ঢাকা     মঙ্গলবার   ০৪ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ১৯ ১৪২৭ ||  ১৪ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

risingbd-august-banner-970x90

বিশ বছরে টাইগারদের সেরা পাঁচ টেস্ট জয় (তৃতীয় পর্ব)

|| রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৯:৩৮, ৩ জুলাই ২০২০  

ক্রিকেট আবিষ্কারক দেশ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সাদা পোষাকে বাংলাদেশের প্রথম টেস্টে জয় পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে দশম টেস্ট পর্যন্ত। ২০১৬ সালে ঘরের মাঠে দুই টেস্ট সিরিজের প্রথমটিতে চট্টগ্রামে মাত্র ২২ রানের আক্ষেপে পোড়ে বাংলাদেশ। তবে দ্বিতীয় টেস্টে মিরপুরে ১০৮ রানের বিশাল ব্যবধানে জয় তুলে নেয় টাইগাররা। বাংলাদেশের জন্য সেটি ছিল অষ্টম টেস্ট জয়। রাইজিংবিডির পাঁচ পর্বের ধারাবাহিক ‘বিশ বছরে সেরা পাঁচ জয়’-এর তৃতীয় পর্ব আজকে সাজানো হয়েছে সে ম্যাচ নিয়েই।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট জয়ের জন্য মরিয়া অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম ঘরের মাঠে স্পিন সহায়ক উইকেট তৈরি করতে বলেন। আর ইংরেজদের কাবু করতে দলে আনেন অচেনা এক অস্ত্র। সেই অস্ত্র কাজে এসেছিলেন প্রথম ম্যাচে, শিকার করেন ৭টি উইকেট। কার কথা বলছি, বুঝে গেছেন নিশ্চয়! মেহেদী হাসান মিরাজ। তবে দারুণ বোলিং করেও চট্টগ্রামের সেই টেস্টে বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত করতে পারেননি তরুণ এই তুর্কি।

আর সেই আক্ষেপ ঘোচাতেই দ্বিতীয় ম্যাচে আরও প্রবলভাবে জ্বলে উঠেছিলেন এই ডানহাতি অফ স্পিনার। স্পিন সহায়ক উইকেট পেয়ে সেখানে বল ঘুরিয়েছেন দারুণভাবে। একাই ধসিয়ে দিয়েছিলেন ইংলিশ ব্যাটিং লাইনআপ।

অধিনায়কের চাহিদামতো মিরপুরে স্পিন স্বর্গরাজ্য বানিয়ে দেন কিউরেটর। ফলে ম্যাচে টসের গুরুত্ব বেড়ে যায়। কারণ দুই দলই ৪র্থ ইনিংসে ব্যাট করা এড়িয়ে যেতে চাইছিল। তবে সেদিন টস ভাগ্য ছিল মুশফিকের পক্ষেই। মুশফিকও দ্বিধায় না ভুগে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন।

আগে ব্যাটিং করলেও শুরুটা অবশ্য ভালো ছিল না বাংলাদেশের। রানের খাতা খুলেই দলীয় ১ রান করে বিদায় নেন ইমরুল কায়েস। এরপর সতর্কতার সঙ্গে খেলতে থাকেন তামিম ইকবাল ও মুমিনুল হক। লাঞ্চের আগেই ফিফটি পূর্ণ করেন তামিম। দলীয় ১১৮ রানে তামিম ৬৮ ও মমিনুল ৪৪ রানে অপরাজিত থেকে মধ্যাহ্নভোজে যান।

ফিরে এসেও দাপটের সঙ্গে খেলতে থাকেন এই দুই বাঁহাতি। শুরুর ধাক্কা সামলিয়ে গড়ে তোলেন ১৭০ রানের জুটি। আর সেখানে বড় অবদান তামিমেরই। এই ওপেনার সেঞ্চুরি তুলে নেন ১৩৯ বলে। তবে এরপরই ঘটে বিপত্তি। ব্যক্তিগত ১০৪ রান করে মঈন আলীর বলে এলবিডাব্লিউ হয়ে ফেরেন তিনি। এর কিছুক্ষণ পরে ৬৬ রান করে ফেরেন মুমিনুলও। এরপরই নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে বাংলাদেশ।

১৭১/১ স্কোর থেকে এক সেশনে ৯ উইকেট হারিয়ে বসে বাংলাদেশ। শেষ ৪৯ রানে ৯ উইকেট হারিয়ে টাইগাররা প্রথম ইনিংসে সংগ্রহ করে ২২০ রান। তামিম ও মুমিনুলের পর কেবল মাহমুদুল্লাহ (১৩) ও সাকিব (১০) ছুঁতে পারেন দুই অঙ্কের ফিগার। ইংল্যান্ডের পক্ষে মঈন আলী ১৯.৫ ওভার বল করে ৫৭ রান খরচায় ৫ উইকেট শিকার করেন।

নিজেদের প্রথম ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নেমে ভালো করতে পারেনি ইংল্যান্ডও। ওপেনার বেন ডাকেটকে ইংল্যান্ড ইনিংসের ১১তম বলে মুশফিকের ক্যাচ বানিয়ে ফেরান সাকিব আল হাসান। এর দুই ওভার পর আরেক ওপেনার অ্যালিস্টার কুককে এলবির ফাঁদে ফেলেন মেহেদী মিরাজ। এরপর তৃতীয় উইকেট জুটিতে গ্যারি ব্যালেন্সকে নিয়ে দলের ইনিংস বড় করার চেস্টা করতে থাকেন জো রুট। কিন্তু দৃশ্যপটে আবার হাজির মিরাজ। ৯ রান করা গ্যারে ব্যালেন্সকে আউট করে ভাঙেন তাদের ১৮ রানের জুটি। স্কোরবোর্ডে ৩ উইকেটে ৫০ রান নিয়ে প্রথম দিন শেষ করে ইংল্যান্ড। ৭ উইকেট হাতে নিয়ে পিছিয়ে থাকেন ১৭০ রানে।

দ্বিতীয় দিন খেলা শুরুর তৃতীয় ওভারের মাথায় আবারও আঘাত হানেন মিরাজ। দলীয় ৬৪ রানে ফেরান মঈন আলীকে (১০)। এরপর দলীয় পাঁচ রান যোগ করতে তাইজুল বেন স্টোকসকে শূন্য রানে ফেরালে ইংল্যান্ডের স্কোর দাঁড়ায় ৬৯/৫।

এরপরই প্রতিরোধের শুরু সফরকারিদের। রুট এবং বেয়ারস্টো গড়েন ৪৫ রানের জুটি। ষষ্ঠ উইকেট হিসেবে মিরাজ বেয়ারস্টোকে ফেরালেও দারুণ খেলে ফিফটি তোলেন রুট। এরপর সে ম্যাচে অভিষিক্ত জাফর আনসারীকে (১৩) ফিরিয়ে দিয়ে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ফাইফার তুলে নেন মিরাজ। এক ওভার পর তাইজুল রুটকে ফেরালে ১৪৪/৮ স্কোর দাঁড়ায় ইংল্যান্ডের।

তবে এরপরই বাংলাদেশের সামনে বিপদ হয়ে আসে ক্রিস ওকস এবং আদিল রশিদ। এই দুই লোয়ার অর্ডার ব্যাটসম্যান নবম উইকেটে গড়েন ৯৯ রানের দুর্দান্ত এক জুটি। অবশেষে মিরাজ আবারও ত্রাতা হয়ে আসেন। ৪৬ রান করা ওকসকে ফেরান দলীয় ২৪৩ রানে। রশিদ-ওকসের ব্যাটিংয়ে ২৩ রানের লিড নিয়ে ফেলে ইংল্যান্ড। তবে তাইজুল সেটি বেশি বাড়তে দেননি। স্টিভেন ফিনকে দলীয় ২৪৪ রানে ফিরিয়ে ইংল্যান্ডকে থামান এই বাঁহাতি স্পিনার। তবে ইনিংসে মিরাজ ৮২ রানে ৬ উইকেট শিকার করে সফরকারীদের আটকে রাখেন। এছাড়াও তাইজুল ও সাকিব পান যথাক্রমে ৩টি ও ১টি করে উইকেট।

২৪ রানে পিছিয়ে থাকা টাইগাররা দ্বিতীয় ইনিংসে উড়ন্ত সুচনা করে। ৯.১ ওভারেই পঞ্চাশ রান তুলে ফেলে ইমরুল-তামিম। দলীয় ৬৫ রানে তামিমকে (৪০ রানে) ফিরিয়ে ক্যারিয়ারের প্রথম উইকেট তুলে নেন বাঁহাতি স্পিনার আনসারি। এদিকে নেমেই ২ বলে ১ রান করে মুমিনুলও আউট হয়ে যান। এরপর ইমরুলের সঙ্গী হোন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। ৮৬ রানের জুটি গড়েন এ দুজন। ফিফটি হতে ৩ রান দূরে থাকতে দলীয় ১৫২ রানে ফেরেন রিয়াদ। বাংলাদেশও দ্বিতীয় দিন শেষ করে ১৫২/৩ নিয়ে।

কল্পনাতীত ভাবে ম্যাচের তৃতীয় দিন শেষ দিন হিসেবে আবির্ভূত হয়। এদিন মোট উইকেট পড়ে ১৭টি! যার শুরু ইমরুলকে দিয়ে। আগের দিন দুর্দান্ত খেলতে থাকা ইমরুল এদিন দলীয় ২০০ রানের মাথায় ৭৮ রান করে মঈনের বলে এলবিডব্লুর শিকার হয়ে ফেরেন।

এরপরে মুশফিককে নিয়ে ৩৮ রানের জুটি গড়েন সাকিব। এরপর ৭ বলের ব্যবধানে দলীয় কোনো রান যোগ না করে সাকিব (৩৮ রান) ও মুশফিক (৯ রান) দুজনেই ফেরেন। বাংলাদেশের স্কোর দাঁড়ায় ২৩৮/৬। তবে সেখান থেকে দলীয় স্কোর ২৯৬ রান করার পেছনে দারুণ অবদান রাখেন শুভাগত হোম। ২৮ বলে ২৫ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি। আর সঙ্গীদের আসা যাওয়ার মিছিল দেখেন। তবে সবার অবদানে শেষ পর্যন্ত ২৭২ রানের লিড পায় বাংলাদেশ।

২৭৩ রানের লক্ষ্যে খেলতে নেমে অসাধারণ সুচনা করেন অধিনায়ক কুক ও ডাকেট। নিজের দ্বিতীয় টেস্ট ম্যাচেই ফিফটির দেখা পান ডাকেট। ইংল্যান্ডও শতরান ছুঁয়ে ফেলে ২২তম ওভারে। দুই ওপেনারের কল্যাণে তৃতীয় দিনের দ্বিতীয় সেশন ইংল্যান্ড শেষ করে বিনা উইকেটে ১০০ রানে।

তবে চা বিরতি থেকে আসার পরেই শুরু হয় সাকিব ও মিরাজের তান্ডব। বিরতির পরে প্রথম বলেই মিরাজের বলে বোল্ড হয়ে ফিরেন ডাকেট। এরপরই ১ রান করে সাকিবের শিকার হোন রুট। স্পিনের বিরুদ্ধে খেলতে গিয়ে মিরাজের বলে মিড অফে তামিমের হাতে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফিরেন ব্যালেন্স। শূন্য রানে করা মঈনও ফেরেন মিরাজের বলে। এদিকে টাইগারদের জয়ে বাধা হয়ে দাঁড়ানো কুককেও ৫৯ রানে প্যাভিলিয়নে পাঠান মিরাজ। ১০০/০ থেকে ইংল্যান্ডের স্কোর নিমিষের মধ্যে ১২৭/৫ হয়ে পড়ে।

শেষ ৫ উইকেট তুলে নিতেও বেশি সময় নেয়নি টাইগার বোলাররা। খরচ করেন মাত্র ৩৭ রান। এরমধ্যে কিছুটা প্রতিরোধ গড়ার চেস্টা করেন স্টোকস ও ওকস। তবে প্রতিপক্ষ দলে যখন সাকিব থাকেন, তখন কিছুই যেন করার থাকে না গেল অ্যাশেজে হেডিংলি টেস্টের নায়ক স্টোকসেরও। ২৫ রান করা স্টোকসকে অসাধারণ এক বলে বোল্ড করে প্যাভিলিয়নের পথ দেখিয়ে স্যালুট ঠুকেন সাকিব। যা হয়ে ওঠে ম্যাচেরই ট্রেডমার্ক।

স্টোকসকে ফিরিয়ে পরের বলেই রশিদকে বিদায় করেন সাকিব। ওই ওভারের শেষ বলে আবার উইকেট নেন জাফর আনসারির। এরপর ফলাফল তো ছিল নিশ্চিত! শুধু ছিল আনুষ্ঠানিকতার বাকি। সেটাও খুব দ্রুত সেরে ফেলেন মিরাজ। সাকিবের তিন উইকেট নেওয়ার দুই ওভার পরে ফিনকে আউট করেই খুশির জোয়ারে ভাসেন মিরাজ। খুশির জোয়ারে ভাসান পুরো বাংলাদেশকেও। এ ইনিংসেও মিরাজ শিকার করেন ছয় উইকেট, আর সাকিবের চারটি। মোট ১২ উইকেট নিয়ে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হোন ওই সিরিজের অভিষিক্ত মিরাজ। ২ ম্যাচে ১৯ উইকেট নিয়ে ম্যান অব দ্য সিরিজও হোন এই তরুণ তুর্কি।

পরের পর্বে থাকছে আরও একটি ঐতিহাসিক জয়ের গল্প। আর অনুমিত ভাবে সেটি অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মিরপুর টেস্টের জয়। সেই গল্প জানতে চোখ রাখুন রাইজিংবিডি.কম-এ।

 

ঢাকা/কামরুল

রাইজিংবিডি.কম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়