ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০২ জুন ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

সিডনি থান্ডারে ডানা মেলছেন বাংলাদেশি ক্রিকেটার অনিক

ইয়াসিন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৫-২৩ ৮:০৮:০৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৬-০১ ৭:০৭:৩৫ পিএম

১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি জয়ের পর বাংলাদেশ ক্রিকেটের পালে লেগেছিলো জোর হাওয়া। তারপর সেই সময়ের তুমুল জনপ্রিয় ফুটবলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ক্রিকেট মানুষের মনে দাগ কেটে নিয়েছে খুব তাড়াতাড়ি। বিশেষ করে বিংশ শতাব্দীর শেষের ও একবিংশ শতাব্দীর শুরুর কিশোর-তরুণরা ফুটবলে না ভেসে হাবুডুবু খেয়েছে  ক্রিকেটের প্রেমে।

তাদের মধ্য থেকে কিছু স্বপ্নবাজ তরুণ স্বপ্ন দেখতে শুরু করে একদিন তারা হবে আকরাম খান, আমিনুল ইসলাম বুলবুল, হাসিবুল হোসেন শান্ত কিংবা মোহাম্মদ রফিক। টিভির পর্দায় স্বপ্নের নায়কদের দেখে কিশোর আসিফ হাসান অনিকও স্বপ্ন দেখেছিলেন বাংলাদেশের ঝাণ্ডা বিশ্বমঞ্চে উড়াবেন। সেই স্বপ্ন পূরণে পা বাড়িয়েছিলেন ভালোভাবেই।

আবাহনী মাঠে কোচ সাইফুর রহমান বাবু, ইয়াসিন ও রাজুর কাছে অনুশীলনে হাত পাকিয়েছিলেন। দেশের ক্রিকেটে স্বপ্ন রঙিন করার সুযোগ এসেছিল। জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৫ দলের ক্যাম্পে ডাক পেয়েছিলেন। কিন্তু পরিবারের চাপে সেই সুযোগ হাতছাড়া করতে হয়। বাংলাদেশে পেশাদার ক্রিকেট সেখানেই শেষ। এরপর স্কুল, কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিকেট সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে এই ডানহাতি অলরাউন্ডারের জীবন।

দেশ থেকে বিদেশ পাড়ি দিয়েছেন উচ্চশিক্ষার জন্য। কিন্তু ক্রিকেটের নেশা ছাড়তে পারেননি। অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে খুলল নতুন দরজা। কমিউনিটি ক্রিকেট খেলে অনিক এখন বিগ ব্যাশের দল সিডনি থান্ডারের দরজায় কড়া নাড়ছেন।

প্রতি বছর সিডনি থান্ডারের অধীনে কমিউনিটি টুর্নামেন্ট হয় যেটির নাম থান্ডার নেশন্স কাপ। অস্ট্রেলিয়া বাদে ১০ থেকে ১৪টি দেশের কমিউনিটি দলগুলো অংশ নেয় এতে। বাংলাদেশ থেকে একটি দল অংশ নিচ্ছে নিয়মিত। সাথে আছে ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, আফগানিস্তানও।

বাংলাদেশের বিশাল কমিউনিটির খেলোয়াড় থেকে টুর্নামেন্টের আগে ট্রায়াল হয় এবং সেখান থেকে ১৬ জন নিয়ে বাংলাদেশের দল তৈরি করা হয়। গত তিন বছর ধরে ওই টুর্নামেন্টে খেলছেন অনিক । শেষ দুই বছরে বাংলাদেশ দলের অধিনায়কও তিনি। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ দলে রয়েছে একাধিক অস্ট্রেলিয়ার গ্রেড ক্রিকেটের (প্রিমিয়ার লিগের) খেলোয়াড়। গত বছর বাংলাদেশ প্রথম রাউন্ডে বাদ পড়লেও ২০১৮ সালে খেলেছিল সেমিফাইনাল। সেমিতে আফগানিস্তানের কাছে হেরে ফাইনালের স্বপ্ন মাটি হয় অনিকদের।

থান্ডার নেশন্স কাপ থেকে বাছাই করে ১৫-১৬ জনের অল স্টারস অরিজিন দল তৈরি করে সিডনি থান্ডার। সে দলকে ট্রেনিংয়ের পাশাপাশি পার্থ, অ্যাডিলেড, মেলবোর্নে খেলার ব্যবস্থা করে দেয় থান্ডার। সেসব ম্যাচগুলোতে ভালো করলে প্রতি বছর দুজন খেলোয়াড়কে রুকি চুক্তিতে সিডনি থান্ডারের দলে নেওয়া হয়। যারা থান্ডারের মূল দলের খেলোয়াড়দের সাথে অনুশীলনের সুযোগ পান। আর অনুশীলনে মন জয় করতে পারলে সরাসরি খুলে যায় সিডনি থান্ডারের মূল স্কোয়াডের দরজা। এভাবেই সিডনি থান্ডার দীর্ঘদিন ধরে কমিউনিটি ক্রিকেট থেকে ক্রিকেটার উঠিয়ে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে।

অনিক ২০১৮ সালে অল স্টারস অরিজিন দলে টিকেছিলেন কিন্তু মূল একাদশে খেলার সুযোগ পাননি। এ বছরও অল স্টারস অরিজিন দলে সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব সেই পথে বিছিয়ে দিয়েছে কাঁটা। এই কাঁটা বিছানে পথ পেরিয়ে এ বছর আর খেলা হবে কি না তা নিয়েও সংশয়ে অনিকের।

আক্ষেপটা তাই আড়াল করতে পারলেন না তিনি, ‘এই বছর আমার জন্য ভালো একটা সুযোগ ছিলো। সিডনি থান্ডার পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে রুকি চুক্তিতে দুজন খেলোয়াড়কে দলে নেয়। আমার এবার খুব ভালো সময় যাচ্ছিল। অনুশীলন ভালো হয়েছিল। সবাই ভালো বলছিল। এবার রুকি চুক্তিতে ঢোকা অসম্ভব কিছু ছিল না।’

সিডনি থান্ডারের খেলোয়াড় তুলে আনার এই পুরো প্রক্রিয়ার সাথে ‍যুক্ত থাকেন অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপজয়ী ক্রিকেটার মার্ক ওয়াহ। থান্ডার কর্তৃপক্ষ থেকে তাঁর স্বাক্ষরিত চিঠিও পেয়েছিলেন অনিক। অনুশীলনেও মার্ক ওয়াহের সঙ্গে দারুণ সময় কাটিয়েছিলেন এ বাংলাদেশি। কিন্তু করোনাভাইরাসের বিষাদে ঢেকে গেছে সব আয়োজন।

তবুও যতদূর এসেছেন তাতে গর্বিত অনিক, ‘বাংলাদেশ কমিউনিটির সঙ্গে পরিচিত হই খেলাধুলার মাধ্যমে। বাংলাদেশ দলকে প্রতিনিধিত্ব করে সিডনি থান্ডারে খেলার সুযোগ আসে। রুকি ক্রিকেটার হিসেবে ওদের দলে প্রবেশের সুযোগও আসবে। অস্ট্রেলিয়ার খেলোয়াড়দের সঙ্গে অনুশীলন, সফর করা হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়ে আমি নিজেকে নিয়ে গর্ববোধ করি।’

অস্ট্রেলিয়ার কমিউনিটিতে অনিক এখন খুব পরিচিত। অস্ট্রেলিয়াতে বাংলাদেশের কমিউনিটির ক্রিকেট দল আছে প্রায় ৩২টি। কমিউনিটির ভেতরে বিভিন্ন টুর্নামেন্ট হয় যেমন, বিডি গোল্ড কাপ, কেএফসি স্বাধীনতা কাপ, সিডনি অলস্টার্স টুর্নামেন্ট। অনিক যোগ দেওয়ার পর কমিউনিটির টুর্নামেন্টে তাঁর দল পিফি দুটিতে চ্যাম্পিয়ন, একটিতে রানার্সআপ হয়েছে।

ফেডারেশন ইউনিভার্সিটি অব অস্ট্রেলিয়াতে পেশাদার অ্যাকাউন্টিংয়ে মাস্টার্স করছেন। সাথে চাকরি তো আছেই। পড়াশোনা ও চাকরির পাশাপাশি  অস্ট্রেলিয়াতে  পেশাদার ক্রিকেট ক্যারিয়ার গড়া খুব চ্যালেঞ্জিংই শুধু নয়; বরং ভীষণ কঠিন এক যুদ্ধ। কিন্তু ব্যাট-বলের নেশায় মগ্ন অনিক ছাড়তে পারেন না কোনোটাই, ‘খুব ছোটবেলা থেকে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী হওয়াতে খেলা বন্ধ করতে পারিনি কখনো। এখানে আমি প্রথম যেদিন আসি সেদিনই আমি খেলতে যাই। বিমান থেকে নেমে পৌনে দশটায় বোনের বাসায় যাই, এখন সেখানেই আমি থাকি। এরপর দুপুর আমার দুলাভাই আমাকে খেলতে নিয়ে যান। সে থেকে পিফি-ই আমার টিম।’

আফগানিস্তানের বিপক্ষে নেশন্স কাপের সেমিফাইনাল ও মার্ক ওয়াহর অধীনে ট্রায়ালে অংশ নেওয়া এখন পর্যন্ত অনিকের সেরা মুহূর্ত। নিজের কণ্ঠে শোনালেন সেসব কথা, ‘গত বছর সেমিফাইনালে আফগানিস্তানের সাথে খুব কাছে গিয়ে ম্যাচ হেরেছিলাম। খুব ভালো খেলা হয়েছিল আমাদের। আফগানিস্তানের দলটা খুব ভালো ছিল, ওদের জাতীয় লিগ খেলে এমন খেলোয়াড়ও ছিল। এছাড়া সিডনি থান্ডারে যখন ট্রায়াল দেই, সেখানে মার্ক ওয়াহ ছিলেন। তিনি খুব মনযোগ দিয়ে দেখছিলেন, আমি কীভাবে ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং করছিলাম। কাছে এসে আমাকে কিছু টিপস দিয়েছিলেন। সেগুলো পরবর্তীতে আমার কাজে লেগেছে। আমার জন্য সেটা ছিল দারুণ মুহূর্ত।’

প্রবাসী বাংলাদেশিরা অনিকের পারফরম্যান্স এবং নিবেদনে দারুণ উৎফুল্ল। সিডনি থান্ডারের মূল দলের হয়ে অনিক একদিন মাঠে নামবেন সেই স্বপ্ন বুনছেন তাঁরা। প্রবাসী বাংলাদেশি হুমায়রা পারভীন সামিরার কন্ঠে আত্মবিশ্বাসের সুর, ‘সিডনিতে আমাদের কমিউনিটি বিশাল বড়। এখানে অনিক আমাদের রোল মডেল। সিডনি থান্ডারের জার্সিতে তাকে দেখা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের। তুখোড় একজন অলরাউন্ডার। দারুণ অধিনায়ক। মাঠে এবং মাঠের বাইরে দারুণ পরিশ্রমী।’

 

ঢাকা/ইয়াসিন/কামরুল