ঢাকা, সোমবার, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

হুলহুলিয়া যেন রূপকথার গ্রাম

এমএম আরিফুল ইসলাম : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১১-১১ ৫:১৩:১৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১১-২২ ৫:২৪:১১ পিএম

‘আমাদের ছোট গাঁয়ে ছোট ছোট ঘর, থাকি সেথা সবে মিলে নাহি কেহ পর।’ কবি বন্দে আলী মিয়া তার কবিতায় যে আদর্শ গ্রামের ছবি এঁকেছিলেন, সেরকমই একটি গ্রাম হুলহুলিয়া।

এ গ্রামে নেই চুরি-ডাকাতি, ঝগড়া-বিবাদ কিংবা রাজনৈতিক বিরোধ। গ্রামটি বেকারত্ব ও মাদকের ছোঁবল থেকে মুক্ত। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এ গ্রামের কেউ কখনো মামলা করতে থানায় যাননি। ২০০ বছরের বেশি সময় ধরে এ গ্রামে কখনো পুলিশ ঢোকেনি। গ্রামটিতে শিক্ষার হার প্রায় শতভাগ। বাসিন্দাদের অধিকাংশই উচ্চ শিক্ষায় আলোকিত। স‌্যানিটেশন সুবিধাও শতভাগ। এখানে বাল্যবিবাহ ও যৌতুকের প্রচলন নেই।

আজকাল পত্রিকা ও টেলিভিশন খুললেই দেখা যায়, বিভিন্ন গ্রামে অপরাধ ও অনিয়মের খবর। নগরের পঙ্কিলতা ছড়িয়েছে গ্রামগুলোতে। হুলহুলিয়া এসব থেকে মুক্ত। হুলহুলিয়া যেন রূপকথার কোনো গ্রাম।

জেলা সদর থেকে ৩৮ কিলোমিটার এবং সিংড়া থানা সদর থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে ছায়াঢাকা শান্ত এ গ্রামটি চৌগ্রাম ইউনিয়নে অবস্থিত। ১৩টি পাড়া নিয়ে গঠিত চলন বিলবেষ্টিত এ গ্রামের আয়তন প্রায় দুই বর্গকিলোমিটার।

গ্রামের মানুষকে চমৎকার ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে বেঁধেছে ‘হুলহুলিয়া সামাজিক উন্নয়ন পরিষদ।’ এই পরিষদ হুলহুলিয়াকে আধুনিক গ্রাম হিসেবে গড়তে কাজ করছে। অনেকে মনে করেন, এ গ্রামটি রাষ্ট্রের মধ্যে ছোট আরেকটি রাষ্ট্র।

একটা সময় ছিল, যখন বর্ষা মৌসুমে এ গ্রামে তেমন কোনো ফসল হতো না। ওই সময়ে মানুষের হাতে কোনো কাজও থাকত না। অভাব লেগেই থাকত।

হুলহুলিয়া সামাজিক উন্নয়ন পরিষদের সহ-সভাপতি মো. আলমগীর কবীর শাহ পরিষদ গঠনের ইতিহাস প্রসঙ্গে বলেন, ১৯১৪-১৫ সালে প্রবল বন্যায় ফসল নষ্ট হওয়ায় গ্রামে অভাব দেখা দেয়। অনেক চাষি ধানবীজের অভাবে জমি ফেলে রাখতে বাধ্য হন। সবার মনে কষ্ট, হতাশা, আশঙ্কা। বিষয়টি গ্রামের মাতবর মছির উদ্দিন মৃধার মনে দাগ কাটে। একদিন গ্রামের প্রতিটি পরিবার থেকে একজন করে লোক ডেকে নিয়ে সভায় বসেন মাতবর। সিদ্ধান্ত হয়- যাদের ঘরে অতিরিক্ত ধানবীজ আছে, তারা বিনা শর্তে অন্যদের ধার দেবেন। সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়। খালি জমি ফসলে ভরে ওঠে। এতে উদ্বুদ্ধ হয়েই গ্রামের উন্নয়নে সবাইকে নিয়ে একটি পরিষদ গঠিত হয়। ১৯৪০ সালের ১ জানুয়ারি সেই পরিষদ হুলহুলিয়া সামাজিক উন্নয়ন পরিষদ নামে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে।

তিনি জানান, হুলহুলিয়া সামাজিক উন্নয়ন পরিষদের মাধ্যমে গ্রামের শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হয়। পরিষদে একজন সভাপতি, একজন সহ-সভাপতি ও ২১ জন নির্বাহী সদস্য থাকেন। এছাড়া, পাঁচজন উপদেষ্টা থাকেন। দুই বছর পর পর গ্রামবাসীর প্রত্যক্ষ ভোটে পরিষদ নির্বাচিত হয়। পরিষদ গ্রামের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও বিচারব্যবস্থা পরিচালনা করে। ১৯৫৭ সাল থেকে নির্বাচনের মাধ্যমে পরিষদের সদস্যদের মধ্য থেকে বিচারক প্যানেল গঠন হয়ে আসছে। গ্রামে কোনো বিরোধ হলে এই প্যানেল আলোচনার মাধ্যমেই তা মীমাংসা করে। বড় কোনো অপরাধ সংগঠিত না হলে থানা বা আদালতে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। বিচারক প্যানেল ও পরিষদের ওপর গ্রামবাসীর আস্থা আছে বলে তারা পরিষদের ওপরই নির্ভর করে। এই আস্থাই পরিষদের বড় সাফল্য বলে মনে করে গ্রামের বাসিন্দারা।

গ্রামের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মালেক প্রামাণিক বলেন, এই গ্রামে ব্রিটিশ আমল থেকে নিজস্ব শাসনব্যবস্থা চালু আছে। এই ব্যবস্থা নিয়ে গ্রামবাসীর মধ্যে কখনো বিরোধ সৃষ্টি হয়নি। গ্রামের বিচারব্যবস্থায় ধর্মীয় গোঁড়ামির স্থান নেই।

১৮৬৯ সালে হুলহুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়ে তোলা হয়। কিন্তু উচ্চ বিদ্যালয় না থাকায় প্রাথমিকের পর অনেকেই ঝরে পড়ত। পরিষদের উদ্যোগ এবং গ্রামের মানুষের চেষ্টায় ১৯৬৬ সালে হুলহুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয় গড়ে তোলা হয়। শুরুতে শিক্ষকদের অনেকেই বিনা বেতনে বা অর্ধেক বেতনে শিক্ষাদান করেছেন। পরে এখানে একটি মাদ্রাসাও প্রতিষ্ঠা করা হয়। বর্তমানে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি একটি বেসরকারি সংস্থার পরিচালনায় দুটি স্কুল চলছে।

চলন বিলবেষ্টিত হওয়ায় আগে বর্ষা মৌসুমে নৌকাই ছিল গ্রামটির যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। তবে পরিষদের চেষ্টায় এখন সারা বছর সড়ক পথেও যাওয়া যায় এই গ্রামে। সবার সহযোগিতায় হুলহুলিয়ায় গড়ে উঠেছে মসজিদ, মন্দিরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান। গড়ে উঠেছে ডাকঘর ও দাতব্য চিকিৎসালয়ও। গ্রামের যারা চিকিৎসক হয়েছেন তারা বিভিন্ন সময়ে বিনামূল্যে গ্রামবাসীকে চিকিৎসাসেবা দেন।

১৯৪৪ সালে ‘দ্য হুলহুলিয়া ডায়মন্ড ক্লাব’ গঠন করা হয়। ক্লাবের উদ্যোগে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ১৩ সদস্যের একটি কমিটি এই ক্লাব পরিচালনা করে। হুলহুলিয়ায় সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে আসছে শেকড় ও বটবৃক্ষ নামের দুটি অরাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন। এই প্রতিষ্ঠানের সদস্য সবাই চাকরিজীবী। তাদের অনুদানে গ্রামের অভাবী ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি, অসহায় মানুষকে সহায়তা ও বেকারদের কর্মসংস্থানের ব‌্যবস্থা করা হয়।

হুলহুলিয়ার দেড় শতাধিক বাসিন্দা প্রকৌশলী ও শতাধিক ব‌্যক্তি চিকিৎসক হয়েছেন। আছেন কৃষিবিদ, আইনবিদ ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

আধুনিক হুলহুলিয়া গঠনের উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু থেকে নিজেদের মেধা, অর্থ ও শ্রম দিয়ে গেছেন অনেকেই। তবে যাদের অবদান বেশি তারা হলেন- শিক্ষাবিদ মরহুম মছির উদ্দিন মৃধা, মরহুম মফিজ উদ্দিন, মরহুম ফরিদ উদ্দিন শাহ, আণবিক শক্তি কমিশনের পরিচালক মরহুম হানিফ উদ্দিন মিঞা, আইন মন্ত্রণালয়ের সাবেক যুগ্ম সচিব মরহুম এ কে তালুকদার, রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম এম এম রহমত উল্লাহ, পল্লী দারিদ্র‌্য বিমোচন ফাউন্ডেশনের (পিবিডিএফ) যুগ্ম পরিচালক ড. মো. মনারুল ইসলাম মনাক্কা, বঙ্গবন্ধু মেডিক‌্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেন্টাল বিভাগের চেয়ারম্যান ডা. মাহাবুবুর রহমান প্রমুখ। গ্রামের শতাধিক ব্যক্তি উচ্চতর শিক্ষা শেষে বিভিন্ন দেশে বড় বড় চাকরিতে নিয়োজিত থেকে গ্রামের উন্নয়নে অবদান রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

হুলহুলিয়া সামাজিক উন্নয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. আল তৌফিক পরশ বলেন, পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য ধরে রেখে সবাই মিলেমিশে গ্রামে সুশিক্ষা, সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি আধুনিক হুলহুলিয়া গঠনই আমাদের মূল লক্ষ্য। কোনো কারণে পরিষদের বিচার কারো মনমতো না হলে তাদের থানা বা আদালতের আশ্রয় নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। তবে এ ধরনের ঘটনা নেই বললেই চলে। বিচারকাজ ছাড়াও দুস্থ-মেধাবী ছাত্রদের বৃত্তি প্রদান করে পরিষদ। রয়েছে হতদরিদ্রদের সহযোগিতার জন্য দারিদ্র‌্য তহবিল।

পল্লী দারিদ্র‌্য বিমোচন ফাউন্ডেশনের যুগ্ম পরিচালক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হুলহুলিয়া শেকড়ের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ড. মো. মনারুল ইসলাম মনাক্কা বলেন, গ্রামে ২০০০ সালে হুলহুলিয়া শেকড় নামের সামাজিক সংগঠন বেকারদের কর্মসংস্থান নিয়ে কাজ শুরু করে। বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা ২৬৫ জন। ইতিমধ্যে হুলহুলিয়া গ্রামকে বেকারমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

চৌগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জাহেদুল ইসলাম ভোলা বলেন, হুলহুলিয়া আদর্শ গ্রাম। ইতিমধ্যে আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের ছোঁয়ায় এটি আদর্শ গ্রামে পরিণত হয়েছে। নির্বাচিত পরিষদ থাকায় হুলহুলিয়া গ্রামে কোনো বিবাদ বা সংঘর্ষ হয় না বললেই চলে। দেশের সব গ্রামেই এমন পরিষদ চালু হলে দেশ অনেক এগিয়ে যেত।

সিংড়া উপজেলা ইউএনও সুশান্ত কুমার মাহাতো বলেন, 'হুলহুলিয়া গ্রাম দেশের আর দশটা গ্রাম থেকে অনেকটা আলাদা। এই গ্রামের মানুষ সামাজিক বন্ধনকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এমন আদর্শ গ্রাম যেন প্রতিটা জায়গায় হয়।

সিংড়া থানার ওসি (তদন্ত) নেয়ামুল আলম বলেন, থানার পরিসংখ্যানই বলে, হুলহুলিয়া গ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই ভালো। জমি নিয়ে বিরোধ হলেও গ্রামের পরিষদই তা সমাধান করে।


নাটোর/আরিফুল ইসলাম/রফিক

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন