ঢাকা, শনিবার, ৩ কার্তিক ১৪২৬, ১৯ অক্টোবর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

ঈদের ছুটিতে ড্রাগনের শান্তিময় স্বর্গরাজ্যে

কাজী আশরাফ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৫-১৫ ২:৪১:৩৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৫-১৫ ৪:২৭:১৪ পিএম

কাজী আশরাফ: কেউ বলেন ‘অগ্নিবর্ষী ড্রাগন দেবতার দেশ’, কেউ বলেন ‘বজ্রপাতের দেশ’। আদিবাসীরা তাদের মাতৃভাষায় দেশটিকে ড্রুক ইয়ুল বা ‘বজ্র ড্রাগনের দেশ’ নামে ডাকে। যে যাই বলুক ভুটান দক্ষিণ এশিয়ার শান্তিপ্রিয় একটি দেশ। হিমালয়ের কল্যাণে উঁচু পর্বতমালা, ঘন জঙ্গল, সবুজ ভ্যালি ভুটানের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের অন্তর্গত। ভুটান শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ ভূ-উত্থান থেকে, যার অর্থ ‘উঁচু ভূমি’। অর্থাৎ ‘ল্যান্ড অব দ্য পিসফুল থান্ডার ড্রাগনস’।

হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত অপরূপ ভুটান যেন রূপকথার গল্পের মতো এক রাজ্য। সুউচ্চ পর্বত শ্রেণী দ্বারা আবৃত প্রকৃতি এবং ঝরনা সেখানকার অন্যতম শোভা। পর্বতের বুকে শ্বেত বরফের আস্তরণ তো রয়েছেই। স্থানীয়দের সংস্কৃতিও বেশ সমৃদ্ধ। দুর্গপ্রাসাদ, বৌদ্ধ মন্দীর ও পর্বতে অসংখ্য গুহা সেখানকার ইতিহাস ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে রয়েছে। দেশটির পশ্চিমে অবস্থিত হিমালয় কন্যা নেপাল, উত্তরে তিব্বত এবং পূর্বে ভারতের অরুণাচল প্রদেশ। এই ঈদে আপনি চাইলে পরিবার বা বন্ধুদের নিয়ে ভুটান ভ্রমণ করতে পারেন। এর আগে চলুন জেনে নেই দেশটিতে কী কী দেখার আছে।
 


দেশটির রজধানী থিম্পু। এটি পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম রাজধানী শহর। সমতল থেকে এর উচ্চতা প্রায় সাত হাজার ফুট।  একমাত্র রাজধানী শহর যেখানে রাজপথে কোনো সিগন্যাল বাতি নেই। নেই শব্দটি সেখানে আরও দুটি ক্ষেত্রে প্রযোজ্য- কোনো ভিক্ষুক নেই এবং গৃহহীন কোনো মানুষ নেই। রাজধানী থেকে আট কি.মি. দূরত্বে সিমতোখা দেজং। এটি একটি দুর্গ। ১৬২৭ খ্রিষ্টাব্দে দুর্গটি নির্মাণ করেন দেশের প্রথম রাজা সাবদ্রুং নাওয়াং ন্যামজেল। দেশের সবচেয়ে প্রাচীন এই দুর্গ না দেখলে আপনার অনেক কিছুই অজানা রয়ে যাবে। রাজপথ হলো ভুটানের এমন একটি জায়গা যেখানে মিলবে দেশটির সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের স্মারকস্বরূপ বিভিন্ন দ্রব্য। এখানে আপনি বিভিন্ন ধরনের সবজিও পাবেন। মূলত এটি একটি বাজার বিশেষ। গ্রামে উৎপাদিত নানা ধরনের শাকসবজি, বিখ্যাত লাল মরিচ, ঐতিহ্যবাহী  বিভিন্ন আকৃতির মুখোশ এবং হাতে বোনা গালিচা এই বাজারের অন্যতম আকর্ষণ। এছাড়াও থিম্পুর অন্যান্য আকর্ষণের মধ্যে নিউ ন্যাশনাল লাইব্রেরি, হাইকোর্ট, রাজকীয় গল্ফ কোর্স, দ্য স্কুল অব আর্টস, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ট্রেডিশনাল মেডিসিন অন্যতম। এছাড়া স্থানীয় স্থাপত্য কৌশল বা ধরনের জন্য প্রতিটি ভবন আলাদাভাবে একেকটি অনন্য সৌন্দর্যের নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

ভুটানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর পারো ভ্যালী। দেশের একমাত্র বিমান বন্দরটি এখানে অবস্থিত। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল অথচ নয়নাভিরাম অবতরণযোগ্য বিমান বন্দর বলে খ্যাত। চারিদিকে পর্বত ঘেরা ভ্যালী আপন প্রাকৃতিক লীলার কারণে ভুটানের সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয় জায়গা।  টাইগার নেস্ট নামক দৃষ্টিনন্দন ভবনটি দেখতে এখান থেকেই যেতে হয়। সুন্দরতম ‘হা ভ্যালী’ দেখতেও এখান থেকে আপনাকে যেতে হবে। পৃথিবীর বিখ্যাত ট্র্যাকিং ট্রেইল ‘দ্রুক পাথ ট্রেইল’-এর শুরু এই পারো ভ্যালী থেকে। পারোতে বেশ কয়েকটি দর্শনীয় বৌদ্ধ মন্দীর রয়েছে।
 


জিগমে দর্জি ন্যাশনাল পার্ক ভুটানের সর্ববৃহৎ সংরক্ষিত বনাঞ্চল। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম অভয়ারণ্য হিসেবে এই পার্কের অবস্থান শীর্ষে। দেশের জাতীয় ফুল ব্লু পপি, বিরল প্রজাতীর মনোহর এই ফুল পার্কের ভেতর প্রচুর দেখতে পাওয়া যায়। রয়েছে ম্যাগনোলিয়া, জুনিপার্স ফুল এবং সচরাচর দেখা যায় না এমন বহু প্রজাতীর অর্কিড। দৈত্যাকৃতির রুবার্ব এবং অতি পুরনো পাইন ও ওয়াক গাছও রয়েছে প্রচুর। প্রাণীর মধ্যে দেখা মেলে ভুটানের জাতীয় পশু টাকিন, যার শরীর গরুর মত কিন্তু মাথা ছাগলের মত। ভাগ্য ভালো থাকলে আপনি দেখতে পাবেন রেড পান্ডা, গোল্ডেন লেঙ্গুর, লেপার্ড এবং শ্বেত ভালুকসহ অন্যান্য প্রাণী।

টংসায় রয়েছে রাজ পরিবারের প্রাসাদ। এক সময় দেশটির শাসন কাজ এখান থেকেই পরিচালিত হতো। পুনাখা ভ্যালীর নৈসর্গিক সৌন্দর্যও আপনাকে মুগ্ধ করবে। এর সুনিপুণ কারুকার্য অন্যতম আকর্ষণ। এটি ফু চু (পুরুষ) এবং মু চু (নারী) নামের দুই নদী দ্বারা আবদ্ধ জায়গা।  বলতে পারেন ভুটানের অন্যতম পর্যটক আকর্ষন হলো পুনাখা ভ্যালী। বুমথাং আরেকটি জায়গার নাম। টংসা ভ্যালী থেকে পূর্বে অবস্থিত, যার উচ্চতা ২৬০০ মিটার। বায়ু পরিবর্তনযোগ্য নির্মল হাওয়ার প্রবাহ এখানকার নিত্য বিষয়। পাশাপাশি দেশের ধর্মীয় নগরী বলেও খ্যাত। এখানে রয়েছে কিছু দৃষ্টিনন্দন অতি প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দীর। মনগার দুর্গ ভুটানের স্বতন্ত্র স্থাপত্যশৈলীর আকর্ষণীয় নমুনা। মনগার নির্মিত হয়েছে ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে। বিখ্যাত এই স্থাপনায় তাদের চিরাচরিত কোনো চিত্রকর্ম উৎকীর্ণ হয়নি, যা ঐতিহ্যবাহী নির্মাণশৈলী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
 


থাসিংগাং ভুটানের সর্ববৃহৎ জেলা। এখানকার দুর্গগুলি ১৭ শতকে নির্মিত। থাসিংগাংকে বৌদ্ধ ভিক্ষু ও সন্যাসীদের গৃহনগর বলা হয়ে থাকে। আপনি এখানে দেখবেন কত নিবিষ্ট মনে ভিক্ষুগণ ধর্ম চর্চায় নিজেদের নিমগ্ন রেখেছেন। চ্যালেলা পাস পারো ভ্যালী থেকে দুই ঘণ্টা উপরের দিকে ওঠা পথ, যা দেশের সর্বাধিক সুন্দর স্থান। শীতকালে নদী ও ঝরনাগুলো জমে কাচের মত স্বচ্ছ হয়ে থাকে। আপনি দেখবেন পথের পাশে রং-বেরঙের শতসহস্র ফুলে ভরে আছে। থেকে থেকে মৃদু গতিতে তুষার ঝড়ের ঘটনা এখানে প্রতিদিনের বিষয়। কথিত আছে এই পাস তার ভক্ত পর্যটকদের আহ্বান করে মূর্ছা যাওয়ার মতো সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য। পাসে দাঁড়িয়ে দেখা যায় পর্বতের সাদা ও ধূসর চুড়া আর তার নিচে অপরূপ বিস্তীর্ণ উপত্যকাভূমি।

ভ্রমণ মানেই চোখজুড়ে সৌন্দর্য উপভোগ করা। পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বের বিষয় হলো শপিং। ভিন্ন সংস্কৃতির দেশে গিয়েছেন অথচ প্রিয়জনদের জন্য উপহার কিনবেন না তা তো হয় না। চিন্তা নেই, সে ইচ্ছা পূরণ করতে রয়েছে অতি চমৎকার ব্যবস্থা। হস্তশিল্প ও অ্যান্টিক জুয়েলারির জন্য ভুটানকে অন্যতম বিবেচনা করা হয়। হাতে বোনা কাপড়, কাঠের তৈরি জিনিসপত্র ও গালিচার সুনিপুণ কারুকার্য দেখে আপনার সৌখিন মন নেচে উঠবে। পর্যটকদের জন্যই থিম্পুর রাজপথে হস্তশিল্পের বাজার বসে।
 


ভ্রমণের আনুষ্ঠানিকতা ও কিছু তথ্য: সার্কভুক্ত দেশের নাগরিকদের জন্য ভুটানে যেতে আলাদা ভিসার প্রয়োজন হয় না। দেশটির একমাত্র বিমানবন্দর পারোতে অবতরণের সঙ্গে সঙ্গে পোর্ট এন্ট্রি দিয়ে  আপনাকে তাদের দেশে স্বাগত জানানো হবে। সড়ক পথে যাওয়ার পরিকল্পনা করলে ইন্ডিয়ান ট্রানজিট ভিসা নিতে হবে। আপনার ভ্রমণ যদি সড়ক পথে হয়ে থাকে তাহলে ঢাকা থেকে শিলিগুঁড়ি পৌঁছার পর সেখান থেকে অন্য আরেকটি বাসে জয়গাঁ সীমান্তে যেতে হবে। ইন্ডিয়ার জয়গাঁ সীমান্ত হয়ে আপনি সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা সেরে প্রবেশ করবেন ভুটানের ফুন্টসলিং। এরপর আপনার যাত্রা থিম্পু অথবা পারোর দিকে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, কেবলমাত্র সার্কভুক্ত দেশের নাগরীকদের ক্ষেত্রে সেখানে খরচের ব্যাপারে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। অন্যান্য দেশের নাগরীকদের ভুটানে অবস্থানকালে প্রতিদিন দুইশ ডলার খরচ করা বাধ্যতামূলক।


 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৫ মে ২০১৯/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন