ঢাকা, সোমবার, ২৯ আশ্বিন ১৪২৬, ১৪ অক্টোবর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

ডায়াসপোরা সাহিত্যের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা-বিতর্ক

মোজাফ্ফর হোসেন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৭-২৫ ২:৪৪:৩৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৭-২৫ ৪:০৫:১৯ পিএম

|| মোজাফ্‌ফর হোসেন ||
বেশ কয়েক বছর থেকে ইউরোপ এবং আমেরিকায় ডায়াসপোরা লেখকদের রাজত্ব চলছে। এক্ষেত্রে আমরা দেখছি স্বদেশ বা পিতৃমাতৃভূমের চেয়ে ইউরোপ-আমেরিকায় তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা বেশি। ডায়াসপোরা লেখকদের লেখায় আমরা দেখি নিজের ইতিহাস অন্বেষণ বা আত্মপরিচয় সংকটের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে। ব্রিটিশ বাংলাদেশি নৃত্যশিল্পী আকরাম খান তাঁর ‘দেশ’ নাটকে বলেছেন, বাংলাদেশ আর আমার দেশ নয়, আর ইংল্যান্ড কখনোই সেটা হবে না। সংকটটা এখানেই। স্থানচ্যুতির সঙ্গে সঙ্গে অতীত থেকে সরে আসা। এই সংকট থেকেই হয়তো ইশিগুরোর সাম্প্রতিকতম উপন্যাস ‘দ্য বেরিড জায়ান্ট’-এ বলা হচ্ছে, “সে বলে চলে কিভাবে এই দেশটা বিস্মৃতির কুয়াশা দ্বারা অভিশপ্ত হয়ে উঠেছে।’ বিয়াট্রিস এই মহিলা সম্পর্কে আমাদের জানায়। ‘এরপর সে আমার কাছে জানতে চায়, তুমি এবং তোমার স্বামী পরস্পরের প্রতি ভালোবাসার প্রমাণ কিভাবে দেবে যখন তোমরা তোমাদের একসঙ্গে কাটানো অতীতকে মনে করতে পারছ না।’’

স্বদেশ থেকে দূরে অবস্থান করে লেখার আবার একটা সুবিধাও আছে। ডায়াসপোরা লেখকদের যেমন স্বজাতির কাছে জবাবদিহি করতে হয় না, তেমনি জাতীয়তাবাদী চেতনার জায়গা থেকে দায়বদ্ধতা থাকে না, যে-দেশের পরিচয়ে থাকছেন সে-দেশের কাছেও। ফলে তাঁরা পাশ্চাত্যের প্রাধান্যের বিরুদ্ধে অকপটে লড়াই করতে পারেন। যেটা রুশদি-নাইপলরা করেছেন। আবার পিতৃমাতৃভূমির শাসকগোষ্ঠীর বিপক্ষেও তাঁদের লিখতে সমস্যা হয় না। রুশদি যেমন বলছেন, দূর থেকেই স্বদেশ নিয়ে নির্মোহভাবে লেখা সম্ভব। প্রকৃত ইতিহাস আবেগ থেকে আসে না, আসে ঐতিহাসিক বিচ্ছিন্নতা থেকে। যেমন ইশিগুরো বলছেন, “জাপান সম্পর্কে আমার যে জানাশুনার ঘাটতি, দায়িত্ববোধের অভাব, এটা আমি মনে করি আমাকে গৃহহীন লেখক হিসেবে ভাবতে বাধ্য করেছে। আমাকে নির্দিষ্ট করে কোনো সামাজিক ভূমিকা পালন করতে হয়নি। কারণ আমি বিশুদ্ধ ইংরেজ না, আবার জাপানিও না। ফলে আমাকে আক্ষরিক অর্থে কোনো দায়িত্ব পালন করতে হয়নি, কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা সমাজ নিয়ে লিখতে হয়নি। কারো ইতিহাস আমার ইতিহাস হয়ে ওঠেনি।” [সাক্ষাৎকার; কেনজাবুরো ওয়ে গৃহীত]

আবার কারো কারো ক্ষেত্রে উল্টোটাও ঘটার আশঙ্কা থাকে— পিতৃমাতৃদেশ এবং নিজের বর্তমান দেশ দুটোর কাছেই নিজেকে প্রমাণ করতে হয় তাদের আপনজন হিসেবে। প্রতিনিয়ত এই প্রমাণ করার বিষয়টি থাকে, কেননা পিতৃমাতৃদেশের জনগণ এবং নিজ দেশের জনগণ উভয়েই তাঁকে সন্দেহের চোখে দেখে। ফলে একটা মনস্তাত্ত্বিক এবং অস্তিত্বগত সংকট তৈরি হয়, যার প্রভাব তাঁদের লেখালেখিতে গিয়ে পড়ে। যেটা পরিষ্কারভাবে ইশিগুরোর লেখায় পড়েছে। তবে সকলের ক্ষেত্রে বিষয়টা আসে নিজের একটা অতীত এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে শক্ত করে একটা বর্তমানকে দাঁড় করানোর প্রয়াস থেকে। যেমন, ‘মিডনাইটস চিলড্রেন’ উপন্যাসটি লেখার প্রেক্ষাপট হিসেবে সালমান রুশদি তাঁর ‘ইমাজিনারি হোমল্যান্ডস’ গদ্যে জানাচ্ছেন, “বম্বে শহরটা বিদেশিদের তৈরি, জমি অধিগ্রহণ করে, বসতের উপযুক্ত করে নিয়ে ওরা শহরটা বানিয়েছিল। এতদিন দূরে দূরে থেকে প্রায় ওই একই অভিধা আমাকেও দেওয়া যায়, এবং দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করলাম যে, আমারও একটা শহর, একটা ইতিহাস আছে, যা আমি ফের অধিগ্রহণ করতে পারি। যেসব লেখকের পরিস্থিতি আমারই মতো, দেশান্তরিত, হয় পাড়ি জমিয়েছে, নতুবা সেখানকার অভিবাসী, তাদের হয়তো মাঝেমাঝেই কিছু একটা হারানোর বোধ ফিরে ফিরেই হয়, কিছু একটা ফিরে পাওয়ার ইচ্ছা হয়, ফিরে দেখার ইচ্ছা হয়, অথচ সেগুলো নেহাতই মূল্যহীন বলে সাব্যস্ত হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। যদি পেছন ফিরে তাকাতেই হয়, এটা জেনে রেখে তা করাই ভালো যে, অবশ্য তাতে আরো গভীর অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়—এই যে আমরা সশরীরে ভারতে এখন নেই, অনিবার্যভাবে এর অর্থ হলো, ঠিক যে-জিনিসটা আমরা হারিয়েছি সেটা আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়; এককথায়, আমরা তৈরি করে বসব কাহিনি, সত্যিকারের শহর বা গ্রাম নয়, বরং এমন শহর বা গ্রাম যা কোথাও দেখা যায় না, কল্পনায় স্বদেশ, অনেকগুলো মনগড়া ভারত।’ [‘কল্পনায় স্বভূমি’, অনুবাদ : অভিজিৎ মুখার্জি]

উক্তিটা একটু দীর্ঘ হলেও ভাসমান পৃথিবীর সাহিত্য-প্রবণতা বোঝার জন্য জরুরি। ইশিগুরো নিজেও বলছেন, ‘…প্রথমদিকে যখন আমি উপন্যাস লিখতে শুরু করি, জাপানের পটভূমিতেই শুরু করেছিলাম; এটা করার পেছনে কিছু ব্যক্তিগত কারণও ছিল; আবেগের তাড়নায় আমি চাইতাম আমার নিজস্ব জাপানকে আমি আমার মতো করে নির্মাণ করব; এবং তাই করতে চেয়েছি।’ [সাক্ষাৎকার : গাবি উড, দ্য টেলিগ্রাফ] তবে রুশদির সঙ্গে ইশিগুরোর ইতিহাস-চেতনায় একটু ফারাক থাকা স্বাভাবিক। কেননা পাশ্চাত্যের উপনিবেশ হয়ে জাপানকে তত দীর্ঘ সময় কাটাতে হয়নি। তাছাড়া জাপান আজ নিজেই বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর রাষ্ট্র। যদিও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটা জাপানের দখলে নেই। ইংরেজি ভাষার দাপটের জন্য শিল্প-সাহিত্যচর্চার তীর্থভূমি এখন ইউরোপ-আমেরিকা। যে-কারণে জাপানের অনেক লেখক আজ ইংরেজিতে সাহিত্যচর্চা করছেন। কিংবা হারুকি মুরাকামির মতো কেউ কেউ জাপানি ভাষায় লিখলেও অনেক সময় মূলভাষার আগেই ইংরেজি সংস্করণটা বের হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারে। ফলে ঔপনিবেশিকোত্তর ভারতীয় কিংবা আফ্রিকার লেখকদের, যাঁরা ইংরেজিতে লেখেন, তাঁদের সঙ্গে জাপানের ইংরেজি লেখা লেখকদের কিছুটা পার্থক্য আছে। ইশিগুরোর সঙ্গে যে-কারণে নাইপল-রুশদি-আচেবেদের একটা সরল পার্থক্য চোখে পড়ে।

ইশিগুরো স্মৃতি থেকে জাপানের নানা অনুষঙ্গ তুলে ধরছেন। সবসময় সেটি চিনুয়া আচেবেদের মতো সচেতন ইতিহাস নির্মিতি নয়। আচেবে বলছেন, ‘আমি বুঝতে পারলাম আমাকে লেখক হতে হবে। আমাকে ঐতিহাসিক হতে হবে।’ [তর্জমায়: বিদ্যুত খোশনবীশ, সূত্র: দৈনিক অর্থনীতি প্রতিদিন] অর্থাৎ তিনি নিজেকে তাঁর জাতির মুখপাত্র হিসেবে গণ্য করছেন। আচেবে এমন এক জনগোষ্ঠীর লেখক, যাদের ইতিহাস লেখা হয়েছে ইউরোপীয়দের দৃষ্টি দিয়ে। অর্থাৎ শোষক-শ্রেণির হাত দিয়ে তা রচিত। কাজেই প্রকৃত ইতিহাস সেখানে নেই। থাকার কথাও নয়, সেই কথাই বলছেন চিপিউয়া এলডাল: ‘যখন অন্য কেউ তোমার গল্প বলবে, তখন সেটা বদলে যাবে।’ এখানে ইতিহাস মানে শুধু রাজনৈতিক ব্যাপার নয়, সঙ্গে শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি জড়িত। কিন্তু ইশিগুরো সেই দায়িত্ব নিয়ে লিখতে আসেননি। কারণ তিনি নিজেই নিজের ইতিহাস বর্ণনার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সন্দিহান। তিনি বলছেন, ‘স্মৃতি খুব অনির্ভরযোগ্য।’ অন্যত্র বলছেন, ‘আমি যেমনটি বলি, আমি নিশ্চিত এই অভিব্যক্তি যথার্থ নয়, কিন্তু এভাবেই গোধূলিটা স্মৃতিতে আমার আছে।’ আর এজন্যই তাঁকে তুলনা করা হচ্ছে মার্সেল প্রুস্তের সঙ্গে। যতটুকু স্মৃতি আছে, সেটা বাঁচিয়ে রাখা প্রয়োজন, নিজের বেঁচে থাকাটা অর্থপূর্ণ করে তুলতে; না পারলে উপভোগ্য করে তুলতে। যে-কারণে ইশিগুরোর অধিকাংশ লেখায় স্মৃতি মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ঘুরেফিরে আসে। আসে জাপানের অনুষঙ্গ।



ইশিগুরোর ‘অ্যান আর্টিস্ট অফ দি ফ্লোটিং ওয়ার্ল্ড’এক স্মৃতিভ্রষ্ট শিল্পীর গল্প। সে নিজের স্মৃতির সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়েই তার গল্প বলছে। ‘দ্য বেরিড জায়ান্ট’-এ এই কারণেই বলা হচ্ছে, ‘তুমি এবং তোমার স্বামী পরস্পরের প্রতি ভালোবাসার প্রমাণ কিভাবে দেবে যখন তোমরা তোমাদের একসঙ্গে কাটানো সময়গুলোকে মনে করতে পারছ না?’ ভাসমান পৃথিবীতে এই বুদ্বুদসদৃশ স্মৃতিটুকু ধরার জন্য ইশিগুরো বারবার তাঁর উপন্যাসে জাপানে ফিরে যাচ্ছেন, যে-জাপানকে তিনি ঠিকমতো জানতে-চিনতে পারেননি, যে-জাপানের সাহিত্য-ঐতিহ্য থেকে কিছু শেখেননি উল্লেখ করে তিনি বলছেন, ‘…জাপানি লেখকদের কোনো প্রভাব আমার ওপর নেই।… আমি যখনই অনুবাদে জাপানি বইগুলি পড়ি তখন ধাঁধায় পড়ে যাই, হতবুদ্ধি হয়ে পড়ি।’ [সাক্ষাৎকার : প্যারিস রিভিউ] এখান থেকে জন্ম নিচ্ছে একটা চতুর্থ বিশ্বের আখ্যান, যে-বিশ্বে সীমারেখা বলে কিছু থাকছে না, তৈরি হচ্ছে একটা ভাসমান পরিস্থিতি। ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়া, আফ্রিকা সব কেন্দ্রচ্যুত হয়ে মিশে যাচ্ছে একে অন্যের ভেতর, তৈরি হচ্ছে অন্য এক আন্তর্জাতিকতা। সেখান থেকে জন্ম নিচ্ছে ‘Transfictional identity’।

এই ভাসমান পৃথিবীর লেখকদের ভাষা ও সাহিত্যশৈলী কোনো নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর সাহিত্যের ঐতিহ্যের ভেতর থেকে তৈরি হয় না। প্রথম কথা হচ্ছে তাঁরা স্বদেশি ভাষা জানেন না, জানলেও সেটি সাহিত্য-উপযোগী জানা নয়; যেমন ইশিগুরো বলছেন, ‘বর্তমানে ইংল্যান্ডই আমার দেশ, কিন্তু আমার বাবা-মা এখনো সুস্থভাবে বেঁচে আছেন। যখনই ফোনে তাদের সঙ্গে জাপানি ভাষায় কথা বলি, শুনলে মনে হবে সদ্য কথা বলতে শিখেছি। এখন এটাই আমার একমাত্র ভাষা, যা দিয়ে তাদের সঙ্গে আজো আমার সম্পর্ক অটুট আছে।’ [প্যারিস রিভিউ] দ্বিতীয়ত, তাঁরা যে ইংরেজি ভাষায় লিখছেন সেটি নির্দিষ্ট করে ইউরোপ বা আমেরিকার কোনো নির্দিষ্ট শহরের বা জনগোষ্ঠীর ভাষা হিসেবে চেনার উপায় নেই। একইভাবে তাঁদের সাহিত্যিক-প্রবণতা স্বদেশি সাহিত্য-ঐতিহ্য থেকে আসে না। আসে বিশ্বের বিভিন্ন মহান লেখকের কাছ থেকে। এই কারণে ইশিগুরোর মতো লেখকদের আন্তর্জাতিক লেখক হিসেবে বিবেচনা করতে সমস্যা থাকে না। তাঁদের এই আন্তর্জাতিকতা আসে স্বদেশের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতাবোধ ও যে-দেশে থাকছেন সে-দেশের সঙ্গে পুরোপুরি একাত্ম হতে না পারার হতাশা থেকে। একটা বিকল্প সন্তুষ্টির জায়গা হিসেবে তাঁরা বেছে নেন বিশ্বজনীনতা বা বিশ্বনাগরিকতা, যাকে আমরা বলতে চাচ্ছি ভাসমান পৃথিবী বা চতুর্থ বিশ্বের সাহিত্য। নিজ দেশে থেকেও উপনিবেশ-উত্তর তৃতীয় বিশ্বের লেখকরাও এই সংকটে ভুগছেন। বহুজাতিক পণ্য ও সংস্কৃতির আগ্রাসনের মুখে তারা নিজস্বতা বলে কিছু খুঁজে পাচ্ছেন না নিজের জন্মভিটাতেই। আমরা জানি, ত্রিনিদাদের নোবেলজয়ী কবি ডেরেক ওয়ালকোট ডায়াসপোরা লেখক ছিলেন না। তারপরও বহুজাতিক ও বহুভাষিক সংস্কৃতির ভেতর বেড়ে ওঠার ফলে তাঁর ভেতরেও একধরনের সাংস্কৃতিক সংকট ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের জাতীয়তাবাদী চেতনা ও প্রবণতা নিয়ে দ্বিধান্বিত হয়ে তিনি লিখেছেন:

আমি কেবল একজন নিগ্রো, যে সমুদ্র ভালোবাসে

আমি শিক্ষিত হয়েছি ঔপনিবেশিক শিক্ষায়

আমার শরীরে-সংস্কৃতিতে মিশে আছে ডাচ, নিগ্রো এবং ইংরেজ

তাই হতে পারে আমি কেউ না, অথবা নিজেই একটা জাতি। [কবিতা : দ্য স্কুনার ফ্লাইট]


দক্ষিণ কোরিয়ার কবি কো উন যে কারণে বলছেন:

‘সমস্ত কোরীয় উপদ্বীপ হয়ে যাচ্ছে সিউল।…

তুমি, আমি, আমরাও সবাই,

হয়ে উঠছি এক নিউইয়র্ক

হয়ে উঠছি জঘন্য সেই কেবলা

কিংবা তারই কোনো নকল। আমি বলি:

হয়ে উঠছি নিকৃষ্টতম, নির্লজ্জতম, তথাকথিত ‘কেন্দ্র’।

[আমার এলাকা কোথায় গেল?— কো উন, অনুবাদ : ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ]

এই নতুন বিশ্বের সাহিত্যে লেখক আর কারো মুখপাত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন না। ভাসমান বিশ্বের আরেক কথক চেক বংশোদ্ভূত ফরাসি কথাসাহিত্যিক মিলান কুন্দেরা বলছেন, ‘ঔপন্যাসিক কারোরই মুখপাত্র নন। এমনকি নিজের ভাবনারও মুখপাত্র নন।’ [তর্জমায়: দুলাল আল মনসুর, দ্য আর্ট অব নভেল, কাগজ প্রকাশন, ২০০৭] কুন্দেরা নিশ্চয় তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর ঔপন্যাসিকদের এই ভাবনার ভেতর ঢালাওভাবে বেঁধে দেননি। অনুন্নত অর্ধ-শিক্ষিত দেশগুলোতে লেখকরা এখনো জাতির বিবেক বলে বিবেচিত হন। পূঁজি-বিপ্লবের আগে ইউরোপেও ডিকেন্স, দস্তয়েভস্কি এবং তলস্তয়রা লিখেছিলেন উঠতি মধ্যবিত্ত শ্রেণির মুখপাত্র হিসেবে। কিন্তু সময় বদলেছে, প্রযুক্তি ও মিডিয়ার বিপ্লবের ফলে লেখক আর ঘটমান বা ঘটিত ঘটনার বর্ণনাকারী নন। তাঁরা এখন ঘটনার কতগুলো সম্ভাব্যতা নিয়ে কথা বলছেন, যেটি ঘটতেও পারে, নাও পারে। ইউরোপ-আমেরিকায় অভিবাসী মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নেটিভনেস বা স্থানীয়তার ধারণা বদলে যাচ্ছে। সাহিত্যকে যে সামাজিক বয়ান থেকে কাফকা অন্তর্বয়ানের দিকে টেনেছিলেন, সেটিকে এখন বিশ্ববয়ানের দিকে টানছেন এই ভাসমান পৃথিবীর লেখকরা। ফলে ‘তুমি কার জন্যে লেখো’ এই প্রশ্নের উত্তরে ওরহান পামুক তুর্কিতে বসে লিখলেও স্বীকার করে নিচ্ছেন, তিনি তাঁর সেই স্বদেশি মেজরিটির জন্য লেখেন না, যারা তাকে পড়েন না; তিনি লিখছেন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পাঠকদের জন্যে যারা তাঁকে পড়ছেন। [তুমি কার জন্যে লেখো/ওরহান পামুক]

এভাবেই ডায়াসপোরা সাহিত্যে স্বদেশ-বিদেশ ভেঙে অন্তর্বয়ান ও মহাবয়ানের মিশ্রণে নতুন এক বিশ্ববয়ানের সৃষ্টি হচ্ছে।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৫ জুলাই ২০১৮/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন