ঢাকা     বুধবার   ০৫ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২০ ১৪২৭ ||  ১৫ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

risingbd-august-banner-970x90

নদী ও সমুদ্রের গান

|| রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:৩২, ৮ জুলাই ২০২০  
ভোলা চরফ্যাশন যাওয়ার পথে (ছবি:সাইফ)

ভোলা চরফ্যাশন যাওয়ার পথে (ছবি:সাইফ)

শীতের সন্ধ‌্যা। কুয়াশামাখা আকাশে আপন মনে উড়ে গেল বকের সারি। ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছে। রাত বাড়ছে। অন্ধকার গাঢ় হচ্ছে। আমরাও এগিয়ে যাচ্ছি। সঙ্গী চাঁদ-তারার হাসি, সমুদ্র, জলরাশি আর রাতের আকাশ।

আমরা তখন ঢাকা বিআইডব্লিউটিসি থেকে ইলিশার (ভোলা) দিকে যাচ্ছি। এমভি অ‌্যাডভেঞ্চার-৩ জাহাজে প্রথম যাত্রা বিরতি হবে ভোলার চরফ্যাশন বেতুয়া লঞ্চঘাটে। ৩০০ কিলোমিটার নৌ-পথ! বিকেল সাড়ে তিনটায় জাহাজ ছাড়ার কথা ছিলো।  কিন্তু সেদিন ছিলো বৃহস্পতিবার। ঢাকার রাস্তায় প্রচণ্ড জ‌্যাম! দুইশ ত্রিশ জনের দল। অনেকেই সময় মতো পৌঁছুতে পারেননি।  হঠাৎ দেখি জাহাজটা কেঁপে উঠল। জাহাজের দড়ি পন্টুন থেকে আলাদা হতে শুরু করল। যাত্রী ঠিকঠাক উঠল কিনা দেখার জন্য সার্ভেয়ার ছোটাছুটি শুরু করে দিয়েছেন। অবশেষে জাহাজ ছাড়ল সন্ধ‌্যা সাড়ে ছটায়।

বেতুয়া লঞ্চঘাট, ভোলা

আমরা লঞ্চের ডেকে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছি। কেউ ছবি তুলছেন। কেউ সেলফি। এরই মধ‌্যে জাহাজ ভ্রমণের সমন্বয়কারী সবাইকে কেবিনের চাবি এবং ভ্রমণের নির্দেশনা বুঝিয়ে দিলেন।  তখন সময় রাত প্রায় নয়টা। আমরা কয়েকজন ডেকে দাঁড়িয়ে জল দেখছি। শীতের রাতে হিমেল বাতাস এসে শরীরে লাগছে।  অন্যরকম এক অনুভূতি। আকাশে তখন তারার আলো।  আনমনেই শৈশবের স্মৃতি মনে পড়ে যায়। এরই মধ্যে ঘোষণা এলো জাহাজের নিচতলায় কুপন দেওয়া হবে। নাস্তা আর গিফট হিসেবে রয়েছে ব‌্যাগ। 

নিচ তলা অডিটরিয়ামের মতো। একপাশে চায়ের দোকান।  রাত বাড়ছে। ব‌্যান্ড দল ‘আপনঘর’-এর গান চলছে।  অনেকেই গান শুনছেন। কেউ নাচছেন। কেউ চা, কফিতে ব‌্যস্ত। রাত তখন তিনটা। আমি জাহাজের ডেকে চলে এলাম।  মাস্টারের রুমে গেলাম। কিছুক্ষণ মাস্টার নাসির ভাইয়ের সঙ্গে গল্প করলাম। কীভাবে তারা জাহাজ চালায়, কীভাবে দিক নির্ণয় করে সামনে এগিয়ে যায়, পানি কম না বেশি কীভাবে জানাতে পারে- এসব নানা বিষয়ে কথা বলে জানার চেষ্টা করলাম।  

লঞ্চে সেলফি

বুঝতে পারলাম ঘুম পাচ্ছে। সকাল ছয়টায় বের হয়ে অফিস শেষ করেই জাহাজে এসে উঠেছি। আমি নাসির ভাইয়ের রুম থেকে আবারও নিচে চলে এলাম। রং চা আর বিস্কুট খেয়ে শরীর চাঙা করার চেষ্টা করছি। কিন্তু না, শরীর ঘুমে ভেঙে পড়ছে। রাত চারটার দিকে জাহাজের দো’তলায় ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে কম্বল মুড়িয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। কিছুক্ষণ ঘুমানোর পর হঠাৎ হইচইয়ে ঘুম ভেঙে গেল। সময় তখন ভোর সাড়ে চারটা। পরে জানতে পারি ছোটো ছোটো নৌকার লাইট চারদিক থেকে আমাদের জাহাজের দিকে আসছিলো। ফলে অনেকেই ডাকাত মনে করে চিৎকার দিয়েছে। এরপর আর ঘুম হয়নি। চেয়ার থেকে উঠে আবারও চলে যাই ডেকের সামনে।  উদ্দেশ‌্য সূর্যোদয় দেখা।

রাত শেষে ভোরে সূর্য ওঠার অপেক্ষায়। আমি ডেকে দাঁড়িয়ে আছি। বাতাস আর ঢেউয়ে শীত শীত অনুভব হচ্ছে। এরই মধ্যে সূর্য দেখা যাচ্ছে। ছবি তুললাম। ভিডিও করলাম। নতুন সূর্য আর পানির ঢেউয়ের ছন্দ আমি হারিয়ে গেলাম অন্য এক ভুবনে।

চর কুকরিমুকরিতে আড্ডা

সূর্য আর পানির ঢেউ দেখতে দেখতে বেতুয়া লঞ্চঘাটে পৌঁছে যাই। সময় তখন সকাল আটটা। ঘাটে পা রাখতেই চোখ জুড়িয়ে গেল। সামনে বিশাল মেঘনা। কিন্তু মনে হবে বিশাল জলরাশির মেঘমাল্লার। মনে হবে যেন সমুদ্র। জল, জল, জল আর পানির ঢেউয়ের ছন্দ।

বেতুয়া লঞ্চঘাটে নেমে কিছুক্ষণ হেঁটে বাসে উঠি। সেখান থেকে ভোলায় গিয়ে নাস্তার বিরতি। নাস্তা শেষে জ্যাকব টাওয়ার পরিদর্শন শেষে আবারও বাস। চল্লিশ মিনিট পর বাস থেকে নেমে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় চর কুকরিমুকরির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। নৌকা যাচ্ছে। সময় তখন দুপুর। নদীর পাড়ের সবুজ অরণ্যে ঘেরা। আঁকা-বাঁকা খাল পেরিয়ে যখন নদীর মোহনায় চোখে পড়ে সেখানে অপার সৌন্দর্যের হাতছানি। নদীর ঢেউ, নির্মল বাতাস, ম্যানগ্র্যোভ বন, দৃষ্টির সীমানার পুরোটা যেন সবুজ আর সবুজ। অপরূপ প্রকৃতির সাজে সাজানো বনভূমি যেন আরেক সুন্দরবন। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর পৌঁছে গেলাম।  নৌকা থেকে নেমে চর কুকরিমুকরিতে পা রাখছিলাম তখন সময় দুইটা।

লাঞ্চ শেষ করে আমরা কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করি। এরপর বিকেলে আবার ইঞ্জিনচালিত নৌকায় চরফ্যাশনের দিকে ফিরছি।  যখন ডুবে গেলো সূর্য তখন নদী, তীর ছুঁয়ে জাগা চর, ম্যানগ্রোভের বনে নেমে এলো সন্ধ্যা। সমস্ত প্রকৃতি যেন ধ্যান করছে মৌনতার। চরাচরে নেমে আসা এই সন্ধ্যায় হৃদয়ে শুধু ঢেউয়ে শব্দ।

চর কুকরিমুকরি যাওয়ার পথে

রাত সাতটার দিকে আমরা বেতুয়া লঞ্চঘাটে আবার জাহাজে চড়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করি। এই ভ্রমণের ব্যবস্থাপনায় ছিলো ‘লোক’। ভ্রমণ পরিচালনা করেছেন কবি অনিকেত শামীম। আমাদের ভ্রমণে ছিলেন কবি মতিন রায়হান। রাতে যখন ফিরছিলাম তখন মতিন ভাই কবিতা লিখলেন। নদী-সমুদ্রের গান শিরোনামে এই কবিতাটি দিয়েই শেষ করছি লেখা। তিনি লিখেছেন—

নদী-সমুদ্রের বন্ধনের কাছে কিছু জমা রেখে যাই

তুমি শল্কপত্রে প্রত্নস্মৃতি, আমি মন্মথ তোমাকে পাই

দেহের বীণায়! হৃদয়ের পুষ্প ডানা নাড়ে সজল গ্রীবায়, এসো মরমিয়া, উজ্জ্বল উদ্ধারে পৃথিবীকে ত্রস্ত করে তুলি!

তুমি চর কুকরিমুকরি যাবে? ফুঁসছে সমুদ্র,

রোদ উঁকি দিচ্ছে দেহের কিনারে; সবুজ বনের হরিণীরা চর্যার নতুন চরে ঢেউ তুলছে! বোধের নগরে দোলা দিচ্ছে অজন্তার গুহাচিত্র! বিস্ময়ে বিমূঢ় আমি! চরফ্যাশনের জাহাজঘাটে আজ কী রেখে এলাম?

অন্ধকার না কি আলোর ফোয়ারা? মধুমতি, তুমি কি

নদীকে চেনো? চিকিৎসাবিদ্যার ভাষায় ও কথা বলে!

আমি তো চিরশরণার্থী হৃদয়ের অসুখবিসুখে!

ও ঢেউখেলানো সবুজ, কী অস্থির পরাপৃথিবীর সজল মেঘমল্লার... দ্যাখো, প্রেমের নৈবেদ্য কী করে সাজাই!

ও জোৎস্নাফোটা রাত, নির্জনে স্তনের মতো তোমাকে বাজাই!

আলোকচিত্র: লেখক

 

সাইফ/তারা

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়