ঢাকা, শনিবার, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

আয়ারল্যান্ডের ভিসা পাওয়া এত সহজ! (৭)

উদয় হাকিম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৬-৩০ ৭:০৮:২৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৭-০১ ৯:২৬:৫১ এএম
আয়ারল্যান্ডের দক্ষিণ-পূর্ব এলাকার একটি সি বিচ

উদয় হাকিম, ডাবলিন (আয়ারল্যান্ড) থেকে ফিরে : মাত্র দুই ঘণ্টায় আয়ারল্যান্ডের ভিসা পেলাম! কিভাবে পেলাম সে কাহিনি তো শুনলেনই। সেটা যদিও বছর দুয়েক আগের ঘটনা। এখন বলছি এ বছরের কাহিনি। এবার ভিসা পেতে লেগেছিল তিন দিন।

ক্রিকেট স্পন্সরশিপের কাজ করতে করতে একটা জিনিস বুঝে গেছি, এসব কাজ হয় শেষ সময়ে। ক্রিকেট মাঠের ইনস্টিডিয়া রাইটস যিনি কেনেন, তার প্রবণতা থাকে কীভাবে আরো বেশি দামে বিক্রি করবেন। অন্যদিকে ক্রেতা বসে থাকেন কীভাবে আরো কম দামে কিনবেন। একেবারে শেষের দিকে গিয়ে রফা হয়। ফলে শেষ সময়ে বিপদে পড়েন স্পন্সর প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা। বিশেষ করে ইউরোপ আমেরিকা অস্ট্রেলিয়া- এসব দেশের ভিসা করাতে সময় লাগে বেশি। শেষ অবধি ভিসা হয় না বলে অনেকেই যেতে পারেন না।

গত মে মাসে শেষ হওয়া ত্রিদেশীয় সিরিজেও তাই হলো। টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার কয়েকদিন আগে টাইটেল স্পন্সর হলো ওয়ালটন। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে উদয় হাকিম আর ফিরোজ আলম মনোনীত হলেন আয়ারল্যান্ড ট্যুরের জন্য। টুর্নামেন্টের দেখভালের জন্য। ওদিকে তখন রোজা চলছিল। কদিন পরেই ঈদ। কাজের বেশ চাপ। ভিসার জন্য ইন্ডিয়া যাওয়ার সুযোগ ছিল না তাদের কারো।

ওদিকে আগেই বলেছিলাম- আয়ারল্যান্ডের ভিসা পাওয়ার ফ্যাকরা। বাংলাদেশে আইরিশ দূতাবাস বা কনস্যুলেট অফিস নেই। বাংলাদেশিদের আইরিশ ভিসা নিতে হয় দিল্লি থেকে। তবু সরাসরি দিল্লিতে ভিসা আবেদন জমা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। জমা দিতে হবে কলকাতা। দিল্লি থেকে প্রসেস হয়ে আসবে কলকাতায়। কলকাতা থেকে ভিসা নিয়ে তারপর আসতে হবে ঢাকা। তার মানে যতদিন ভিসা না হচ্ছে ততদিন আপনি কলকাতা থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। পাসপোর্ট ছাড়া দেশে ফিরবেনই বা কীভাবে?

আয়ারল্যান্ডের অনিশ্চিত ভিসার জন্য দুজনের যাওয়া ঠিক হবে না। তাহলে উপায়। ঠিক হয়েছিল সহকর্মী মিলটনকে পাঠাব। যতদিন লাগে সে ইন্ডিয়া থাকুক। মিলটনের ইন্ডিয়ার ভ্যালিড ভিসা আছে। সুতরাং সমস্যা নেই। তবে হ্যাঁ, সমস্যা আছে। নিয়ম অনুয়ায়ী এক জনের পাসপোর্ট আরেকজন বহন করতে পারেন না। এক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের অনুমোদন লাগে।

প্রয়োজনীয় ফরম সংগ্রহ হলো। দরকারি সব কাগজ জমা দিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হলো। দুদিনের মধ্যেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন মিলল। তৃতীয় দিনের মাথায় আমাদের দুজনের পাসপোর্ট এবং অন্যান্য নথিপত্র নিয়ে মিলটন চলে গেল ইন্ডিয়া।

শাহ আব্দুল করিমের একটা বিখ্যাত গান আছে- গেরামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান। ওই গানের অন্তরায় একটা কথা আছে- দিন হতে দিন আসে যে কঠিন। সেটাই হলো। আগে ঢাকা-দিল্লি সরাসরি ফ্লাইট ছিল জেট এয়ারের। সেটি এখন নেই। মানে সরাসরি ঢাকা থেকে দিল্লি যাওয়ার রাস্তা নেই এখন। আগে কলকাতা যেতে হবে। সেখান থেকে ডমিস্টিক ফ্লাইট ধরে দিল্লি।

রাতে রওয়ানা হলেন মিলটন। কলকাতা গিয়ে পৌঁছালেন। পরদিন সকালে আরেক ফ্লাইট ধরে গেলেন দিল্লি। সবাই জানতাম, বাংলাদেশিদের আয়ারল্যান্ড ভিসা আবেদন জমা দিতে হয় কলকাতা। কিন্তু একটু ভাবুন- কলকাতা আবেদন জমা দেবেন। সেটি কুরিয়ারে দিল্লি যাবে। কবে যাবে, কবে সেটি খুলবে, কবে প্রসেস হবে? অনিশ্চিত! এমনও হতে পারে দেড় মাস ধরে বসে আছেন। কোনো রিপ্লাই নাই। কাউকে কিছু বলতেও পারবেন না। এর মধ্যে পুলিশের হাতে ধরা খেলেও মুশকিল। পাসপোর্ট দেখাতে পারবেন না। আবার পাসপোর্ট দেখাতে পারলেও পুলিশ প্রশ্ন করতে পারে, আপনার কাছে তিন পাসপোর্ট কেন? ওদিকে আমার পাসপোর্টে আমেরিকা লন্ডনসহ বিভিন্ন দেশের ভ্যালিড ভিসা। বুঝেছেন বিষয়টা কেমন জটিল। সুতরাং অনিশ্চয়তায় না থেকে দিল্লি গিয়ে চেষ্টা করাই ভালো। সেরকমই নিদের্শনা ছিল।

যাওয়ার আগে মিলটনকে একটা গল্প বলেছিলাম। সত্য ঘটনা। এটা বলার উদ্দেশ্য ছিল যাতে ভয় না পায়। ভিসা না পেলেও কোনো সমস্যা নেই সেটি বোঝানোর জন্য। নব্য বিবাহিত এক মহিলার স্বামী ঢাকায় থাকেন। পাশের বাড়ির এক যুবককে তিনি রাতে বাসায় যেতে বলেছিলেন। কিন্তু এরই মধ্যে ঢাকাইয়া বাসায় চলে এসেছেন। যুবক রাতে ঘরের বেড়ায় টোকা দিলেন। মহিলার স্বামী ওঁৎ পেতে থেকে যুবককে ধরে ফেললেন। বকাবকি করছিলেন। কেন সে এত রাতে সেখানে? যুবক জবাব দিল, ভাবিসাব আসতে বলেছিলেন। এসেছি। এতো বকাবকি করছেন কেন? দেখা হলে হবে না হলে চলে যাব। মিলটনও ভিসা না হলে চলে আসবেন।

 

আয়ারল্যান্ডের সমুদ্র তীরবর্তী একটি বাতিঘর

দিল্লিতে মিলটনের সঙ্গী হলেন তানভির ভাই। উনি ব্রডকাস্ট এক্সপার্ট হিসেবে যাচ্ছিলেন আয়ারল্যান্ড। প্রোডাকশন ম্যানেজার হিসেবে। এরকম একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে ব্রডকাস্ট হেড যাচ্ছেন বাংলাদেশ থেকে! বিষয়টা কিন্তু গর্বের। অনেক দিন ধরেই তিনি এ পেশায় আছেন। ভালো নাম করেছেন। বিশেষ করে ইন্ডিয়ানরা এক নামে তাকে চেনেন। তার অধীনে কাজ করেন ইন্ডিয়ান প্রফেশনালসরা।

তানভির ভাইকে ফোনে বলেছিলাম মিলটনকে হেল্প করতে। দিল্লি গিয়ে তানভির মিলটন একই হোটেলে উঠলেন। লাগেজ রেখেই মিলটন চলে গেলেন চানক্যপুরীর মালচা রোডের ১৭ নম্বর বাড়িতে। ওটাই আয়ারল্যান্ড অ্যাম্বাসি। সেখানে আসিফুল বিলাশ নামে বিসিবির এক কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি গিয়েছিলেন সাকিব আল হাসানের পাসপোর্ট নিয়ে। কারণ আইপিএল খেলতে ভারতে যাওয়ায় সাকিবের ভিসা আবেদন টিমের অন্য খেলোয়াড়দের সঙ্গে জমা দেওয়া যায়নি। সেটা নিয়ে তিনি সরাসরি দূবাতাসে গিয়ে ভিসা করিয়ে নিচ্ছিলেন। তানভির ভাইও তার ভিসার জন্য গিয়েছিলেন। তিন জনে মিলে ভাবছিলেন কিভাবে আমাদের ভিসা তাড়াতাড়ি বের করা যায়।

ততদিনে বেশ কয়েকবার দূতাবাসের ভেতের গিয়েছিলেন বিলাশ সাহেব। সুতরাং তার সঙ্গে কয়েকজনের সখ্য হয়ে উঠেছিল। ওদিকে তানভির ভাইও তার ভিসার জন্য সাহায্য নিয়েছিলেন বিলাশের। মুশকিল হলো তিনি প্রথমে সাকিবের ভিসা করিয়েছেন। পরে তানভির ভাইয়ের জন্য অনুরোধ করেছেন। সবই হয়েছে। কিন্তু আবার কি করে আরো দু-তিন জনের জন্য অনুরোধ করবেন। ওদিকে না করলেও তো চলে না।

দূতাবাস কর্মকর্তাদের অনুরোধ করলেও সেটি রক্ষা হচ্ছিল না। যথারীতি ওই একই কাহিনি। কলকাতা জমা দিন। নইলে দিল্লিতেই কোনো কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে জমা দিন। উপায় না দেখে মিলটন চলে গেলেন দিল্লি ভিএফএস সেন্টারে। কিন্তু তারা বাংলাদেশিদের ভিসা আবেদন নেবেন না। কলকাতা গিয়ে দিতে বললেন। ভীষণ মুশকিল। ব্যাংক ড্রাফট আর দৌড়োদৌড়ি করে সেদিন পার হয়ে গেল।

পরদিন সকালে বিলাশ সাহেবকে আবারো পাঠানো হলো বিষয়টা গুরুত্ব বোঝানোর জন্য। বলা হলো ওয়ালটন আগে তোমাদের দেশের ক্রিকেটে স্পন্সর করেছে। আবারো যাচ্ছে। এটা তো আলটিমেটলি তোমাদেরই লাভ। তোমাদের উচিত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাদের কাজটা করে দেওয়া। আখেরে লাভবান হবে আয়ারল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ড। কথা সত্য। কিন্তু...। কিন্তু আবার কি? সিনিয়র অফিসারদের অনুমোদন লাগবে। কথা বলে দেখি।

অবশেষে কাজ হলো। অনুমোদন হলো। আবেদন জমা দেওয়া গেল। বলা হলো তিন কর্মদিবস লাগবে। সোমবারে কাগজ জমা হলো। বুধবার পাসপোর্ট ফেরত দেওয়ার কথা। কিন্তু সেদিন পয়লা মে। মে দিবসের ছুটি। কি করা যায়? ৫ মে ক্রিকেট সিরিজ শুরু। তার আগেই অন্তত একজনকে পৌঁছাতে হবে- মাঠের ব্র্যান্ডিং দেখতে।

ভাগ্য ভালো বলতে হবে। একদিনের মধ্যেই দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক ধরনের সখ্য হয়ে গেল মিলটনের। খবর পাওয়া গেল  পয়লা মে সীমিত আকারে দূতাবাস খোলা থাকবে। অনুরোধ করা হলো ওইদিন যেন আমাদের ভিসাগুলো দেওয়া হয়। বলা হলো, পরিস্থিতি বোঝে মোবাইল ফোনে জানানো হবে।

পয়লা মে সকালে ফোন গেল মিলটনের মোবাইলে। দুপুরে গিয়ে পাসপোর্ট সংগ্রহ করা হলো। ইয়েস। ছয় মাসের ভিসা হয়েছে প্রত্যেকের। ক্রিকেট আয়ারল্যান্ড, বিজনেস ভিসা!

আরো পড়ুন

** আয়ারল্যান্ডের ভিসা পাওয়া এত সহজ! (৬)
** আয়ারল্যান্ডের ভিসা পাওয়া এত সহজ! পর্ব ৫
**আয়ারল্যান্ডের ভিসা পাওয়া এত সহজ! পর্ব ৪
** আয়ারল্যান্ডের ভিসা পাওয়া এতো সহজ! পর্ব ৩
** আয়ারল্যান্ডের ভিসা পাওয়া এত সহজ! পর্ব ২
** আয়ারল্যান্ডের ভিসা পাওয়া এত সহজ!
** ক্রিকেট ভক্ত শাহীনের গল্প
** বিশ্বকাপ জিতবে বাংলাদেশ!
** আয়ারল্যান্ডে মাঠ জুড়ে বাংলাদেশ!
 **আয়ারল্যান্ড প্রবাসী বাংলাদেশিরা নিজেদের ভাগ্যবান মনে করছেন
** গুড লাক বাংলাদেশ


রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩০ জুন ২০১৯/উদয় হাকিম/সাইফ

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন