ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৫ চৈত্র ১৪২৬, ০৯ এপ্রিল ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

নতুন প্রজন্মকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণের পরামর্শ দেন দেবেশ

আব্দুল্লাহ আল নোমান : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৩-২৫ ১:৪১:১৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৩-২৫ ১:৪৮:১১ পিএম

১৯৭১ সালে সিলেটের সীমান্তবর্তী জৈন্তাপুর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন দেবেশ রঞ্জন কর। তখন তার বয়স ১৯-এর কোঠায়। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পরপরই যুদ্ধপরিস্থিতি আঁচ করতে পেরেছিলেন তিনি। এ কারণে বামপন্থিসহ সমমনাদের নিয়ে সেভাবেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন তারা।

৭ মার্চের রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পরপরই পরিস্থিতি অনেকটাই প্রতিকূলে চলে যায়। বিশেষ করে ছাত্রলীগসহ স্বাধীনতাপন্থি সংগঠনের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের নামের তালিকা করে পাকিস্তান প্রশাসন ধড়পাকড় শুরু করে। তখন তারা বাড়ি ছেড়ে জৈন্তাপুর ইউনিয়ন পরিষদের পেছনে রাত কাটাতেন।

এভাবে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন তারা। ২৬ মার্চের পর ৪ এপ্রিল তিনি গ্রামের বাড়ি চারিকাটার পূর্ব সরুখেলে এসে দেখতে পান, তার দাদা ও বাবা ছাড়া সবাই ভারতে পাড়ি দিয়েছেন। ওইদিনই তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের দলে যোগ দিতে পাড়ি দেন ভারতের ‘মুক্তাপুর’। সেখানে মুক্তিবাহিনীর রিক্রুট ক্যাম্পে প্রশিক্ষণের জন্য তিনি সিলেক্ট হন।

ভারতের ১৫৫ গোর্খা রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল বিএন রাও তাদের ট্রেনিং করান। দেবেশ আর্টিলারি ট্রেনিংও নেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিক মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেওয়া দেবেশ ট্রেনিং শেষে ৫নং সেক্টরের ‘মুক্তাপুর’ সাব-সেক্টরের অধীনে জয়ন্ত সেনের নেতৃত্বাধীন কোম্পানির সদস্য হিসেবে বিভিন্ন গেরিলা অভিযানে অংশ নেন।

এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অভিযান ছিল সারি নদীর পাশে ‘দিঘারাইল’ অভিযান। স্থানটি মুক্তিবাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এখানে হানাদার বাহিনীর একাধিক এলএমজি পোস্ট ছিল, সেখান থেকে তারা সারি নদীর সেতুর নিরাপত্তা রক্ষা করতেন। সেতুটি উড়িয়ে দেওয়া ছিল মুক্তিবাহিনীর জন্য চ্যালেঞ্জ। এটি উড়িয়ে দিলে সিলেটের সঙ্গে জৈন্তাপুর-জাফলংয়ের সরাসরি যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। এ কারণে এখানে বেশ কয়েকবার অভিযান পরিচালনা করা হয়। এইসব অভিযানে বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা প্রাণ হারান।

দেবেশ রঞ্জন বলেন, একেকটি এলএমজি পোস্ট আয়তনে ছিল ২৫-৩০ স্কয়ার ফুটের। এসব বাঙ্কারের মধ্যে অনেক পিতলের সামগ্রী পাওয়া যায়। একই সঙ্গে নারীদের ব্যবহৃত রক্তাক্ত শাড়ি, ব্লাউজ, চুঁড়ি পাওয়া যায়। প্রত্যেক বাঙ্কারে এসব মেলে। এসব দৃশ্য এখনো চোখে ভাসে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

দেবেশ রঞ্জন বলেন, জৈন্তাপুরের প্রধান সড়ক থেকে বাজারের মধ্যবর্তী পথ চলাচলের অনুপযুক্ত ছিল। রাস্তার দুই পাশে অসংখ্য নর-নারীর মৃতদেহ পড়ে ছিল। এসব দেহ পঁচে, গলে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। যে কারণে বিজয়ের পরে দুই মাস এই সড়ক দিয়ে চলাচল করা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, ‘‘বিভিন্ন পয়েন্টে তিন-চারটি করে এলএমজি বাঙ্কার ছিল। আমাদের হালকা হাতিয়ার নিয়ে এসবের মোকাবেলা করা ছিল কষ্টের। তবে মনোবল থাকায় আমরা পাক হানাদারদের এসব অস্ত্রের কাছেও হার মানিনি। বিশেষ করে প্রথম দুই-তিন মাস বেশ কষ্ট হয়েছে।’’

একটি অভিযানে ভারতের এক নায়েকের হাতে গুলি লাগে। এ সময় ওই সহযোদ্ধা করে বলেন, ‘‘খুন রুখদে ইয়ার, খুন রুখদে।’’ দেবেশ মাথা থেকে গামছা খুলে ওই যোদ্ধার হাত বেঁধে দেন। তখন ওই যোদ্ধা তাকে বলেন, ‘‘তিনি যদি মারা যান, তাহলে যেন তার পরিবারের সদস্যদের বলা হয়- তারা যেন এক পাঠানকে হত্যা করে মৃত্যুর প্রতিশোধ নেয়। এ কথা বলে তিনি হাসতে থাকেন।’’

প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের স্মৃতিকথা তুলে ধরে দেবেশ রঞ্জন বলেন, ‘‘প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের প্রথম দুই/তিন মাস কঠিন সময় পার করতে হয়েছে। ১৫ জনের জন্য রান্না করা ভাত ১০০ জনও খেয়েছি। না খেয়েও থাকতে হয়েছে। তবে পরবর্তীতে ভারত সহায়তা দিতে শুরু করায় সেই কষ্ট দূর হয়।’’

দেবেশ রঞ্জনের কাছে প্রশ্ন করা হয়- যে প্রত্যাশা নিয়ে যুদ্ধে অংশ করেন, স্বাধীনতার ৪৯ বছরে এর কতটুকু পূরণ হয়েছে?

এর উত্তরে তার কণ্ঠে ছিল আক্ষেপের সুর। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে দেশকে পাকিস্তানিদের কবল থেকে মুক্ত করার সংগ্রামে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। কিন্তু কান্না আসে যখন দেখেন- প্রতিটি সেক্টর দুর্নীতি, অসুবিধা, চরিত্রহীনতা।

তবে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা এসব অসুবিধাকে দমন করতে কাজ করছেন উল্লেখ করে তিনি এও বলেন, শেখ হাসিনা যা করে যাচ্ছেন, তাতে তিনি অভিভূত। মুক্তিযোদ্ধারা যে স্বপ্ন নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছেন, তার বাস্তবায়নে শেখ হাসিনা অনেক সংগ্রাম করে যাচ্ছেন।

তবে তিনি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের কোটা তুলে দেওয়ার বিরোধিতা করেন।

মুক্তিযোদ্ধা দেবেশ রঞ্জন কর বয়সের ভারে ন্যূব্জ। বর্তমানে হার্টের সমস্যায় ভুগছেন। বেশির ভাগ সময়ই বাড়ির বারান্দার চেয়ারে বসে কাটছে তার। সেখানেই কথা হয় তার সঙ্গে।

সুখী-সমৃদ্ধ দেশ গড়তে তিনি নবীন প্রজন্মকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করে নিজেকে গড়ে তোলার তাগিদ দেন। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর সোনার দেশ গড়তে হলে সোনার মানুষ হিসেবে নতুন প্রজন্মকে গড়ে উঠতে হবে।  

 

ঢাকা/বকুল

     
 

আরো খবর জানতে ক্লিক করুন : সিলেট, সিলেট বিভাগ