ঢাকা, বুধবার, ৩১ আষাঢ় ১৪২৭, ১৫ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত বেকার হোস্টেলে একদিন

মিলটন আহমেদ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১২-২২ ৫:০০:১৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০২-১২ ১:২২:৫২ পিএম
স্মৃতি জাদুঘরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আবক্ষ মূর্তি

বেকার হোস্টেল। আমরা অনেকেই হয়তো জানি না, বেকার হোস্টেলের সঙ্গে আমাদের ঐশ্বর্যমণ্ডিত ইতিহাস কীভাবে জড়িয়ে আছে। অথবা কেনই-বা প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে, জীবনের অনেক আবেগ, অনুভূতির সঙ্গে মিশে আছে এই হোস্টেলের নাম। আজকের এই স্বাধীন বাংলাদেশের যিনি রূপকার; হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত এই বেকার হোস্টেল। কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের শিক্ষার্থী থাকাকালীন বঙ্গবন্ধু এখানেই থেকেছেন। এটি মূলত ছাত্রাবাস।

কলকাতার তালতলার সন্নিকটে ৮ নম্বর স্মিথ লেনে সরকারি বেকার ছাত্রাবাসের অবস্থান। শুধু আমি নই, দেশের প্রতিটি মানুষের কাছে এই ছাত্রাবাসের ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে। উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে বঙ্গবন্ধু তৎকালীন ইসলামিয়া কলেজে (বর্তমানে মৌলানা আজাদ কলেজ) ভর্তি হন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত এই কলেজটি তখন বেশ নামকরা ছিল। এই কলেজে বি.এ পড়াকালীন ১৯৪২ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত তিনি বেকার হোস্টেলে ছিলেন। শুধু তাই নয়, ১৯৪৬ সালে বঙ্গবন্ধু ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন। পরের বছর তিনি ইসলামিয়া কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাসে বি.এ ডিগ্রী লাভ করেন।

বঙ্গবন্ধু বেকার হোস্টেলের ২৪ নম্বর কক্ষে থাকতেন। তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু ২৪ নম্বর কক্ষের সঙ্গে ২৩ নম্বর কক্ষটি সংযুক্ত করে ‘বঙ্গবন্ধু স্মৃতি কক্ষ’ করার উদ্যোগ নেন। ১৯৯৮ সালের ৩১ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন উচ্চশিক্ষামন্ত্রী অধ্যাপক সত্যসাধন চক্রবর্তী বঙ্গবন্ধু স্মৃতি কক্ষের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।

আগেই জেনেছিলাম, বাংলাদেশের অনেকেই বেকার হোস্টেলে যান বঙ্গবন্ধু স্মৃতি কক্ষ পরিদর্শনে। আমিও একইভাবে কৌতূহলী ছিলাম ঐতিহাসিক স্থানটি পরিদর্শনে। ট্যাক্সি আমাকে নামিয়ে দিল মৌলানা আজাদ কলেজের প্রধান ফটকের ঠিক সামনে। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আমি কলেজটি দেখলাম। এই কলেজেই পড়াশোনা করেছেন আমাদের দেশের শ্রেষ্ঠ একজন মানুষ। কাছেই একটি চায়ের দোকানে সাদা চুলের এক বৃদ্ধের কাছে জানতে চাইলাম- বেকার হোস্টেলের পথ কোন দিকে? তিনি আমাকে হাতের ইশারায় একটি গলির মাথা দেখিয়ে বললেন, বাঁয়ে ঢুকতে। আমি গলির মাথা অব্দি গিয়ে কয়েকজনকে পুনরায় জিজ্ঞেস করে কয়েকটি ঘুপচি গলি পেরিয়ে স্মিথ লেন খুঁজে নিলাম।

স্মিথ লেন একেবারেই নিঃশব্দ। শীতের সকালের সুনসান নীরবতা। ঝিরিঝিরি বাতাসে গাছের পাতার মৃদু শব্দ দারুণ প্রশান্তি আর ভালোলাগা তৈরি করেছে। ওই তো আট নম্বর স্মিথ লেন! ইটের গেটের উপর ধনুকের মতো বাঁকানো লোহার বেদিতে ইংরেজিতে লেখা বেকার হোস্টেলের নাম। ভেতরে রক্তলাল সুগঠিত উচ্চ দালান। গেটের সামনে এসে দাঁড়ালাম। হোস্টেলের নামের নিচে প্রতিষ্ঠাকাল লেখা- উনিশশত দশ। দারুণ শিহরণ তখন আমার ভেতর! একের পর এক গলি পেরিয়ে যখন এই জায়গাটির খোঁজ করছিলাম, মনে হচ্ছিল পূর্বপুরুষের কারো সন্ধানে সুদূর থেকে এসেছি এই দেশে। হঠাৎ সাইকেলের ক্রিং ক্রিং বেলের শব্দে সম্বিৎ ফিরে পাই। এলোমেলোভাবে সাইকেল চালিয়ে পাশ দিয়ে চলে গেল এক কিশোর। 

 

হোস্টেল কক্ষে বঙ্গবন্ধুর বিছানা এবং পড়ার টেবিল। চেয়ারে বসা লেখক

 

এর আগে আমি বারদু’য়েক কলকাতা এসেও এখানে আসার সুযোগ করে উঠতে পারিনি। এবার সেই সুযোগ পেয়েছি। গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে দেখলাম ভেতরে কম বয়সি তিন-চারজন ছেলে হোস্টেলের অভ্যর্থনা কক্ষের সামনের সিঁড়িতে আড্ডায় মজে আছে। আমি নিশ্চিত ওরা এই ছাত্রাবাসে থেকেই পড়ালেখা করে। ভেতরে ঢুকে জিজ্ঞেস করলাম, শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর কোন দিকে? ওরা জানাল তিনতলায়। কিন্তু অভ্যর্থনা কক্ষে আগে যেতে হবে এবং কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলতে হবে। সিঁড়ি টপকে আমি সেখানে গিয়ে মধ্যবয়স্ক একজনকে বললাম, আমি এসেছি বাংলাদেশ থেকে। আমাদের জাতির জনকের স্মৃতি জাদুঘর একবার পরিদর্শনে ইচ্ছুক। আপনার সহযোগিতা চাই।

তিনি আমার কাছে জানতে চাইলেন, অনুমতিপত্র এনেছি কিনা? অনুমতিপত্র! কার অনুমতি? এখানে আসতে অনুমতি লাগে? আমি জানতে চাইলাম।
তিনি বললেন, কলকাতাস্থ বাংলাদেশ হাই কমিশনের অনুমতি লাগে।
আমার শিহরণ, আমার আবেগ, আমার অনুভূতি নিমিষে দুমড়ে মুচড়ে গেল। আমি জানতাম, এখানে এসব কিছুর দরকার হয় না।
তিনি বললেন, আগে দরকার হতো না। যখন যে বা যারা এখানে আসত, আমরা তাদের ঘুরিয়ে দেখাতাম। কিন্তু ছোটখাটো কিছু বিষয় বিবেচনায় এখন হাই কমিশনে গিয়ে অনুমতি নিয়ে এখানে আসতে হয়।

তৃতীয়বারও আমার ইচ্ছা অপূর্ণ থাকবে তাহলে? কোথায় সেই হাই কমিশন অফিস? কার সঙ্গেই-বা কথা বলব? সব কিছু এলোমেলো মনে হতে লাগল। আমি ক্ষমা চাওয়ার মতো দুই হাতের কবজি উঁচিয়ে অনুরোধের সুরে বললাম, দেখুন, আমি আসলে জানতাম না অনুমতির ব্যাপারটি। এসেই যখন পড়েছি, আপনি যদি দয়া করেন তাহলে আমার এত দূর থেকে আসা সার্থক হবে। প্লিজ!

না, সম্ভব না– বলে তিনি ভেতরে চলে গেলেন। অনেকদিন আমার মন এভাবে কালো মেঘে ঢাকা পড়েনি। কলকাতায় আবারো আমার আসা হবে জানি। তখন না হয় অনুমতি নিয়েই আসব। কিন্তু এটা তো একেবারে শেষের সমাধান। এখন আর কী করা যায়?

কলকাতায় বাংলাদেশ বনাম ভারতের মধ্যকার দিবা-রাত্রির গোলাপি বলের টেস্ট ম্যাচের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং কলকাতার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি অন্যতম। তাই উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ঘিরে কঠিন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে এই ম্যাচ কাভার করতে যাওয়া সাংবাদিকদের জানানো হয়েছিল, যারা ইডেন গার্ডেনের প্রেস বক্সে বসে খেলা কাভার করবেন তারা যেন ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাই কমিশনে গিয়ে সাংবাদিকদের নামের তালিকা দিয়ে আসেন। ‘প্রথম আলো’র রানা আব্বাস আর ‘মানবজমিন’র ইশতিয়াক ভাই সেখানে গিয়েছিলেন দুদিন আগে। নামের তালিকা দেয়ার জন্য। ‘রাইজিংবিডি’র স্পোর্টস রিপোর্টার ইয়াসিন হাসানের মুখে শুনেছিলাম সেকথা। হঠাৎ মনে পড়ল- ইয়াসিনকে একটা ফোন করি।

 

বেকার হোস্টেলের প্রধান ফটক

 

ইয়াসিনকে ফোনের অপরপ্রান্তে পাওয়া গেল। জানালাম, অনুমতি ছাড়া বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিময় ঘরটি দেখার সুযোগ থেকে আমি বঞ্চিত হতে যাচ্ছি। ইয়াসিন মাত্র প্রেস বক্সে ঢুকেছে। আমি বললাম, ইশতিয়াক ভাইকে আমার কথা বলো। হাই কমিশনের কারো ফোন নম্বর যদি থেকে থাকে তার কাছে, আমাকে যেন দেন।
‘ওকে, দেখছি’ বলে ইয়াসিন ফোন কেটে দিল। এটাই ভরসা। ভাবছিলাম, কারো ফোন নম্বর পেলে যোগাযোগ করে অনুরোধ করব। যদি সহানুভূতিশীল হন, তাহলে মনের আশা পূরণ হতেও পারে। অপেক্ষা করছি। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় আমাকে পঞ্চাশ–পঞ্চাশ সিগনাল দিচ্ছে। হতেও পারে, নাও পারে। পাঁচ থেকে সাত মিনিট আমি হোস্টেলের সামনে গার্ডেনের মতো জায়গাটির আশেপাশে হাঁটাহাঁটি করলাম। জায়গাটি খুব নীরব। জনমানব কোথাও আছে বলে মনে হয় না। বেশকিছু ছবি তুললাম রক্তিম দালানের বাইরের সবুজ গাছপালায় আচ্ছাদিত অংশের। তখনও হৃদয় ভাঙার সিগনাল তাড়া করে চলেছে আমাকে।

মোবাইলের ভাইব্রেট পেতেই পকেট থেকে বের করে হাতে নিলাম। ইয়াসিনের এসএমএস। ইকবাল নামে একজনের ফোন নম্বর মেসেজ করেছে। কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশ হাই কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইকবাল নামের এই ভদ্রলোক। আগেই বলেছি- কলকাতা টেস্ট ম্যাচ কাভার করতে আসা সাংবাদিকদের নামের তালিকা দিতে দুজন গিয়েছিলেন বাংলাদেশ দূতাবাসে। তাদের কারো কাছ থেকে ইয়াসিন ফোন নম্বর সংগ্রহ করেছে। নম্বর পেয়ে খুবই সামান্য আশার সঞ্চার হলো আমার মনে। এটাই শেষ সুযোগ। কল করলাম ইকবাল সাহেবকে। তার আগে অবশ্য মনে মনে রিহার্সেল করে নিয়েছি কীভাবে তাকে ম্যানেজ করা যায়।

অপরপ্রান্তে ফোন রিসিভ করতেই বিনয়ের সঙ্গে সালাম দিলাম। আমার পরিচয় বললাম। ইকবাল সাহেব যেভাবে আমার সালামের জবাব দিলেন– নিমিষেই বুঝে নিলাম এই লোক দারুণ নম্র আর বিনয়ী। আমার আশার দিগন্তে সূর্য আরেকবার উঁকি দিল। তাকে বললাম, স্যার, আমি মিলটন আহমেদ, বাংলাদেশ থেকে এসেছি। বাংলাদেশের ওয়ালটন গ্রুপ চলতি ইন্ডিয়া বনাম বাংলাদেশ ক্রিকেট সিরিজের সহযোগী স্পন্সর। আমি ওয়ালটনের অতিরিক্ত পরিচালক পদে আছি। প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হিসেবে আমি কলকাতা টেস্ট ম্যাচের জন্য এখানে এসেছি। স্যার, বঙ্গবন্ধু আমাদের অনেক বড় আবেগের একটি নাম। আমার অনেক দিনের ইচ্ছা বেকার হোস্টেলে তাঁর স্মৃতি কক্ষ দেখব। কিন্তু এখানে এসে জানতে পারলাম, আপনার অনুমতিপত্র ছাড়া সেটা সম্ভভ নয়। আগে জানলে অবশ্যই আপনার সাথে দেখা করে সকল নিয়ম মেনেই আসতাম। এখন আপনি যদি একবার সুযোগ দেন, আমি চিরকৃতজ্ঞ থাকব।

তিনি আমার কথাগুলো শুনলেন। তারপর বললেন, স্যরি, কিন্তু এভাবে এখন আর পরিদর্শনের সুযোগ নেই। আপনি একটু কষ্ট করে আমাদের অফিসে এসে অনুমতিপত্র নিয়ে যান।

স্যার, প্লিজ। আমি অনেক আশা নিয়ে এসেছি। আপনি চাইলেই সম্ভব, আমি জানি- অনুরোধ করলাম তাকে। অপর প্রান্ত থেকে বললেন, ওখানে কে আছে? ফোনটা তাকে দিন। আমি অভ্যর্থনা কক্ষের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম। তড়িৎ গতিতে কক্ষের ভেতর ঢুকে তসলিম খান নামে এক ব্যক্তিকে ফোন ধরিয়ে দিলাম। বললাম, দূতাবাস থেকে ইকবাল স্যার কথা বলবেন। আমার দিকে কেমন করে যেন তাকিয়ে তিনি ফোনটা নিলেন। ফোনে দুজনের কথা হচ্ছে। তসলিম সাহেব ‘জি স্যার, জি স্যার’ করছেন। শেষে বললেন, স্যার আপনি তাহলে আমাদের স্যারকে একটু বলে দিন। তারপর আমি সব ব্যবস্থা করছি। ওপাশ থেকে কিছু শোনামাত্র এক দৌড়ে কোথায় যেন মিলিয়ে গেলেন তসলিম খান। হায়! হায়! আমার ফোনটা নিয়ে যাচ্ছে। ফিরে এলেই হয়। নব্বই ভাগ নির্ভার আমি ততক্ষণে।

আমি প্রথমে এসে তসলিম খানের সঙ্গেই দেখা করেছিলাম। তিনিই চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু স্মৃতি কক্ষ দেখার অনুমতিপত্র। তসলিম খান। নামই বলে দেয় তিনি মুসলিম। বয়স্ক লোক। চল্লিশ বছরের মতো এখানে চাকরি করছেন। তিন সন্তানের জনক। মিনিটচারেক পর আমার ফোন নিয়ে ফিরে এলেন। একেবারেই অন্য রূপে। প্রথম দেখায় তার হাত দুখানা ছিল পেছনে। কর্তাব্যক্তির ভঙ্গিমায়। বিনয়ের লেশমাত্র ছিল না। কিন্তু এখন সেই রূপের উল্টো রূপ দেখছি। আমি হয়ে গেলাম তার স্যার। কর্তাব্যক্তির পেছনের হাত দুটি এবার সামনে আমাকে পথ দেখিয়ে দিচ্ছে। বললেন, স্যার আপনি একটু আসেন। আপনার নাম এন্ট্রি করতে হবে। তারপর আমি নিজেই আপনাকে ঘুরে দেখাব।

 

বঙ্গবন্ধু স্মৃতিবিজড়িত বেকার হোস্টেল

 

রেজিস্ট্রি বইয়ে আমার নাম, বাবার নাম, পাসপোর্ট নম্বর, অতঃপর মোবাইল নম্বর– সব লিখলাম। মনে তখন সুবাতাস বইছে। লেখা তো কোনো কষ্টই না। স্যার চলেন– বলে সামনে আগে আগে হাঁটা ধরলেন। আমি তার পেছন পেছন। শিহরণ নিয়ে বেকার হোস্টেলের লম্বা করিডোর ধরে হেঁটে চলেছি। একেবারে শেষ মাথায় উপরে ওঠার সিঁড়ি। আমরা দুজন এবার পাশাপাশি। চওড়া কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছি। উত্তেজনায় আমি রীতিমত স্তব্ধ! একটু পরেই সেই কাঙ্ক্ষিত স্মৃতি কক্ষ।  আমি স্তব্ধতা ভেঙ্গে তসলিম খানকে জিজ্ঞাসা করলাম– প্রতিদিন এখানে বাংলাদেশিরা আসে কিনা? তিনি জানালেন, অনেকেই আসে, তবে মাঝে মাঝে। ওপারের বাঙালিরা বেশিরভাগ মানুষই কলকাতা আসে ঘুরতে, কেনাকাটা করতে। তবে আপনার মতো মানুষ কম আসে স্যার। ভাবলাম, সবাই হয়তো জায়গাটির কথা জানে না। অথবা কলকাতা মানুষ আসেই হয়তো ব্যাগ ভর্তি কেনাকাটা করার জন্য। যাই হোক, দোতলায় উঠেই মনে হলো এসে পড়েছি। তসলিম খান তখন তিনতলায় উঠছেন। বুঝলাম আমার গন্তব্য স্থান তিনতলায়।

তিনতলার সিঁড়ির প্রান্ত থেকেই চোখে পড়ল লোহার কেচি গেট দিয়ে আবদ্ধ কক্ষটি। উপরে লেখা ‘বঙ্গবন্ধু স্মৃতি কক্ষ’। বাঁ পাশের দেয়ালে পাথরে খোদাই করে লেখা ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান– জীবন ও কারাজীবন’। নিচে তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত লেখা আছে। তখনও আমার মধ্যে বিস্ময়। ভেতরে ঢুকতে পারব তো! নাকি আবার কোনো ফোন এসে বাদ সাধবে- না, এভাবে দূতাবাসের অনুমতিপত্র ব্যতিরেকে এই কক্ষ দর্শন করা যাবে না।
তেমন কিছু হলো না। লোহার খাঁচার গেটটি তালামুক্ত করে তারপর কাঠের দরজা খুললেন তসলিম খান। আমার ভেতরে উত্তেজনা ততক্ষণে ফেটে পড়ছে। মনে হলো তেড়েফুঁড়ে ভেতরে ঢুকে পড়লাম। ভেতরে ঢুকে স্বস্তি অনুভব করলাম। আর কোনো সমস্যা হবে না। শান্ত আর স্বাভাবিক এখন আমি।

দরজা দিয়ে ঢুকতেই চোখে পড়ল জাতির জনকের আবক্ষ মূর্তি । ২০১১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বেকার হোস্টেলে প্রথম শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছিল। তৎকালীন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিপু মনি ভাস্কর্য উন্মোচন করেন। কিন্তু কলকাতার ভাস্কর বঙ্গবন্ধুর মুখ যথাযথভাবে ফুটিয়ে তুলতে না পারায় সেই ভাস্কর্য নিয়ে সে-সময় আপত্তি ওঠে। পরবর্তীকালে শেখ মুজিবুর রহমানের মুখাবয়ব ঠিকঠাক ফুটিয়ে তুলতে নতুন আরেকটি ভাস্কর্য স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী তাজুল ইসলাম। একই বছরের ৩রা আগস্ট বঙ্গবন্ধুর নতুন আবক্ষ ভাস্কর্য ঢাকা থেকে এনে বেকার হোস্টেলে প্রতিস্থাপন করা হয়। সেই ভাস্কর্য আমি ছুঁয়ে দেখলাম।

তসলিম খান নিজ থেকেই বললেন, স্যার আপনি দাঁড়ান আমি ছবি তুলে দেই। আগে বঙ্গবন্ধুর সেই কক্ষে যাওয়ার তাড়না অনুভব করলাম আমি। তবু ছবি তুললাম। ২৩ আর ২৪ নম্বর কক্ষের সামনের জায়গাটায় এই ভাস্কর্য। এর আশেপাশের অন্য জায়গাজুড়ে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর অনেক ছবি। একপাশে বাবা আর মেয়ের হাস্যজ্জ্বল একটি ছবি। তাতে বাবার ঘাড়ে মাথা রেখে দাঁড়িয়ে আছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১৯৪৯ সালের একটি ছবিতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে তরুণ শেখ মুজিবুর রহমান। তার পাশের ছবিতে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। সাদা পাজামা পাঞ্জাবির উপরে কালো কোট পরিহিত শেখ মুজিবুরের ঘাড়ের দুপাশ দিয়ে ঝোলানো সাদা শাল।  চোখে কালো ফ্রেমের সেই বিখ্যাত চশমা। ব্যাক ব্রাশ চুলে দারুণ ব্যক্তিত্ববান– শেখ মুজিবুর রহমান।

২৩ আর ২৪ নম্বর কক্ষ একত্র করে সাজানো হয়েছে স্মৃতি কক্ষ। সেই কাঙ্ক্ষিত কক্ষের সামনে এসে দাঁড়ালাম। দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই একপ্রকার শিহরণ খেলে গেল আমার শরীরে। ছিমছাম সাজানো সবকিছু। স্মৃতি কক্ষে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর ব্যবহৃত খাট, পড়ার চেয়ার, টেবিল এবং কাঠের আলমারি। এতো কাল পরেও আমার কাছে মনে হলো এখনো অতি যত্নের সাথে এর সবকিছু ব্যবহার করছেন বঙ্গবন্ধু। আলমারির পাশের দেয়ালে টাঙানো বড় ফ্রেমে বাধাই করা বঙ্গবন্ধুর ছবি। ছবির নিচে রাখা কাঠের তৈরি একটি শেলফ। ভেতরে এবং উপরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বেশ কিছু বই। কিছু বই শেখ মুজিবুর রহমানের উপর লেখা। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ও শোভা পাচ্ছে সেখানে। বইগুলোর কয়েকটি আমি নেড়েচেড়ে দেখলাম। বঙ্গবন্ধুর পড়ার টেবিলের উপরে সাদা কাপড় দেয়া। দেখে মনে হয় পড়ার জন্য পরিপাটি করে রাখা হয়েছে।  টেবিলের ঠিক উপরে দেয়ালে মহৎ মানুষটির আরও একটি বাঁধানো ছবি। শান্তির পায়রা উড়িয়ে দিচ্ছেন সেই ছবিতে।

 

শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি কক্ষের প্রবেশপথ  

 

টেবিলের সামনের চেয়ারে আমি বসলাম। টেবিলের উপরে হাত রেখে গর্ব অনুভব করলাম। মনে হলো এই মহান মানুষটির জন্য সমস্ত বাঙালি জাতি গর্বিত। আমরা ঋণী এই মহৎ লোকটির কাছে। যিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন বাংলাদেশ একদিন পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। টেবিলের পাশেই বঙ্গবন্ধুর ব্যবহৃত বিছানা। আমি যখন বিছানায় বসলাম হঠাৎ তাড়িত আবেগে আমার দু’চোখ ঝাপসা হয়ে এলো।

ছবি: লেখক                  


ঢাকা/তারা