ঢাকা, বুধবার, ২৫ চৈত্র ১৪২৬, ০৮ এপ্রিল ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

‘তোর ঘরে মামলা ঢুকুক’

কাজী জহিরুল ইসলাম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৩-০১ ২:৫৯:৪৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৩-০১ ৩:০২:৩৫ পিএম

ছেলেবেলায় আমার এক আত্মীয় বলেছিলেন, মুর্শিদাবাদের বাংলা খুবই শ্রুতিমধুর। ওদের অভিধানে কোনো খারাপ গালি পর্যন্ত নেই। সর্বোচ্চ খারাপ খালি যেটা ওরা দেয় তা হলো ‘তোর ঘরে মামলা ঢুকুক’।

পরবর্তী জীবনে আর কখনো এই কথার সত্য-মিথ্যা যাচাই করা হয়ে ওঠেনি। তবে সেই শিশুকাল থেকেই মুর্শিদাবাদের মানুষদের প্রতি মধুর বাংলা বলার কারণে এক ধরনের মুগ্ধতা তৈরি হয়ে আছে। সব সময় ভাবতাম, ‘তোর ঘরে মামলা ঢুকুক’ এটা কি করে গালি হয়। কিন্তু জীবনের এতগুলো বছর পার করে, পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই-য়ে আমেরিকায় এসে বুঝতে পারছি, এরচেয়ে খারাপ গালি আর হয় না। পৃথিবীর আর কেউ মানুক আর না মানুক আমেরিকানরা এটা হাড়ে হাড়ে মানে।

এই স্বাধীনচেতা এবং গর্বিত জাতি মার্কিনীরা একটি বিষয়কেই ভীষণ ভয় পায়, তা হলো মামলা। কথায় কথায় তাই একজন অন্যজনকে মামলার ভয়টাই বেশি দেখায়। এর মূল কারণ কিন্তু জেল খাটার ভয় না, অর্থদণ্ডের ভয়। একজন আমেরিকানকে যদি জিজ্ঞেস করেন, তুমি কাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসো? সে অবলীলায় উত্তর দেবে, ডলারকে। আমেরিকানদের যাবতীয় কর্মকাণ্ড আবর্তিত হয় ডলারকে কেন্দ্র করে।

আমার এক বাংলাদেশি বন্ধুর প্রতিবেশী এক ইতালীয় আমেরিকান। ভদ্রলোক একজন ইঞ্জিনিয়ার। তেমন ব্যস্ত ইঞ্জিনিয়ার নন নিশ্চয়ই। আমার বন্ধু জানালেন, ইতালীয় ইঞ্জিনিয়ার সাহেব সপ্তাহে একদিন তার বাগানের ঘাস কাটে আর সুইমিং পুল পরিস্কার করে দেয়। আমার বন্ধুটি তাকে মাসে ৬০০ ডলার মজুরি  দেন। আরেক বাংলাদেশি বন্ধুর স্ত্রী তার প্রতিবেশীকে মধ্যাহ্নভোজের নিমন্ত্রণ করেছেন। তিনি কোনো কারণে নিমন্ত্রণে আসতে পারেননি বলে বন্ধুর স্ত্রী তার জন্য প্যাকেটে করে খাবার দিয়ে এসেছেন। খাবার-টাবার খেয়ে বিকেলবেলা তিনি ৭৫ ডলারের একটি চেক নিয়ে এসেছেন। যেন ডলার দিয়েই মিটিয়ে দেবেন ভালোবাসা বা আন্তরিকতার মূল্য।

ডলারের প্রতি আমেরিকানদের অকুণ্ঠ প্রেম। তাই মামলা খেয়ে সেই ডলার যদি জরিমানা গুণতে হয়  তাহলে তো মামলাকে সঙ্গত কারণেই ভয় পাবে। এখানকার মামলার রায়গুলিও হয় বড় অদ্ভুত। এক ষোল বছরের তরুণী তার বাবার সাথে রাগ করে দোতলার জানালা থেকে লাফিয়ে পড়েছে আত্মহত্যার অভিপ্রায়ে। কিন্তু দুর্ভাগ্য তরুণীটির, এত কম উচ্চতা থেকে পড়ার কারণেই হয়ত, তিনি আত্মহত্যা করতে পারেননি, তবে গুরুতর আহত হয়েছেন।

প্রিয় পাঠক, এই ঘটনায় কারো দোষ খুঁজে পাচ্ছেন? ভাবছেন, বাবা অপরাধী? না, মেয়েটির বাবা মামলা ঠুকে দিলেন বাড়িওয়ালার বিরুদ্ধে, তার জানালায় সেইফটি গ্রিল নেই কেন? সেইফটি গ্রিল থাকলে তো তার মেয়ে লাফিয়ে পড়তে পারত না। বিজ্ঞ আদালত বাবার কথায় অকাট্য যুক্তি দেখতে পেয়েছেন। বাড়িওয়ালাকে দেড় লাখ ডলার জরিমানা করে দিলেন। কারো হয়ত বড়ি খেয়ে এলার্জি হল, গায়ে কিছু র‌্যাশ উঠলো, অমনি মামলা ঠুকে দিলেন  ডাক্তারের বিরুদ্ধে। কারো বাড়ির সামনের ফুটপাতে কলার খোসায় পা দিয়ে, কিংবা তুষারপাতের দিনে, তুষারে পা পিছলে পড়ে গিয়ে কারো কোমর ভাঙল, মামলা হয়ে গেল বাড়িওয়ালার বিরুদ্ধে। জরিমানা ৫০/৬০ হাজার ডলার, বেশিও হতে পারে। বিচারকের অকাট্য যুক্তি কলার খোসা পড়ে আছে দেখলে না কেন, সময়মত তুষার সাফ করোনি কেন? আরো যে কত কারণে মামলা হয় তার কোনো হিসেব নেই। এসব মামলায় পড়ে যাতে বড় অংকের অর্থদণ্ড না দিতে হয় তার ব্যবস্থাও আছে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, নির্মাণ কোম্পানিসহ প্রায় সকল পেশাজীবীই মামলার অর্থদণ্ড থেকে বাঁচার জন্য ইনস্যুরেন্স কিনে রাখেন।

লেখক: কবি, কথাসাহিত্যিক, জাতিসংঘে কর্মরত

 

ঢাকা/সাইফ