ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩০ আষাঢ় ১৪২৭, ১৪ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

‘নতুন প্রজন্ম যুদ্ধের সংজ্ঞা নির্ধারণে ভুল করছে’

স্বরলিপি : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৬-১২-১৫ ৮:২৯:১২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৬-১২-১৫ ৮:২৯:১২ পিএম

|| রাইসুল ইসলাম আসাদ ||

 

গেরিলা যুদ্ধ কী? প্রশ্নটি বর্তমান প্রজন্মকে যদি করা হয় তাদের অধিকাংশই ভুল উত্তর দেবে বলে আমার ধারণা। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে বলা যায়, আমাদের ইতিহাস অনাদরের ইতিহাস!

 

বিজয় দিবস প্রসঙ্গ আর একটু গভীরে নিয়ে কথা বলতে চাই। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আমি গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম। এ বিষয়ে প্রতি বছরই বিভিন্ন টেলিভিশন-রেডিও আর সংবাদপত্রে সাক্ষাৎকার দিয়ে থাকি। দুঃখের বিষয়, আমি যেহেতু অভিনয় করি সেই সুবাদে বাংলাদেশের কিছু মানুষ আমাকে চেনেন। একইভাবে আরো কিছু পরিচিত মুখ আছে। প্রতি বছর বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস এলে সংবাদমাধ্যমগুলো এদের খুঁজে খুঁজে বের করে। পাতার পর পাতা এদের নিয়ে নিউজ-প্রতিবেদন হয়।

 

আমি খুব অবাক হই, যুদ্ধে কি শুধু এই হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ অংশগ্রহণ করেছিল? আমার মনে হয় শহরের চেয়ে গ্রামের লোকজন বেশি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। তাদের চিন্তা, তাদের বোধ, তারা কেমন আছে সেগুলো নিয়ে পর্যাপ্ত কাজ হয় না।

 

বিজয় শুধু কি একটি অনুষ্ঠান? যুদ্ধের গল্প তুলে ধরার উপযুক্ত দিন কি শুধু স্বাধীনতা দিবস? আমরা ভুলে যাচ্ছি মুক্তিযুদ্ধ প্রতিদিনের, প্রতিমুহূর্তের। অনেকে গেরিলা যুদ্ধ সম্পর্কে না জেনে এসেই প্রশ্ন করতে শুরু করে দেয়। এ অবস্থাকে কী বলব? কী লজ্জা!

 

নতুন প্রজন্ম মনে হয় যুদ্ধের সংজ্ঞা নির্ধারণে ভুল করছে। আমি বলতে চাই, যুদ্ধ মানেই কিন্তু বোমাবাজি করা না, যুদ্ধ মানেই গোলাগুলি নয়। তবু অনেকে যুদ্ধ নিয়ে প্রশ্ন করতে গেলেই বলে বসে, তারপর কী হলো? গুলিটা কে করল? কিন্তু যুদ্ধটা তা নয়। এটা যুদ্ধের একটা অংশ। একটা যুদ্ধ সংগঠিত হওয়ার আগে পরে যে কত ঘটনা-কত কাহিনি রয়ে গেছে। যুদ্ধের মতো একটা বিভৎস বিষয়ে মানুষ শুধু শুধু অংশ নেয় না। এর পেছনে থাকে স্বাধীন হওয়ার অদম্য ইচ্ছা।

 

একটা জাতি দিনের পর দিন বঞ্চিত হওয়ার গল্প জানতো। এই জাতির ছিল অধিকারহীনতার ইতিহাস। ছিল শোষণের যাঁতাকলে পৃষ্ঠ হওয়ার স্মৃতি। মনে রাখতে হবে, মুক্তিযুদ্ধের গল্প নয় মাসের কিন্তু তার আগের একটা প্রস্তুতি কাল আছে। সেই সময় থেকেই মিছিল-মিটিংয়ে থাকা, সংগঠনে যুক্ত হওয়া। এই কাজগুলো চলছিল। আমরা সেগুলোতে অংশ নিয়েছি।

 

এতগুলো কথা বলার কারণ হচ্ছে, গেরিলা যুদ্ধ করতে হলে যেভাবে অপারেশন চালাতে হয় তা জানেন না অনেকেই। জানার চেষ্টাও মনে হয় কম। আমরা গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম। তরণদের বলতে চাই, আমরা জনগণের মধ্যে থেকে যুদ্ধ করেছি। বিষয়টা মাছ এবং পানির মতো। পানি হচ্ছে জনগণ আর আমরা যারা গেরিলা তারা হচ্ছি মাছ। পানি যদি না থাকে তো মাছ বাঁচবে না।

 

গেরিলা যুদ্ধে সরাসরি যোদ্ধাবেশে অপারেশন করার সুযোগ ছিল না। আমাদের আশ্রয়স্থল ছিল জনগণ। যুদ্ধ চলাকালীন কোথাও খুব বেশি সময় অবস্থান করতে পারিনি। পরিবার থেকে বলে বেরিয়েছিলাম। দীর্ঘ সময় বিচ্ছিন্ন থেকেছি। মাঝে-মধ্যে বাড়িতে আসতাম কিন্তু থাকতাম না। আমি আর নাসির উদ্দীন ইউসুফ একসঙ্গে যুদ্ধ করেছি। ও ছিল আমাদের সেকেন্ড ইন কমান্ডার।

 

আমাদের বাড়িও ছিল পাশাপাশি। একবার পুলিশ আমাদের বাড়ি ঘেরাও দিয়েছিল। ওরা খুঁজতে খুঁজতে আমরা পার হয়ে চলে গিয়েছিলাম। আমাদের শেলটার ছিল, বিভিন্ন পকেট ছিল। সে সব জায়গায় থাকতে হতো।

 

মাঝে মধ্যে এমনও দেখা যেত রাত্রে একত্রে অবস্থান করেছি, পরদিন আরেক জায়গায় যাব কিন্তু সকালে উঠে দেখতাম কারফিউ জারি হয়েছে। সেখান থেকে পালাতে হতো আবার। কখনো বাড়ির দেয়াল টপকে, কখনো সহযোদ্ধাদের অনেককে চোখের সামনে মরতে দেখেছি। নৃশংসভাবে গুলি চালাতে দেখেছি। একদিকে অপারেশনের দায়িত্ব আর সঙ্গে করে নিয়ে বেড়ানো মৃত্যুর ফাঁদ। অবশেষে পাই স্বাধীন দেশ, বাংলাদেশ। দাম দিয়ে কেনা বাংলাদেশ। আমরা যেন এই ইতিহাস ভুলে না যাই।

 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৬ ডিসেম্বর ২০১৬/শান্ত/তারা