ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ চৈত্র ১৪২৬, ০৭ এপ্রিল ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

পূজায় মন্দিরে বেড়ানো

তাপস রায় : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৬-১০-০৮ ৫:৪৫:৫০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৯-১৮ ২:৩৭:০৯ পিএম

তাপস রায় : শুভ মহালয়া থেকেই দুর্গাপূজার দিন গণনা শুরু। ষষ্ঠীতে বোধন, সপ্তমীতে নবপত্রিকা প্রবেশ, অষ্টমীতে কুমারী পূজা, নবমীতে হোমযজ্ঞ এবং দশমী তিথিতে বিসর্জন। পাঁচদিন শুধু আনন্দ আর আনন্দ। এই আনন্দ মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে প্রতিমা দেখার মধ্য দিয়েই পূর্ণতা পায়। যে কোনো শহরে ঘুরে ঘুরে পূজা দেখতে চাইলে চুক্তিভিত্তিক রিকশা অথবা অটোরিকশা ভাড়া করে নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। বন্ধুরা হুল্লোড় করে এক অটোতে ঘুরে ঘুরে নিমকি, গজা মুখে পুরে পুরে পূজা দেখার আনন্দের তুলনা হয় না। এ দিন না হয় ঘরে ফিরতে রাত দুপুর হলো তাতে মহাভারত অশুদ্ধ হবে না।

 

রাজধানীতে অবশ্য একদিনে সব মণ্ডপ দেখা সম্ভব নয়। এ জন্য আগে থেকেই পরিকল্পনা করে নিতে হবে। উত্তরা, গুলশান, ফার্মগেট, ধানমন্ডি, মিরপুর একদিন হলে, পরদিন জগন্নাথ হল, ঢাকেশ্বরী মন্দির, রামকৃষ্ণ মিশন হয়ে পুরান ঢাকা- ব্যাস কোর্স কমপ্লিট। পুরান ঢাকাতেই মিলবে পূজার সত্যিকারের আমেজ। ছোট্ট গলিপথের ওপর মঞ্চ বানিয়ে বিভিন্ন নকশার প্রতিমা রাতের আলোক সজ্জায় অনিন্দ্য সৌন্দর্যের মূর্ত প্রতীক হয়ে ওঠে।

 

রাজধানীর পাশে কোথাও পূজা দেখতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ চমৎকার জায়গা। অবশ্য এবারে পূজায় দেশের বিখ্যাত কোনো মন্দিরে যাওয়ার প্ল্যানও আপনি করতে পারেন। এতে রথ দেখা এবং কলা বেচা দুটোই হবে। অর্থাৎ পরিবার নিয়ে ট্যুরও হলো, পূজা দেখাও হলো। সুতরাং তালিকায় রাখুন বিখ্যাত কিছু মন্দিরের নাম।

 

শ্রী শ্রী চণ্ডী তীর্থ। চট্টগ্রাম শহর থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরত্বে বোয়ালখালীতে এর অবস্থান। ঐতিহাসিক মতে ব্রহ্মবৈবর্ত পূরাণে মেধস মুনির যে আশ্রমের কথা রয়েছে এটিই সেই আশ্রম। মর্ত্যলোকে এখানেই হয়েছিল দেবী দুর্গার প্রথম পূজা। আরেকটি ঐতিহাসিকভাবে বিখ্যাত জায়গা রাজশাহীর তাহেরপুর। অবিভক্ত বাংলায় সর্বপ্রথম শারদীয় দুর্গোৎসবের সূচনা করেছিলেন রাজা কংস নারায়ণ এই তাহেরপুরে। পরিবার সমেত মায়ের প্রতিমা গড়ে পূজা করার এই রীতির সূচনা তখন থেকেই। এটি ষোড়শ শতাব্দির শেষের দিকের ঘটনা। যদিও সেই মন্দিরটি এখন আর নেই। তবুও দেখে আসতে পারেন সেই পূণ্যভূমি।

 

আদিনাথ মন্দির

 

মা ভবানীর মন্দির উপমহাদেশের অন্যতম শক্তিপীঠ। পূরাণ মতে বগুড়ার ভবানীপুরে সতী মাতার ৫১টি দেহ খণ্ডের মধ্যে থেকে বাম পাঁজর মতান্তরে বাম পায়ের নুপূর এসে পড়েছিল। এই মন্দিরে এখনও দুর্গাপূজা হয়। কান্তজির মন্দিরের নাম না শেনার কোনো কারণ নেই।  দিনাজপুরে অবস্থিত এই মন্দিরটি দেশের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন মন্দির। এই মন্দিরের প্রতিমা কতটা দৃষ্টিনন্দন হয় একবার গিয়ে দেখেই আসুন না।

 

সমুদ্রবেষ্টিত মহেশখালী দ্বীপের অন্যতম দর্শনীয় পূণ্যস্থান আদিনাথ মন্দির। সমুদ্রের পাড়ে প্রায় ২০০ ফুট উঁচু পাহাড়ের ওপর মন্দিরের অবস্থান। পুরাণ অনুযায়ী মহেশখালী দ্বীপে দেবতা শিবের আগমন ঘটে ত্রেতা যুগে। রাম-রাবণ যুদ্ধের সময় শিবের কৃপা লাভের জন্য রাবণ কৈলাস পর্বত থেকে শিবকে আনতে যান। রাবণ শর্ত ভঙ্গ করায় রওনা দিয়েও পথিমধ্যে শিব মৈনাক পাহাড়ে থেকে যান। সে অনুযায়ী আদিনাথ মন্দিরের এই পাহাড়ের নাম মৈনাক। মৈনাক থেকেই মইশখালী এবং আরো পরে মহেশখালী শব্দের উৎপত্তি বলে ধারণা করা হয়।

 

পটুয়াখালী দয়াময়ীর মন্দিরের কপাল ঠেকিয়ে আসতে পারেন। ১২০৮ সন থেকে সেখানে পূজা হয়ে আসছে। মৌলভীবাজার জেলার রাজনগরের পাঁচগাঁওয়ে দেবী দুর্গার পূজা অতটা প্রাচীন না হলেও বেশ ব্যতিক্রম। একমাত্র এই মন্দিরেই লাল রঙের প্রতিমা প্রতিষ্ঠা করে পূজা করা হয়। দেশের কোথাও আপনি আর এমনটি পাবেন না। সতেরো শতক থেকে সেখানে এভাবে পূজা হয়ে আসছে। কল্যান্দী সর্বজনীন দুর্গা মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা রাজা রামেন্দ্র রায় চৌধুরী। তিনি প্রায় ৩০০ বছর পূর্বে ১ একর জায়গায় মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। এটিও প্রসিদ্ধ দুর্গা মন্দির।

 

সীতাকুণ্ড

 

সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী পঞ্চমন্দিরও কম জাগ্রত নয়। সেখানেও জাঁকজমকের সঙ্গে দুর্গাপূজা হয়। চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত চন্দ্রনাথ মন্দিরের কথাই বা ভুলি কী করে? পূণ্যতীর্থ হিসেবে মন্দিরটি ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।

 

চাইলে নোয়াখালীর চৌমুহনী ঘুরে আসতে পারেন। সেখানে ধর্মীয় আবেগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। তাই এবার সেখানকার সনাতন ধর্মাবলম্বীরা মুক্তিযুদ্ধ স্মরণে ৭১ ফুট দীর্ঘ দুর্গা প্রতিমা নির্মাণ করছেন। বলা হচ্ছে এটিই উচ্চতায় দেশের সবচেয়ে বড় প্রতিমা। অবশ্য সেদিক দিয়ে বিবেচনা করলে বাগেরহাটের সিকদার বাড়ির পূজার আয়োজন সবাইকে টেক্কা দেবে। সংখ্যার দিক থেকে দেশের সর্ববৃহৎ মণ্ডপ নির্মাণ হচ্ছে বাগেরহাটের সদর উপজেলার হাকিমপুর গ্রামের সিকদার বাড়িতে। এই মণ্ডপ ৬০১টি প্রতিমা দিয়ে সাজানো হয়েছে। এবারের পূজায় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি প্রতিমা নিয়ে পূজার আয়োজন করা হয়েছে এখানে। মূল মণ্ডপসহ আশপাশের প্রায় আধা কিলোমিটারজুড়ে সাজানো হয়েছে অপরূপ সাজ-সজ্জায়। সুতরাং ঘুরে আসতে পারেন এই মন্দিরেও। কেননা মায়ের সঙ্গে মায়ের মন্দিরের কথাও তো জানতে হবে। এখন না হলে আর কখন? সেই জানাটাই না হয় হোক এবার।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৮ অক্টোবর ২০১৬/তারা