ঢাকা, বুধবার, ২৩ আষাঢ় ১৪২৭, ০৮ জুলাই ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

শর্তসাপেক্ষে কানাডায় সরকারি সুবিধা প্রবাসীরা কতটা পাবে?

ফজলে আজিম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৫-০৭ ৯:৫৭:৪৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৫-০৭ ১০:০৩:০৯ পিএম

কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোকে বলা হয় মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন এ সময়ের সবচেয়ে আলোচিত প্রধানমন্ত্রী। তার দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ও দেশপ্রেম প্রমাণ করেছে, তিনি সফল রাষ্ট্রনায়ক। কিছুদিন ধরে বাংলাদেশের বিভিন্নজনের ফেসবুক ওয়ালে ঘুরে বেড়াচ্ছে জাস্টিন ট্রুডো ঘরে ঘরে নাকি খাবার পাঠিয়ে দিচ্ছেন। সবাইকে অর্থ সাহায্য করছেন। বাড়ি ভাড়া ফ্রি করে দিয়েছেন। অনেকে আবার মেসেঞ্জারে নক করে আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন- আমি পেয়েছি কিনা? পেলে কতো পেয়েছি?

কানাডার সরকার অনেক মানবিক। আবেগিক নয়, বাস্তবিক পরিস্থিতির আলোকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে পুরো জাতির প্রশংসা কুড়িয়েছেন। জাস্টিন ট্রুডোর স্ত্রীর করোনাভাইরাস পজিটিভ ধরা পড়ার পর ট্রুডো নিজেও স্বেচ্ছায় আইসোলেশনে ছিলেন ১৪ দিন। এর মধ্যেও প্রতিদিন তিনি সকালে গণমাধ্যমের সামনে বিবৃতি দিয়েছেন। প্রতিদিনই কিছু না কিছু নতুন তথ্য দিয়েছেন আর ধন্যবাদ জানাচ্ছেন যারা অক্লান্তভাবে সরকারের উদ্যোগকে সফল করার জন্য কাজ করছেন। ঘরে বসেই তিনি তার দাপ্তরিক কাজ সেরেছেন তখন। 

স্থানীয় টিভি চ্যানেল, অনলাইন ও কাগজের পত্রিকায় যেসব খবর আসছিলো বাংলায় অনেকেই আবেগতাড়িত হয়ে অতিরঞ্জিত করে তথ্যগুলো প্রকাশ করেছেন। এতে বাংলাদেশী শিক্ষার্থী ও অভিবাসীদের অনেকেই বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছেন। 

করোনাভাইরাসের মহামারি থেকে কানাডার নাগরিকদের সুরক্ষিত রাখতে জাস্টিন ট্রুডো কিছু সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেগুলো এতো দিনে সবাই জেনে গেছেন। কানাডার নাগরিক ও অভিবাসীদের সহযোগিতা চেয়ে তিনি বলেছিলেন, আপনারা খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হবেন না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো অফিসিয়ালি বন্ধ রেখেছিলেন তিনি। এখনও বন্ধ আছে। রেস্টুরেন্টগুলোতে বসে খাবার গ্রহণের সুযোগও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সীমিত আকারে চালু আছে টেক-আউট সার্ভিস। ফুড ডেলিভারি কুরিয়ারগুলো খাবার পৌঁছে দিচ্ছে বাসায়। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে শপিং মল ও সব ধরনের বিপণী বিতান। শুধু খোলা আছে সুপারস্টোর, ওষুধের দোকান, রেস্টুরেন্ট ও গুরুত্বপূর্ণ চিঠি আদান-প্রদানের জন্য কুরিয়ার সার্ভিস। এমন সিদ্ধান্তে অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়তে পারেন। তাই বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন ট্রুডো।

প্রতিমাসের নিয়মিত বড় অঙ্কের খরচ মেটাতে আগামী চার মাস বাড়িওয়ালাদের মর্টগেজ দিতে হবে না বলে জানিয়েছেন। ব্যাংকগুলোকেও এ  নির্দেশনা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যারা শিক্ষা কিংবা আবাসনের জন্য ঋণ নিয়েছেন তাদের ক্ষেত্রেও ঋণ পরিশোধে শিথিলতা আরোপ করা হয়েছে। যারা বাড়িওয়ালা তাদের ক্ষেত্রে সরকারের এ নীতি থাকলেও ভাড়াটিয়াদের ঠিকই মাস শেষে ভাড়া গুনতে হচ্ছে। তবে সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে সরকারের সুস্পষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে।

কানাডিয়ান সিটিজেন ছাড়াও যারা বৈধভাবে কাজ করেন তাদের সবাই বাধ্যতামূলকভাবে সরকারকে নিয়মিত আয়কর দেন। বেতনের টাকা দেওয়ার সময় অধিকাংশ কোম্পানি ট্যাক্সের টাকা সরাসরি সরকারের কোষাগারে জমা দিয়ে দেয়। পাশাপাশি প্রত্যেক চাকুরিজীবির আয় থেকে এমপ্লয়মেন্ট ইন্সুরেন্স-এর প্রিমিয়াম হিসেবে প্রতিমাসে একটা নির্দিষ্ট টাকা কেটে রাখা হয়। যা চাকরির সুরক্ষা বীমা বলা হয়। কোনো কারণে কেউ যদি চাকরি হারায় তখন ইন্সুরেন্স থেকে তাকে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট হারে ভাতা দেওয়া হয়। সে ভাতা দিয়ে একজন মানুষ বাসা ভাড়াসহ দৈনন্দিন খরচ মিটিয়ে আরামে দিনযাপন করতে পারে।

সরকারি ঘোষণার কারণে সাময়িক বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে এমপ্লয়িদের চিঠি দেওয়া হচ্ছে। যেটা দেখিয়ে অনেকেই এমপ্লয়মেন্ট ইন্সুরেন্স-এর বেনিফিটের টাকা তুলতে পারছেন। সেখানেও বেশ কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। যারা ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে কাজ করেন তাদের জন্য সময়টা চ্যালেঞ্জিং বলা যেতে পারে। কারণ তারা এ সুবিধা পাবেন না।

সেল্‌ফ এমপ্লয়েড, ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীরা শর্তপূরণ সাপেক্ষে তারা বিভিন্ন বেনিফিটের জন্য আবেদন করতে পারবেন। প্রাথমিকভাবে যারা এ সময়ে চাকরি হারিয়েছেন তাদের অধিকাংশই মাসে প্রায় ২ হাজার কানাডিয়ান ডলার করে বেনিফিট পাবেন। যা দিয়ে বাসা ভাড়াসহ দৈনন্দিন খরচ মেটানো যাবে।

দরিদ্র মানুষদের খাদ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সম্প্রতি ১০০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দের কথা জানিয়েছেন ট্রুডো। ফুড ব্যাংকের মাধ্যমে এ অর্থে খাবার পৌঁছে দেওয়া হবে দরিদ্র, গৃহহীন ও স্বল্প আয়ের মানুষের মাঝে। এখন কথা হলো সবাই কি পাবে এই সরকারি সুবিধা?

উত্তর হচ্ছে- না। প্রতিটি ফান্ডের ক্ষেত্রে কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। যেমন আপনি যদি সেল্‌ফ এমপ্লয়েড, পূর্ণকালীন কিংবা চুক্তিভিত্তিক কোনো চাকরি করে থাকেন তবে আপনি সপ্তাহে ৫০০ ডলার করে ১৬ সপ্তাহ বেনিফিট পেতে পারেন। এজন্য শর্তগুলো হচ্ছে: ১. যদি আপনি চাকরিচ্যুত হন এবং বর্তমানে কোনো আয় না থাকে। অর্থাৎ বর্তমান পরিস্থিতির কারণে কোনো প্রতিষ্ঠান যদি আপনাকে চাকরিচ্যুত করে। ২. ডাক্তারের পরামর্শে কোয়ারেন্টাইনে থাকেন। ৩. অসুস্থ কাউকে দেখাশোনা করেন। ৪. ছোট বাচ্চাদের দেখাশোনা করার জন্যে বাসায় থাকতে হয়।

যারা রেস্টুরেন্ট ব্যবসা করেন তাদের কর্মীদের সময়মতো বেতন প্রদানে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত ভুর্তকি দেওয়ার প্রস্তাবনা রয়েছে সরকারের। প্রতিটি রেস্টুরেন্টের মালিক সপ্তাহে তিনজন কর্মীর জন্যে ১১২৫ ডলার করে সরকারের কাছ থেকে প্রণোদনা পাবেন। এর মানে হচ্ছে রেস্টুরেন্ট সচল থাকতে হবে এবং ব্যক্তিগত কিংবা কুরিয়ারে অর্ডারের মাধ্যমে টেক-আউট চালু থাকতে হবে।

কানাডার স্থানীয় সংবাদপত্র ‘গ্লোবাল নিউজ’-এর তথ্য অনুযায়ী, সরকারি ঘোষণা আসার পর থেকে ৩ এপ্রিল পর্যন্ত এমপ্লয়মেন্ট ইন্সুরেন্স বেনিফিটের জন্য ২১ লাখ আবেদন জমা পড়েছে। তবে বেশ কিছু আবেদনের ক্ষেত্রে শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। যেমন শিক্ষার্থীদের বেনিফিট পাওয়ার জন্য আবেদন করতে হলে ২০১৯ সালে আবেদনকারীকে অন্তত ৫০০০ ডলার আয় করার প্রমাণ দেখাতে হবে। অন্যান্য পেশাজীবীদের মতো কেউ যদি স্বেচ্ছায় চাকরি ত্যাগ করে তারা এ সুবিধাগুলো পাবে না।

ভ্যানকুভার, ব্রিটিশ কলম্বিয়া, কানাডা


ঢাকা/তারা