ঢাকা, মঙ্গলবার, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ২৬ মে ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

‘শিক্ষক হয়ে বন্দুক হাতে রণাঙ্গনে দেখে ওরা বিস্মিত হয়েছিল’

তারা : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৬-১২-১৫ ৪:১৪:২৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৬-১২-১৫ ৪:১৪:২৪ পিএম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. অজয় রায়। স্বাধীনতা সংগ্রামে দেশমাতৃকার ডাকে কলম রেখে হাতে তুলে নিয়েছিলেন অস্ত্র। যদিও পরবর্তীতে বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন। এই সংগঠনটি মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশ-বিদেশে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে জনমত গঠনসহ নানা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। উত্তাল দিনে সাহসী ভূমিকার কথা, অন্তঃসত্তা স্ত্রী রেখে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া এবং যুদ্ধজয়ের পর দেশে ফেরার অভিজ্ঞতার কথা উঠে এসেছে তার এই সাক্ষাৎকারে। তিনি কথার ফাঁকে বলেছেন, ছেলে অভিজিৎকে নিয়েও। তার সাক্ষাৎকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ তুলে ধরা হলো রাইজিংবিডির পাঠকের উদ্দেশে।

 

সাংবাদিক : আপনি কখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন?

অজয় রায় : আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৭ সালে পদার্থবিদ্যায় এমএসসি পাশ করে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে কিছুদিন পদার্থবিদ্যায় প্রভাষক হিসেবে কাজ করি। আমার দিব্যি মনে আছে বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেই এই পদটি অর্জন করি। ভিক্টোরিয়া কলেজে অধ্যাপনা শেষে ১৯৫৯-৬০ শিক্ষাবর্ষে জুলাই মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে জুনিয়র লেকচারার হিসেবে যোগ দেই। 

 

সাংবাদিক : আপনার মূল বাড়ি কোথায়? জন্মতারিখ ও সাল কবে?

অজয় রায় : আমার মূল বাড়ি দিনাজপুর শহরে। আমরা কয়েক পুরুষ ধরে এই শহরে বাস করে আসছি।প্রবেশিকা সার্টিফিকেট অনুযায়ী আমার জন্মতারিখ ১৯৩৫। তবে পারিবারিক সুত্রানুয়ায়ী আমার জন্ম ১২ মার্চ ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দ; ২৮ ফাল্গুন ১৩৪২ বঙ্গাব্দ।

 

বাবা প্রয়াত অতুলচন্দ্র রায় ছিলেন শহরের খ্যাতনামা ব্যবহারজীবী এবং সমাজসেবক। তিনি নিজেকে আর্যোবংশোদ্ভুত ক্ষত্রিয় সন্তান বলে মনে করতেন।

 

সাংবাদিক : ভারত চলে যাবার আগে ২৫ মার্চ পরবর্তী অবরুদ্ধ ঢাকায় থাকার অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাচ্ছি। 

অজয় রায় : আমরা একাত্তরের এপ্রিলের মাঝামাঝি ঢাকা ছেড়েছিলাম। আমরা আসলে পালাতে পারছিলাম না। মিলিটারিরা পরিচয়পত্র দেখত। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। সে পরিচয় তো আর দেওয়া যাবে না। আমি অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের ভুয়া কার্ড বানালাম। ঢাকায় কিছুদিন হলিক্রস কলেজে আশ্রয় নিয়েছিলাম। আমার মা ও স্ত্রীকে সেখানে রেখেছিলাম। আমি এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়াতাম। একদিন বুকে খ্রিস্টানদের মতো ক্রস ঝুলিয়ে রাস্তায় বের হই ঢাকা ত্যাগ করে ভারতে যাবার উদ্দেশ্যে। ক্রস ঝুলিয়ে আমরা নারায়ণগঞ্জ লঞ্চ ঘাটে যাই। সেখান থেকে নদীপথে  দাউদকান্দির মূল ঘাটের আগেই একটি ছোট ঘাটে নেমে পড়ি। সেখানে আমার স্ত্রীর মামার বাড়িতে উঠি। সেখান থেকে আগরতলা যাই। সহায়তা করেছিলেন ক্যাপ্টেন ভুঁইয়া। তার বাড়ি সেখানে ছিল। তার বাবার সঙ্গেও পরিচয় ছিল; তিনি আমাদের সীমান্ত অতিক্রম করার সব ব্যবস্থা করেন, সঙ্গে দিয়েছিলেন একজন গইড।

 

সাংবাদিক : রণাঙ্গন কোথায় ছিল আপনার?

অজয় রায় : ২৭ মার্চের পাক-আর্মি ক্র্যাক ডাউনের পর থেকেই আমি ঢাকায় স্ত্রী ও মাকে নিয়ে পলাতক জীবনযাপন করছিলাম। এখানে ওখানে আত্মগোপন করছি, চার্চ, এমনকি মসজিদেও আশ্রয় নিয়েছি। সবাই পরামর্শ দিচ্ছেন ভারতে পাড়ি দিতে। আমিও স্থির করলাম ভারতে চলে যাব এবং সেখানে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেব। সে জন্যই কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে ভারতের সোনামুড়ায় একটি ছোট সীমান্ত শহরে প্রবেশ করি ১৯৭১ সালের মে মাসের ২৩ তারিখ। ওখানে দিন কয়েক ছিলাম এবং মুক্তিফৌজে যোগ দিলাম ১৫-২০ সদস্যবিশিষ্ট একটি দলে। অধিকাংশই কলেজ শিক্ষক ও ছাত্র। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের আমার এককালের সহকর্মী অধ্যাপক খোরশেদ আলম, এমপি সেই অঞ্চলের আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। তিনি শিক্ষক ও ছাত্রদের নিয়ে মুক্তিযোদ্ধার একটি দল গড়ে তুলছেন।

 

অধ্যাপক আলম বললেন, ‘অজয় এখানে থাকতে হলে সকলকেই অস্ত্র চালনা শিখতে হবে ও যুদ্ধ করতে হবে।’ দু’জন সুবেদারের অধীনে আমাদের প্রাথমিক সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। কয়েকদিনের প্রশিক্ষণেই আমি একজন দক্ষ সৈনিকে পরিণত হলাম। রাইফেল ও এলএমজি চালনা ছাড়াও গ্রেনেড ছোড়ার কৌশল, ডিনামাইট বা বিস্ফোরক দ্রব্য ব্যহার করে ছোটখাটো সেতু ও কালভার্ট ধ্বংস করা-সবই প্রায় শিখেছিলাম। সামরিক শিক্ষা লাভের পরপরই পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে আমাদের দলটি বেশ কয়েকবার সফলতার সাথে অপারেশন চালায়। আমরা প্রায় ২৫-৩০ পাকিস্তানিকে নিহত করেছি। আমাদের এই অপারেশনের খবর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়েছিল। বস্তুত আমি যুদ্ধ শুরু করি কুমিল্লা-সোনামুড়া সীমান্তে মে মাসের দিকে।

 

সাংবাদিক : এর পরের ঘটনা বলুন, কেননা আমরা জেনেছি মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস আপনার কর্মবৃত্তের ব্যাস ছিল বিস্তৃত ও বিচিত্র?

অজয় রায় : সোনামুড়া ও কুমিল্লা সীমান্তে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের নেতা জনাব এম. আর. সিদ্দীকীর সাথে দেখা হয়। প্রায় একই সময়ে হঠাৎ করেই সেখানে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর সেনানী সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফের সাথে দেখা। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েও এই বয়সে (আমার বয়স তখন ৪১-৪২) বন্দুক হাতে রণাঙ্গনে দেখে দুজনেই বিস্মিত ও চমৎকৃত হলেন। খালেদ মোশাররফ সশ্রদ্ধ সালাম দিয়ে বললেন, ‘স্যার যুদ্ধটা আমাদের করতে দিন; আপনার ছাত্রদের। আপনারা উপদেষ্টা হিসেবে থাকুন। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনকে সহায়তা করুন, তার হাত শক্ত করুন যুদ্ধ চালনায়।’

 

জনাব এম. আর. সিদ্দীকীও একই পরামর্শ দিলেন।

 

ওদের উভয়ের পরামর্শে আমি আগরতলা হয়ে মুজিবনগর আসি। আসার পরপরই জনাব তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত প্রবাসী স্বাধীন বাংলা সরকারের নানা কাজে জড়িয়ে পড়ি। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে সদ্য প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ সরকারের প্ল্যানিং সেলে অবৈতনিক সদস্য হিসেবে যোগ দেই এবং প্ল্যানিং সেলের চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের অধীনে তার সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করি। এই পরিকল্পনা সেলের সাথে আরও অনেক বুদ্ধিজীবী (সদস্য বা কর্মকর্তা হিসেবে) যুক্ত ছিলেন। যেমন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক মোশাররফ হোসেন, সনৎ কুমার সাহা, অর্থনীতিবিদ এস আর বোস, মতিলাল পাল, ড. আনিসুজ্জামান, ড. খান সারওয়ার মুরশিদ প্রমুখ।

 

সাংবাদিক : আমরা শুনেছি ভারতে আশ্রয় নেওয়া বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম অঞ্চলে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব স্তরের শরণার্থী শিক্ষকদের নিয়ে সংগঠিত হয় ‘বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি’। এ প্রসঙ্গে আর একটু তথ্য দেবেন?

অজয় রায় : প্রাইমারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সকল স্তরের প্রবাসী শিক্ষকদের নিয়ে এপ্রিল মাসে একটি শিক্ষক সংগঠন আমরা গড়ে তুলি। এর অফিস ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন দ্বারভাঙ্গা বিল্ডিং-এ। আমি মুজিবনগরে ‘বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি’র সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কাজ করি। এই সমিতির কার্যকরী সভাপতি ছিলেন ঢাকা জুবিলী স্কুলের প্রধান শিক্ষক জনাব কামরুজ্জামান, যিনি বাংলাদেশ মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতিও ছিলেন সে সময়। সভাপতি ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এ. আর. মল্লিক।

 

উল্লেখ্য যে, মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গে এবং আগরতলা ও ত্রিপুরায় অনেক মানুষ পূর্ববাংলা থেকে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পশ্চিমবঙ্গেই এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল এক কোটির মতো। শরণার্থীর মধ্যে শিক্ষকদের সংখ্যাও ছিল উল্লেখযোগ্য। প্রবাসী শিক্ষক নেতারা অনুভব করলেন যে শিক্ষকদের দেখভাল করার জন্য প্রবাসী শিক্ষকদের একটি সমিতি গঠন করা প্রয়োজন। তাই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করার লক্ষ্যে এবং আমাদের যুদ্ধের স্বপক্ষে বিশ্ববাসীর সমর্থন আদায়ের উদ্দেশ্যে উদ্বাস্তু শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীরা ২১ মে ১৯৭১ ‘বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি’র ব্যানারে নিজেদের সংগঠিত করেন। সেদিন বেলা ১১টার দিকে প্রবাসী শিক্ষকেরা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন দ্বারভাঙা ভবনের সামনে সমবেত হয়ে এ সমিতি গঠন করেন। সমিতির নির্বাচিত কার্যকরী সংসদ ছিল এ রকম: সভাপতি ড. আজিজুর রহমান মল্লিক, কার্যকরী সভাপতি কামরুজ্জামান, কোষাধ্যক্ষ ড. খান সারওয়ার মুরশিদ, সাধারণ সম্পাদক ড. অজয় রায়, সহকারী সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান ও গোলাম মুরশিদ। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসব্যাপী সংগঠনটি সহায়কশক্তি হিসেবে নানা ক্ষেত্রে কাজ করে মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখে।

 

সাংবাদিক : আপনি তো রণাঙ্গনে রাইফেল নিয়ে শত্রু নিধনে ব্যস্ত। কিন্তু আপনার স্ত্রী-পুত্র এরা কোথায়, শুনেছি আপনার স্ত্রী তখন অন্তঃসত্তা।

অজয় রায় : আসামের শিবসাগর জেলায় নাজিরায় আমার বড় ভাইয়ের বাসায় ছিলেন আমার মা ও স্ত্রী। আমার বড় ভাই ছিলেন প্রকৌশলী। আমার বৌদি ছিলেন রুশ মেয়ে, অপূর্ব সুন্দরী। আমার স্ত্রীকে ভারি যত্নে রেখেছিলেন। সেখানেই অর্থাৎ নাজিরাতেই একটি মাতৃসদনে জন্ম নেয় আমার প্রথম সন্তান যুদ্ধকালে নভেম্বর মাসে। রণাঙ্গন থেকে ছেলেকে দেখতে এলাম তখন ওর বয়স ১৫-২০ দিন। আমি স্ত্রী ও নবজাতককে নিয়ে চলে এলাম কলকাতায় আমার এক মাসীমার বাসায়, ভবানীপুরে। ওদের সেখানে রেখে তারপর আমি রণাঙ্গনে ফিরে যাই। তবে সবসময় স্ত্রী-ছেলের খবর রাখতাম।

 

সাংবাদিক : বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির কার্যক্রম আর একটু বলুন।

অজয় রায় : বাংলাদেশ থেকে তখন পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও কুচবিহারে শরণার্থী গেছে কমপক্ষে ৯০ লাখ। আমরা অর্থাৎ বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি সেখানে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থায় কাজ শুরু করি। কামরুজ্জামান ছিলেন খাদ্য ও ত্রাণ পুনর্বাসন মন্ত্রী। পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও কুচবিহারে শরণার্থীদের মধ্যে চিকিৎসা, শিশুদের দুধের ব্যবস্থা করতে হতো আমাদের। ভারতীয় সরকার হিমশিম খাচ্ছিল প্রায় কোটিখানেক উদ্বাস্তুকে বাসস্থান, আহার্য, চিকিৎসা প্রদানে। শিশুদের আবার আলাদাভাবে দেখভাল করতে হতো।

 

শিক্ষক সমিতি আর একটি প্রকল্প গ্রহণ করল ক্যাম্প স্কুল স্থাপন। বেকার ৫ থেকে ১৬ বছরের শিশু-কিশোর-তরুণদের জন্য ক্যাম্প স্কুল করতে হলো। তারা যুদ্ধ করছিল না। ক্যাম্পে ক্যাম্পে থাকত। তাদের পাঠদানের জন্য এসব স্কুল করতে হলো। ক্যাম্প স্কুলে শিক্ষক নিয়োগ করা হলো। তার দায়িত্ব দেওয়া হলো হেনা দাসকে এবং সার্বিক দায়িত্ব থাকলো মাধ্যমিক স্কুল টিচার অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন কামরুজ্জামান সাহেবের ওপর। আবশ্য সার্বিক দেখভাল করার মূল দায়িত্ব বহন অবশ্যই করতে হয় শিক্ষক সমিতির সম্পাদককে, অর্থাৎ আমাকে।

 

পশ্চিমবঙ্গে ২০০, আগরতলায় ৫০ ও কুচবিহারে ১৫টি স্কুল খোলা হয়েছিল। সীমান্তে হসপিটালও করতে হয়েছিল। সীমান্তের হসপিটাল থেকে গুরুতরভাবে আহত মুক্তযোদ্ধাদের ব্যারাকপুর হসপিটালে পাঠানো হতো। সীমান্তের হসপিটালগুলোতে ছোটখাটো অপারেশন করার ব্যবস্থা আমরা করেছিলাম পশ্চিমবঙ্গ রেডক্রস সোসাইটির সহযোগিতায়। এ ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গ রেডক্রস সোসাইটির সভাপতি প্রদেশপাল শ্রীমতী পদ্মজা নাইডুর সহযোগিতা অবিস্মরণীয়। ফিল্ড হাসপাতালগুলিতে ফাস্ট এইডের ব্যবস্থা থাকতো। মেডিকেল কলেজের ছাত্রীদের চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হতো। তরুণীদের দুই মাসের প্রশিক্ষণ দিয়ে নার্সের দায়িত্ব দেওয়া হতো। প্রয়াত কবি সুফিয়া কামালের দুই মেয়ে সুলতানা কামাল ও আরো কয়েকজন এই প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত ছিলো।

 

ওয়াহিদুল হককে নিয়ে একচি গানের দল করেছিলাম, সনজিদা খাতুনের সহযোগিতায়। ক্যাম্পে ক্যাম্পে গান চলত। অনেক সময় মুক্তাঞ্চলেও গানের দলটি চলে যেত, মুক্তিযোদ্ধাদের গান শুনিয়ে উদ্দীপ্ত করতো তারা। 

 

সাংবাদিক : বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির আর কী কী কর্মসূচি নিয়েছিল?

অজয় রায় : বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবাসী শিক্ষকেরা মুক্তিযুদ্ধের সহায়ক শক্তি হিসেবে কয়েকটি সংগঠন স্থাপনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। তার মধ্যে একটি ছিল বাংলাদেশ সরকারের অধীনে একটি পরিকল্পনা সেল। এটি প্রতিষ্ঠায় অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান, এস আর বোস, মোশাররফ হোসেন ও সনৎ কুমার সাহা; পরিসংখ্যানবিদ ওয়াহিদুল হক, ড. খান সারওয়ার মুরশিদ, ড. আনিসুজ্জামানমহ আমি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলাম।

 

বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি নানা কর্মসূচি ও কার্যক্রম হাতে নিয়েছিল। যেমন সাধ্য মতো শরণার্থী শিক্ষকদের পুনর্বাসন ও মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহায়তা দান, মুক্তিযুদ্ধের জন্য বস্তুগত সহযোগিতা ও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য শীতবস্ত্রসহ পোশাক, জুতা ইত্যাদি সংগ্রহ ও বিতরণ, ভারতসহ দেশে-বিদেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচারণা ও জনমত গড়ে তোলা, প্রচার ও মনস্তাত্ত্বিকযুদ্ধে সহায়তা করা, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ সম্পর্কিত পুস্তিকা প্রকাশ করা।

 

বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি ও বাংলাদেশ লিবারেশন কউন্সিলের প্রচারাভিযান ও বিশ্বনেতাদের কাছে আবেদনের ফলে বাংলাদেশ-মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তাদের ধারণা স্পষ্ট হয়। তারা আমাদের প্রতি সহমর্মী হয়।

 

সাংবাদিক : মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলে আপনি কবে দেশে ফিরে এলেন?

অজয় রায় : বিজয়ের পর তাজউদ্দীন আহমদ বাংলাদেশে ফিরলেন। আমি ফিরলাম বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের একদিন আগে। কারণ আমার অনেকে কাজ ছিল। বিশেষ করে প্ল্যানিং সেল ও শিক্ষক সমিতির অফিস গুটাতে হয়েছিল। তাতেই সময় চলে গিয়েছিল। স্থলপথে দেরি হবে বলে বিমানে ঢাকায় আসলাম, সাথে স্ত্রী ও কোলে শিশু অভিজিৎ ।

 

সাংবাদিক : অভিজিৎ-এর সঙ্গে আপনার একটি প্রিয় স্মৃতি ...

অজয় রায় : অভিজিতের ডাক নাম ছিল ’গুল্লু’। গুল্লুর সাথে আমার অনেক প্রিয় স্মৃতি জড়িয়ে আছে। রণাঙ্গন থেকে যখন ওকে জন্মের সময় আপার আসামে ডিগবয় হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলাম তখন ওর বয়স ১৫-২০ দিন। দেখি ও জুল জুল চোখে আমাকে দেখছে মায়ের পাশে শুয়ে। আমাকে দেখে হাত-পা ছুড়তে লাগল। আমি ওকে কোলে তুলে নিলাম।

 

আর একটি স্মৃতি আছে ও যখন বুয়েট থেকে বি.এসসি (অনার্স) ডিগ্রী পেল, বাসায় আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। ওকে জড়িয়ে আর একটি মধুর সুখস্মৃতি আছে। ও যখন ২১ বছরে পদার্পণ করে, আমরা ওর জন্মোৎসব ধুমধামের সাথে পালন করি। ওর মা ওকে একটি সোনার চাবি উপহার দেয়। আর একটি সুখস্মৃতি রয়েছে ওকে ঘিরে। ও যখন ওর পি.এইচডি থিসিস সাবমিট করে ওর ইচ্ছেতে আমি ওর সাথে সিঙ্গাপুর ছিলাম। ও যখন সাফল্যের সাথে ওর থিসিস ডিফেন্ড করে এসে আমাকে জানালো যে, ওর পি.এইচডি হয়ে গেছে। আমরা আনন্দে পিতা-পুত্র পরস্পরকে জড়িয়ে ধরলাম। সেদিন সেখানকার ওর পরিচিত বাঙালি বন্ধু-বান্ধবীদের সাথে আমরা এক আনন্দঘন সন্ধ্যা সেলিব্রেট করেছি।    

 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৫ ডিসেম্বর ২০১৬/তারা