছে গোলাপি বলের টেস্টও। 

মাঠের পারফরম্যান্সে রদবদল এসেছে টিম ম্যানেজমেন্টে। ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ ব্যর্থতার পর কোচ স্টিভ রোডসকে ছাঁটাই করে বিসিবি। পেস বোলিং কোচ কোর্টনি ওয়ালশের চুক্তিও আর বাড়ায়নি। নতুন করে বিসিবি যুক্ত করে দক্ষিণ আফ্রিকার রাসেল ডমিঙ্গো, শার্ল ল্যাঙ্গাভেল্ট ও নিউজিল্যান্ডের ড্যানিয়েল ভেট্টরিকে।পেস বোলিং কোচ হয়ে আসা ল্যাঙ্গাভেল্ট অবশ্য দেশের ডাকে ছেড়েছেন বাংলাদেশের চাকরি।স্পিন বোলিং কোচ ভেট্টরি বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করবেন বছরে একশ দিন।

আরেকটি নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর অপেক্ষায় সবাই। ব্যর্থতা ঝেরে নতুন করে শুরুর অপেক্ষা। ২০১৯ সাল ছিল ব্যর্থতায় মোড়ানো ও দুঃস্মৃতি বহন করা। নতুন বছরে বাংলাদেশের নতুন রণকৌশল বাংলাদেশকে পাল্টে দেবে এমনটাই প্রত্যাশা কোটি কোটি ক্রিকেটভক্তের।


ঢাকা/ইয়াসিন/পরাগ

রাইজিংবিডি.কম

সম্পর্কিত বিষয়:

আরো পড়ুন  

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়