ঢাকা, রবিবার, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৭ নভেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

পাবে সামান্যে কি তার দেখা

হুমায়ূন শফিক : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১০-২২ ১:৪৭:০৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১০-২২ ৩:৫৩:৩৬ পিএম

কয়েক বছর আগে একবার লালন সাঁইজির তিরোধান দিবসে কুষ্টিয়া যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলাম, কিন্তু যাওয়া হয়নি অসুস্থতার কারণে। এক সন্ধ্যায় যখন কয়েকজন বড় ভাই এবং বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলাম, জানাল লালনের ১২৯তম তিরোধান উপলক্ষে তারা এবার কুষ্টিয়া যাবে। তখনই মনস্থির করে ফেললাম। পকেটে টাকা ছিল না, মায়ের কাছ থেকে বাস ভাড়া নিয়ে ১৭ তারিখ দুপুর দুইটার টিকেট কেটে ফেললাম। সঙ্গে কবি অতনু সিংহ, আনান ও ইরান।

দুপুরে খেয়ে গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে কাউন্টারে জিজ্ঞেস করলাম- বাস এসেছে কিনা? তখন ১টা ৫০। আমরা সবাই চায়ের দোকানে চা পান করছিলাম। আনান বলল, মামা পানি কিনে নিও। আনান ও ইরান দুই বন্ধু। আমার ভাগ্নে। অতনু ভাই সিনিয়র মানুষ। কিন্তু সম্পর্ক বন্ধুর মত। আমরা আড্ডা দিচ্ছিলাম, এমন সময় কাউন্টারের সেই লোকটা এসে বলল, আপনাদের বাস চলে এসেছে দ্রুত যান। আমরা তড়িঘড়ি করে বাসে উঠে বসলাম। এসি বাস হলেও তেমন সুবিধার মনে হলো না। যাই হোক, সাঁইজির নাম নিয়ে রওনা হয়ে গেলাম।

কুষ্টিয়াতে আমরা থাকব নবপ্রাণ আখড়ায়। আগে রোমেল ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা ছিল। উনি বলছেন, চলে আসো, অসুবিধা নাই। ফরহাদ মজহার নবপ্রাণ আখড়ার কর্তা। তার সঙ্গে একবার মাত্র দেখা হয়েছিল। বাস চলছে। আমার পাশে অতনু সিংহ। বাম পাশের একটি সিটে ইরান এবং আনান বসেছে ঠিক আমার পিছনে। ওরা নিজেদের মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত। চ্যাটিং বা ফেইসবুকিং করছে। আমি আর অতনু ভাই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথাবার্তা বলছিলাম। কারেন্ট ইস্যু থেকে শুরু করে পলিটিক্স।

ফেরিঘাটে পৌঁছলাম সাড়ে চারটার দিকে। ফেরিতে বাস উঠলে আমরা নেমে গেলাম। ক্যান্টিনে গিয়ে হালকা কিছু খেলাম। এরপর ফেরির ছাদে উঠে পদ্মার সৌন্দর্য দেখতে দেখতে সূর্যের দিকে চোখ পড়তেই অতনু ভাই আমার ফোন নিয়ে ছবি তুললেন। ছবিগুলো খুবই সুন্দর হয়েছে! ফেরি এপাড়ে এসে থামলে, দ্রুত নিচে নেমে বাসে উঠে বসলাম। বাস আবার চলতে শুরু করল। এবার সবার চোখে হালকা ঘুম। চুপচাপ বসে রইলাম। অতনু ভাই কম্বল মুড়ি দিয়ে চ্যাটিং বা ফেসবুকিং করছিল। আমি চোখ বন্ধ করেই রইলাম। কারণ মনে হচ্ছিল পথ শেষ হচ্ছে না। প্রথম কোথাও গেলে এমনই মনে হয়। প্রথম প্রেম যেমন খুব সহজে ধরা দিতে চায় না তেমনই।

 

 

আমাদের বাস কুষ্টিয়ার মজমপুরে গিয়ে থামল ঠিক দশটায়। নেমেই আসার টিকেট কাটার জন্য বাসের কাউন্টারে গেলাম। কিন্তু হায়- টিকেট নাই! অনেকক্ষণ দৌড়াদৌড়ি করেও লাভ হলো না। শেষে একটা নন এসিতে বুকিং দিয়ে রাখলাম। এবার আমরা যাবো লালনের মাজারে। দুইটা রিকশা নিলাম। একটায় অতনু সিংহ ও আমি। অন্যটায় ওরা দুজন। অতনু ভাই বললেন, এখানে এলেই মনে হয় হুগলি বা হাওরায় আছি। আমি যেহেতু জায়গাগুলোতে যাইনি, তাই জিজ্ঞেস করলাম- সেগুলো কি এরকমই? ‘এরকম মানে একদম এরকম! খুব ভাল লাগে আমার!’ তার অভিব্যক্তি দেখেই আমি বুঝেছি সত্যি তার এই শহর খুব ভালো লাগে এবং ভালোবাসেনও। রিকশা লালনের মাজার থেকে অনেক দূরে নামিয়ে দিল। মূলত রাস্তা বন্ধ। সবাই হেঁটে যাচ্ছে। নেমেই যেন আমরা জনসমুদ্রে ডুবে গেলাম। কিছু অতি উৎসাহী তরুণ লাইন ধরে খুব দ্রুত যাচ্ছে এবং চিৎকার করছে। চিৎকার এবং দৌড়াদৌড়িতে বিরক্ত হয়ে গেলাম। আমরা একজন আরেকজনের পিছন পিছন হাঁটছিলাম। তখন রাত এগারটা। কিন্তু সেরকম মনে হচ্ছে না। লাখ লাখ মানুষ চারপাশে। থইথই করছে। সত্যি বলতে পহেলা বৈশাখেও এত মানুষ দেখিনি। যদি বৈশাখেও কম মানুষ হয় না। এরা কিসের টানে এসেছে কে জানে!

ভিড়-হইহুল্লার পেরিয়ে আমরা তিনজন লালনের মাজারের গেটে পৌঁছালাম। যাবো নবপ্রাণ আখড়ায়। সেখানেই রাতে থাকব। খাওয়া-দাওয়া করব। তিনজন ঢুকেই মনে পড়ল একজন মিসিং। আনান আমাদের থেকে কখন আলাদা হয়ে গেছে টের পাইনি। এত লোকের ভিড়ে টের পাওয়া জটিলও। আনানকে ফোন দিতেই বলল, পিছনে পড়ে গেছে। তবে চিনতে নাকি অসুবিধা হবে না। কিছুক্ষণ পরেই আনান চলে এলো। আমরা নবপ্রাণের গেটে অপেক্ষা করছিলাম। একসাথে সবাই ঢুকলাম। অতনু সিংহ আগেও অনেকবার এসেছেন। তাই অনেকেই পরিচিত। আমাদের তিনজনের পরিচিত কেউ নাই। আমি চিনি মোহাম্মদ রোমেল আর ফরহাদ মজহারকে (তাকে কে না চিনে)। যাই হোক, ঢুকে দেখি রোমেল ভাই দাঁড়িয়ে আছে শাদা পাঞ্জাবি পরে। তাকে বেশ মানিয়েছিল। কথাবার্তা বলে হাতমুখ ধুয়ে নিলাম সবাই।

নবপ্রাণ আখড়াবাড়ির গেট দিয়ে ঢুকেই একটু সামনে এগিয়ে ডানে মঞ্চ এবং তার উল্টো দিকে ডুমুরতলা। এই ডুমুরতলাতেই লালনকে জ্ঞানহীন অবস্থায় পেয়েছিলেন মতিজান। লালন জীবনের শেষ-অব্দি মতিজানের বাড়িতে ছিলেন। মতিজানের কবরের পাশেই শায়িত আছেন লালন সাঁই। আমরা সেবা নিয়ে মঞ্চের পাশ দিয়ে দুইতলায় উঠে গেলাম। সেখানে আগেই যার যার ব্যাগ রেখেছিলাম। এবার উঠলাম হালকা বিশ্রাম নিতে। তিনজনে উঠেই বসে পড়লাম। ক্লান্তিতে তখন ঘুম চলে আসছিল। কিন্তু রাতে যদি লালনের মাজার এবং নদীর তীরের মেলা না দেখি তাহলে কি ভালো লাগবে? তাই ক্লান্তি উপেক্ষা করে বের হলাম। রাতে আর অতনু বা রোমেল ভাইয়ের দেখা পাইনি। তিনজনে লালনের মাজারের ঐদিকে না গিয়ে মেলার দিকে গেলাম প্রথমে।

রাত ১২.৩০। ভিড় কিন্তু একটুও কমেনি, ক্রমশ বেড়েছে। ঢোকার সময় লোকজনের ধাক্কায় মনে হলো ভিতরে প্রবেশ করলাম। ডান দিকে মেলা এবং বাম দিকে গানের আসর। মেলার তাবুই দেখা যাচ্ছিল শুধু আর মানুষ। সামনে না গিয়ে কোনো কিছুই চোখে পড়ছিল না। মেলা ঘোরা বাদ দিয়ে আমরা গান শুনতে যাবো ভাবলাম। কিন্তু গানের আসরে দেখা যাচ্ছে যারা বসে আছে সবাই গাজা খেয়ে চুর হয়ে আছে। এদিকটা সম্পূর্ণই গাজাখোরদের আড্ডা। পুলিশও চারপাশে ঘুরছে। হয়তো কয়েকদিনের জন্য তাদের ছাড় দেওয়া। জানি না। একের পর এক গান গেয়েই যাচ্ছেন শিল্পীরা। খাচার ভিতর অচিন পাখি থেকে পাবে সামান্যে কি তার দেখা। পরিচিত গান আবার কিছু অপরিচিত গানও। হয়তো সেসব গান আগে শুনিনি। এখনও আবার মনে নাই। গান শুনতে শুনতে আমরা কুলফি মালাই খেলাম। কুষ্টিয়ার বিখ্যাত কুলফি। তানভীর ভাই ফোন দিয়ে বলছিলেন, কুলফি খেয়ে আইসো। খেতে খারাপ না। রাত তিনটার দিকে আমরা নবপ্রাণ আখড়াবাড়িতে ফিরলাম। তখন সবার চোখে ঘুম। কিন্তু ভোরে উঠতে হবে। গোষ্ঠ গান শুনব। লালন গোষ্ঠ গান খুব কমই লিখেছেন। কিন্তু ভোরের এই গানের প্রতি আমার প্রবল আগ্রহ।

 

 

ছয়টায় ঘুম ভেঙে গেলে সাথে সাথে উঠে পড়লাম। নিচে নেমে দেখি ফরহাদ মজহার ও অন্যান্য যারা গান গাইবে তার মঞ্চে উঠে গেছেন। চুপচাপ মঞ্চের সামনে বসে পড়লাম। অন্য কেউ ঘুম থেকে ওঠেনি। তাদের ডাকিও নি। অতনু সিংহ অনেকবার হয়তো শুনেছেন, রোমেল ভাইও শুনেছেন। আনান ও ইরানের তেমন আগ্রহ হয়তো নাই। কিছুক্ষণ পরেই গোষ্ঠ গান শুরু হয়ে গেল।

অনাদির আদি শ্রীকৃষ্ণনিধি  তার কি আছে কভু গোষ্ঠ খেলা ॥
ব্রহ্মরূপে সে অটলে বসে  লীলাকারি তার অংশকলা ॥
সত্যাসত্য সকল বেদ-আগমে কয়
সচ্চিদানন্দ রূপে পূর্ণ ব্রহ্ম হয়
জন্ম মৃত্যু যার নাই ভবের পর
সেতো নয় স্বয়ং কভু নন্দলালা ॥

পূর্ণচন্দ্র কৃষ্ণ রসিক সেজন
শক্তিতে উদয়, শক্তিতে সৃজন
গোষ্ঠ ভাবে সব চিত্ত আকর্ষণ
বৃহদাগমে তারে বিষ্ণু বলা ॥

গুরুকৃপা বলে কোন ভাগ্যবান
দেখেছে সেরূপ পেয়ে চক্ষুদান
সেরূপ হেরিয়ে সদা যে অজ্ঞান
লালন বলে সেতো প্রেমের ভোলা ॥

তারপরে গাইলেন,

লয়ে গোধন গোষ্ঠের কানন
চল গোকুলবিহারী
গোষ্ঠে চলো হরিমুরারি ॥

তুই আমাদের সঙ্গে যাবি
বনফল সব খেতে পাবি
আমরা ম’লে তুই বাঁচাবি
তাই তোরে সঙ্গে করি ॥

ওরে ও ভাই কেলে সোনা
চরণে নূপুর দে না
মাথায় মোহন চূড়া নে না
ধড়া পর বংশীধারী ॥

যে ত্বরাবে এই ত্রিভুবন
সে যাবে আজ গোষ্ঠের কানন
ঠিক রেখ মন অভয় চরণ
লালন ওই চরণের ভিখারি ॥

এভাবে সকালের সেবা দেওয়ার সময় হয়ে গেল। হাতমুখ ধুয়ে সেবা নেওয়ার জন্য সবার সাথে বসলাম। একে একে সবাইকে খুড়া দেওয়া হলো। মাটির খুড়া। অন্য জেলায় হয়তো অন্য নাম। সবাইকে হাত ধোয়ানো শেষে সেবা দিল। অহ সেবা প্রথমে মাথায় করে আনা হয়। তখন তারা একটা প্রার্থণা জপ করে। সেটা মনে নেই। এইখানে নিয়মই হচ্ছে সবাই একসাথে সেবা নেওয়া শুরু করবে এবং কারো আগে শেষ হলেও অন্যের জন্য বসে থাকবে। এবং সবার শেষ হলে তবেই হাত ধোয়া যাবে। আবার যিনি সেবা দান করছেন তিনি অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত সেবা গ্রহণও করা যাবে না।

 

 

সেবা গ্রহণ শেষে আবার উপরে গেলাম। তারা তখনও ঘুমে। একটু পরে নবপ্রাণেই আবার গান শুরু হবে। নবপ্রাণ আখড়া বাড়িতে সারাদিন গান হয়। আর সরকারি মাঠে সারারাত। অন্যান্য আখড়া বাড়িতে গাজার আসর বসলেও এখানে সিগারেটও নিষেধ। আবার শুয়ে পড়লাম। কারণ একটু না ঘুমিয়ে নিলে সারাদিন মাথা ব্যথা করবে। দিনটাই মাটি হবে। (আগামী পর্বে সমাপ্য)



ঢাকা/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন