ঈদুল আজহার আর মাত্র দিনকয়েক বাকি। রাজধানীর পশুর হাটগুলোতে ক্রেতাদের আনাগোনা থাকলেও বেচাকেনা এখনো জমে ওঠেনি। দাম শুনেই চোখ কপালে উঠছে ক্রেতাদের। বাজেটের সঙ্গে বিক্রেতাদের হাঁকা দামের আকাশ-পাতাল পার্থক্যের কারণে বেশির ভাগ ক্রেতা দাম শুনেই ফিরে যাচ্ছেন।
অন্যদিকে, বিক্রেতারা বলছেন ভুসি, খৈল ও খড়ের মতো গোখাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে গত বছরের তুলনায় এবার কোরবানির পশুর দাম চড়া। তবে ঈদের দুই-একদিন আগে বিক্রি বাড়ার আশা তাদের।
রবিবার (২৪ মে) রাজধানীর গাবতলীর কোরবানির পশুর হাটে গিয়ে দেখা যায় ক্রেতাদের আনাগোনা বেড়েছে। কিন্তু বেচাকেনা সে তুলনায় কম। হাটে আসা মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত ক্রেতারা বিপাকে পড়েছেন। গত বছরের তুলনায় এবার ছোট ও মাঝারি গরুর দাম একলাফে অনেক বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের। মাঝারি আকৃতির গরু গত বছর দেড় লাখ টাকার মধ্যে পাওয়া গেলেও এবার দাম চাওয়া হচ্ছে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা। ফলে হাটের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরেও বাজেটের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত গরু মিলছে না সাধারণ মানুষের।
গাবতলী হাটে গরু কিনতে এসেছেন মিরপুরের বাসিন্দা মো. সাকলায়েন আহমেদ। তিনি রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, ‘‘আমি সকাল থেকে দুই ঘণ্টা ধরে মাঝারি আকৃতির একটি গরু খুঁজছি। এখনো পাইনি। মনে হয় একা কোরবানি দিতে পারবো না, ভাগে দিতে হবে। প্রতি বছর গাবতলী থেকে মাঝারি আকৃতির গরু কিনি। এবার বাজেট সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। অথচ দাম চাচ্ছে আড়াই লাখ টাকা।’’
‘‘আজ দেখে চলে যাচ্ছি। দেখি দু’একদিন পর দাম কমে কিনা,’’ বলেন তিনি।
আগারগাঁও থেকে এসেছেন বেসরকারি চাকরিজীবী সাখাওয়াত হোসেন রেজা। তিনি রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, ‘‘বাজারের অবস্থা খুবই অস্বাভাবিক। বিক্রেতারা দাম ছাড়তেই চাচ্ছেন না। একটা ছোট সাইজের গরুর দাম চাচ্ছে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা, যেটার বাস্তব দাম কোনোভাবেই ৯০ হাজার বা ১ লাখের বেশি হওয়া উচিত নয়। আমরা কয়েকজন মিলে ভাগে কোরবানি দেওয়ার জন্য এসেছি, কিন্তু যে দাম হাঁকা হচ্ছে তাতে আমাদের বাজেট পার হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে আরও দু-একটা হাট ঘুরে দেখতে হবে।"
মোহাম্মদপুর থেকে গাবতলীর হাঁটে কোরবানির গরু নিতে এসেছেন গৃহিণী আফরোজা জাহান লিলি। তিনি রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, ‘‘স্বামীর সাথে হাটে এসেছি একটু দেখেশুনে গরু কিনতে। কিন্তু বিক্রেতারা এখন দামের ব্যাপারে কোনো ছাড় দিচ্ছেন না। তারা যে দাম বলছেন, তার থেকে ২০-৩০ হাজার টাকা কম বললেও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। আমাদের মতো সীমিত আয়ের মানুষের জন্য এবার কোরবানি দেওয়াটাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দাম না কমলে এবার হয়তো ছাগল কোরবানি দিতে হবে।’’
৫০টি গরু নিয়ে গাবতলী হাটে এসেছে জামালপুরের খামারি মো. সাত্তার বেপারি। তিনি রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, ‘‘এখনো তেমন বিক্রি হয়নি। আমি মাত্র পাঁচটি গরু বিক্রি করেছি। ক্রেতা শুধু গরুর দামটাই দেখছেন, কিন্তু আমাদের পেছনের খরচটা কেউ দেখছেন না। গত বছর যে ভুসি বস্তা কিনেছি ১৮০০ টাকায়, এবার তা কিনতে হয়েছে ২৫০০ টাকার ওপরে। খৈল, ঘাস, খড় সবকিছুর দাম দ্বিগুণ। এক বছর ধরে একটা গরুর পেছনে যে খাটুনি আর টাকা ঢালছি, সেই হিসাব করলে আমি যে দাম চাচ্ছি তা মোটেও বেশি না। ১ লাখ ৮০ হাজার টাকার নিচে মাঝারি আকারের গরু বিক্রি করলে আমার আসল টাকাই উঠবে না, লাভ তো দূরের কথা।’’
কুষ্টিয়া থেকে বড় আকারের গরু নিয়ে গাবতলীর হাটে এসেছেন শফিক মোল্লা। তিনি বলেন, ‘‘আমি হাটে ১২টি গরু নিয়ে এসেছি। ক্রেতারা আসছেন, দাম জিজ্ঞেস করছেন আর চলে যাচ্ছেন। কেউ কেউ এমন দাম বলছেন যা শুনলে কষ্ট লাগে। তবে আমরা আশা ছাড়ছি না। ঢাকার মানুষ সাধারণত ঈদের ঠিক আগ মুহূর্তে কেনাকাটা করে। সরকারি ছুটি শুরু হলে এবং মানুষের হাতে বোনাসের টাকা এলে ঈদের এক-দুই দিন আগে বিক্রি পুরোদমে বাড়বে। তখন ক্রেতারাও বাজারের পরিস্থিতি বুঝবেন এবং আমরাও ন্যায্য দামে গরু বিক্রি করতে পারব, ইনশাআল্লাহ।’’
গাবতলী কোরবানির পশুর হাটে হাসিল ঘরে দায়িত্বরত আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘‘এখন মোটামুটি জমেছে। তবে ঈদের দুই-তিন দিন আগে বেশি বিক্রি হয়। আমরা আশা করছি গতবারের তুলনায় এবার বিক্রি বেশি হবে।’’