ঢাকা, বুধবার, ৭ কার্তিক ১৪২৬, ২৩ অক্টোবর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

দক্ষিণ এশীয় ডায়াসপোরা সাহিত্য

মোজাফ্‌ফর হোসেন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৮-২০ ২:১৮:০৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৮-২০ ২:৩০:৫৬ পিএম

|| মোজাফ্‌ফর হোসেন ||

পাকিস্তান-পর্ব : পাকিস্তানি ডায়াসপোরা সাহিত্য সম্পর্কে বাংলাদেশ থেকে খুব বেশি জানা যায় না। ঢাকার বইয়ের মার্কেটে পাকিস্তানি ডায়াসপোরা লেখকদের বই তেমন একটা আসে না। সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত দু’একটি বই কোথাও কোথাও পাওয়া যাচ্ছে। এজন্য ইন্টারনেট একমাত্র ভরসা। দক্ষিণ এশিয়া থেকে ভারতীয় ডায়াসপোরা সাহিত্যের পরপরই পাকিস্তানি ডায়াসপোরা সাহিত্য বিশ্বে শক্তিশালী অবস্থানে আছে। ভারতীয় লেখকদের থেকে প্রভাবমুক্ত হয়ে পাকিস্তানি ডায়াসপোরা লেখকরা নিজেদের অবস্থান আলাদা করে চিহ্নিত ও প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছেন; যে কারণে মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক কারা সিলানো বলছেন, “…getting Pakistani writers and their work out from under the shadow of India while also highlighting how this body of work connects to the larger subcontinent, to multi-lingual cultural life within Pakistan, and to the concerns—both national and international—…[is a difficult task; because] Pakistan seems to occupy less cultural space than its larger sub continental neighbor, India.” [Writing from Extreme Edges: Pakistani English-Language Fiction by Cara Cilano]

পাকিস্তানি ডায়াসপোরা সাহিত্য সম্পর্কে কথা বলতে হলে বিংশ শতকের মাঝামাঝি থেকে শুরু করতে হয়। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের মধ্য দিয়ে আজকের বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান মিলে যৌথভাবে গ্রেটার পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পৃথক পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। আলোচনা শুরু করতে চাই এ পর্বের খ্যাতনামা পাকিস্তানি ডায়াসপোরা কবি ও কথাশিল্পী জুলফিকার ঘোষকে দিয়ে। তাঁর জন্ম ১৯৩৫ সালে, করাচিতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ও তাঁর পরিবার দিল্লি চলে আসেন। দেশভাগের পর তাঁরা পাকিস্তানে না ফিরে ইংল্যান্ড চলে যান। বর্তমানে তিনি টেক্সাসে বাস করছেন। জুলফিকার ঘোষের সাহিত্যে জাদুবাস্তবতা, ফ্যান্টাসি, পরাবাস্তবতা এসব আছে। তিনি অবিভক্ত ভারত থেকে ইংল্যান্ড চলে যান। এরপর যখন ফিরে আসেন জন্মস্থানে, তখন সেটি আলাদা রাষ্ট্র। তিনি অবিভক্ত ভারতের মানুষ হিসেবে বিভক্ত ভারতবর্ষে নিজের জন্মস্থানে দাঁড়িয়ে নিজেকে ‘এলিয়েন’ বোধ করতে থাকেন। তাঁর এই অনুভূতির নাম দেন ‘native alien’। অর্থাৎ নিজগৃহে আগন্তুক। এই শিকড়হীন হওয়ার বিষয়টি তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে এভাবে তুলে ধরেছেন : “আমরা যখন ১৯৫২ সালে বম্বে ছেড়ে লন্ডনে পাড়ি দিলাম তখন আমরা আসলে দুটি দেশ ছেড়ে যাচ্ছিলাম। একদিক থেকে আমরা দুই দেশের জন্যই তখন বহিরাগত। আবার যে লন্ডনে যাচ্ছি সেটিও আমাদের দেশ নয়।’ (Confessions of a Native Alien by Zulfikar Ghose) জলুফিকার ঘোষ জীবনের অধিকাংশ লেখা লিখেছেন আত্মপরিচয়ের সংকট থেকে। স্মৃতিকথার এক জায়গায় তিনি লিখছেন, “You’re tormented by not belonging”.

আমেরিকা থেকে লিখছেন আরেক পাকিস্তানি লেখক বাপসি সিধোয়া। তাঁর উপন্যাস ‘আইস ক্যান্ডি’ (পরবর্তীকালে Cracking India শিরোনামে প্রকাশিত) অবলম্বনে ভারতীয় ডায়াসপোরা চলচ্চিত্রকার দিপা মেহতা নির্মাণ করেন ‘আর্থ’ সিনেমাটি। এবং ‘ওয়াটার’ উপন্যাস অবলম্বনে তিনি নির্মাণ করেন ‘ওয়াটার’ ছবিটি। বাপসি সিধোয়া ১৯৩৮ সালে করাচিতে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯ বছর বয়সে বিয়ে করে বম্বে চলে আসেন। বছর পাঁচেক পর স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলে লাহোর ফিরে যান এবং দ্বিতীয়বারের মতো বিয়ে করেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হাস্টনে বাস করছেন। তাঁর মাতৃভাষা গুজরাটি, দ্বিতীয় ভাষা উর্দু এবং তৃতীয় ভাষা ইংরেজি। তিনি নিজেকে পাঞ্জাবি-পার্সি-পাকিস্তানি লেখক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি বহু আন্তর্জাতিক সম্মাননা পেয়েছেন। তাঁর লেখার বিষয় ভারতবর্ষ এবং পরবাসী পাকিস্তানি জনগণের আত্মপরিচয় নির্মিতি।

এরপরেই চলে আসে হানিফ কুরেইশির নাম। এই ব্রিটিশ-পাকিস্তানি লেখক নাট্যকার-চিত্রনাট্যকার ও নির্মাতা হিসেবেও খ্যাতিমান। টাইম ম্যাগাজিন ১৯৪৫ সালের পর থেকে ৫০জন মহান ব্রিটিশ লেখকের তালিকায় হানিফকে রেখেছেন। হানিফের জন্ম লন্ডনে পাকিস্তানি বাবা ও ব্রিটিশ মায়ের ঘরে। তিনি আটটি উপন্যাস, দুটি ছোটগল্পের সংকলনসহ বেশ কিছু গ্রন্থের প্রণেতা। বাবা-মা দুজন দুদেশের মানুষ হওয়ার কারণে ঘরের বাইরে শুধু নয়, নিজগৃহে তাঁকে দুই সংস্কৃতির বোঝাপড়ার ভেতর দিয়ে বেড়ে উঠতে হয়েছে। বাবা পাকিস্তানি হলেও মা যেহেতু ব্রিটিশ এবং নিজের জন্ম ও বেড়া ওঠা লন্ডনে, তাই পাকিস্তান সম্পর্কে খুব বেশি জানার সুযোগ হয়নি হানিফের। ফলে তিনি বাবার ভেতর দিয়ে পিতৃভূমি ও পূর্বপুরুষদের চিনতে চেয়েছেন। আত্মজীবনী My Ear at His Heart গ্রন্থটি যে কারণে যতটা না পাঠকের জন্য লেখা তার চেয়ে বেশি হানিফ কুরেইশি নিজের জন্য লিখেছেন। আরেক ব্রিটিশ পাকিস্তানি লেখক তারেক আলী দেশটির ডায়াসপোরা লেখক হিসেবে সম্প্রতি নাম করেছেন। পেশায় সাংবাদিক। চলচ্চিত্রকার, ঐতিহাসিক ও অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবেও পরিচিত। ছোটগল্পকার আমির হুসেইন ১৯৭০ সাল থেকে লন্ডনে বাস করছেন। তিনি উর্দু, হিন্দি, পার্সি, ফরাসি, ইতালি, স্প্যানিশ, ফার্সি ভাষা জানেন। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সারা সুলেরি খ্যাতনামা আমেরিকান সাহিত্যসমালোচক। সারা সুলেরি উত্তর-উপনিবেশিক অবস্থায় প্রবাসে থেকে নিজের আত্মপরিচয় নির্মাণ করার চেষ্টা করে চলেছেন। নিজের পাকিস্তানে বেড়ে ওঠাকালীন আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ Boys Will Be Boys: A Daughter’s Elegy-তে সাংস্কৃতিক-রূপান্তর সম্পর্কে বলছেন, “Cultures are certainly translated things: moving from one to another requires a discursive equilibrium hard to acquire, hard to retain.” কুরেইশির মতো সুলেরির জন্য ‘গৃহ’ শব্দটার কোনো সরল ব্যাখ্যা নেই। সুলেরিরও মা ব্রিটিশ, বাবা পাকিস্তানি। ফলে দুটি দেশই যেমন তাঁদের নিজেদের। আবার দুটি দেশেই তাঁরা আগন্তুকের মতো।

সাম্প্রতিক সময়ে খ্যাতি অর্জন করেছেন মহসিন হামিদ। হামিদের জন্ম লাহোর। তিন বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে। হামিদ ক্রিয়েটিভ রাইটিং কোর্সে খ্যাতনামা মার্কিন সাহিত্যিক জয়েস ক্যারল ওটেস এবং টনি মরিসনের ছাত্র ছিলেন। প্রথম উপন্যাস ‘মথ স্মোক’ (২০০০)-এর জন্য বেটি টাস্ক অ্যাওয়ার্ড পান। দ্বিতীয় উপন্যাস ‘দ্য রিলাকটেন্ট ফান্ডামেন্টালিস্ট’ (২০০৭)-এর জন্য ম্যান বুকার প্রাইজে মনোনয়ন পান। এই উপন্যাস অবলম্বনে হলিউডে বাংলাদেশি ডায়াসপোরা ফিল্ম প্রডিউসার আনুশে আনাদিলের প্রতিষ্ঠান ডিলিউড থেকে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। ব্রিটিশ পাকিস্তানি লেখক নাদিম আসলাম প্রথম উপন্যাস ‘সিজন অব দ্য রেইনবার্ডস’ দিয়ে আলোচনায় আসেন। দ্বিতীয় উপন্যাস ‘ম্যাপস ফর লস্ট লাভার্স’ দিয়ে বেশ কটি সম্মাননা অর্জন করেন। উপন্যাসটির বিষয় পাকিস্তানি মুসলমানদের প্রবাসজীবন। ব্রিটিশ পাকিস্তানি ঔপন্যাসিক কামিলা শামজির জন্ম ১৯৭৩ সালে। এরই ভেতর তিনি ৭টি উপন্যাস লিখে বেশ কটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেছেন।

পাকিস্তানি-অস্ট্রেলিয়ান লেখক অনুবাদক আজহার আলী আবেদির জন্ম ১৯৬৮ সালে, পাঞ্জাব প্রদেশে। লন্ডন থেকে পড়াশোনা করে তিনি ১৯৯৪ সাল থেকে অস্ট্রেলিয়ায় বাস করছেন। তিনি ৫টি উপন্যাস লিখেছেন। পাকিস্তানি-ব্রিটিশ কবি মনিজা আলভির বাবা পাকিস্তানি এবং মা ব্রিটিশ। জন্মের পরপরই তিনি বাবা-মায়ের সাথে লন্ডন চলে যান। লন্ডনে তাঁর প্রথম কবিতার বই ‘দ্য কান্ট্রি অ্যাট মাই শোল্ডার’ প্রকাশিত হয়। ২০১১ সাল পর্যন্ত তাঁর ৮টি কবিতার বই বের হয়েছে। লন্ডনে বসে তিনি লেখেন ‘Presents From My Aunts In Pakistan’ কবিতাটি। কবিতার একটি অংশে তিনি লিখেছেন:

My salwar kameez

   didn't impress the school friend

who sat on my bed, asked to see

   my weekend clothes.

But often I admired the mirror-work,

   tried to glimpse myself

      in the miniature

glass circles, recall the story

   how the three of us

             sailed to England. 

আরেকটি অংশে লিখছেন:

I pictured my birthplace

from fifties' photographs.

When I was older

there was conflict, a fractured land

throbbing through newsprint.

শেষাংশে লিখছেন:

Or there were beggars, sweeper-girls

   and I was there -

           of no fixed nationality

কবিতাটি সম্পর্কে কবি আলভি নিজে বলছেন, 'Presents from my Aunts in Pakistan' কবিতাটি যখন লিখি তখন আমি ব্রিটেনে। কয়েকমাস বয়সে পাকিস্তান ছেড়ে এসেছি। তখনও পাকিস্তানে যাওয়া হয়নি। আমার কাছে মনে হলো, পাকিস্তান নিয়ে আমার কবিতা লেখা উচিত, কারণ এছাড়া দেশটিকে আমি ছুঁতে পারছিলাম না।

এছাড়াও নতুনদের মধ্যে আমেরিকান-পাকিস্তানি লেখকদের ভেতর শাইলা আব্দুল্লাহ, নওশিন পাশা-জায়দী, নাফিজা হাজি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নওশিন পাশা-জায়দীর প্রথম উপন্যাস ‘দ্য কালার অব মেহেন্দি’ (২০০৬) অল্পবয়সী আমেরিকান পাকিস্তানি মুসলিম নারীর বিষণ্ণতা নিয়ে লেখা। সমাজ-পরিবার-মুসলিম সম্প্রদায় সকলের প্রত্যাশা পূরণ করতে করতে ক্লান্ত নাজলি (উপন্যাসের প্রধান চরিত্র) শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। শাইলা আব্দুল্লাহর প্রথম উপন্যাস ‘স্যাফ্রোন ড্রিমস’ (২০০৯)-এ ৯/১১ এর ঘটনায় স্বামীর মৃত্যু হলে তার ধর্মপ্রাণ স্ত্রীর সন্তান নিয়ে আমেরিকায় যে সংকট তৈরি হয় তা উপজীব্য করে লেখা। শাইলা ও নওশিনের মতো পাকিস্তানি নারীদের অভিবাসী জীবনের সংকটকে উপজীব্য করে তোলেননি নাফিজা হাজি। তিনি তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দ্য রাইটিং অন মাই ফোরহেড’ (২০১০)-এ দ্বিতীয় প্রজন্মের পাকিস্তানি-আমেরিকানদের সাংস্কৃতিক সংকটকে উপজীব্য করে তুলেছেন। ৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্র-প্রবাসী পাকিস্তানিরা স্থানীয়দের মধ্যে ‘অন্য’ বলে চিহ্নিত হতে থাকে। বর্ণবৈষম্যের শিকার হয়। ধর্মীয় লেবাসের কারণে সকলে সন্দেহের চোখে দেখতে থাকে। এসব বিষয় নাফিজার লেখায় উঠে এসেছে।

৯/১১-এর পর ঢালাওভাবে মুসলমানরা আমেরিকায় বিপন্নবোধ করতে থাকে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশি মুসলমানদের চেয়ে পাকিস্তানি মুসলমানদের এই সংকটের মুখোমুখি হতে হয় বেশি করে। কারণ তালেবানরা তখন পাকিস্তানে সক্রিয়। ফলে ডায়াসপোরা পাকিস্তানি লেখকদের ভেতর এই সংকটকে চিহ্নিত করে উপন্যাস লেখার প্রবণতা বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। যেমন, মহসিন হামিদের দ্বিতীয় উপন্যাস ‘দ্য রিলাকটেন্ট ফানডামেন্টালিস্ট’ (২০০৭), এইচ এম নাকভির প্রথম উপন্যাস ‘হোম বয়’ (২০১০), আলী শেথির প্রথম উপন্যাস ‘দ্য উইশ মেকার’ (২০০৯) এবং কমিলা শামসির পঞ্চম উপন্যাস ‘বার্ন্ট শাডোজ’ (২০০৯)-এ ৯/১১-এর পর আমেরিকায় পাকিস্তানি মুসলমানদের অস্তিত্বের সংকটের বিষয়টি উঠে এসেছে।

রূপা ফারুকি একইসঙ্গে পাকিস্তানি-বাংলাদেশি-ব্রিটিশ লেখক। রূপার বাবা নাসির আহমেদ ফারুকি ষাটের দশকে জনপ্রিয় পাকিস্তানি ঔপন্যাসিক, মা নিলোফার বাংলাদেশি নাগরিক। জন্ম লাহোরে ১৯৭৪ সালে। ওঁর জন্মের পরপরই পরিবার লন্ডনে চলে যায়। রূপা লন্ডনে দর্শন-রাজনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করেন। তিনি ইংরেজি ছাড়া বাবা-মায়ের ভাষা উর্দু-বাংলা কোনোটাই শেখেননি। বর্তমানে তিনি ফুলটাইম লেখক। প্রথম উপন্যাস ‘বিটার সুইটস’ প্রকাশিত হয় ২০০৭ সালে। পরের বছর প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় উপন্যাস ‘কর্নার শপ’। এরপর ‘দ্য ওয়ে থিংস লুক টু মি’ (২০০৯), ‘হাফ লাইফ’ (২০১৪), ‘দ্য ফ্লাইং ম্যান (২০১২), ‘দ্য গুড চিলড্রেন’ (২০১৪) প্রভৃতি উপন্যাস প্রকাশিত হয়। ফারুকি ইউরোপ-আমেরিকায় নতুন লেখকদের ভেতর বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। ১২টির অধিক ভাষায় তাঁর বই অনূদিত হয়েছে। তবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য ডায়াসপোরা লেখকদের মতো রূপা এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যকার সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব তুলে ধরেননি। রূপা একটি সাক্ষাৎকারে জানান যে, আন্ড্রিয়া লেভি, ঝুম্পা লাহিড়ী, জেডি স্মিথ, মণিকা আলীর মতো লেখকদের সঙ্গে তাঁকে তুলনা করায় তিনি আপ্লুত। কিন্তু পরিষ্কারভাবে অন্যদের সাথে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য আছে। তিনি অন্যদের মতো উপন্যাসের ভেতর দিয়ে দুই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক সম্পর্ক নির্ণয় করতে চাননি। তিনি আন্তর্জাতিক অবস্থান থেকে লিখতে চেয়েছেন।

পাকিস্তানের ডায়াসপোরা লেখকদের ভেতর অনেকেই উপমহাদেশের ইতিহাস নিয়ে গল্প-উপন্যাস লিখেছেন। বিশেষ করে দেশভাগ ও দাঙ্গার বিষয়টি তাঁদের লেখায় তীব্র হয়ে ধরা দিয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ লেখক সচেতনভাবে বাংলাদেশের জনগণের উপর পাকিস্তানের জুলুম ও মুক্তিযুদ্ধে পরাজয়ের বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। তবে হাতে গোণা কয়েকজন লেখক পাকিস্তানের ভূমিকার নিন্দা জানিয়ে তাঁদের লেখায় মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ উপস্থাপন করেছেন। শেহবা সারওয়ারের প্রথম উপন্যাস ‘ব্ল্যাক উইংস’ (২০০৪) এবং সোররায়া খানের প্রথম উপন্যাস ‘নূর’ (২০০৩)-এ ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পাশবিক আচরণের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে।

আফগান-পর্ব: ভারত-পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের পর সম্ভবত আফগানিস্তান থেকে সবচেয়ে অধিক মানুষ অভিবাসী হয়ে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এর প্রধান কারণ যুদ্ধ। প্রতিনিয়ত বোমা হামলা। মানুষ বাধ্য হয়ে দেশত্যাগ করে প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপ-আমেরিকাতে আশ্রয় নিয়েছে। এই কারণে আফগানিস্তানের ডায়াসপোরা সাহিত্যের প্রধান বিষয় হলো গৃহযুদ্ধ, ইসলামী কট্টরপন্থীদের সহিংসতা, নারী নির্যাতন, দারিদ্র্য ও যুদ্ধ। আফগানিস্তানের ডায়াসপোরা লেখকদের মধ্যে বিশ্বে সর্বাধিক পঠিত হলেন খালেদ হোসেইনি। তাঁর জন্ম কাবুল শহরে, ১৯৬৫ সালে। বাবা দেশটির বৈদেশিক মন্ত্রণালয়ে কাজ করতেন। বাবার বদলিসূত্রে তাঁদের পরিবার ১৯৭০ সালে ইরানে চলে যায়। ১৯৭৬ সালে পরিবারের সাথে খালেদ প্যারিস চলে যান। আফগানিস্তান সোভিয়েত আর্মিদের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে খালেদের পরিবার রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে আমেরিকায় থিতু হয়। খালেদের বয়স তখন ১৫। ইংরেজি ভাষা তখনও শেখেননি। আমেরিকায় নিজের সেই পরিস্থিতিকে তিনি বলেছেন, "a culture shock" এবং "very alienating"। ২০০৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দ্য কাইট রানার’। উপন্যাসের প্রেক্ষাপট আফগানিস্তান। প্রথম উপন্যাসে ব্যাপক সফলতার কারণে তিনি ডাক্তারি পেশা ছেড়ে ফুলটাইম লেখকজীবন বেছে নেন। উপন্যাসটি অবলম্বনে হলিউডে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। দ্বিতীয় উপন্যাস ‘অ্যা থাওজেন্ড স্প্লেন্ডিড সানস’ প্রকাশিত হয় ২০০৭ সালে। এ উপন্যাসেও প্রেক্ষাপট হিসেবে উঠে আসে তাঁর স্বদেশ। তৃতীয় উপন্যাস ‘অ্যান্ড দ্য মাউন্টেইন ইকোড’ প্রকাশিত হয় ২০১৩ সালে। শরণার্থী সংকট নিয়ে লিখেছেন ২০১৮ সালে প্রকাশিত ‘সি প্রেয়ার’ উপন্যাসিকাটি। বইটি সম্পর্কে লেখক বলেন, ‘We are living in the midst of a displacement crisis of enormous proportions. 'Sea Prayer' is an attempt to pay tribute to the millions of families, like Alan Kurdi's, who have been splintered and forced from home by war and persecution.’

খালেদের পরেই আসে আফগান-ডেনিশ লেখক আসেফ সোলতানজাদের নাম। জন্ম কাবুলে, ১৯৬৪ সালে। ১৯৮৫ সালে তিনি পাকিস্তানে চলে যান; পরে ইরানে। ২০০২ সালে তিনি ইরান থেকে ডেনমার্ক চলে যান। তাঁর ৫টি ছোটগল্পের সংকলন এবং ৬টি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। ফ্রেন্স-আফগান লেখক-নির্মাতা আতিক রহিমির জন্ম কাবুলে, ১৯৬২ সালে। সোভিয়েত আক্রমণের সময় তিনি পাকিস্তান হয়ে ফ্রান্সে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন। ২০০০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাসিকা ‘আর্থ অ্যান্ড অ্যাশেজ’। তিনি নিজেই বইটি অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। সেটি আফগানিস্তান থেকে অস্কারে বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র শাখায় প্রতিযোগী হিসেবে মনোনয়ন পায়। 

অন্যান্য দেশ: শ্রীলঙ্কার ডায়াসপোরা লেখকদের ভেতর বুকার প্রাইজ বিজেতা মাইকেল অনদাতজে অন্যতম। তাঁর জন্ম ১৯৪৩ সালে, কলম্বোতে। ১৯৫৪ সালে তিনি ইংল্যান্ড চলে যান। ১৯৬২ সালে তিনি মন্ট্রিয়লে চলে আসেন। সেই থেকে কানাডা আছেন। তিনি একাধারে কবি-কথাশিল্পী-নাট্যকার-প্রাবন্ধিক ও নির্মাতা। ৭টি উপন্যাস ও ১৩টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ‘দ্য ইংলিশ পেশেন্ট’ (১৯৯২) উপন্যাসের জন্য তিনি ২০১৮ সালে ‘গোল্ডেন ম্যান বুকার’ সম্মানে ভূষিত হন। শ্রীলঙ্কার প্রবাসীদের জন্য দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘শ্রীলঙ্কা রত্ম’ প্রদান করা হয় তাঁকে। ২০০৫ সালে তিনি এই সম্মানে ভূষিত হন। শ্যাম সেলভাদুরের জন্ম ১৯৬৫ সালে। তিনি প্রথম উপন্যাস ‘ফানি বয়’ (১৯৯৪)-এর জন্য কানাডার নাগরিক ও বসবাসরত লেখকদের প্রথম উপন্যাসের জন্য প্রদত্ত `Books in Canada First Novel Award’ (বর্তমান নাম Amazon.ca First Novel Award) অর্জন করেন। সাংবাদিক লেখক ও অনুবাদক রু ফ্রিমান বসবাস করছেন কানাডাতে। তিনি নিজে সমকামী হওয়ার কারণে তাঁর উপন্যাসে সমকামীদের প্রেম ও অধিকারের কথা উঠে এসেছে।

শ্রীলঙ্কান আমেরিকান লেখক নেয়োমি মুনাওয়েরা তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘আইল্যান্ড অব এ থাওজেন্ড মিররস’ (২০১২)-এর জন্য এশীয় অঞ্চল থেকে কমনওয়েলথ বুক প্রাইজ জিতে নেন। শীলঙ্কার জাতিগত দাঙ্গা নিয়ে উপন্যাসটি লেখা। মিনোলি সালগাদোর জন্ম মালয়েশিয়ায়, বেড়ে ওঠা শ্রীলঙ্কায়। বর্তমানে বাস করছেন লন্ডনে। মিনোলির প্রথম উপন্যাস ‘এ লিটল ডাস্ট অন দ্য আইস’ প্রকাশিত হয় ২০১৪ সালে। নেয়োমি এবং মিনোলি উভয়ের লেখাতেই স্থানচ্যুতের বিষয়টি ঘুরেফিরে এসেছে। বিদেশে থাকলেও শ্রীলঙ্কার নাগরিক হিসেবে তাঁদের জাতিসত্তার পরিচয়টা শক্তভাবে ধারণ করছেন। তাঁরা তাদের লেখায় চরিত্র সৃষ্টির ভেতর দিয়ে পরবাস জীবনের বেদনা ও অনুভূতিকে প্রকাশ করেছেন। একটি টকশোতে মিনোলি বলেন, “We (মিনোলি এবং নেয়োমি) too are considered outsiders where we live, and so our connection with home matters deeply. Being told that connection, and thus we don’t matter to the country can hurt deeply”.

১৯৫৪ সালে কলোম্বতে জন্ম নেয়া রমেশ ১৯৭১ সালে লন্ডন চলে যান, আর পাকাপাকিভাবে দেশে ফেরেননি। ‘রিফ’ (১৯৯৪) উপন্যাসের জন্য তিনি ম্যান বুকার প্রাইজে ফাইনালিস্ট হন। বর্তমানে তিনি কমনওয়েলথ শর্ট স্টোরি প্রাইজ-এর বিচারকমণ্ডলীর সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। এ পর্যন্ত ৬টি উপন্যাস লিখে দেশে বিদেশে বিভিন্ন সম্মাননা অর্জন করেছেন। ভুটানিদের ডায়াসপোরা লেখকদের ভেতর কুনজাং চোডেন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি প্রথম ভুটানি নারী যিনি ইংরেজি ভাষায় উপন্যাস লেখেন। তিনি জাতিসংঘে কাজ করেছেন। ‘দ্য সার্কেল অব কার্মা’ তাঁর প্রথম উপন্যাস। পরবর্তীকালে তিনি বেশ কিছু গল্প ও উপন্যাস লিখেছেন। নেপালি ডায়াসপোরা সাহিত্য ইউরোপ-আমেরিকায় জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টা করছে। নেপালি ডায়াসপোরা সাহিত্য নিয়ে দেশটির ডায়াসপোরা সাহিত্যে প্রতিনিধিত্বশীল ব্যক্তি হোম নাথ সুবেদি বলেন, “There is a greater Nepal beyond physical Nepal. Nepali literature documents their feelings and experiences and brings them closer.”

নেপালি-ভারতীয়-আমেরিকান লেখক প্রাজ্বল পারাজুলাইয়ের বাবা ভারতীয় এবং মা নেপালি। মিসৌরি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। লন্ডন থেকে প্রথম ছোটগল্পের সংকলন ‘দ্য গুর্খাস ডটার’ প্রকাশিত হয় ২০১২ সালে। কয়েকটি গল্পে নেপালি ডায়াসপোরা জনগোষ্ঠীর অনুভূতি-আবেগ উঠে এসেছে। দ্বিতীয় বই, উপন্যাস ‘ল্যান্ড হোয়্যার আই ফ্লি’ প্রকাশিত হয় ২০১৩ সালে। বইটি ইউরোপে প্রশংসিত হয়।

(আগামী পর্বে সমাপ্য)




 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২০ আগস্ট ২০১৮/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন