ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই উন্মাদনা, পতাকার ঢেউ, কোটি হৃদয়ের একসঙ্গে ধুকপুক করা। গ্যালারির গর্জন, গোলের আনন্দ আর ইতিহাস লেখার প্রতীক্ষা। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপকে ঘিরে আরেকটি গল্পও ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠছে- এটি ট্রফির নয়, পরিবেশের; এটি উৎসবের নয়, উদ্বেগের। পৃথিবীকে রক্ষার কথা বললেও, বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর এবার ইতিহাসের সবচেয়ে দূষণকারী বিশ্বকাপে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে “পৃথিবীর জন্য সবুজ কার্ড” নামে পরিবেশবান্ধব বার্তা ছড়িয়ে আসছে। সমর্থক, খেলোয়াড় ও বিভিন্ন ফুটবল সংস্থাকে পরিবেশ রক্ষায় ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বানও জানানো হয়েছে।
কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই এই প্রচারণার সঙ্গে বাস্তবতার বড় বৈপরীত্য সামনে আসছে।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো; এই ৩ দেশে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিশ্বকাপকে এখন ইতিহাসের সবচেয়ে পরিবেশ-ক্ষতিকর আসর হিসেবে দেখা হচ্ছে। শুধু সবচেয়ে বড় নয়, শুধু সবচেয়ে বাণিজ্যনির্ভর নয়- এটি হতে পারে সবচেয়ে বেশি দূষণ সৃষ্টিকারী বিশ্বকাপ।
‘গ্লোবাল রেসপনসিবিলিটির জন্য বিজ্ঞানী’ নামের গবেষক গোষ্ঠীর হিসাব অনুযায়ী, এই প্রতিযোগিতা থেকে প্রায় ৯০ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য নির্গমন হতে পারে। যা সাম্প্রতিক বিশ্বকাপগুলোর গড় পরিবেশগত প্রভাবের প্রায় দ্বিগুণ।
আর সবচেয়ে খারাপ ভ্রমণ পরিস্থিতি হলে শুধু আকাশপথের যাতায়াত থেকেই নির্গমন ১ কোটি ৩৭ লাখ টন পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
এর পেছনে মূল কারণ- বিশ্বকাপের ক্রমাগত বিস্তার।
আগে যেখানে ৩২ দল খেলত, এবার খেলবে ৪৮ দল। ম্যাচের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১০৪, যা আগের কাঠামোর তুলনায় ৪০টি বেশি। আর পুরো আয়োজন ছড়িয়ে থাকবে এক বিশাল মহাদেশজুড়ে।
অর্থাৎ আরও বেশি দল, আরও বেশি ম্যাচ, আরও বেশি ভ্রমণ, আরও বেশি স্পনসর, আরও বেশি জ্বালানি ব্যবহার।
একজন ইংল্যান্ড সমর্থক যদি প্রতিটি নকআউট ম্যাচ ধরে ফাইনাল পর্যন্ত দলকে অনুসরণ করেন, তাহলে তার ব্যক্তিগত ভ্রমণ থেকেই প্রায় ৩.৫ টন কার্বন নির্গমন হতে পারে। যা একটি গড় ব্রিটিশ বাড়ি প্রায় দেড় বছরের বেশি সময় গরম রাখতে যে শক্তি লাগে, তার সমান।
এটি কেবল একজন সমর্থকের হিসাব। অথচ বিশ্বকাপে থাকবে লাখো দর্শক, গণমাধ্যম কর্মী, করপোরেট অতিথি ও বাণিজ্যিক অংশীদার। ফলে “সবুজ কার্ড” প্রচারণা অনেকের চোখে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠছে।
ফিফা সমর্থকদের পুনর্ব্যবহার, গণপরিবহন ব্যবহার ও পরিবেশবান্ধব আচরণের কথা বলছে। কিন্তু একই সময়ে এমন এক প্রতিযোগিতা তৈরি করেছে, যেখানে দীর্ঘ দূরত্বের বিমান ভ্রমণ প্রায় অনিবার্য। ফ্যান জোনে পরিবেশবান্ধব খাবারের প্যাকেট ব্যবহার করলেও মহাদেশজুড়ে নির্ভরশীল বিমানযাত্রার ক্ষতি সহজে পুষিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।
শুধু দূষণ নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবার সরাসরি মাঠেও পড়তে পারে।
বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, একাধিক আয়োজক শহরে ভয়াবহ গরম খেলোয়াড় ও দর্শকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও সূর্যরশ্মির সম্মিলিত চাপ মাপার সূচক অনুযায়ী ২৬টির বেশি ম্যাচ নিরাপদ সীমার ওপরে তাপঝুঁকিতে অনুষ্ঠিত হতে পারে।
বিশেষ উদ্বেগের জায়গা মিয়ামি। সেখানে প্রতিটি বিশ্বকাপ ম্যাচই ঝুঁকিপূর্ণ তাপমাত্রার মধ্যে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে হওয়া বিশ্বকাপের তুলনায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই ঝুঁকি এখন অনেক বেড়ে গেছে।
এদিকে আরেকটি বিতর্ক স্পনসরশিপ নিয়ে। সৌদি জ্বালানি প্রতিষ্ঠান আরামকোর সঙ্গে ফিফার অংশীদারিত্ব পরিবেশবাদীদের তীব্র সমালোচনার মুখে ফেলেছে। গত বছর ১০০-এর বেশি নারী ফুটবলার এই চুক্তির বিরোধিতা করেন। তাদের বক্তব্য ছিল, এটি ফুটবলের পরিবেশবান্ধব দাবিকে দুর্বল করে।
অবশ্য ফিফা বলছে, পুরোনো স্টেডিয়াম পুনর্ব্যবহার, গণপরিবহন উন্নয়ন, আঞ্চলিক সূচি নির্ধারণ এবং গরম মোকাবিলায় বিশেষ বিরতির মতো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
কিন্তু মূল প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে- এত বড়, এত বিস্তৃত এবং এত যাতায়াতনির্ভর একটি বিশ্বকাপ কি সত্যিই পরিবেশবান্ধব হতে পারে?
হয়তো ২০২৬ বিশ্বকাপ উপহার দেবে স্মরণীয় গোল, ঐতিহাসিক মুহূর্ত, ভাঙবে দর্শকসংখ্যার রেকর্ড, আনবে বিপুল অর্থ।
কিন্তু সবুজ কার্ড উঁচিয়ে ধরার আহ্বানের মাঝেও আরেকটি সত্য ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে- ফুটবল এখনও বিস্তারের মোহ ছেড়ে টেকসই ভবিষ্যৎকে পুরোপুরি বেছে নিতে পারেনি।
বিশ্বকাপের আলো ঝলমলে মঞ্চের পেছনে তাই হয়তো এবার ধোঁয়ার এক অদৃশ্য মেঘও ভেসে থাকবে।