ঢাকা, মঙ্গলবার, ২ আশ্বিন ১৪২৬, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

আফগান জাগরণে কাঁপবে বিশ্বকাপ!

মানজুর মাহমুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৫-২১ ৯:০৬:৪৩ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৮-০৫ ৩:১২:৪৫ পিএম
আফগান জাগরণে কাঁপবে বিশ্বকাপ!
Walton E-plaza

মানজুর মাহমুদ: ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখি উড়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখতে কেমন হয়? এমন কোনো দৃশ্যের বাস্তবিক উপস্থিতি না থাকলেও লেখকদের বর্ণনা পড়ে অনেকেই নিজের মতো করে একটা দৃশ্য সাজিয়ে নেন। যেখানে থাকে ধ্বংস-ব্যর্থতাকে পেছনে ফেলে নতুন দিগন্তের পথে এগিয়ে যাওয়ার রঙিন সব অধ্যায়। আফগানিস্তান ক্রিকেট দলকে ফিনিক্স পাখির সঙ্গে মেলালে বাড়াবাড়ি মনে হবে?

না ভেবেই অনেকে উত্তর দিয়ে দেবেন, না মোটেও বাড়াবাড়ি হবে না। যারা ক্রিকেটের খবর রাখেন, তারা জানেন কতটা এবড়ো-থেবড়ো পথ পেরিয়ে এই অবস্থানে আসতে হয়েছে আফগানিস্তান ক্রিকেট দলকে। ধ্বংসস্তূপ থেকেই উঠে আসা একটি দলের নাম আফগানিস্তান। তাদের দলের প্রতিটা ক্রিকেটারই একেকটা ফিনিক্স পাখি।

যুদ্ধ কিংবা বিধ্বস্ত; এমন শব্দ শুনলেই অনেকে আফগানদের কথা মনে করেন। তাদের গল্প যে এমনই। গুলির শব্দ ‍শুনে ঘুম ভেঙেছে, এমন ক্রিকেটারও আছেন, যারা ব্যাট-বলে আফগানিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করে যাচ্ছেন। খুব অল্প সময়ে অনেক বেশি সাফল্য পাওয়া দলগুলোর মধ্যে আফগানিস্তান রীতিমতো রোল মডেল। আধুনিক ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় বিস্ময়ও তারাই। যে কারণে বিশ্বকাপ আসতেই আলোচনায় বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছেন আফগানরা।

এই মাসের শেষে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে বসতে যাচ্ছে ক্রিকেটের সবচেয়ে মর্যাদার আসর ওয়ানডে বিশ্বকাপ। ওয়ানডে র‌্যাংকিংয়ে ১০ নম্বরে থাকলেও আফগানিস্তানকে ভাবা হচ্ছে আন্ডারডগ হিসেবে। জায়ান্ট কিলার হিসেবে ভাবতেও দ্বিধা দেখাচ্ছেন না কেউ কেউ। অনেকেরই ধারণা, এবারের বিশ্বকাপ হয়ে উঠতে পারে আফগান জাগরণের মঞ্চ।

ক্রিকেটে তাদের পথচলা দীর্ঘ নয়। আফগানিস্তান ক্রিকেট ফেডারেশনের যাত্রা শুরু ১৯৯৫ সালে। খুব অল্প সময়ে নিজেদের প্রমাণ করে ২০০৩ সালে এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সদস্যপদ লাভ করে তারা। অল্পের জন্য ২০১১ বিশ্বকাপে সুযোগ না পেলেও সে বছরই চার বছরের জন্য ওয়ানডে মর্যাদা পেয়ে যায় আফগানিস্তান। ২০১৭ সালে এসে স্থায়ীভাবে ওয়ানডে মর্যাদা পায় দেশটি। তবে এর আগেই ২০১৫ বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে ক্রিকেটের নতুন হুমকি হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করা আফগানিস্তান।
 


পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা ধরে রেখে এবারের বিশ্বকাপেও জায়গা করে নিয়েছে আফগানিস্তান। আর এবার বড় স্বপ্ন নিয়েই ইংল্যান্ডে যাচ্ছে তারা। আফগানিস্তানের বিশ্বকাপের স্কোয়াডের ১৫ সদস্যের মধ্যে অনেকের গায়েই ইতোমধ্যে তারকার সিল লেগেছে। এ ছাড়া তারা যেভাবে পারফর্ম করে আসছে, তাতে ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং; সব বিভাগেই আফগানদের ভালো করার দারুণ সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন অনেক ক্রিকেটবোদ্ধাই।

আফগানিস্তানের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা স্পিন। এই বিভাগে তাদের প্রধান অস্ত্র ২০ বছর বয়সি লেগ স্পিনার রশিদ খান। যে কি না ইতোমধ্যেই হয়ে উঠেছেন মহাতারকা। ওয়ানডের বোলিং র‌্যাংকিংয়ের তিন নম্বরে থাকা রশিদ খান বিশ্বকাপে যে কোনো দলের জন্য হুমকিস্বরূপ। রশিদ খানের সঙ্গে যোগ দিয়ে আফগানদের স্পিন আক্রমণ আরও ধারালো করবেন অভিজ্ঞ মোহাম্মদ নবী। তরুণ মুজিব উর রহমানের স্পিন ভেল্কিও হয়ে উঠতে পারে প্রতিপক্ষের জন্য চিন্তার কারণ।

ব্যাটিংয়েও মাঠ কাঁপানোর মতো রসদ আছে আফগানিস্তান দলে। হজরতউল্লাহ জাজাই, মোহাম্মদ শাহজাদরা নিমেষেই প্রতিপক্ষের বোলিং বিভাগকে দিশেহারা করে তোলার সামর্থ্য রাখেন। রহমত শাহ, আসগর আফগান, নাজিবুল্লাহ জাদরান, হাসমউল্লাহ শহীদীদের ব্যাটিংও বিপদে ফেলতে পারে প্রতিপক্ষকে।

অলরাউন্ডার হিসেবে আফগানদের পথ দেখাবেন অধিনায়ক গুলবাদিন নাইব, মোহাম্মদ নবী, সামিউল্লাহ শেনওয়ারি, রহমত শাহরা। সঙ্গে ব্যাটসম্যান রশিদ খানের ওপরও মাঝে মাঝে ভরসা রাখতে পারে তারা। এ ছাড়া গুলবাদিন নাইব, আফতাব আলম, হামিদ হাসান, দৌলত জাদরানদের নিয়ে গড়া পেস আক্রমণ একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো নয়। সব মিলিয়ে ইংলিশদের মাটিতে আফগানদের ভালো করার সম্ভাবনার কথা বলে রাখছেন অনেকেই। 

বিশ্বকাপে আফগানিস্তান

২০১১ বিশ্বকাপ দিয়ে যাত্রা শুরু হতে পারতো তাদের। কিন্তু সামান্যর জন্য সেবার বিশ্বমঞ্চে নিজেদের জানান দিতে পারেনি আফগানরা। ২০১৫ বিশ্বকাপে ঠিকই জায়গা করে নেয় দেশটি। প্রথম অভিজ্ঞতায় বুক জিতিয়ে বলার মতো কোনো সাফল্য পায়নি তারা। ৫ ম্যাচের চারটিতেই হেরে বিদায় নিতে হয় । অবশ্য খালি হাতে ফিরতে হয়নি গ্রুপ পর্বের চতুর্থ ম্যাচে স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে দেয় আফগানরা। বিশ্বকাপে এটাই তাদের একমাত্র জয়।

ইংল্যান্ডের মাটিতে আফগানিস্তান

বিশ্বকাপে খেলার অভিজ্ঞতা থাকলেও ইংল্যান্ডের মাটিতে প্রথমবারের মতো খেলতে যাচ্ছে আফগানিস্তান। বেশ কিছু সফর করলেও ইংলিশদের মাটিতে কোনো ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা নেই তাদের। ক্রিকেটের জনক দেশটির বিপক্ষেও ওয়ানডে খেলার সুযোগ সেভাবে হয়নি আফগানদের। মাত্র একটি ম্যাচে ইংলিশদের মোকাবেলা করেছে তারা। সিডনিতে অনুষ্ঠিত ২০১৫ বিশ্বকাপের সেই ম্যাচে ৯ উইকেটের বড় ব্যবধানে হেরে যায় মোহাম্মদ নবীর দল।
 


আফগানদের বড় সাফল্য

ওয়ানডেতে আফগানিস্তানের বড় সাফল্য বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, উইন্ডিজের মতো দলকে হারানো। ওয়ানডেতে বাংলাদেশ ও উইন্ডিজকে তিনবার করে হারিয়েছে তারা। এশিয়া কাপে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে হইচই ফেলে দিয়েছিল। এ ছাড়া একই আসরে ব্যাটে-বলে দারুণ লড়াই করা আফগানরা ভারতের বিপক্ষে টাই করে। ওয়ানডেতে তাদের সবচেয়ে বেশি সাফল্য জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। এই দলটির বিপক্ষে সর্বোচ্চ ১৫টি ম্যাচে জিতেছে আফগানিস্তান।

২০১৫ বিশ্বকাপের পর আফগানিস্তানের সাফল্য

এই সময়টাতেই মূলত আফগানিস্তানের উত্থান হয়েছে। এই সময়েই ক্রিকেটের নতুন হুমকি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছেন নবী, রশিদ, শাহজাদরা। ২০১৫ বিশ্বকাপের পর (১৯ মে পর্যন্ত) ৬২টি ওয়ানডে খেলেছে তারা। এর মধ্যে ৩৩টি ম্যাচেই বিজয়ের নিশান উড়িয়েছে আফগানরা।

মাঠের এক পাশে ক্রিকেটারদের অনুশীলন চলছে, অন্য প্রান্তে ফুটছে বোমা। যে বোমায় প্রাণ হারাতে হয়েছে তিনজন ঘরোয়া ক্রিকেটারকে। এমন খবরে ক্রিকেটবিশ্ব যখন শোক প্রকাশ করছে, আফগানিস্তানের অন্যান্য ক্রিকেটার তখন গা ঝারা দিয়ে উঠে ব্যাট-বল নিয়ে ঝুটেছেন অন্য কোনো মাঠের দিকে। কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মাঠে ঘাম ঝরিয়ে গেছেন তারা।

এ কারণেই নবী-রশিদদের কাছে ক্রিকেট বিরাট একটা সাম্রাজ্য। যে সাম্রাজ্য তারা বংশ পরম্পরায় পাননি। কাটা বিছানো দুর্গম পাহাড় কিংবা বিস্তৃত মরুভূমি পেরিয়ে সবুজ দিগন্ত খুঁজে বের করতে যে মেহনতটা করতে হয়, তাদেরকে তার চেয়েও বহুগুনে মেহনত করে আজকের এই অবস্থান তৈরি করে নিতে হয়েছে। সেই অবস্থানটা এবারের বিশ্বকাপ দিয়ে আরও মজবুত করতে প্রস্তুত ক্রিকেটের এই নতুন বিস্ময়।

আফগানিস্তানের বিশ্বকাপ স্কোয়াড: গুলবাদিন নাইব (অধিনায়ক), মোহাম্মদ শাহজাদ (উইকেটরক্ষক), নূর আলী জাদরান, হজরতউল্লাহ জাজাই, রহমত শাহ, আসগর আফগান, হাসমতউল্লাহ শহীদী, নাজিবুল্লাহ জাদরান, সামিউল্লাহ শিনওয়ারি, মোহাম্মদ নবী, রশিদ খান, দৌলত জাদরান, আফতাব আলম, হামিদ হাসান ও মুজিব উর রহমান।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২১ মে ২০১৯/ইয়াসিন

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন
       
Marcel Fridge