ঢাকা, বুধবার, ২৪ আষাঢ় ১৪২৭, ০৮ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

কষ্টগুলো এখন আমাকে প্রতিদান দিচ্ছে: রাকিবুল

কামরুল ইসলাম ইমন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৫-২৯ ৭:৩৭:২৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৫-৩০ ২:৫২:৫৪ পিএম

‘বুকের ভেতর আছে প্রত্যয়, আমরা করবো জয় নিশ্চয়ই’- গীতিতে নিজেদের উদ্বুদ্ধ করা বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ক্রিকেটাররা বৈশ্বিক ক্রিকেটে প্রথম উড়িয়েছেন লাল-সবুজের পতাকা।

দেশকে দিয়েছেন সবচেয়ে বড় অর্জন। আর সে বিশ্ব জয়ের জয়সূচক রান এসেছিল রাকিবুল হাসানের ব্যাট থেকে। মূলত বাঁহাতি স্পিনে সিদ্ধহস্ত এই ক্রিকেটার পচেফস্ট্রুমের সেই ফাইনালে অধিনায়ক আকবরের সঙ্গে জুটি বেঁধে কাটিয়ে দিয়েছেন বন্ধুর পথ। শেষদিকে চার মেরে খেলাটাকে গুছিয়ে নিয়েছিলেন। এরপর আনকেলেকরকে ডিপ মিড উইকেটে ঠেলে জয়সূচক রান। ব্যাস তাতেই, উনিশের হাত ধরে বিশে হলও বিশ্বজয়।

রাকিবুলের কাছেও সেই স্মৃতি আজও অম্লান,‘জয়সূচক রানটা যখন নিলাম, ওটাই আমার কাছে বিশ্বকাপের সবচেয়ে ভালো মুহূর্ত।’ তবে ওই এক রানের আগের ওভারে চার মেরে উল্লাস শুরু করেও থামিয়ে দিয়েছিলেন পুচকে রাকিবুল। বুঝেছিলেন ফিনিশিং লাইন তখনও  ক্রস করা হয়নি। সে জন্যই বাড়তি সতর্কতা।   

‘সত্যি বলতে ওই চারটা মারার পর একটু উত্তেজিত হয়ে গেছিলাম। পরে ভাবলাম, না আরও দুই রান লাগে। তখন নিজেকে নিজে বোঝাচ্ছিলাম। আরও দুই রান বাকী, ওই দুই রান করে ম্যাচ শেষ করতে হবে।’

বল হাতে বিশ্বকাপে আলো ছড়িয়েছেন এ বাঁহাতি স্পিনার। উইকেট নিয়েছেন ১২টি। নামের পাশে আছে একটি হ্যাটট্রিকও। স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে ১৯ রানে তার শিকার পাঁচ ব্যাটসম্যান। নিজের সাফল্যের থেকে দলের সাফল্য রাকিবুলের কাছে বড়। আর বড় দলের বিপক্ষে চোখ রাঙিয়ে শিরোপা জেতায় তৃপ্তি তিনি।

‘বড় বড় দলের সাথে একটু আক্রমণাত্মক থাকতে হয়। ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ওরা মাঠে খুব আক্রমণাত্মক থাকে, স্লেজিং করে। তাই ওদের সাথে ওইভাবে খেলা উচিত।ভারতের সাথে এর আগে আমরা দুটি এশিয়া কাপ ও ট্রাই নেশন কাপের ফাইনাল হেরেছিলাম। তাই এবার মাথায় কেবল একটা কথা ছিল, আবার ওদের ফাইনালে পেয়েছি তো হারাবোই।’

‘আমরা জানতাম ভারত মাঠে অনেক আক্রমণাত্মক থাকবে। ফলে তাদেরকে যদি পাল্টা আক্রমণাত্মক মনোভাব দেখানো যায়, খেলা যায় তাহলে ওদের হারানো সম্ভব। আমরা কেবল ওইটাই চেষ্টা করেছি।’

যদি কোনও কারণে ফসকে যেত স্বপ্নের শিরোপা! তাহলে আফসোসের অনলে ঠিক কতটা পুড়তেন রাকিবুল? জানালেন, অনেক বেশি। হয়তো হারিয়েও যেতেন! এজন্য নিজেকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতেন! রাকিবুলের কণ্ঠে, ‘অনেক অনেক আফসোস হতো। খুব দুঃখ লাগতো এই ভেবে যে, আরেকটা ফাইনাল ভারতের কাছে হেরে গেলাম! ব্যক্তিগত জায়গা থেকে ভাবতাম, নিজে ভালো খেলতে পারিনি, হয়ত আমি আমার সেরাটা দিতে পারিনি বলে ফলাফল আমাদের পক্ষে আসেনি। প্রচুর আফসোস থাকতো।’

বিশ্বকাপজয়ী রাকিবুলকে নিয়ে পরিবারের অনেক গর্ব। অথচ একটা সময় পরিবার থেকে কোনও সমর্থন পাননি। বাবার ছোটখাটো চাকরির (প্রাইভেট কার চালক) বিপরীতে রাকিবুলদের পরিবারে ক্রিকেট ছিল বিলাসিতা। অথচ এ ক্রিকেটই এখন রাকিবুলের পরিবারের সবচেয়ে বড় পরিচয়। পরিবারও এখন দিচ্ছেন অকুণ্ঠ সমর্থন। একসময় বাবা-মা আটকে রাখতেন। ক্রিকেটের জন্য উত্তম মধ্যম দিতেন। তাঁরাই বলছেন মাঠে যাও। রাকিবুলও এই ক্রিকেট দিয়ে চেষ্টা করছেন পরিবারকে সহায়তা করতে। সাথে দরিদ্রতা জয় করার আনন্দ তো আছেই।

‘পরিবারের সবাই, আত্মীয়-স্বজন সকলে এখন আমাকে নিয়ে গর্ব করে। এটা ভাবলেও আমার নিজের কাছে অনেক ভালো লাগে। আসলে সবকিছু মিলিয়ে ভালোই সময় কাটছে। অতীতের কথা মাথায় আসলে অনেক কিছু মনে পড়ে। অনেক কিছু পার করে এসেছি। তবে ভালো লাগার বিষয়, কষ্ট গুলো এখন আমাকে প্রতিদান দিচ্ছে। আমি শেষপর্যন্ত সার্থক ও সফল হতে পেরেছি।’

‘যখন শুরু করেছিলাম, তখন কারো সমর্থন ছিলও না। পরে যখন ভালো করা শুরু করলাম। তখন তারা ধীরে ধীরে বিশ্বাস করা শুরু করে। এরপর সমর্থন দিয়েছে। ক্রিকেট দিয়ে দারিদ্র্যটাও জয় করতে পারায় ভালো লাগে অনেক। নিজের প্রতিও ভালো লাগা কাজ করে। আসলে যে কেউ চায় তাঁর পরিবার ভাল থাকুক। সেখান থেকে অনেক ভালো লাগে।’

‘শুরুতে অনেক চ্যালেঞ্জ ছিল। যদি ভালো করতে না পারতাম, তাহলে ওরা আমাকে সুযোগও দিতো না। সেখান থেকে ভয়ও ছিল আবার নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাসও ছিল। জানতাম, কিছু করতে পারলে ক্রিকেট থেকেই করতে পারবো।’ - বলেছেন রাকিবুল।

এ পর্যায়ে উঠে আসতে আলাদিনের প্রদীপ পাননি। নিজের কষ্টে, পরিশ্রমের ফলে রাকিবুল পেয়েছেন নিজেকে,‘আমি সপ্তাহের ছয়দিন আবাহনী মাঠে অনুশীলন করতাম। পারলে সাতদিনই। আড্ডা তেমন দিতাম না। হয়ত সপ্তাহে এক-দুইদিন ২-৩ ঘণ্টার জন্য বেরুতাম। আর বের হলেও ফাস্টফুড বা এইরকম কিছু খেতাম না। শুধু নিজের ক্রিকেটের জন্যই।’

সম্প্রতি রাকিবুলের আইডল বাংলাদেশ ক্রিকেটের সেরা তারকা সাকিব আল হাসান বলেছেন, ‘অনূর্ধ্ব-১৯ দল বিশ্বকাপ কীভাবে জিততে হয় দেখিয়ে দিয়েছে। তাঁরাই পারবে বাংলাদেশের হয়ে বড় মঞ্চে ভবিষ্যৎ বিশ্বকাপ এনে দিতে।’ সে কথার সাথে একমত হয়েছিলেন রাকিবুলের অধিনায়ক আকবর আলীও। রাকিবুলও সুর মিলিয়েছেন এক সুরে। তিনি বিশ্বাস করেন, অভিজ্ঞতা নিয়ে বিশ্বকাপে গেলে সাফল্য এনে দিতে পারবেন।

‘অনূর্ধ্ব-১৯ দলে আমরা অভিজ্ঞ দল নিয়ে গেছি। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কাজটা আসলে অনেক কঠিন। অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায় আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট তো আর এক না। সেখানে চাপ আরও বেশি। তবে আমরা যদি দুই তিন বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে তারপর বিশ্বকাপে যেতে পারি। তাহলে কিছু একটা সম্ভব।’

সে সম্ভবকে বাস্তব রূপ দেবেন রাকিবুলের মতো সুপার হিরোরা। এগিয়ে যাবেন আরও বহুদূর। ইতিমধ্যে বাংলাদেশকে যুব বিশ্বকাপ জিতিয়ে হয়েছেন সবার ভালোবাসার পাত্র। তাদের প্রতি আশাও তাই সীমাহীন। সে ভালোবাসা আর আশাকে কাজে লাগিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চান রাকিবুল। সবার কাছে দোয়া চেয়ে তাই এই ক্রিকেটার বলেন,‘আমাদের প্রতি দেশের সবার ভালোবাসা, দোয়া আর আশা বেড়ে গেছে। ওইটাকে অনুপ্রেরণা হিসেবে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাবো।’

 

ঢাকা/কামরুল/ইয়াসিন