জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেছেন, ‘‘সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, এবারের বাজেট যেন লুটেরাদের বাজেট না হয়। বাজেট যেন সাধারণ মানুষের জন্য হয়।’’
বৃহস্পতিবার (২১ মে) বিকালে রাজধানীর কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের (আইডিইবি) মুক্তিযোদ্ধা হলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছায়া বাজেট কমিটির আয়োজনে ‘বৈশ্বিক অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশের বাজেট: কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও সংস্কারে অগ্রাধিকার এবং জনপ্রত্যাশার বৈষম্যহীন সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন।
আখতার হোসেন বলেন, ‘‘আওয়ামী লীগের সময়ে বাজেট মুখ্য বিষয় ছিল না। সেটি একটি কাগজে দলিল ছিল। সেসময় দেশকে পরিচালনা করত একটি কর্পোরেট গোষ্ঠী। তারা দেশের পয়সাগুলোর মালিক ছিল। তাদের হাত ধরেই দেশের পয়সা বিদেশে পাচার হয়েছিল। তারা যে বাংলাদেশের নাগরিক, এখন তারা শিকার করতে চায় না। এখন যখন জবাবদিহিতার সময় এসেছে, তখন তারা দেশের কাছেও জবাবদিহিতা করতে চায় না। তারা নাগরিকত্ব ছেড়ে দিতে চায়।’’
‘‘বাজেট সংসদে সবচেয়ে রুটিন এবং গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা; যার সঙ্গে নাগরিক সম্পৃক্ততা সবচেয়ে বেশি। প্রতিবছর বাজেট আসলে আমরা একটি কথা শুনি যে, বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বাজেট করা হবে। কিন্তু পাস হয়ে গেলে আমরা দেখি গতানুগতিক পূর্বের বছর ধারবাহিকতায় একটি বাজেট হয়েছে,’’ যোগ করেন তিনি।
আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্যে ছায়া বাজেট প্রণয়ন কমিটির প্রধান ও সংসদ সদস্য ড. আতিক মুজাহিদ বলেন, ‘‘আমরা আজকের বাজেট সভা করার আগে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। মানুষের সাথে কথা বলে বুঝেছি যে, বাংলাদেশের মানুষ সরকারের কাছে দয়া চায় না। তারা একটা ফেয়ারনেস চায়। করের বোঝা যেন কেবল নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বোঝা না হয়, শিল্পপতিরা যেন বাদ না যায়। তারা একটি নিশ্চয়তা চায়, তারা যে ব্যবসায় বিনিয়োগ করবে, যেখানের প্রবাহিকা কীভাবে কাজ করবে এবং তাদের ব্যবসা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। বাজেট কীভাবে ব্যয় হবে, তারা জবাবদিহিতা চেখতে চায়। তারা এমন একটি কর সিস্টেম চায়, যেটাকে তারা বিশ্বাস করতে পারবে।’’
আলোচনা সভায় সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘‘সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন-২০০৯’ অনুযায়ী বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, এটি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি উপস্থাপন করে। এই আইনের অধীনে অর্থমন্ত্রীর প্রতি তিনমাস পর বাজেটের অগ্রগতি কি হচ্ছে তা পেশ করবেন। এই আইনের ১২(২) ধারা অনুযায়ী যথাসম্ভব মার্চ মাসের মধ্যে সংশোধিত বাজেট পেশ করার নিয়ম থাকলেও তা করা হয় না, যা একটি বড় আইনি ব্যত্যয়।’’
এছাড়া ত্রৈমাসিক বাজেট অগ্রগতির রিপোর্ট ওয়েবসাইটে দেওয়া বন্ধ হওয়াকেও তিনি স্বচ্ছতার ঘাটতি হিসেবে উল্লেখ করেন।
বর্তমান সংকটের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকারের আবর্তক বা চলতি ব্যয় মোট রাজস্ব আয়ের চেয়ে ৪০ হাজার কোটি টাকা বেশি ছিল। এ ঘাটতির কারণে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতের উন্নয়ন ব্যয় ২৫ শতাংশ কমিয়ে দিতে হয়েছে। তাছাড়া বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। কর ফাঁকি রোধে তিনি এনআইডি-র মাধ্যমে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ভূমি ও গাড়ি রেজিস্ট্রেশন যুক্ত করে একটি সমন্বিত ডিজিটাল কর ব্যবস্থার প্রস্তাব করেন।
তিনি আরো বলেন, ‘‘গত দুই দশক ধরে এনবিআর সংস্কারের কথা শুনছি। কিন্তু মূল হলো বাস্তবায়ন। এনবিআর সংস্কার যে পিছিয়ে যাচ্ছে, আমার মনে হয়, তা আবার সংসদে আসবে। তার বড় কারণ হলো, এনবিআরের সংগ্রহ ও পলিসি জায়গা একইসঙ্গে। ফলে এখানে স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।’’
প্রথম সেশনে সভাপতির বক্তব্যে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘‘কর ব্যবস্থা সংস্কার করা জরুরি। গরিব মানুষ কর দেয়; অন্যদিকে যারা বড়লোক, তারা সেখান থেকে লুট করে নিয়ে যায়। কর ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী না করলে রাষ্ট্রের সাথে নাগরিকদের সম্পর্কের ভাটা পড়বে। জনগণ রাষ্ট্রের উপর আস্থা হারাবে। অন্তর্বর্তী সরকার যখন এনবিএআর আলাদা করতে চেয়েছিল, তখন এনবিআর-এর দুটি দল আলাদা হয়ে গিয়েছে। আর এখন যারা গণতন্ত্রের কথা বলে ফেনা তোলে, তারা সেসময় এনবিআরকে বাধাগ্রস্ত করার সব চেষ্টা করেছে।’’
জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম সদস্য সচিব সাদিয়া ফারজানা দিনার সঞ্চালনায় প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ছায়া বাজেট কমিটির উপ-প্রধান আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল। আরো বক্তব্য রাখেন সাবেক সিএজি, অর্থ সচিব এবং সোনালী ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী, কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ড. খান জহিরুল ইসলাম প্রমুখ।