ঢাকা, সোমবার, ৭ আশ্বিন ১৪২৬, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

আয়ারল্যান্ডের ভিসা পাওয়া এত সহজ! পর্ব ৪

উদয় হাকিম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৬-১১ ৬:৪৬:৪০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৬-১২ ১২:০৫:৩৮ পিএম
আয়ারল্যান্ডের ভিসা পাওয়া এত সহজ! পর্ব ৪

উদয় হাকিম, ডাবলিন (আয়ারল্যান্ড) থেকে ফিরে : পার্কে বসে ছিলাম। ভাবছিলাম, কী করা যায়। অজয় আয়ারল্যান্ড দূতাবাসের ভেতরে যেতে দিচ্ছিল না। ভিনদেশি একটা দূতাবাসের বাইরে বসে থেকে চলে যেতে হবে! পরিচিত কেউ নাই। দূতাবাস সংশ্লিষ্ট কারো ফোন নম্বরও ছিল না। কোনো প্রকার যোগাযোগের উপায় ছিল না। ভাবছিলাম, ফরিদ ভাইকে কল করব কি না। ওই যে, দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার ফরিদ হোসেন। না, ফরিদ ভাইকে সবার পরে কল দেব। যখন আর কোনো উপায়ই থাকবে না।

বিপদে চুপ করে ভাবতে হয়। সেটাই করছিলাম। উপায় কী? যেভাবেই হোক সিকিউরিটি গার্ড অজয়কে ম্যানেজ করতে হবে। ওর কাছে কোনো উপায় আছে। সবকিছুরই বিকল্প আছে। এটারও নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু ভিসার জন্য কোনো হেল্প করছিল না অজয়। বার বার বলছিল, নট পসিবল। অনেকেই মনে করতে পারেন, দূতাবাসে ভিসার জন্য একজন দারোয়ানকে এত তোয়াজ করার কী দরকার?

এ প্রসঙ্গে একটা গল্প মনে পড়ে গেল। আমি তখন ঢাকার শ্যাওড়াপাড়ায় থাকি। প্রথম আলোতে সহ-সম্পাদক হিসেবে কাজ করছিলাম। ওদিকে বিসিএস প্রিলিমিনারির প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। পরীক্ষার ঠিক আগের দিন আমার এক চাচা আসলেন বাসায়। তিনিও পরীক্ষা দেবেন আমার সঙ্গে। তিনি এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক। শফি আংকেল বলে ডাকতাম তাকে। তিনি বললেন, উদয় চলো তাস খেলি। টুয়েন্টি নাইন। তাস! আজকে! কাল না পরীক্ষা? শফি আংকেল উত্তর দিলেন, আরে পরীক্ষা! কী বলো? কেউ আটকাতে পারবে না! মানে! এতো ভালো প্রিপারেশন? সেসময় ঘনিষ্ট কয়েকজন বন্ধু মিলে শ্যাওড়াপাড়ায় একটা মেসে থাকতাম। সবাই পরীক্ষার্থী। একথা শুনে সবাই ছুটে আসলো। কী বলেন, আংকেল! আপনার প্রিপারেশন এতো ভালো! কেউ আটকাতে পারবে না? আংকেল কথা বলছিলেন না। আমি চাপাচাপি করলাম, আংকেল বলেন তো ঘটনাটা কি? গাইড বই পুরোটা মুখস্থ? আংকেল চুপি চুপি বলছিলেন, হলের দারোয়ান ছাড়া আর কেউ আটকাতে পারবে না!

নষ্ট করার মতো সময় ছিল না। যা করার ঝটপট করতে হবে। হলে হবে, না হলে চলে যাব। উঠে আবার গেলাম অজয়ের কাছে। খাতির জমানোর চেষ্টা করলাম। দাদা, ধর্মশালায় জীবনে একবার হলেও যাব। এত চমৎকার জায়গা। ভূস্বর্গ যাকে বলে। সেই এলাকার মানুষ আপনি। কত ভাগ্যবান! অজয় শোনে আর মুচকি হাসে।

বললাম, বুঝেছি ভেতরে যাওয়া হবে না আমার। আপনি যেতে দেবেন না। কী হলে আমার ভিসা পেতে পারি, একটা উপায় বলে দেন। ইংরেজিতে বলে, আই ডোন্ট নো। বুঝলাম, আপনি জানেন না। এবার বলেন, ভেতরে যোগাযোগের কি উপায় আছে? অজয় কিছুটা সদয় হচ্ছিল। একটা ফোন নম্বর দিলো। পিএবিএক্স নম্বর। ভেতরে যোগাযোগ করার জন্য। দূতাবাসের ভেতর থেকে কেউ যদি ফোন করে আপনাকে ভেতরে যেতে বলে; তখনই কেবল আমি যেতে দিতে পারব।

ইংরেজিতে একটা কথা আছে- লাইট অ্যাট দি এন্ড অব দ্য টানেল। সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তের আলো। অন্ধকারে আলোর রেখা। সেটাই যেন হলো দেখা। বিপত্তি বাঁধতে যাচ্ছিল আরেকটা। আগেরদিন সন্ধ্যা বেলা নিজামুদ্দিনের মাজার এলাকা থেকে মোবাইল ফোনের সিম নিয়েছিলাম। ইন্ডিয়াতে ২৪ ঘণ্টা লাগে সিম অ্যাকটিভ হতে। তাহলে তো এই ফোনে কথা বলা যাবে না। কিন্তু ভাগ্য সহায় হলো- প্রথম চান্সেই কল চলে গেল। রিং হচ্ছিল। তার মানে সিম সচল হয়ে গিয়েছিল। রিং বাজলো ঠিকই, কেউ ধরল না। পিএবিএক্স থেকে বলা হলো, কাঙ্ক্ষিত নাম্বারে কল দিতে। না হলে অপারেটরের সাহায্য নিতে কোনো একটা নম্বর চাপতে। চেপেও লাভ হলো না। কেউ কল রিসিভ করল না।

আবার কল দিলাম। সেবারও কাজ হলো না। আবার কল। এবার ভালো করে শুনলাম রেকর্ড ভয়েস। কী কাজের জন্য কাকে ফোন দিতে হবে। ভিসা পারপাস দেখে একটা নম্বরে প্রেস করলাম। এক ভদ্রলোক রিসিভ করলেন। বললাম, ভিসার ব্যাপারে আমার হেল্প দরকার। জিজ্ঞেস করল, আপনি কি আয়ারল্যান্ডের নাগরিক? না। ভারতের? না। কোন দেশের? বাংলাদেশের। আপনি কোলকাতায় সাবমিট করুন। বলেই ফোন কেটে দিলো। আবার কল করলাম। এবার আরেকজন ধরলেন। বললেন, আপনি কোলকাতায় পেপারস সাবমিট করুন। বললাম, আমি আপনাদের দূতাবাসের সামনে আছি। উত্তর এলো, তাহলে আপনি দিল্লি ডিএইচএল সেন্টার থেকে কুরিয়ার করুন। ফোন রেখে দিলেন।

কিছুটা হোপলেস হলাম। কল করলাম আবারও। এবার যিনি ধরলেন, তাকে আগেই বললাম- দয়া করে কলটা কাটবেন না। আমি কী বলি একটু শুনুন। সংক্ষেপে বললাম সবই। উনি বললেন, এখান থেকে কোনো ভিসা প্রসেস সরাসরি হয় না। বুঝলাম, আপনার ইমার্জেন্সি। কিন্তু আপনাকে সিস্টেম মানতে হবে তো। প্রসেসে এটা সাপোর্ট করে না। হতাশ!

অজয় আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। কি হচ্ছে না? জিজ্ঞেস করল। উত্তর দেবার প্রয়োজন ছিল না। সে কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। অনুমানে সবই বুঝে নিচ্ছিল।

আবারো কল করলাম। সেবার সম্ভবত রাষ্ট্রদূতের পিএসকে কল করেছিলাম। ভদ্র মহিলা। ইন্ডিয়ান হবে মনে হচ্ছিল। তাকে অনুরোধ করলাম, আমি একটা বিপদে পড়েছি। আপনার হেল্প দরকার। তার আগে আমার সমস্যাটা দয়া করে ধৈর্য্য ধরে একটু শুনুন। উত্তর এলো, আচ্ছা সংক্ষেপে বলুন।

আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় ক্রিকেট সিরিজ হচ্ছে ১২ মে থেকে। আজ ৯ মে। সেখানে টাইটেল স্পন্সর ওয়ালটন। ওয়ালটনের প্রতিনিধি হয়ে প্রেজেন্টেশন সিরিমনিতে আমার থাকার কথা। শেষ মুহূর্তে টাইটেল স্পন্সর ডিসাইড হয়েছে। যে কারণে ভিসা নিতে সময় পাইনি।

ভদ্র মহিলা বললেন, আপনি কোলকাতা গিয়ে অ্যাপ্লাই করুন। আমরা হাতে পেলে চেষ্টা করব তাড়াতাড়ি ভিসা দিতে। উত্তর দিলাম, সেটা কীভাবে সম্ভব। সিরিজ চলাকালে তো ভিসা পাওয়া সম্ভব নয়। সমস্যা আছে আরেকটা। কী, ভদ্রমহিলা জানতে চাইলেন।

বললাম, ওয়ালটনের প্রতিনিধি প্রথম ম্যাচ থেকে থাকতে না পারলে ওয়ালটন স্পন্সরের টাকা দেবে না। সেক্ষেত্রে আয়ারল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ড বিপদে পড়বে। আপনি একটু চিন্তা করেন ইন্ডিয়াতে ক্রিকেট ম্যাচ হচ্ছে। সেখানে স্পন্সর প্রতিষ্ঠানের কেউ না থাকলে ওই প্রতিষ্ঠান কি সহজে টাকা দেবে? এখন ভিসা না পেলে ভবিষ্যতে আমরা আয়ারল্যান্ডে কোনো স্পন্সর করব না। বিষয়টা গুরুত্বসহকারে দেখবেন, প্লিজ। উনি বললেন, আপনি লাইনে থাকুন। কাটবেন না ফোন। আমি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথা বলে জানাচ্ছি।

এতোক্ষণে হালে কিছুটা পানি পেলাম। মিনিট সাতেক পর ওপার থেকে ওই ভদ্রমহিলার কণ্ঠ! হ্যালো, আর ইউ হেয়ার! ইয়েস ম্যাডাম, আই অ্যাম হেয়ার।

আপনার কাছে কি আয়ারল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ডের চিঠি আছে? জ্বি আছে। স্পন্সরশিপ কন্ট্রাক্ট? ইয়েস ম্যাডাম। অন্যসব দরকারি কাগজ? ইয়েস ম্যাডাম।ব্যাংক ড্রাফট? নো ম্যাডাম। আপনি তাহলে স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়াতে গিয়ে একটা ব্যাংক ড্রাফট নিয়ে আসুন। দুপুর ২টায় এসে কল করবেন আমাকে। কত রুপির ড্রাফট বা পে অর্ডার দিতে হবে সেটাও বললেন।

আপনার নামটা কী ম্যাডাম? আমি অনিন্দিতা (নামটা এখন সঠিক মনে নেই, এরকমই হবে)। থ্যাংক ইউ ম্যাডাম। সো কাইন্ড অব ইউ।

মুখে হাসি দেখেই অজয় বুঝে ফেলেছিলো সব। বললাম, স্টেট ব্যাংক কোথায়? সবচেয়ে কাছের শাখাটা কই? অজয় বলল, আশেপাশে নেই। অনেক দূরে। চানক্যপূরীর প্রায় বাইরে। বলে কী? তাহলে উপায়। একটা অটো নেওয়ার পরামর্শ দিলেন। উৎসাহ পাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল কাজটা হয়ে যাচ্ছে। খাঁদের কিনার থেকে উঠে এসে চূড়ায় বসার মতো ব্যাপার। তখনই ফোন দিলাম ফরিদ ভাইকে। সবকিছু বললাম সংক্ষেপে। ফরিদ ভাই বললেন, বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাছাকাছি একটা শাখা আছে। উনার এক সহকারীকে ডেকে রোডের নাম দিলেন। একটা অটো নিয়ে ছুটলাম সেদিকে। ঘড়িতে তখন সকাল ১১টা।

স্টেট ব্যাংকের শাখায় পৌঁছালাম ১৫ মিনিটের মধ্যেই। লাইনে দাঁড়ালাম। আমার পালা যখন আসলো তখন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বললেন, অন্য কাউন্টারে যেতে। যেখানে যেতে বললেন, সেখানকার লোকটা পান খাওয়া নিয়ে ব্যস্ত। পাশের জনের সঙ্গে খোশ গল্প করছিলেন। ব্যাংকের ভেতরে-বাইরে আর লোকটার পান খাওয়ার অবস্থা দেখে আমাদের দেশের সরকারি ব্যাংকগুলোর কথাই মনে পড়ল! একই অবস্থা। যাহোক, আধা ঘণ্টার মধ্যে কাজ হয়ে গেল। ব্যাংক থেকে বের হয়ে অটো নিয়ে সোজা আয়ারল্যান্ড অ্যাম্বাসি। দুপুর তখন ১২টা।

অজয়কে বললাম, অনিন্দিতা ম্যাডামকে বলেন আমি এসেছি। ফোন করলেন। ওপাশ থেকে উত্তর এলো এখন তো আসতে বলিনি। ঠিক বেলা ২টায়! আরো দুই ঘণ্টা! যাক, কী আর করি। তবু ভিসা হলে এসব কষ্ট সব উবে যাবে।

ভাবলাম, ২টায় দূতাবাসে ঢুকলে কখন ছাড়া পাব ঠিক নেই। দুপুরের খাবারটা তাহলে খেয়ে নিই। অনেক দূরের একটা রেল স্টেশনে গেলাম খেতে। ৮০ রুপির মতো অটো ভাড়া নিয়েছিল। ট্যাক্সিতে ফিরতে অবশ্য প্রায় ১৫০ রুপি লাগল।

২টা বাজার ১৫ মিনিট আগে পৌঁছে গেলাম দূতাবাসের সামনে। অজয়কে বললাম, দাদা নক করেন ওই ম্যাডামকে।ওম হু। কেন? ঠিক ২টায়। তার আগে না। ওহ, আচ্ছা। বলে পার্কে গিয়ে বসলাম। অনেক গরম। রান্না ঘরের মতো আগুনে বাতাস। আমার তর সইছিল না। মিনিট দশেক পরে আবার গিয়ে দাঁড়ালাম গেটে, অজয়ের সামনে। অজয় ঘড়ি দেখল। অপেক্ষা। ঠিক ২টা ২ মিনিটে অজয় কল করল ভেতরে। অনিন্দিতা ম্যাডাম যেতে বলেছেন। অজয় তার রেজিস্ট্রি খাতা খুললেন। নাম-ঠিকানা, ফোন নম্বর লিখে একটা ভিসিটর কার্ড দিলেন। তারপর গেট খুলে দেখিয়ে দিলেন- ওদিকে দোতলায় গিয়ে অপেক্ষা করেন।

ক্রিকেট স্টেডিয়াম থেকে ড্রেসিং রুমে উঠতে যেরকম খাড়া সিঁড়ি থাকে বাইরে থেকে, সেরকম একটা সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেলাম। প্রথম কক্ষটি ফাঁকা। কেউ নেই। একটা কালো রঙের সোফায় বসলাম। ডিসপোজাল গ্লাস নিয়ে একটু পানি পান করলাম। তিন-চার মিনিট পর একজন ম্যাডাম দ্বিতীয় ঘরটায় এসে বললেন, কে এসেছেন? এগিয়ে গেলাম। ম্যাডাম, আমি। কাগজগুলো দিন। শ্যামলা রঙের সুশ্রী ভদ্র মহিলা। বয়স ২৫ থেকে ৩০ এর মধ্যে। কাঁচের ফাঁক দিয়ে কাগজ নিলেন। প্রথমে পাসপোর্ট, এরপর ব্যাংক ড্রাফট, আয়ারল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ডের চিঠি দেখে বললেন, ওকে। ৪টায় আসেন। আজকে? ইয়েস, ৪টায় সময় এসে পাসপোর্ট নিয়ে যাবেন। ভিসাসহ না ভিসা ছাড়া? বললেন, ভিসাসহ।

আহ! মনটা খুশিতে ভরে উঠল!!

কিন্তু এত অল্প সময়ে ভিসা! দেবে নাকি রিফিউজড হবে!

** আয়ারল্যান্ডের ভিসা পাওয়া এতো সহজ! পর্ব ৩
** আয়ারল্যান্ডের ভিসা পাওয়া এত সহজ! পর্ব ২
** আয়ারল্যান্ডের ভিসা পাওয়া এত সহজ!
** ক্রিকেট ভক্ত শাহীনের গল্প
** বিশ্বকাপ জিতবে বাংলাদেশ!
** আয়ারল্যান্ডে মাঠ জুড়ে বাংলাদেশ!
** আয়ারল্যান্ড প্রবাসী বাংলাদেশিরা নিজেদের ভাগ্যবান মনে করছেন
** গুড লাক বাংলাদেশ




রাইজিংবিডি/ঢাকা/১১ জুন ২০১৯/উদয় হাকিম/রফিক

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন