ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ০৪ জুন ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

আমন ধান নিয়ে বিপাকে কৃষক

মাওলা সুজন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৩-২৮ ৪:৫৯:০০ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৩-২৮ ৫:২৩:০৪ পিএম

নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার চর ওয়াপদা গ্রামের কৃষক মো. ইব্রাহিম (৩৫)। কৃষিই তার আয়ের একমাত্র উৎস। নিজের সামান্য জমির পাশাপাশি প্রায় ২০ একর জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করেন। গত মৌসুমে প্রায় সব জমিতেই আমন ধান আবাদ করেছিলেন তিনি। উৎপাদন ভালো হলেও কাঙ্ক্ষিত দাম পাননি। এ মৌসুমেও ন্যায্য দাম না পাওয়ায় আমন ধান নিয়ে বিপাকে পড়েছেন ইব্রাহিমের মতো অনেক কৃষক।

মো. ইব্রাহিম জানান, এ মৌসুমে যখন ধান কেটেছেন, তখন দাম ছিল সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা প্রতি মণ। কিছু ধান বিক্রি করে শ্রমিকদের মজুরি দিয়েছেন। বেশিরভাগ ধান সংরক্ষণ করেছিলেন পরে বেশি দাম পাওয়ার আশায়। এর মধ্যে তিনি সয়াবিন ও তরমুজসহ অন্যান্য রবি শস্য আবাদ করেছেন। ধান বিক্রি করতে না পারায় এসব শস্য আবাদের জন্য তাকে বিভিন্ন ব্যক্তি ও এনজিওর কাছ থেকে ঋণ নিতে হয়েছে। প্রায় আড়াই মাস অপেক্ষা করেও ধানের কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না ইব্রাহিম। এখন বাড়ির সামনে ধান স্তূপ করে রেখেছেন। ধানের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কিত তিনি।

নোয়াখালীর বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় আড়াই মাস আগে উঠেছে আমন ধান। এখন রবি শস্য আবাদের সময়। কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় এখনো নোয়াখালীর বিভিন্ন উপজেলায় অনেক কৃষক খেতে বা বাড়ির সামনে ধান স্তূপ করে রেখেছেন। অনেকে অভাব-অনটনে পড়ে শুরুতে নামমাত্র মূল্যে ধান বিক্রি করেছেন। কেউ কেউ কিছু ধান এখন বিক্রি করছেন, কিছু রেখে দিচ্ছেন ফাল্গুন মাসের শেষদিকে বেশি দাম পাওয়ার আশায়।

কৃষকরা জানান, ৩-৪ বছর ধরেই উৎপাদন খরচের চেয়ে বাজারে ধানের দাম কম। ফলে অনেকে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। ভবিষ্যতে ধানচাষে বড় ধরনের লোকসান হতে পারে বলে শঙ্কা তাদের।

একদিকে বাজারে ধানের দাম কম, অপরদিকে সরকারিভাবে ধান কেনা হচ্ছে অল্প পরিমাণে। এছাড়া, খাদ্য বিভাগের কাছে ধান বিক্রি করতে গিয়েও নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে কৃষককে।

ষাটোর্ধ্ব কৃষক নজির আহম্মদ জানান, আমন মৌসুমে তিনি ২২ একর জমিতে ধান চাষ করেছেন। এর মধ্যে বেশিরভাগ জমিই বর্গা নেওয়া। ভালো ফলনও পেয়েছেন। বাজারে ধানের দাম কম হওয়ায় খেতেই ধান গাদা করে রেখেছেন। সম্প্রতি সরকারিভাবে ধান কেনার খবর পেয়ে খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি মাত্র এক টন ধান বিক্রির সুযোগ পেয়েছেন। ধান নিয়ে গেলে নানা অজুহাতে তার ধান ফিরিয়ে দিয়েছে গুদাম কর্তৃপক্ষ। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে তিনি তার নামের ধানের টোকেনটি পাইকারের কাছে বিক্রি করেছেন।

তবে ধান সংগ্রহে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত খাদ্য নিয়ন্ত্রক এ কে এম আবু সাঈদ চৌধুরী।

তিনি বলেছেন, তারা নিয়ম মেনেই ধান নিচ্ছেন। টোকেনপ্রাপ্ত হলেও যদি ধানের আর্দ্রতা সরকারি নিয়মের বাইরে থাকে তাহলে সে ধান নেওয়া হচ্ছে না। যেসব কৃষক নিয়ম মেনে ধান নিচ্ছেন গুদামে, তাদের কাছ থেকে সাদরেই ধান সংগ্রহ করা হচ্ছে। গুদামগুলোতে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় কখনো কখনো ধান সংগ্রহে কিছুটা সময় লাগছে। তারপরও কৃষকদের অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।

সরকারিভাবে মিলারদের ধান কেনার ক্ষেত্রে দাম নির্ধারণ, খাদ্য গুদামের মাধ্যমে সহজ শর্তে ধান ক্রয় ও সংগ্রহের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং কৃষিতে ভর্তুকি বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে করেন স্থানীয় পাইকার ও কৃষিবিদরা।

ধানের বাজারমূল্য এখনো আশানুরূপ নয় বলে মনে করেন আল-আমিন বাজারের পাইকারি ধান ব্যবসায়ী মোহাম্মদ মানিক। তিনি বলেন, স্থানীয় পাইকারদের কিছু করার নেই। মিলাররা যেভাবে দাম নির্ধারণ করেন সেভাবেই ধান কেনেন তারা। তবে এভাবে বছরের পর বছর কৃষক ধানের দাম না পেলে ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে ধানচাষ বন্ধ হতে পারে।

খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্কের (খানি) কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি নুরুল আলম মাসুদ বলেন, এ সমস্যা সারা দেশের। এমন সংকট থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে সরকারিভাবে ধানের আগাম মূল্য ঘোষণা, গুদামের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করা, শস্য মজুদ ঋণ পুনরায় চালু করা এবং কৃষকদের বিনা সুদে ঋণ দেওয়া ও বীজ সহযোগিতার উপর জোর দিতে হবে।

জেলা প্রশাসক তন্ময় দাস বলেছেন, নোয়াখালীতে ভবিষ্যতে সরকারিভাবে আমন ধান সংগ্রহের পরিমাণ বাড়ানোর সুপারিশ করা হবে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, এ জেলায় এবার আমন মৌসুমে ধান উৎপাদন হয়েছে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টন। খাদ্য বিভাগ ধান কিনেছে মাত্র ১৪ হাজার ৭৮৮ টন।

 

নোয়াখালী/সুজন/রফিক

       
 

আরো খবর জানতে ক্লিক করুন : নোয়াখালী, চট্টগ্রাম বিভাগ