ঢাকা, রবিবার, ৩ ভাদ্র ১৪২৬, ১৮ আগস্ট ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত রাজধানীর ১০ জাদুঘর

বরুণ দাস : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৮-১২-১৬ ২:০২:৪৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০২-১৮ ১:৩১:৩০ পিএম
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত রাজধানীর ১০ জাদুঘর
Walton E-plaza

বরুণ দাস : ডিসেম্বর আমাদের জীবনে একটি ভিন্ন মাত্রা নিয়ে আসে। এটি আমাদের মুক্তি সংগ্রামের প্রেরণায় প্রত্যয়বদ্ধ হওয়ার মাস। নতুন করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শপথ নেয়ার মাস। ১৯৭১-এর মার্চ মাস থেকে ডিসেম্বর- এই দীর্ঘ নয় মাস পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী নিরীহ বাঙালির উপর চালিয়েছে নির্মম, অকথ্য, অসহনীয় অত্যাচার। লাখ লাখ ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। অমানবিকভাবে হত্যা করেছে তিরিশ লাখ নিরীহ নারী-পুরুষকে। সম্ভ্রমহানি করেছে অসংখ্য নারীর। এত কিছুর পরও বিশ্বের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সৃষ্টি করেছিল বাংলাদেশ। সেইসব গৌরবগাঁথার অনেক কিছুই সংরক্ষিত আছে ঢাকার বিভিন্ন জাদুঘরে।

বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর : রাজধানীর কর্মব্যস্ত এলাকা শাহবাগে অবস্থিত জাতীয় জাদুঘর। বর্তমানে এর নিদর্শনের সংখ্যা ৮৬ হাজারেরও বেশি। প্রায় সাড়ে আট একর পরিমাণ জমির ওপর গড়ে ওঠা চারতলাবিশিষ্ট এ ভবনে নিদর্শন প্রদর্শনের জন্য রয়েছে ৪৫টি গ্যালারি। দোতলা, তিনতলা ও চারতলায় অবস্থিত এ গ্যালারিগুলোতে ৩০ হাজার নিদর্শন উপস্থাপিত আছে। বাকি নিদর্শনগুলো আছে গুদামজাত অবস্থায়। পালা করে এসব নিদর্শন গ্যালারিতে প্রদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ৩৮, ৩৯ এবং ৪০ নম্বর গ্যালারিতে রয়েছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন নিদর্শন।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর : ১৯৯৬ সালের ২২মার্চ ঢাকার ৫ নম্বর সেগুনবাগিচায় সম্পূর্ণ বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই জাদুঘর গড়ে উঠেছিল ১২ কাঠা জায়গা নিয়ে। প্রতিষ্ঠার ২১ বছর পর নিজস্ব ভবন এফ-১১/এ-বি, সিভিক সেক্টর, আগারগাঁও, ঢাকা- এই ঠিকানায় স্থানান্তরিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। এই জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারিতে রয়েছে- পাকিস্তানী শাসনামলের শুরু থেকে ১৯৭০-এর নির্বাচন পর্যন্ত ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত বিবরণ, ১৯৭১-এর অসহযোগ আন্দোলন ও অন্যান্য নিদর্শন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের উদাত্ত ভাষণের ঐতিহাসিক আলোকচিত্র, রয়েছে ২৫ মার্চের কালোরাত্রি, বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার আলোকচিত্র এবং ১৭ এপ্রিল অস্থায়ী সরকারের ঐতিহাসিক শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের আলোকচিত্র। এছাড়াও রয়েছে  মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষের অবদানের নানা তথ্য, রয়েছে প্রতিরোধ লড়াই, গেরিলা যুদ্ধ, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন, বৈদেশিক সমর্থন বিশেষ করে ভারতীয় জনসাধারণের সমর্থনের প্রতিচ্ছবির নানা তথ্য সম্ভার। আছে গণহত্যা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা, বীরশ্রেষ্ঠ, শহীদ বুদ্ধিজীবী, চূড়ান্ত লড়াই ও মুক্তিযুদ্ধে বিজয় সম্পৃক্ত বিভিন্ন স্মারক, বিবরণ ও ছবি। সেইসাথে রয়েছে পাকবাহিনীর বর্বরতা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা, প্রাথমিক প্রতিরোধ, প্রবাসী সরকার ও সেক্টর কমান্ডারদের তৎপরতার বিবরণ। রয়েছে অস্থায়ী সরকারের মন্ত্রীসভা ও প্রশাসন সম্পর্কিত বিভিন্ন জিনিসপত্র, দলিল, সেক্টর কমান্ডারদের ব্যবহৃত সামগ্রীও রয়েছে বিভিন্ন গ্যালারিতে।

বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর : ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ১০ নম্বর বাড়িতে ১৯৬১ সাল থেকে সপরিবারে বাস করতেন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই বাড়িটিই কালের পরিক্রমায় আজ ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে পরিচিত।
যেসব কারণে এই বাড়িটির ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে- এই বাড়ি থেকেই ১৯৬৬ সালে বাঙালির মুক্তিসনদ ঐতিহাসিক ৬ দফার ঘোষণা দেয়া হয়। ১৯৬১ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত মোট ১২বার বঙ্গবন্ধু এই বাড়ি থেকে গ্রেফতার হন। এই বাড়ি থেকেই পরিচালিত হয়েছে ১৯৬৯-এর ঐতিহাসিক ছাত্র গণঅভ্যুত্থান। পরিচালিত হয়েছে ১৯৭০ সালের নির্বাচন, ১৯৭১ সালের মার্চব্যাপী ইতিহাসের নজিরবিহীন অসহযোগ আন্দোলন।  ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানী বাহিনীর গণহত্যা শুরু হলে ঐ দিবাগত রাত সাড়ে বারোটায় বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। একই রাতে অর্থাৎ ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে ইয়াহিয়ার সামরিক সরকার বঙ্গবন্ধুকে এই বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে পাকিস্তান কারাগারে বন্দি করে। বাংলাদেশ স্বাধীন হলে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি তিনি আবারো এই বাড়িতে এসেই ওঠেন। পরবর্তীতে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর কতিপয় উচ্চাভিলাষী সদস্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পরিবারের উপস্থিত অন্যান্য সকল সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করে।  তাঁর স্মৃতিবিজড়িত অনেক কিছুই সংরক্ষিত রয়েছে এই জাদুঘরে।

সোহরাওয়ার্দী পাতাল জাদুঘর : বর্তমানে আমরা যে জায়গাটিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নামে চিনি বা জানি; পূর্বে এর নাম ছিল রমনা রেসকোর্স ময়দান। পরে বাংলার মহান রাজনীতিবিদ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নামে এর নামকরণ করা হয়। নানা কারণেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বাংলার ইতিহাসের সাথে সম্পৃক্ত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ঐতিহাসিক স্থান হিসেবেও এর  গুরুত্ব অপরিসীম।

 



একাত্তরসহ অন্যান্য সকল ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতে অসংখ্য স্মৃতি বিজড়িত এই উদ্যানে নির্মিত হয়েছে একটি পাতাল জাদুঘর। এই জাদুঘরে প্রবেশের পর প্রথমেই হাতের ডানে রয়েছে অডিও ভিজ্যুয়াল রুম। তারপর শুরুতে আছে বড় আকারের খোলা গ্যালারি; যেখানে স্থান পেয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পূর্ব ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের পটভূমির ছবি এবং লিখিত দলিলসহ চমৎকার ওয়াটারফল। গ্যালারিতে যাওয়ার পথের দু’পাশের দেয়ালে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সময় ঘটে যাওয়া নির্যাতনের ছবি। পরের খোলা গ্যালারিতে রয়েছে ড. হেনরি কিসিঞ্জারের কাছে পাঠানো স্যামুয়েল হসকিনস-এর গোপন দলিল। এখানে রয়েছে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকেল ৩টা ৩১ মিনিটে ঢাকার রেসকোর্স মযদানে যে টেবিলটির ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন তার অনুকৃতি টেবিল। আছে বেতার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার দালিলিক প্রমাণপত্রাদি। সেইসাথে ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণের মুহূর্তের বেশ বড় আকারের একটি ছবি।

জল্লাদখানা  বধ্যভূমি  জাদুঘর : মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে পল্লবীর দিকে মিনিট দশেক হাঁটলেই বেনারশি পল্লী। এর ভেতরের রাস্তা ধরে আরও কয়েক মিনিট হাঁটলেই শেষ মাথায় জল্লাদখানা বধ্যভূমি জাদুঘর। কসাইখানা জাদুঘর নামেও এটির বেশ পরিচিতি রয়েছে। এখানে ২০ হাজারের বেশি বাঙালিকে মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা করা হয়। পাকিস্তানি হানাহার, অবাঙালি বিহারি আর তাদের দোসররা মিলে এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়। রাজধানীর বিভিন্ন জায়গা থেকে বাঙালি মুক্তিযোদ্ধা, লেখক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীদের ধরে এনে এই জায়গায় হত্যা করা হতো।
এ জাদুঘরের আয়তন খুবই সামান্য। ছোট্ট এই জায়গায়ই মুক্তিযুদ্ধে স্মৃতিগুলোকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে চমৎকারভাবে। ভেতরে প্রবেশ করতেই এক টুকরো সবুজ মাঠ স্বাগত জানাবে। এর চারপাশেই স্বচ্ছ কাচের বাকসোর ভেতরে মাটির সরায় সংরক্ষণ করা আছে বিভিন্ন বধ্যভূমির মাটি। একটি ছোট ঘরের ভেতরে বধ্যভূমির কূপটি স্বচ্ছ কাচে ঘেরা রয়েছে। ছোট ছোট ঘরের ভেতরে সংরক্ষিত রয়েছে শহীদদের স্মৃতি সংবলিত বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন।

ঢাকা সেনানিবাস  বঙ্গবন্ধু জাদুঘর : ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। ১৯৬৭ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ দিকে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান পূর্ব পাকিস্তান সফরে এসে খুলনায় এক জনসভায় বলেন, আওয়ামী লীগ ও ন্যাপ নামে দুটি পার্টি পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে আলাদা করার ষড়যন্ত্র করছে। ১৯৬৮ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে সরকার এক গেজেট বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশ করে, এই ষড়যন্ত্রের মূল হোতা হচ্ছেন শেখ মুজিবুর রহমান। ১৭ জানুয়ারি শেখ মুজিবকে ঐ মামলায় বেকসুর খালাস দিয়ে পুনরায় তাৎক্ষণিকভাবে সামরিক বিধির আওতায় ১৮ জানুয়ারি জেল গেটেই গ্রেফতার করা হয়। আগরতলায় বসে ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল বলে এই মামলার নাম দেওয়া হয় ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’। আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অপরিহার্য প্রয়োজনে এবং আগামী প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এক সংকটময় সময়ের অবস্থান সম্পর্কে অবহিত রাখার উদ্দেশে সেনানিবাসের যে ভবনটিতে তাঁকে বন্দী করে রাখা হয়েছিল সেখানেই এই জাদুঘর নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এরপর আগরতলা মামলা সংক্রান্ত প্রামাণ্য দলিল, মামলার কার্যবিবরণী, অভিযুক্ত ও সাক্ষীদের পরিচিতি ও ছবি এবং বন্দী থাকাকালে বঙ্গবন্ধুর ব্যবহৃত জিনিসপত্র দিয়ে জাদুঘরটিকে সাজানো হয়। ঢাকা সেনানিবাসের ভেতরে স্টাফ রোডের মোড় থেকে শহীদ সরণি ধরে উত্তর দিকে চারশো গজ এগোলে আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজের উল্টোদিকে চোখে পড়বে ঢাকা সেনানিবাস বঙ্গবন্ধু জাদুঘর। এর সবচেয়ে দর্শনীয় বস্তু হচ্ছে ভিআইপি রুম যেখানে বঙ্গবন্ধুকে অন্তরীণ করে রাখা হয়েছিল। এই কক্ষটি সে-সময়ে যে অবস্থায় ছিল ঠিক সেভাবেই সংরক্ষণ করা হয়েছে। অন্তরীণ অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর ব্যবহৃত কাপড়, ধূমপানের পাইপ ও ধূমপান সামগ্রী, খাট ও অন্যান্য আসবাবপত্র, চিত্তবিনোদনের জন্য রেকর্ড প্লেয়ার প্রভৃতি যেখানে যে অবস্থায় ছিল সেভাবেই রাখা হয়েছে। পাশের আর একটি স্টোর রুমে আগের মতোই রয়েছে চাল, ডাল, তেল, চিনি, চা প্রভৃতি সামগ্রী বস্তা ও ভাণ্ড। এছাড়া জাদুঘরজুড়ে রয়েছে দেয়ালের উপর প্রান্ত বরাবর সাজানো পিতলখচিত বিভিন্ন ধরনের প্রতীকী ফলক।

 



বাংলাদেশ বিমানবাহিনী জাদুঘর : বাংলাদেশের সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সদস্যদের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। ১৯৮৭ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ বিমানবাহিনী জাদুঘর। এতে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর জন্ম, মুক্তিযুদ্ধকালে এর ভূমিকা এবং স্বাধীনতা-উত্তরকালে বিমানবাহিনীর বিভিন্ন কার্যক্রম ও আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া নানাভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এখানে স্বাধীনতা যুদ্ধে ব্যবহৃত বিমান থেকে শুরু করে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে সংযোজিত বিভিন্ন ধরণের বিমান ও সাজ-সরঞ্জাম প্রদর্শনীর জন্য বাংলাদেশ বিমানবাহিনী জাদুঘর স্থাপিত হয়। জাদুঘরে রাখা বিমানগুলো বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর পর্যায়ক্রমিক ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে। এছাড়া জাদুঘরে উপস্থাপিত ম্যুরাল চিত্রে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তি সংগ্রামকে তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও সহায়ক শক্তি ভারতীয় মিত্রবাহিনী কর্তৃক ব্যবহৃত তিনটি জঙ্গী বিমান ও কিছু স্মারক গোলাবারুদ সম্প্রতি ভারতীয় বিমানবাহিনী বাংলাদেশ বিমানবাহিনী জাদুঘরকে হস্তান্তর করেছে। এই জঙ্গী বিমানগুলো মিত্রবাহিনী কর্তৃক হানাদার বিমান আক্রমণকে প্রতিহত এবং ভূপাতিত করতে ব্যবহৃত হয়েছিল। এ জাদুঘরে প্রদর্শিত নিদর্শনসমূহ ঐতিহাসিক আলোকচিত্রর মধ্যে রয়েছে- স্বাধীনতা যুদ্ধে ব্যবহৃত কানাডায় নির্মিত একটি অট অটার বিমান, স্বাধীনতা যুদ্ধে ব্যবহৃত ফ্রান্সের তৈরি একটি এলুয়েট হেলিকপ্টারসহ বিভিন্ন দেশের বেশ কিছু হেলিকপ্টার, প্রশিক্ষণ বিমান, জঙ্গী বিমান এবং গোলাবারুদ।

বাংলাদেশ রাইফেলস জাদুঘর : বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশ রাইফেলস-এর ভূমিকা ও অবদান স্মৃতিতে ধরে রাখার লক্ষ্যে ১৯৯৬ সালে ঢাকার পিলখানায় বাংলাদেশ রাইফেলস জাদুঘরটি স্থাপিত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি, ৭ জন বীর শ্রেষ্ঠের জীবনবৃত্তান্ত ও ছবি, প্রাচীন বাংলার ঐতিহাসিক পটভূমিসহ শাসকদের ছবি, বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের ছবি, ভাষা আন্দোলনে শহীদদের ছবি, ব্রিটিশ রৌপ্যমুদ্রা ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নানা নির্দশন এবং পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর অমানুসিক নির্যাতন ও অত্যাচারের বিভিন্ন ছবি ও তথ্য, স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশের বিভিন্ন রাণাঙ্গনে নেতৃত্বদানকারী সেক্টর কমান্ডারদের নামসহ এলাকার নকশা ইত্যাদি রাইফেলস জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।
কালের বিবর্তনে ৭ বার পরিবর্তিত বাংলাদেশ রাইফেলসের পোশাকে সজ্জিত ৭টি ভাস্কর্য জাদুঘরে উপস্থাপিত আছে যা বাংলাদেশ রাইফেলস-এর দুইশ বছরের ঐতিহ্যের নির্দশন বহন করছে। স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে ডাকটিকেটসহ বিভিন্ন দেশের স্মারক ডাকটিকেট, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রকাশিত পুস্তক সংরক্ষিত আছে এবং বর্তমান বিডিআর-এর কার্যক্রমের উপর বেশ কিছু ছবি ও স্যুভিনিরও রয়েছে।

বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর : ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী একযোগে আক্রমণ চালিয়েছিল ঢাকায় রাজারবাগ পুলিশ লাইনসহ পিলখানা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে রাজারবাগ পুলিশ লাইনেই বাঙালি পুলিশ সদস্যদের দ্বারা পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রথম প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। একই সঙ্গে পুলিশ সদস্যরা বেতার যন্ত্রের মাধ্যমে সারাদেশের থানাগুলোতে ঢাকা আক্রান্ত হওয়ার বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছিল। ফলে প্রতিরোধ যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে পুলিশ সদস্যদের ওই গৌরবোজ্জ্বল ত্যাগকে নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে ঢাকায় রাজারবাগ পুলিশ লাইনে স্থাপিত হয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। এই জাদুঘরে সেই স্মৃতিবহ বেতার যন্ত্রটি ছাড়াও স্থান পেয়েছে একটি পাগলা ঘণ্টা, যেটি বাজিয়ে সেই রাতে পুলিশ সদস্যদের একত্রিত করা হয়েছিল। রয়েছে পুলিশ সদস্যদের ব্যবহৃত রাইফেল, বন্দুক, মর্টারশেল, হাতব্যাগ, টুপি, চশমা ও ইউনিফর্ম।

 



মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পুলিশের মহাপরিদর্শক বেতারে ভাষণ দিয়ে পুলিশ সদস্যদের উজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছিলেন। এই জাদুঘরে সেই ভাষণের কপিও রাখা আছে। এছাড়া জাদুঘরের দেয়ালজুড়ে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক বিভিন্ন ধরনের আলোকচিত্র এবং পোস্টার।

সামরিক জাদুঘর : বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সামরিক বাহিনীর রয়েছে বিশাল অবদান। আবহমান বাংলার চিরাচরিত সামগ্রিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় এ দেশের সামরিক বাহিনীর ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাফল্য আর উন্নয়নের ক্রমবিকাশ সংরক্ষণ ও প্রচার করার জন্য ১৯৮৭ সালে ঢাকার মিরপুর সেনানিবাসের প্রবেশদ্বারে স্থাপিত হয় বাংলাদেশ সামরিক জাদুঘর। জাদুঘরটি ১৯৯৮ সালে বিজয় সরণিতে স্থনান্তরিত করা হয়। জাদুঘরটি পরিদর্শন করলে জানতে পারা যাবে এ দেশের সামরিক ঐতিহ্য; সেইসাথে জানা যাবে মুক্তিযুদ্ধের নানা নিদর্শন সম্পর্কে।
সামরিক জাদুঘর ভবনের নিচতলায় রয়েছে অত্যাধুনিক টাচস্ক্রিন কম্পিউটার, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত চলচ্চিত্র সহজেই দেখা যাবে। দ্বিতল ভবনের নিচতলায় রয়েছে  ঐতিহাসিক যুদ্ধাস্ত্র ও বিভিন্ন সমরযান। রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানির ব্যবহৃত গাড়ি, স্বাধীনতাযুদ্ধে মুক্তিবাহিনী ও পাকিস্তানি বাহিনীর ব্যবহৃত কামান ও বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধযান। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর ও সেক্টর কমান্ডারদের তৈলচিত্র দেখতে পাওয়া যাবে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ নামক গ্যালারিতে। এ গ্যালারিতে আরও রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দলিলের অনুলিপি। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর জেনারেল নিয়াজির আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষরের মুহূর্তটি একটি বিশাল তৈলচিত্রে উপস্থপিত হয়েছে। রয়েছে বীরশ্রেষ্ঠদের তৈলচিত্র। তাঁদের বীরত্বগাঁথা উঠে এসেছে ছবিগুলোয়। সামরিক জাদুঘরের দোতলায় একটি পাঠাগারও রয়েছে। এটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আর সহায়ক রকমারি বইয়ে ঠাঁসা। যে কেউ এটি ব্যবহার করতে পারেন।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৬ ডিসেম্বর ২০১৮/তারা

Walton AC
ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন
       

Walton AC
Marcel Fridge