ঢাকা, রবিবার, ১২ মাঘ ১৪২৬, ২৬ জানুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথোপকথন

: রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৪-০৬-২৩ ৮:১১:১৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৪-০৬-২৩ ১০:২২:২০ পিএম

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে লেখক

হাবিবুর রহমান স্বপন : তিনি তার গানে বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করেন না। প্রথাগত কোনো সংগীতশিক্ষা তার কখনো ছিল না, ফলে তার কোনো সংগীতগুরু নেই। অথচ গান গেয়েই তিনি এপার-ওপার দুই বাংলার মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় ঠাঁই করে নিয়েছেন। ‘আমি বাংলায় গান গাই, আমি বাংলার গান গাই’- গানটি শুনলেই তার নামটি প্রথমে মনে পড়ে। পাঠক, ঠিক ধরেছেন, আমি প্রতুল মুখার্জির কথা বলছি। সংগীতপ্রিয় মানুষের কাছে তিনি প্রতুল মুখোপাধ্যায় নামেই বেশি পরিচিত।

প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের জন্ম অবিভক্ত বাংলায় বরিশালে, ১৯৪২ সালে। বাবা প্রভাতচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ছিলেন সরকারি স্কুলের শিক্ষক। মা বাণী মুখোপাধ্যায় ছিলেন গৃহিণী। তার শৈশব কেটেছে পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার চুচুড়ায়। প্রতুল স্কুলজীবনেই নিজের লেখা ও সুরে গান গাইতেন। এ সময় মঙ্গলচরণ চট্টোপাধ্যায়ের ‘আমি ধান কাটার গান গাই’ কবিতায় তিনি প্রথম সুরারোপ করেন। তখন তার বয়স মাত্র ১২ বছর। নিজের লেখা গানের পাশাপাশি ছড়া, কবিতায়ও তিনি বিভিন্ন সময় সুরারোপ করেছেন। অনুবাদ করেছেন বিভিন্ন ভাষার কবিতা। তবে কবিতার চেয়ে গানই তাকে বেশি পরিচিতি এনে দিয়েছে। কেননা তার গান গণমানুষের কথা বলে। সেখানে পাওয়া যায় তাদের মুক্তির আশ্বাস, জেগে ওঠার প্রেরণা।

প্রতুল মুখোপাধ্যায় জীবনে, কর্মে, সাধনায় অন্যান্য গণসংগীতশিল্পীদের চেয়ে একটু ভিন্ন বৈকি। তিনি অত্যন্ত সাদাসিধে জীবন যাপন করেন। প্রযুক্তির এই যুগেও তিনি মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন না। তাকে কেউ কখনো কোনো  জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পড়তে দেখেননি। খদ্দরের পাজামা আর সুতি পাঞ্জাবি- এই হলো তার সব সময়ের পোশাক। সহজ-সরল এই মানুষটির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণাকেন্দ্রের পুরস্কার বিতরণী সভায়। সেখানে আমিও আমন্ত্রিত ছিলাম। আমার আসনের পাশেই ছিল তার আসন। পরিচয় পর্ব সেখানেই। বাংলাদেশের পাবনা জেলায় বাড়ি শুনে বললেন, ‘পাবনার উর্বর মাটিতে অনেক বিপ্লব সংগঠিত হয়েছে। বিশেষ করে নীল বিদ্রোহ, পলো বিদ্রোহ। এ ছাড়া লেখক প্রমথ চৌধুরী, প্রমথনাথ বিশী, কবি বন্দে আলী মিয়া, প্রখ্যাত গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, বাংলার গণমানুষের নায়িকা সুচিত্রা সেন।’ এটুকু বলেই তিনি আমার কাছে সুচিত্রা সেনের পৈতৃক বাড়ির বর্তমান অবস্থার কথা জানতে চাইলেন।

কথা হচ্ছিল, এর মধ্যেই অনুষ্ঠান শুরু হলো। প্রথমে লিটল ম্যাগাজিন পুরস্কার। পুরস্কার পেল বাংলাদেশের লিটল ম্যাগাজিন শালুকশালুক-এর সম্পাদক কবি ওবায়েদ আকাশ পুরস্কার গ্রহণ করলেন। আমি ও ওবায়েদ আকাশ দুজনই একসঙ্গে প্রতুল মুখোপাধ্যায়কে অনুরোধ করলাম, তিনি যেন ‘আমি বাংলায় গান গাই’ গানটি করেন। তিনি দৃঢ়ভাবে ঘাড় নাড়িয়ে অপারগতা প্রকাশ করলেন। মুখের ওপর এভাবে না বলায় একটু বিব্রতই হলাম।

অতিথিদের বক্তৃতা পর্ব শেষে শুরু হলো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রথমে রবীন্দ্রসংগীত গাইলেন শাওন নন্দী। এরপর মৌসুমী পাল, ঊমা ঘোষ ও শিউলী বিশ্বাস গাইলেন। এক ফাঁকে কৌতুকও হলো। কৌতুক পরিবেশন করলেন সাধন বিশ্বাস। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কবি কালীকৃষ্ণ গুহ।

প্রতুল মুখোপাধ্যায় তিনটি গান গাওয়ার পর হঠাৎ করেই থামলেন এবং বললেন, ‘বাংলাদেশ থেকে এসেছেন আমাদের অতিথি আকাশ ও স্বপন, ওরা শুনতে চেয়েছেন ‘আমি বাংলায় গান গাই’ গানটি। তাদের সম্মানে আমি গানটি গাইছি।’

সঙ্গে তিনি এও যোগ করলেন, “বাংলাদেশে কি একজন ‘বাবু’ নামের শিল্পী আছেন। তিনি নাকি দাবি করেন, এই গানটি তিনি লিখেছেন। অথচ আমি গানটি রচনা করেছি। এটা কেমন ধরনের কর্ম আপনারাই বিচার করুন।”

এটুকু বলেই তিনি বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই গানটি গাইলেন। নিজের গান সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি কখনো গান শিখিনি, মানে কোনো ওস্তাদ ধরে গান শেখা হয়নি। যখন গণসংগীত লিখেছি বা সুর করেছি, তার মূল উৎস্য ছিল আমার শোনা গান। সারা জীবন যত গান শুনেছি, তা দিয়েই আমার গান। কাব্যগীতি, হিন্দি ফিল্মের গান, বাংলা আধুনিক গান, জাপানিসহ বিভিন্ন ভাষার গান থেকে আমি উপাদান গ্রহণ করেছি। আমার বাড়িতে দশ বছরের ছোট্ট যে সহায়িকা ছিল, সেও তো আমার গুরু। ছোটবেলায় সংস্কৃত পড়তাম। তার একটা অদ্ভুত গাম্ভীর্য ছিল, আমি তাকে নিয়েছি। সেতার শুনেছি, সেতারের গৎ গলায় তুলেছি। যখন যা অনুভব করেছি, তখন ওই উপাদানগুলো নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছি। এর সবকিছু মিলেছে আমার গানে।’

প্রতুল মুখোপাধ্যায় নকশাল আন্দোলন সমর্থন করে প্রচুর গান করেছেন। সে সময় গানগুলো হয়ে উঠেছিল গণমানুষের মুক্তির গান, স্বাধীনতার গান। তখন মানুষ প্রতুলকে নয়, তার গানকেই জানত।

শ্রোতাদের কাছ থেকে মনে রাখার মতো সমালোচনা পেয়েছেন দু’বার। এর একটা দীপ্ত অন্যটি বিনীত। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় স্মরণসভায় গান গাওয়ার পর এক ছাত্র প্রতুল মুখোপাধ্যায়কে বলেছিল, ‘দাদা, আপনার গানের কতকগুলো লাইনে একটু ট্রেইল ড্রপ হচ্ছে। শেষের দিকের কথাগুলো অস্পষ্ট হচ্ছে। কবিতার কথা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে।’

এরপর থেকে প্রতুল মুখোপাধ্যায় গান গাওয়ার সময় বিষয়টি খেয়াল রাখতেন। পরবর্তী সময়ে একটি খবরের কাগজে ছাপা হয়- প্রতুলের অতি স্পষ্ট উচ্চারণ কৃত্রিম মনে হয়।

দ্বিতীয় সমালোচনা পেয়েছিলেন ১৯৯৫ সালে একজন গাছির কাছ থেকে। দুপুরের হট্টগোলের মধ্যে প্রতুলের গান শুনে তিনি বলেছিলেন, ‘গান কেমন করে গাইতে হয় তা তিনি জানেন। শুধু একটা জিনিস জানেন না, তা হলো কখন কোথায় গাইতে হয়। নৌকা চালায় যে মাঝি, সেও জানে কখন ভাটিয়ালি ধরতে হয়।’

বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার না করার পেছনেও তার কিছু যুক্তি রয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যন্ত্র মানুষকে গান শুনতে বাধ্য করে। আমি চাই আমার গান মানুষ তার ইচ্ছা আর আগ্রহ নিয়ে শুনুক। চাপিয়ে দেয়া কোনো কিছুর ফল কখনো ভালো হয় না। তাই আমি আমার শ্রোতাদের সব সময় উন্মুক্ত রাখতে চাই।’

প্রতুল মুখোপাধ্যায় গান গেয়ে শ্রোতাদের প্রশংসা পেয়েছেন প্রচুর। একবার চুচুড়ায় একটি অনুষ্ঠানে ‘আমি বাংলায় গান গাই’ গানটি গাওয়া পর এক বৃদ্ধ  তাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, ‘এত দিন কোথায় ছিলে ভাই? বড্ড দেরি হয়ে গেল যে। গানটা আরো আগে গাইতে পারলে না?’

আরেক দিনের ঘটনা। একদিন তিনি বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষা করছিলেন, এমন সময় একজন দোকান কর্মচারী তাকে প্রণাম করে একটি ‘ওডোনিল’ উপহার দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি গরিব দোকান কর্মচারী। ল্যাট্রিনের দুর্গন্ধ দূর করার জন্য ওডোনিল বিক্রি করি। দয়া করে আমার এই ছোট্ট উপহারটি নিন।’

গরিব মানুষের ভালোবাসায় কৃত্রিমতা থাকে না। যে কারণে প্রতুল উপহারটি গ্রহণ করেছিলেন। তার গাওয়া একটি জনপ্রিয় গান, ‘আলু বেচো, ছোলা বেচো/ বেচো বাখরখানি/ বেচো না বেচো না বন্ধু তোমার চোখের মণি।’ গানটির শেষের দিকে একটি লাইন আছে- ‘ঘর-দোর বেচো ইচ্ছা হলে, বেচো সোনা-দানা/ বেচো না বেচো না বন্ধু হাতের কলমখানি।’ এ কথার মাধ্যমে তিনি বুঝিয়েছেন কলমের সইয়ের বিনিময়ে অবৈধ অর্থ না নিতে বা ঘুষ গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে। এভাবে শিক্ষিত মানুষকে তিনি চোখে আঙুল দিয়ে পথ দেখিয়েছেন।  

প্রতুল মুখোপাধ্যায় শিশুদের ভালোবাসেন। তাদের জন্য অনেক গান গেয়েছেন। গানগুলো শিশুদের প্রিয়। শিশুদের জন্য গাওয়ার আমন্ত্রণ পেলে তিনি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেখানে উপস্থিত হন। প্রাণ খুলে গান করেন। বলেন, ‘আমি শিশুদের হাসিমুখ পছন্দ করি।’

একবার এক মহিলার সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল। মহিলা এগিয়ে এসে তার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, ‘আপনি কি বাংলা?’

তিনি হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘ঠিকই ধরেছেন, আমি বাংলা।’

এ প্রসঙ্গে প্রতুল মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘যেহেতু মহিলা আমার নাম জানতে চাননি তাই আমিও বলিনি। তা ছাড়া ‘আমি বাংলা’ এত বড় পরিচয় কে ছাড়তে চায়।’ কথাগুলো বলার সময় তার চোখে-মুখে গৌরবের চিহ্ন ফুটে উঠতে দেখলাম। পরক্ষণেই বললেন, ‘শ্রোতাদের ভালোবাসা নিয়েই তো বেঁচে আছি।’

তবে গান নিয়ে তার দুঃখবোধও কম নয়। আক্ষেপ করেই বললেন, ‘বাংলা ভাষাভাষীরা এখন বাংলা গান শুনতে চায় না। বিকৃত উচ্চারণে বাংলা বলায় তিনি কষ্ট পান।’

প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের গান, রাজনৈতিক ভাবনা এবং কর্মকাণ্ড তাকে অন্যদের থেকে অলাদা করেছে। তিনি বলেন, ‘আমি কখনো কাউকে ফলো করিনি। কোনো সংঘেও যাইনি। আমি কখনো নিঃসঙ্গ নই, তবে নিঃসংঘ।’

এরপরই দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, ‘একটি কথা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, প্রতুল মুখোপাধ্যায় সব সময় তার বিবেককে ফলো করে।’

প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের পেশাজীবন শুরু হয়েছিল অধ্যাপনা দিয়ে। এখন অবসর জীবনযাপন করছেন। তার প্রকাশিত গানের সংখ্যা প্রায় ২০০।

আমাদের দুজনের সঙ্গে তার দ্বিতীয় দফা দেখা হলো, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে। দেখলাম, তিনি বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন। এগিয়ে যেতেই হেসে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমরা কেমন আছো?’

সড়কের পাশে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ কথা হলো। আমরা তাকে বাংলাদেশে আসার আমন্ত্রণ জানালাম। তিনি আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন। যদিও প্রথম সাক্ষাতে তিনি আমাদের বলেছিলেন, ‘নো, আই নেভার গো টু বাংলাদেশ।’ এভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করার কারণ মাহমুদুজ্জামান বাবু। যিনি তার গানকে নিজের বলে চালিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। বুঝতে পারলাম, এ ঘটনা তার ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। বাবুর ওপর গোসসা করেই তখন এভাবে ‘না’ বলেছিলেন।

গণমানুষের এই শিল্পী কোনো পুরস্কার পাননি। তবে তিনি পেয়েছেন অজস্র সংগীতপ্রেমী মানুষের ভালোবাসা। এই তার সবচেয়ে বড় পুরস্কার।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৩ জুন ২০১৪/তাপস রায়/কমল কর্মকার