ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৩১ আষাঢ় ১৪২৭, ১৬ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

আনতালইয়া এক প্রাচীন জনপদের হাতছানি: শেষ পর্ব

ফাতিমা জাহান : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০১-২০ ২:০১:৩৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০২-০৫ ৫:৫৯:৪২ পিএম
অ্যাস্পেন্দোস রোমান এম্ফিথিয়েটার

খুব সকালে চললাম অ্যাসপেন্দোস। আরেকটি প্রাচীন নগরী। দিনের পুরোটা কেটেছে অসাধারণ কিছু মানুষের সান্নিধ্যে। এ ক’দিনে মেরহাবা, তেশেকুর ইদেরিম, বিরলিশ, চিকিশ ইত্যাদি ছোট ছোট শব্দ শিখে গিয়েছি। চলাফেরা করতে একেবারেই অসুবিধা হয় না। সাধারণ মানুষজন এত ভালো যে, কেউ কারো ভাষা না জানলেও যথেষ্ট সাহায্য করেন।

আনতালইয়া অতোগার থেকে জানলাম অ্যাসপেন্দোস যাওয়ার সরাসরি বাস নেই। ভেঙে ভেঙে যেতে হবে। এ আর নতুন কি আমার জন্য! প্রথমে বাসে যেতে হবে সেরিন, এক ঘণ্টার পথ, তারপর  আরেকটা বাস ধরে অ্যাসপেন্দোস। সেরিনে নেমে দেখি কেউ ইংরেজি জানে না। অতি ছোট মফস্বল শহর টাইপের একটা জায়গা। যিনি বাস আসা যাওয়ার তদারকি করছিলেন তার কক্ষে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। হা সব্বনাশ! ইনিও ইংরেজি জানেন না। আমার তেমন চিন্তা হলো না। জায়গার নাম বললাম- বাকিটা ইশারা ইঙ্গিত। বুঝলাম ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে বাস আসবে। মাঝের সময়টা এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করছিলাম।

বাসস্ট্যান্ডে যে কত ধরনের মানুষ বসে আছেন গন্তব্যে যাওয়ার অপেক্ষায়। দুজন বৃদ্ধ খুব কায়দা করে আমার ছবির জন্য পোজ দিলেন। একজন বৃদ্ধা, বয়স কত হবে কে জানে? মুখের বলিরেখার ভাঁজের সংখ্যা বলে দিচ্ছে আশির নিচে বয়স তো হবেই না- এত সুন্দর করে, স্টাইল করে লাঠির ওপর থুতনি দিয়ে বসে ছিলেন যেন এখনই মিস তুর্কীর শিরোপাটা তার হাতে তুলে দেয়া হবে!

এদিকে বাস তদারককারী আঙ্কেল আমাকে ইশারায় ডাকছেন। কাছে গিয়ে দেখি তিনি দু'জন চাইনিজ ছেলেমেয়ের সাথে বসে আছেন। চাইনিজ দু'জনও অ্যাসপেন্দোস যাবে। আমরা একসাথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। চাইনিজ মেয়েটির নাম লিসা। ছেলেটি জিমি (একটাও আসল নাম নয়, চাইনিজদের দু'টো নাম থাকে, একটা চাইনিজ আর সুবিধার জন্য আরেকটা ইংলিশ নাম)। অদ্ভুত কারণে যে কোন দেশে গেলে চাইনিজদের সাথে আমার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে সহজে।

এবার আমি আঙ্কেলের সাথে গল্প জুড়ে দিলাম। আঙ্কেলের নাকি দু'টো মেয়ে আছে। একজন আমার মত দেখতে। আমি তো আহ্লাদে গদগদ! তার নিজের নাম ইয়ুরগুল। এখানকারই বাসিন্দা। আমার সবুজ রঙের জুতো ময়লা হয়ে গিয়েছে দেখে তার কী যে দুঃখ! অপরিচিত মানুষের অবারিত ভালোবাসা আমি দু'হাত মেলে নেই। এ ভালোবাসায় খাদ থাকে না, স্বার্থ থাকে না।  

আঙ্কেল কথা বলছিলেন তুর্কী ভাষায়। লিসা জিজ্ঞেস করল আমি তুর্কী ভাষা জানি কিনা? আমি না বলায় আবার জিজ্ঞেস করল, তাহলে এত কথা বুঝলে কি করে?

স্পার্টাকাস বেসে আলী, রোমান এম্ফিথিয়েটার

 

আমি বললাম, তুর্কী ভাষায় অনেক আরবি, ফারসি, ইউরোপিয়ান শব্দ ব্যবহার করা হয়। আর মানুষের ভাষা বোঝার জন্য বডি ল্যাংগুয়েজই যথেষ্ট। একটা শব্দ বুঝলে পুরো বাক্য ধরে ফেলা যায়। আমাদের বাস ততক্ষণে এসে গেছে। আঙ্কেলকে বিদায় জানিয়ে চললাম অ্যাসপেন্দোস।

বাসে সামনের সিটে বছর দুয়েকের এক বাচ্চা আমাকে দেখে কিছুক্ষণ পরপর লাফিয়ে আমার সিটে আসতে চাইছিল। তার মা দিচ্ছিলেন না। চলন্ত বাস, পরে গিয়ে ব্যথা পেতে পারে। আমি সামনে গিয়ে কিছুক্ষণ হাই হ্যালো করলাম। বাচ্চাটিকে নিয়ে মা নেমে গেলেন মাঝপথে। মায়ের সাথে একগাদা বাজারের ব্যাগ, বাচ্চা সামলাবেন না ব্যাগ- আমি ব্যাগগুলো নামিয়ে দিলাম। আমাকে তুরস্কের পথেঘাটে কত মানুষ নিরহঙ্কার সাহায্য করেছে। প্রতিদান না দিলে মনের ভেতরের খচখচানিটা থেকেই যায়।   

এক ঘণ্টার মধ্যে অ্যাসপেন্দোস পৌঁছে গেলাম। টিকেট কেটে ভেতরে ঢুকে দেখি বিশাল আকারের রোমান এম্ফিথিয়েটার। মাথা ঘুরে যাবার মত! এখানে নাকি বারো হাজার লোকের বসার জায়গা আছে।

অ্যাসপেন্দোস শহরের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় খ্রীস্টপূর্ব ৫৪৬ সালে। সমৃদ্ধশালী অঞ্চলটি তখন ছিল পারসিয়ানদের দখলে। এরপর গ্রীকরা দখল করে খ্রীস্টপূর্ব ১৯০ সালে। রাজ্যের হাতবদলের ফেরে রোমান সাম্রাজ্যের হয় অ্যাসপেন্দোস আনুমানিক ৩৪৫ খ্রিস্টাব্দে। অটোম্যান সাম্রাজ্যের শুরুর দিকে আনুমানিক ১৪৬০ খ্রিস্টাব্দে এ রাজ্যের বিলুপ্তি ঘটে।

আমি, লিসা, জিমি নিজেদের মত ঘুরে রোমান থিয়েটার দেখলাম। এটি তুরস্ক ও ইউরোপের সবচেয়ে আকর্ষণীয়, সুরক্ষিত প্রাচীন থিয়েটার। এখানে ছবি তোলার জন্য স্পার্টাকাস, গ্লাডিয়েটরের পোশাক পরিহিত বীর যোদ্ধার দেখা মিলবে। যাদের একজনের আসল নাম আলী, আরেকজন আহমেদ। আলী জানালো তার ডিউটি শেষ হবে শিগগির, আর তখন একটা বাস আছে সেরিন যাবার। আমরা ইচ্ছে করলে তার সাথে যেতে পারি। খুব বেশি ট্যুরিস্ট আসেনি। যারা এসেছে তারাও গ্রুপ করে এসেছে। একটা চাইনিজ গ্রুপ দেখলাম। এরপর পুরো রোমান এম্ফিথিয়েটার আমাদের তিনজনের হয়ে গেল।

 

সেরিন বাসস্ট্যান্ডে জিমি, লিসা ও ইয়ুরগুল আঙ্কেলের সাথে

 

রোমান এম্ফিথিয়েটার এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে যেন নিচের স্টেজে যে কোন ভাষণ, যে কোন অনু্ষ্ঠানের আওয়াজ অর্ধচন্দ্রাকৃতি থিয়েটারের যে কোন প্রান্ত থেকেই শোনা যাবে। আমরা তিনজন পুরো থিয়েটার ঘুরে নিচে আসতেই আলী, আহম্মদ আর তাদের ফটোগ্রাফার ফাতিমার সাথে দেখা হলো। ফাতিমার আমার লাল ব্যাকপ্যাক খুব পছন্দ হলো। আমি হাসতে হাসতে বললাম, এটা কেনার জন্য লিসা জিমি সাহায্য করতে পারবে। কারণ ব্যাগটা চীন থেকে কিনেছি।

আলী তাড়া দিলো এবং আমাদের বাস ধরার জন্য বাইরে আসতে বলে নিজেই উধাও হয়ে গেল। বেরিয়ে আলীকে দেখতে না পেয়ে এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করছিলাম। অনতিদূরে পথে একটি ছেলে দাঁড়িয়ে ছিল সাদা টি শার্ট আর ডেনিম পরে। কাছে গিয়ে চিনতে পারি আবার পারি না। এ যে দেখছি আলী! পোশাক একটা মানুষকে কত বদলে দেয়! একটু আগে যে ছিল রোমান বীর যোদ্ধা, এখন সে একজন তুর্কী।                

আমি, লিসা, জিমি, আলী একই বাসে স্কুলের বাচ্চাদের সাথে হৈ চৈ করতে করতে সেরিন ফিরছিলাম। বাসে সামনের সিটে বসেছিল ৮-৯ জন স্কুলের কিশোর। বয়স হবে ১৩-১৪। ওরা আমাদের চেয়েও বেশি হৈচৈ করছিল। আমিও যোগ দিলাম। আমাকে জিজ্ঞেস করল, আমেরিকা থেকে এসেছ? আমি বললাম,  তুর্কী থেকে এসেছি। ওরা বিশ্বাস করে হৈ-হল্লার মাত্রা বাড়িয়ে দিল। পরে স্কুলের বাচ্চারা বিশ্বাসই করতে চাচ্ছিল না যে- আমি তুর্কী নই।

সেরিন পৌঁছে আবার দেখা হলো ইয়ুরগুল আঙ্কেলের সাথে। এবার সময় কম। বাস থেকে নেমেই দেখি আনতালইয়ার বাস হাজির। আঙ্কেল আমাদের বলছিলেন পরের বাসে যেতে। কিন্তু আমরা তাড়াতাড়ি ফিরতে চাচ্ছিলাম। আঙ্কেলকে বিদায় জানালাম। তিনি বারবার বললেন- আবার আসবে কিন্তু।

জানি না আর আসা হবে কিনা। বা এলেও আঙ্কেলকে পাবো কিনা? মনটা ভার হয়ে গেল। কিন্তু মন ভার করা তো বন্ধুদের সামনে মানায় না।

 

অ্যাস্পেন্দোসের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য

 

আনতালইয়া পৌঁছে ট্রাম ধরে চললাম ওল্ড সিটি। ট্রামে বসে মানুষ দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। এ শহরের ট্রামে দু'পাশে বেঞ্চের মত মুখোমুখি বসার ব্যবস্থা আছে। আমি মাঝখানে, দুপাশে লিসা, জিমি। আর আমাদের উল্টোদিকে বসে আছে এক গ্রীক দেবী। অনেক বেশি সুন্দর মানুষ দেখলে বাকরুদ্ধ, বিমোহিত হয়ে যেতে হয়। আমরা তিনজন মন্ত্রমুগ্ধের মত মেয়েটিকে দেখছিলাম। বয়স হবে ২০-২১,  মাথার কাজল কালো চুল কোমর ছুঁয়েছে, চোখ দুটো যেন মাইকেল এঞ্জেলো এঁকে দিয়েছেন, গোলাপী ঠোঁটে আদর ঝরে ঝরে পরছে। নীল ডেনিম আর সাদা টি শার্ট যেন আরো অলৌকিক করে তুলেছে মেয়েটিকে। আমাদের চোখের পলক পড়ে না!

ট্রামের চড়ার পর কেউ কারো সাথে একটা শব্দও বলিনি। শুধু মেয়েটিকে দেখছি। মেয়েটি কখনো ফোন দেখছে তো কখনো পাশে বসা বন্ধুর সাথে কথা বলছে। এরকম মুখ, এমন রূপ সত্যিই আমি শুধু শিল্পীর  আঁকা ছবিতে দেখেছি। বাস্তবে যে এমন কেউ থাকতে পারে জানা ছিলো না। লিসা আর জিমি তো আরো স্তম্ভিত। কারণ আমি জানি। আমি যখন চীন দেশে বেড়াতে গিয়েছিলাম তখন দিনে কম করে হলেও কুড়িবার আমায় লোকজনের কাছে শুনতে হয়েছে 'ইউ আর বিউটিফুল!' আমার মতো বদসুরতকে বিউটিফুল বলার কারণ একটাই- আমার চোখের আকার তাদের চেয়ে সামান্য বড়। আর এখন লিসা জিমি যে সাক্ষাৎ দেবীদর্শন করছে এতে কোন সন্দেহ নেই।

ট্রাম তো অনন্তকাল চলে না। আমাদের গন্তব্যও এসে গেল বলে। লিসা, জিমি চলে গেল তাদের হোটেলে। আমি ঠিক করলাম আরো কিছুক্ষণ আনতালইয়ার বাতাস গায়ে মাখবো। হাঁটতে হাঁটতে কতটা সময় পার হলো টের পাইনি। ডিনার করতে হবে। কোনো রেস্টুরেন্ট পছন্দ হচ্ছিল না। শেষমেশ চলে গেলাম পরিচিত রেস্টুরেন্টে, যেখানে আমি রোজ খাবার খাই। খাবার খেতে খেতে মানুষ দেখতে দেখতে দেখি রেস্টুরেন্ট বন্ধ করার সময় হয়ে গেছে। ওয়েটার মেয়েটি বোধহয় অপেক্ষা করছিল। আমি তার সাথে গল্প জুড়ে দিলাম। বাচ্চা মেয়ে, নাম হিরানূর, আন্ডারগ্র্যাডে পড়ছে আর ফাঁকে ফাঁকে পার্টটাইম চাকরি করছে। মেয়েটি খুব খুশী আলাপ করে। সে এবং আরেকজন ওয়েটার খুব আগ্রহ ভরে ছবি তুলল আমার সাথে। আহা! এ শহরে কতই না ভালোবাসা মানুষের জন্য মানুষের!


ঢাকা/তারা